এরশাদ পরবর্তী রাজনীতি

Pub: মঙ্গলবার, জুলাই ১৬, ২০১৯ ২:৩৮ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, জুলাই ১৬, ২০১৯ ২:৩৮ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

০১.
নয় বছরের একজন শাসকের মৃত্যুতে অালোচনা সমালোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক,না হওয়াটাই বরং বিস্ময়কর।স্বৈরশাসক হলে ত ভিন্ন প্রতিক্রিয়া হবেই।একজন মানুষ হিসাবে এরশাদের মৃত্যু স্বাভাবিক, যেহেতু পরিনত বয়সেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন।
অালোচনা এখানেও নয়।ব্যক্তি এরশাদ ভালো মন্দের মিশেলে একজন সাধারণ মানুষ হলেও শাসক হিসাবে তার দ্বারা যারা নির্যাতিত জুলমের শিকার হয়েছে তারা যে ছাড় দিবেনা এটাইত বাস্তবতা।তার মৃত্যুতে তাইতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে কেউ নুর হোসেন,কেউ দীপালি সাহা হয়ে খুনের বিচার চেয়েছে।এসব দেখে অবাক হইনি।

পৈতৃক ভিটা ভারতে,দেশভাগের পর চলে অাসেন পূর্ববঙ্গে।মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাস ছিল তার স্পর্শের বাইরে।১৯৭১-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে।বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান,কর্ণেল তাহের, মেজর জলিল কিংবা অারো অনেকেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও এরশাদ কেন পারেননি সে প্রশ্ন এখন আর তোলার সুযোগ কোথায়?১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যত্থানে শাহাদাত বরণ করলেন!তাও চট্টগ্রাম ক্যান্টমেন্টের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে!সেই সময়ের সেনাবাহিনীর প্রধান এরশাদ কি তার অধীনের একজন জিওসি কর্তৃক প্রেসিডেন্ট হত্যার এত বড় একটা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে একেবারেই অন্ধকারে ছিলেন?

০২.
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ এর পর বিএনপি মনোনীত বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করে জোর জবরদস্তি করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে বসেন এরশাদ।ফলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার সমাধি রচিত হয়।শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশালের জায়গায় জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের কবর রচিত হয় এরশাদের হাতে।১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের সংশ্লিষ্টরাও তার সহযোগিতা পেয়েছে! তার ক্ষমতার অংশীদারও হয়েছে অনেকেই।তাই বলে জনগণ কী তাকে দায়মুক্তি দিবে?জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার আদলেই ১৮ দফার অালোকে প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় পার্টি নামক দলের।একটা দল গঠন করতে যে পরিমাণ রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার সমন্বয় ও পরিশ্রম করতে হয় তাও তাকে করতে হয়নি,জাস্ট বিএনপির দলীয় আদর্শের একটা কার্বন কপি নিয়েই গড়ে উঠে জাপা।জিয়াউর রহমানের দল থেকে ধার করা অাদর্শের মতই পেয়েযান কিছু রেডিমেড লিডার।ক্ষমতার রাজনীতির টানে এরশাদের জাপা কিছু দিনের মধ্যেই অন্য দলের নেতাদের নিরাপদ অাবাসে পরিনত হয়।

তার নয় বছরের মেয়াদে প্রায় ৬০ বার মন্ত্রী পরিষদই পরিবর্তন করা হয়েছে। ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে সে সময় খুব সহজেই চলেছে রাজনৈতিক দলের ভাঙ্গা গড়ার খেলা।যাকেই থ্রেট মনে করেছেন তাকেই মন্ত্রীত্ব আর ক্ষমতার টোপে কাছে টেনেছেন।সেই সময়ের ডাকসুর জিএস জিয়াউদ্দিন বাবলু সহ অনেক ছাত্রনেতারও এরশাদের ক্ষমতার হালুয়া রুটির ভাগ পাওয়ার অভিযোগ আছে!৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৩টি জেলাতেই এরশাদ আর্মি অফিসারদের জেলার এসপি হিসাবে নিয়োগ দিয়ে বসেন।১৯৮৭ সালের দিকে প্রশাসনের বেসামরিক দায়িত্বে এরশাদ প্রায় ১৫০০ আর্মি অফিসারকে নিয়োগ দেন। [Bangladesh politics the Shahabuddin interregnum, Muhammad A.Hakim,page-13]
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সেনাবাহিনীকে অর্থ সম্পদ বেসামরিক ক্ষমতা আর প্রাচুর্যে এরশাদই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কাছে টেনে ছিলেন ঠিকে থাকার স্বার্থে!যা একটি গণতান্ত্রিক সরকারে কখনোই কাম্য হতে পারে না।

০৩.
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদের (১৯৮২- ২০১৯) ৩৭ বছরের রাজনৈতিক জীবন কেটেছে সরাসরি কখনো সামরিক স্বৈরাচার কখনও বেসামরিক স্বৈরাচারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে।অনেকেই বলে থাকেন এরশাদ দেশবাসীর সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করলেও আওয়ামীলীগের সাথে করেনি!এরশাদের সময় অাওয়ামী লীগ যেমন সামরিক স্বৈরাচার হওয়ার পরেও তার পাশে থেকেছে ঠিক তেমনি ভাবে বর্তমানে একটি কর্তৃত্ববাদী চরম ফ্যাসিবাদী সরকারকেও জাপা সমর্থন দিয়ে জনগণের স্বপ্নকে খুন করেছে!যার রেফারির ভূমিকায় ছিল ভারত!১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর।এই নয় বছরের এরশাদের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের জন্য রাজপথে উত্থান হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতির এক ফিনিক্স পাখি অাপোষ হীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার।রক্ত ঝরেছে ইতিহাসের অনেক নায়ক মহানায়কের।কিন্তু দেশনেত্রী থেমে যাননি।অাপোষও করেননি।করেছেন অন্য অনেকেই।বীরের ভূমিকায় লড়েছে ছাত্রসমাজ।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭দলীয় জোট, শেখ হাসিনার ৮দলীয় জোট ও বামদের পাঁচ দলীয় জোট মিলে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলিল তৈরী করেছিল যা “তিনজোটের রুপরেখা” নামে পরিচিত সেই রূপরেখায় সেই দিন প্রত্যেকটি দলই ওয়াদা করেছিল বাংলাদেশে গণতন্ত্র, অাইনের শাসন,ন্যায়বিচার,সুশাসন,সহনশীলতার রাজনীতি ও অবাধ নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবাই ভবিষ্যতেও সচেষ্ট থাকবেন!কিন্তু কোথায় আজ সেই প্রতিশ্রুতি?সে জন্যই মানুষ মনে করে এরশাদ অবশ্যই স্বৈরাচার তবে তার চেয়েও বড় স্বৈরাচার অাছে?সামরিক স্বৈরাচারের সাথে সাধারণত পাশ্চাত্য দুনিয়া তথা মার্কিন সাম্রাজ্যেবাদের ভাল সম্পর্ক থাকলেও এরশাদ ছিলেন ব্যতিক্রম।সে ভারতকেও পাশে রেখেছে ফলে নয় বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পরেও স্বাভাবিক রাজনীতিতে ঠিকে থেকে স্বাভাবিক মৃত্যুকে বরন করতে পেরেছেন!এএক বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে।
পাকিস্তানের সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফও নিজের শাসনের পর স্বাভাবিক রাজনীতি করতে পারেননি যেমনটা এরশাদ পেরেছে।বলা যায় এরশাদের রাজনীতি অনেকটাই ম্যাকিয়াভেলিয়ান স্টাইল অব পলিটিক্স!যেখানে শক্তি ও ধূর্ততাই মূখ্য।

০৪.
নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতিতে এরশাদ পরিনত হয় এক অপরিহার্য ব্যালেন্স অব পাওয়ারে।ফলে দুই পক্ষের কাছেই নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে জাহির করে শেষ পর্যন্ত তার সময়ের সহযোগী বন্ধুকেই সমর্থন দিয়েছে।যার মধ্যস্হতায় ছিল ভারত।এরশাদের প্রতি ভারতের দূর্বলতার কারণ হিসাবে ভারতে তার বেরে উঠা শেখরকেও অনেকেই একটা কারণ মনে করে থাকেন।
২০০১ সালের পার্লামেন্ট ইলেকশানে জাতীয় পার্টির বিএনপির সাথে জোট করা না করা নিয়ে দল ভেঙ্গে যায়,এরশাদ চলে যায় অাওয়ামীলীগের সাথে জোটে। জাতীয় পার্টির এরশাদ নানা হিসাব নিকাশের কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনেও মহাজোটে গেলেও কাজী জাফর রওশন এরশাদসহ সহ দলের বৃহত্তর একটা অংশ বিএনপি জোটেই অাসতে চেয়েছিলেন।নানামুখী চাপে তা আর হয়ে উঠেনি।২০১৪ সালের বিএনপি বিহীন নির্বাচনটাও জাপা না গেলে অাওয়ামী লীগের জন্য করা কঠিন হত।২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি পায় ৬টি আসন আর জাপা সংসদে প্রধান বিরোধী দল!এও মেনে নিতে হচ্ছে! জাতীয় পার্টি ও এরশাদ কখনোই জনগণ কী চায় তা বুঝার চেষ্টা করেনি।তাদের রাজনীতিটাই ছিল জনগণের মতামতের বিরুদ্ধের রাজনীতি!

অার উন্নয়ন?এরশাদের সময়ের উন্নয়নের কথা বলা হয়,উন্নয়ন ত এখনো হচ্ছে!এটাকে কী বলবেন?সমর্থন করবেন?দুনিয়ার সকল স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্য একটাই তারা উন্নয়নের স্লোগান তুলে সুশাসন ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধামাচাপা দিতে চায়।এরশাদ ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।কখনো প্রেমিক কখনো কবি এরশাদকে আন্তর্জাতিক সমাজ তখন – the richest president of the poorest country of the world হিসাবেই জানত।

০৫.
অাজকের বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংকট এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এগুলোর জন্য এরশাদ ও তার দল জাপা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত!জাপা আওয়ামীগের সাথে না থাকলে দেশে এই ধরনের একটি শাসন চলতে পারত না। এরশাদের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির একটি যুগের সমাপ্তি টেনেছে সত্য, তবে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্হা ঠিকই রয়ে গেছে।

এরশাদের মৃত্যুর সাথে সাথে তার রাজনৈতিক দল জাপাও আর ঠিকে থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ!রংপুর কেন্দ্রীক আঞ্চলিক এই রাজনৈতিক দলটির ভবিষ্যতও সময়ই বলে দিবে। এতদিন কোনো ভাবে জাপার নেতৃত্ব এরশাদের হাতে থাকলেও বর্তমান সরকারের সময়কালটা যে জাপা সরকারের বাইরে এক চুলও নড়তে পারবেনা এটা বলাই যায়।অনেকটাই আওয়ামীলীগের অঙ্গসংগঠনের মতই এখন চলতে হবে জাপাকে।তবে দেশে নিকট ভবিষ্যতে মিডটার্ম নিরপেক্ষ কোনো পার্লামেন্ট ইলেকশন হলে কিংবা সামনের পার্লামেন্ট ইলেকশন যখনই হবে তখন জাপার বর্তমান রাজনৈতিক মিত্রের সাথে বর্তমান সম্পর্ক ঠিক নাও থাকতে পারে।সামনে জাপার কয়েক টুকরো হয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।এরশাদ সাবেক প্রেসিডেন্ট ছিলেন সুতরাং বিশ্বব্যাপী তার পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকারকে বলতে সুবিধা হয়েছে যে অামাদের পার্লামেন্টের বিরোধী দলের নেতাতো সাবেক প্রেসিডেন্ট!বিরোধী দল তার দল! বহিবিশ্বতো এত হিসাব করেনি সত্যিকারে জাপার অবস্থানটা কী?এই সুযোগটাও আপাতত বর্তমান সরকারের জন্য বন্ধ হয়ে গেল!এরশাদ বিহীন জাপা অাওয়ামীলীগের জন্যও একটা বড় চেলেঞ্জিং বিষয়।জাপাকে ব্যবহার করে নতুন কোনো খেলা অার হচ্ছে না!

কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা তার একটা বড় অংশীদারকেই হারিয়েছে বলা যায়।এরশাদ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্হায়ী কর্তৃত্ববাদী শাসন একটু হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লো!

।।
মোঃনিজাম উদ্দিন
সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সহসম্পাদক
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ