fbpx
 

মশা সম্মেলন : আসিফ নজরুল

Pub: শনিবার, আগস্ট ১৭, ২০১৯ ১:৫০ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, আগস্ট ১৭, ২০১৯ ১:৫০ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সরদার পাখা ঝাপটায়। রাগী রাগী চেহারা করে, একটা হুল উঁচু করে রাখে কিছুক্ষণ। পিনপিন শব্দ থামে না তবু। ধিঙ্গি মশাটা কথা বলছে জোরে জোরেই। সে কিছুদিন আগে একজন বুদ্ধিজীবীকে কামড়ে দিয়েছে। বুদ্ধিজীবীটা হোমরাচোমরা টাইপের মানুষ। খুব খাতির তার লাসাঙ্গা রাজ্যের রানির সঙ্গে। এমন একটা বুদ্ধিজীবীকে কামড়ে দিয়ে ধিঙ্গির বুদ্ধি বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেড়েছে তার অহংকার। কিন্তু এটা সহ্য করা যায় না সব সময়। সরদার জোরে একটা পিনপিন শব্দ করে। নীরব হয়ে যায় সবাই।

তাদের সম্মেলনটা হচ্ছে রাজ্যের মশা নিবারণী সংস্থার ছাদে। সরদারই বুদ্ধি করে জায়গাটা বের করেছে। রাজ্যে মশা মারার নতুন ওষুধ এসেছে। এই ওষুধে নাকি কাজ হচ্ছে। এর মধ্যে তাদের প্রায় বারোজন কমরেড ইন্তেকাল করেছে। ধিঙ্গির ধারণা, মরেছে আসলে অনেক বেশি। ধিঙ্গির মতো কোনো কোনো মহিলা মশা ছড়াচ্ছে এসব গুজব। মানুষের রক্ত খেয়ে খেয়ে স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে এদের। সে পুরুষ মশা, তার এসব সমস্যা নেই।

সরদার উঁচু গলায় বলে, লাসাঙ্গার মশাকুল, আমরা কি নিজেদের হত্যা করি?

না!

সে সবার কথা শুনতে চায়। বলো, আমরা কি নিজেদের গুম করি? নির্যাতন করি?

এবার সবাই তারস্বরে করে বলে, না!

সবাই থামার পর মিহি মশাটা আরেকবার না বলে চিৎকার করে। সে তার দিকে তাকাতেই মিহি ফিক করে হেসে ফেলে। মিহির পায়ের সাদা বর্ডারে একটু গোলাপি ভাব আছে। গায়ের কালো রংটাও খুব ঘন। সে একদিন মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল। মিহি তারপর থেকে আহ্লাদী ভাব করে তার সঙ্গে। তার অবশ্য খারাপ লাগে না।

সে জোরগলায় বলে, আমার কি কাউকে গ্রেপ্তার করি?

না না শব্দে ছাদ সরগরম হয়ে ওঠে। ছাদের শেওলার ওপরে পড়ে থাকা একটা শুকনা ডালের টুকরার ওপর সে বসেছে। একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে। চারপাশ এখনো ভেজা ভেজা, বাতাসে সবুজ ঘ্রাণ।

সরদারের হঠাৎ খিদে লাগে। মাথা উঁচিয়ে সে সামনের মশাকুলকে দেখে। এদের মধ্যে পেটলা একটা মশা আছে। তার পেটটা সারাক্ষণ রক্তে ফুলে থাকে। ভালো হতো তার পেটে একটু হুল ঢুকিয়ে দিতে পারলে।

সেটা অবশ্য সম্ভব নয়। সরদার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা। দিনের আলোয়, সত্যি সত্যি ভোটে। নিজের প্রজাকে শুষে তিনি খেতে পারেন না। রক্ত তার খাবারও নয়। কাজেই এসব ফালতু ভাবনা বাদ দিয়ে সে সিরিয়াস হয়। বলে, তাহলে গোপনে এত কথার দরকার কী? কেন এত গুজব?

কেউ উত্তর দেয় না। বুড়ি মশা শুধু বলে, অনেকে ভয় পাচ্ছে।

ভয়ের কোনো কারণ নেই। এই রাজ্যের মানুষদের কি আমরা চিনি না? তাদের পুরোনো ওষুধে আমার মারা যাইনি। নতুন ওষুধেও মারা যাওয়ার কথা নয়।

কিন্তু কেউ কেউ মারা যাচ্ছে।

সরদার উত্তর দেয় না। সবার দিকে মুখ উঁচিয়ে বলে, নতুন ওষুধ গায়ে লেগেছে, এমন কে কে আছে এখানে?

মিহি হাত তোলে। তারপর আরও কেউ কেউ। সরদার বলে, তোমরা কেউ মরেছ?

মশারা একে-অপরের মুখ-চাওয়াচাওয়ি করে।

মরেছ?

মিহি বলে, আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। উড়তে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। একটু পরে দেখি আরাম। কী যে আরাম।

মিহির কথায় সবাই হাসে। সরদারও। সে ঘন চোখে মিহির দিকে তাকায়। তাকে অবাক করে দিয়ে মিহি দ্রুত একবার চোখ টিপে দেয়।

সরদার খুশিমনে বলে, আমাদের কিছু বোন মারা গেছে। কিন্তু সেটা নতুন ওষুধের কারণে কি না, আমরা জানি না। হতে পারে বয়স হয়েছিল। হতে পারে তারা খারাপ মানুষের রক্ত খেয়েছিল!

খারাপ মানুষের রক্ত নিয়ে ভয় আছে এডিসদের মধ্যে। তাদের পইপই করে বলা আছে খারাপ মানুষ কারা। লাসাঙ্গা রাজ্যে খারাপ মানুষেরা বড় বড় বাড়িতে থাকে, বড় বড় গাড়িতে চড়ে, তাদের গাড়ি আর বাড়ি সারাক্ষণই খুব ঠান্ডা থাকে। ভালো মানুষদের বেশির ভাগ থাকে গাদাগাদি করে ছোট ছোট বাড়িতে। ভালো মানুষেরা রিকশায় চড়ে কিংবা হাঁটে বা বাসে বসে ঘামে। এদের বাচ্চারা পড়ে ময়লা আর অন্ধকার স্কুলে।

বেশি ভালো যারা, তারা থাকে বহু দূরে, সবুজ সবুজ মাঠের পাশে, না হয় শহরের আবর্জনা ফেলার জায়গায়। বেশি ভালোদের রক্তে নাকি স্বাদ নেই তেমন। সবদিক বিবেচনা করে শহরের কম ভালোদের রক্ত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটা না শুনে বড় বাড়ির মানুষদের কামড়ালে কী করতে পারে সে?

সরদার সবাইকে বলেছে যে বড় বাড়ির মানুষেরা ঘরে ছিটায় খাঁটি ওষুধ। হতে পারে তাদের বাড়িতে ঢুকে ইন্তেকাল করেছে মশাদের কেউ কেউ। কিন্তু তাই বলে শহরের মানুষের জন্য ছিটানো নতুন ওষুধে তারা মরেছে, এটা তো বিশ্বাস করা যায় না!

সে বলে, আমরা বলেছিলাম খারাপ মানুষের বাড়িতে না যেতে। সেখানে গেলে তো মুশকিল!

ধিঙ্গি মুখ খোলে। বুদ্ধিজীবী তো খারাপ মানুষ। তাকে কামড়ে দিয়ে আমি তো মরিনি। আমার চাচাতো বোনেরা মিলে রানির কোষাধ্যক্ষকে কামড়ে দিয়েছিল। পেট ঠেসে রক্ত খেয়েছিল। এই সংবাদ মানুষদের পেপারে এসেছে। কই, আমরা তো মরিনি!

খারাপ মানুষের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকা ধিঙ্গির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকায় সবাই। এমনকি মিহিও তার দিকে তাকিয়ে কয়েকবার কাঁপায় চোখের পাতা। সরদার একটু বিরক্ত হয়। বিরক্তি নিয়েই বলে, নতুন ওষুধেও তো অনেকে মরেনি। লাসাঙ্গা রাজ্যের শাসকেরা আসল ওষুধ আনবে সাধারণ প্রজাদের জন্য, এটা কি কেউ বিশ্বাস করো?

সবাই মন দিয়ে শুনছে তার কথা। রক্তে পেট ঠাসা মশাটাকে চোখে পড়ে তার। শেওলায় আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে। ঢুলুঢুলু চোখ প্রাণপণে খুলে রেখে শুনছে তার কথা।

সে তাড়াতাড়ি পেটলা থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। বলে, লাসাঙ্গার শাসকেরা বড় বড় বাড়ি আর গাড়ি করল কেমন করে? কেন আমরা তাদের বাড়িতে কোনো শিশুকে দেখি না। কীভাবে তারা তাদের শিশুদের দূর রাজ্যে পাঠানোর টাকা পায়? নকল ওষুধ না কিনলে কীভাবে তারা এত টাকা পায়? যারা নকল ওষুধ কেনে সব সময়, কেন তারা এবার খাঁটিটা কিনবে?

তার কথায় কাজ হয়েছে। মশারা খুশি হয়েছে শুনে। আনন্দের চোটে মিহি সামনের দুই পা নাচাতে থাকে। চোখ চকচক করছে তার খুশিতে।

সরদার বলে, তা ছাড়া যারা বেশি ভয় পাবে, তাদের তো উপায় আছে!

সবাই আবার তাকায় তার দিকে। সে বলে, উত্তরে ওষুধ দিলে দক্ষিণে চলে যাবে। দক্ষিণে দিলে উত্তরে।

ধিঙ্গি বলে, উত্তর-দক্ষিণে একসঙ্গে দিলে?

তাদের মধ্যে মিল নেই। তারা একসঙ্গে কোনো কাজ করবে না।

যদি করে?

ধিঙ্গি বুদ্ধিজীবীর রক্ত খেয়েছে। কিন্তু সে তার স্বভাব পায়নি। পেলে সরদারকে এত প্রশ্ন করত না। সরদার খুনখুন করে হাসে। তাহলে আমরা ওপরে চলে যাব!

ধিঙ্গি মরিয়া হয়ে বলে, সেখানেও দিলে।

ধিঙ্গি ভুল বুদ্ধিজীবীর রক্ত খেয়েছে কি না, সন্দেহ হয় সরদারের। সে বিরক্ত হয়ে বলে, ওপরে কীভাবে দেবে? তাদের কি মশার ওষুধ দেওয়ার বিমান আছে?

তাই তো! এডিসরা একসঙ্গে করতালি দিয়ে ওঠে।

মিহি ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে তার একদম সামনে চলে এসেছে। তার নিজেরই এবার চোখ টেপার ইচ্ছা হয়। বহু কষ্টে দমন করে তা। বলে, লাসাঙ্গা রাজ্যের শাসকেরা যুদ্ধ করার বিমান কেনে, জাহাজ কেনে। তারা নিজেদের মানুষের চোখ নষ্ট করার গ্যাস কেনে, পেটানোর জন্য যন্ত্রপাতি কেনে। কিন্তু তারা আমাদের মারার জন্য বিমান কেনে না! আমাদের জন্য তারা কী কেনে? সরদার একটু থামে। তারপর আবার বলে, কী কেনে?

পচা ওষুধ। নকল ওষুধ। ছন্দে ছন্দে নেচে নেচে তারা এটা বলে কয়েকবার। সরদার এই ফাঁকে মিহির সঙ্গে একটু নেচে নেয়।

নাচ শেষে বলে, ভোজ হবে এখন। ভোজ।

কোথায়?

সরকারি হাসপাতালে।

এডিসরা অবাক হওয়ার ভান করে, সরকারি হাসপাতালে?

হ্যাঁ! বড় হাসপাতালে।

ধিঙ্গির খুব ইচ্ছা হয় আবার তর্ক করতে। জিজ্ঞেস করতে যে বড়লোকের ক্লিনিকে না কেন? কিন্তু সে উত্তরটা জানে। বড়লোকদের হাসপাতালে দরজা-জানালা বন্ধ থাকে। ঠান্ডা রুমগুলোতে কোনোমতে ঢুকতে পারলেও তারা মানুষদের চোখে পড়ে যায়। সরকারি হাসপাতাল গিজগিজে, অন্ধকার, নোংরা। সেখানে ধরা পড়ার ভয় নেই।

পুবের আকাশে সূর্য উঠছে। সরদার মশা জোরে হাঁক দেয়, সরকারি হাসপাতাল।

সবাই সমস্বরে বলে, সরকারি হাসপাতাল।

পিন পিন পিন!

সবাই বলে, পিন পিন পিন!

প্রথম উড়াল দেয় সরদার। তার পেছনে বাকিরা। আজ বাতাস কম। উড়ে আরাম পায় তারা। সরদার একসময় দেখে মিহি উড়ছে তার পাশে।

সরকারি হাসপাতালের কাছে আছে বড় একটা বিশ্ববিদ্যালয়। তার ছাদের অসংখ্য গর্ত। সেখানকার পানি খুব পরিষ্কার। মিহির সঙ্গে গিয়ে ভালো একটা গর্ত পছন্দ করে আসবে সে। মিহিকে ভালোবাসে, ভালোবাসবে তার সন্তানদেরও। মানুষের রক্ত খেতে বেশি দূরে যেতে হবে না তাদের।

মেডিকেল কলেজের সামনে প্রচণ্ড শব্দ করে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। নতুন ওষুধ। সে একবার নিচে ডাইভ দিয়ে সেই ওষুধের ভেতর দিয়ে উড়ে আসে। মরেনি সে, একটুও টলোমলো হয় না তার ওড়া।

সরদার একটা জাত নেতা। মানুষের নেতাদের মতো নয় সে। নিশ্চিন্তে তার পেছনে উড়ে যায় এডিসরা।

প্রথম আলো


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ