fbpx
 

১৮ আগস্ট ২০১৯ ঐতিহাসিহ ‘নানকার বিদ্রোহ’-এর ৭০তম বার্ষিকী

Pub: রবিবার, আগস্ট ১৮, ২০১৯ ৩:৩৪ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, আগস্ট ১৮, ২০১৯ ৩:৩৪ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নানকার বিদ্রোহ সিলেট অঞ্চলের একটি কৃষক-আন্দোলন, যা ১৮ আগস্ট ১৯৪৯ সালে সংগঠিত হয়। জমিদারের ভূমিদাসদের একটি প্রথাকে “নানকার প্রথা” বলা হতো। বিংশ শতাব্দীর ২০-এর দশকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ১৯৫০ সালে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।

শব্দের উৎপত্তি
‘নান’ ফার্সি শব্দ, এর অর্থ রুটি এবং ‘কার’ অর্থ যোগান বা কাজ করা; অর্থাৎ ‘নানকার’ শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয় সেসব কর্মীদের যারা খাবারের বিনিময়ে কায়িক শ্রম দান করে।

নানকার কারা
কেবল খাবারের বিনিময়ে যে জমির ভোগস্বত্ব প্রজাদেরকে দেওয়া হতো সে জমিকেই নানকার জমি বলা হতো। এই নানকার প্রজারা ছিলো ভূমির মালিকের হুকুমদাস; প্রজাই নয় তাদের স্ত্রী-সন্তানরাও বংশানুক্রমে ভূমি মালিকের দাস হতো। সাধারণতঃ নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই; যেমন: কিরান, নম-শূদ্র, মালি, ঢুলি, নাপিত, পাটনি প্রভৃতি শ্রেণীর লোকেরাই নানকার শ্রণীর প্রজা ছিল।

ইতিহাস
নানকার একটি বর্বর শ্রম শোষণের প্রথা, অনেকটা মধ্যযুগীয় দাস প্রথার সঙ্গে তুলনীয়। প্রধানত সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ অঞ্চলে এই সামন্ত প্রথাটি প্রচলিত ছিল। সামন্ত ভূ-মালিকদের সিলেট অঞ্চলে মিরাশদার এবং বড় মিরাশদারকে জমিদার বলা হতো। জমিদার বা মিরাশদারবাড়ির নিকটবর্তী স্থানে কিছু প্রজার বসবাসের ব্যবস্থা করা হতো, তাঁরাই ছিলেন নানকার প্রজা। জমিদারবাড়ির সার্বক্ষণিক গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত থাকতে হতো তাঁদের। এমনকি গভীর রাতেও নারী-পুরুষনির্বিশেষে জমিদারবাড়ির ডাকে ত্বরিত সাড়া না দিলে নেমে আসত অসহনীয় নির্যাতন।

বৃটিশ আমলে সামন্তবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্ট শোষণ পদ্ধতি ছিল নানকার প্রথা। নানকার প্রজারা জমিদারের দেয়া বাড়ি ও সামান্য কৃষি জমি ভোগ করতেন, কিন্তু ওই জমি বা বাড়ির উপর তাদের মালিকানা ছিল না। তারা বিনা মজুরিতে জমিদার বাড়িতে বেগার খাটতো। চুন থেকে পান খসলেই তাদের উপর চলতো অমানুষিক নির্যাতন। নানকার আন্দোলনের সংগঠক কমরেড অজয় ভট্টচার্যের দেয়া তথ্যমতে, সে সময় বৃহত্তর সিলেটের ৩০ লাখ জনসংখ্যার ১০ ভাগ ছিল নানকার এবং নানকার প্রথা মূলত বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেট জেলায় চালু ছিল। ১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধর্মপাশা থানায় নানকার আন্দোলন গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহের সুতিকাগার ছিল বিয়ানীবাজার উপজেলা। সামন্তবাদী শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিয়ানীবাজার অঞ্চলের নানকার কৃষকরা সর্বপ্রথম বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

লাউতা বাহাদুরপুর অঞ্চলের জমিদাররা ছিল অতিমাত্রায় অত্যাচারী। তাদের অত্যাচারে নানকার, কৃষক সবাই ছিল অতিষ্ঠ। লোক মুখে শোনা যায়, বাহাদুরপূর জমিদার বাড়ির সামনে রাস্থায় সেন্ডেল বা জুতা পায়ে হাঁটা যেত না। ছাতা টাঙ্গিয়ে চলা ও ঘোড়ায় চড়াও ছিল অপরাধমূলক কাজ। যদি কেউ এর ব্যতিক্রম করতো তবে তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। জমিদারদের এহেন অত্যাচারে অতিষ্ঠ হলেও তার শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহস কারোরই ছিল না। শোনা যায় নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও কেউ জমিদারদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পেত না। দিনে দিনে জমিদারদের অত্যাচার বাড়ত থাকে সেই সাথে বাড়তে থাকে মানুষের মনের ক্ষোভ, এই অনাচারের প্রতিকার চায় সবাই। তাই গোপনে গোপনে চলে শলাপরামর্শ। কেউ কেউ আবার সাহস সঞ্চার করে এ সময় নানকার ও কৃষকদের সংগঠিত করতে কষক সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় হয়।[১]

অজয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে চলতে থাকে নানকার কৃষকসহ সকল নির্যাতিত জনগনকে সংগঠিত করার কাজ। ১৯৪৭-এর আগেই অজয় ভট্টাচার্য আত্মনিয়োগ করেন নানকার প্রজাদের সংগঠিত করতে এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার হন ব্রিটিশ ভারতের নিরাপত্তা আইনে। দেশ বিভক্তির আগে ও পরে দুই ভাগে সংঘটিত হয় রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহ, যার অন্যতম রূপকার হলেন কমরেড অজয় ভট্টাচার্য। নিপীড়িত মানুষকে সংগঠিত করতে সে সময় অজয় ভিট্টাচার্যের সাথে কাজ করেছেন শিশির ভট্টাচার্য (লাউতা), ললিতপাল (লাউতা), জোয়াদ উল্ল্যা (নন্দিরপল), আব্দুস সোবহান (দক্ষিণ পট্টি) ও শৈলেন্দ্র ভট্টাচার্য (লাউতা) সহ আরও কয়েকজন। তাদের নেতৃত্বে নানকার কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকাশ্য বিদ্রোহ করে জমিদারের বিরুদ্ধে। বন্ধ হয়ে যায় খাজনা দেওয়া এমনকি জমিদারদের হাট-বাজারের কেনাকাটা পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় জমিদার ও তার লোকজানকে ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে ভীত সন্ত্রস্থ জমিদাররা তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শরণাপন্ন হয়ে এ অঞ্চলের নানকার কৃষকদেরকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করে। জমিদারদের প্ররোচনায় পাকিস্তান সরকার বিদ্রোহ দমনের সিদ্ধান্ত নেয়।

১৭ আগষ্ট ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রাবণী সংক্রান্তি। প্রথম দিনের উৎসব আরাধনা শেষে আগামী দিন মনসা পূজার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে গভীর রাতে বিছানার গা এলিয়েছেন সানেশ্বর উলুউরির মানুষ। ভোরে উঠে পূজা আর্চনা, আনন্দ উৎসব আরও কত কি ভাবতে ভাবতে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে সবাই। কিন্তু ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথে পেটোয়া বাহিনী আক্রমণ করে সানেশ্বরে। ঘুমন্ত মানুষ ভীতসন্তস্ত্র হয়ে ঘুম ভেঙ্গে দিগবিদিক পালাতে তাকে। সানেশ্বর গ্রামের লোকজন পালিয়ে পার্শ্ববর্তী উলুউরিতে আশ্রয় নেয়। উলুউরি গ্রামে পূর্ব থেকেই অবস্থান করছিলেন নানকার আন্দোলনের নেত্রী অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও সুরথ পাল।

তাদের নেতৃত্বে উলুউরিও সানেশ্বর গ্রামের কৃষক, নারী-পুরুষ সরকারী বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়াবার প্রস্তুতি নেয় এবং লাটিসোটা, হুজা, ঝাটা ইত্যাতি নিয়ে মরণ ভয় তুচ্ছ করে সানেশ্বর ও উলুউরি গ্রামের মধ্যবর্ত্তী সুনাই নদীর তীরে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয় সরকারি ও জমিদার বাহিনীর সাথে। কিন্তু ইপিআরের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে লাটিসোটা নিয়ে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি কৃষকরা। ঘটনা স্থলেই ঝরেন পড়ে ৬টি তাজা প্রাণ।

অজয় ভট্টাচার্য সিলেটের ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নানকার বিদ্রোহের প্রাণকেন্দ্র ছিল লাউতা বাহাদুরপুর। ১৯৪৮ সালের মে মাসে গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত লাউতা বাহাদুরপুর কেন্দ্রিক পঁয়তাল্লিশ সদস্য বিশিষ্ট নানকার আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা কমিটির সম্পাদক ছিলেন তিনি।

নানকার দিবস
১৯৪৯ সালের ১৮ আগষ্ট নানকারদের উপর পাকিস্তানী মুসলিমলীগ সরকারের ইপিআর, পুলিশ এবং জমিদারদের লাঠিয়াল বাহীনি সংগবদ্ধ হয়ে সশ্রস্ত্র হামলা চালালে ৬ জন নানকার নিহত হন; তারা হলেন:
রজনী দাস (৫০) – ১৫ দিন আগে নিহত নদীর তীরে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে নিহত;
ব্রজনাথ দাস (৫০); কুটুমনি দাস (৪৭); প্রসন্ন কুমার দাস (৫০); পবিত্র কুমার দাস (৪৫) ও অমূল্য কুমার দাস (১৭) – পরবর্তী সময়ে বন্দী অবস্থান নিহত।
এসময় পুলিশের অত্যাচারে নানকার নেত্রী অন্তঃসত্ত্বা অপর্না পালচৌধুরীর গর্ভপাত ঘটে ঘটনাস্থলে। বীভৎস অত্যাচারে তিনি পঙ্গু হয়ে যান। শ্রীহট্ট, রাজশাহী ও ঢাকা জেলে তিনি ৫ বছর বন্দী থাকেন।

প্রথার সমাপ্তি
১৮ আগস্ট, ১৯৪৯ সালে মানব সভ্যতার ইতিহাসে জন্ম নিয়েছিল এক নির্মম ইতিহাস। ১৯৩৭ সালের ঘৃণ্য নানকার প্রথা রদ ও জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ওইদিন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সানেশ্বর উলুউরি গ্রামের সুনাই নদীর তীরে পাকিস্তান ইপিআরের ছোড়া গুলিতে প্রাণ দেন পাঁচজন কৃষক। এর প্রায় ১৫ দিন আগে সানেশ্বরে সুনাই নদীর বুকে জমিদারের লাঠিয়ালদের হাতে শহিদ হন রজনী দাস। এ নিয়ে নানকার আন্দোলনে মোট শহিদের সংখ্যা হয় ছয়জন। আহত হোন হৃদয় রঞ্জন দাস, দীননাথ দাস, অদ্বৈত চরণ দাসসহ অনেকে। বন্দি হোন এই আন্দোলনের নেত্রী অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও উলুউরি গ্রামের প্রকাশ চন্দ্র দাস, হিরণ বালা দাস, প্রিয়মণি দাস, প্রমোদ চন্দ্র দাস ও মনা চন্দ্র দাস। এ ঘটনার পরেই আন্দোলনে উত্তাল হয় সারাদেশ। তাদের এই আত্মত্যাগের ফলেই ১৯৫০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল ও নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। তাই বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসে, বিশেষ করে অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সকল গৌরবান্বিত আন্দোলন বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কৃষক বিদ্রোহ বা নানকার আন্দোলন।

আন্দোলনের সাথে জড়িত কয়েকজন সংগঠক
নানকার বিদ্রোহের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সংগঠক হলেন: বরুণ রায়, হেনা দাস, অজয় ভট্টাচার্য।

ইতিহাসের অজানা অধ্যায়
বিংশ শতাব্দীর শুরুর ভাগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝখানে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে যে ছোট ছোট আন্দোলন গুলো ভারতবর্ষের মানুষগুলোকে একত্রিত হতে সাহায্য করেছে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বইপত্র না ঘাঁটলে এসকল আন্দোলনের অধিকাংশই জানাশোনার আড়ালে রয়ে যায়। মধ্যযুগীয় সামন্তবাদী আমলের একটি অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থাকে ঘিরে তৎকালীন সিলেট ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহের তেমনই একটি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মূলত “নানকার বিদ্রোহ” নামে, যা পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতবর্ষের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে গরীব কৃষক শ্রেণীর বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণে অগ্রদূতের ন্যায় কাজ করে।

যেহেতু বিদ্রোহের ঘটনাক্ষেত্র সিলেট, তাই সিলেট জেলায় নানকার শব্দটির সাথে পরিচিতি থাকলেও বাকি জেলায় তেমন নয়। নান বা ‘রুটি’ থেকেই নানকার শব্দের উৎপত্তি। রুটি দিয়ে যে লোক রাখা হয় তাকেই নানকার বলে। এর অন্যান্য প্রতিশব্দগুলো হচ্ছে, বেগার প্রথা, চাকরান প্রথা ইত্যাদি। সেকালে জমিদারগণ একখণ্ড জমি বরাদ্দ করে নানকারের খোরাক যোগানোর দায়িত্ব শেষ করে ফেলত। জমিই আসলে রুটির অর্থ বহন করত। নানকারকে ক্ষুদ্র একটি ভিটাসহ দু’চার বিঘা জমি বরাদ্দ করা হত। জমি থাকলেই জীবিকা নির্বাহ করা যায়, এটিই ছিল সামন্তবাদী যুগের বিশ্বাস। কিন্তু খোরাকি উৎপাদনে যে শ্রম শক্তি ব্যয় হত তা ছিল মূল্যহীন এভাবে নানকারকে যে জমি বরাদ্দ করা হত, তা হচ্ছে নান (রুটির জন্য) জমি। তাকে খানে (খাবার জন্য) বাড়িও বলা হত। এই ‘নানজমি’ বা ‘খানেবাড়ি’ ভোগ করার পরিবর্তে নানকারদের জমিদারের প্রয়োজনে অনির্দিষ্ট পরিমাণে তার শ্রমশক্তি ব্যয় করতে হত। জমিদার যখনই তার প্রয়োজনানুসারে ডাকত, সশরীরে উপস্থিত হয়ে নানকার হুকুম তামিল করতে বাধ্য ছিল। বিনা মজুরির এই খাটুনিকে বলা হত ‘হদ’ বা ‘বেগারি ‘। একদিকে নানজমি আরেকদিকে বেগারি, এছাড়া নানকার প্রথার কোন প্রান্তে অন্য আর কিছুর আদান প্রদান ছিল না। নানকাররা জমিদারদের প্রজা হিসেবে পরিগণিত হত, খানেবাড়ির প্রজা, হদুয়া প্রজা, বেগার প্রজা, চাকরান প্রজা নানকারদের এসকল নামেই ভূষিত করা হত।

নানকার জমির ক্রয় বিক্রয়, হস্তান্তর, বন্ধকী কোন কিছুই প্রজাদের অধীনে ছিল না। এমনকি স্থায়ী ফল ফসলের বাগানও তাদের অধিকারে ছিল না। জমিতে কোন বড় আকারে গাছ বা মূল্যবান কাঠ উৎপন্ন হলে তা ছিল জমিদারের অধিকারে। অথচ গাছ রোপণ, রক্ষণাবেক্ষণ এমনকি যথাসময়ে ফল আহরণ করে তা জমিদারবাড়িতে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব ও ছিল নানকার প্রজার। প্রজার অধিকার ছিল কেবল ভিটের মাটিতে। ধান, ডাল, তামাক, তরিতরকারি প্রভৃতি মৌসুমি ফসলের উপর নির্ভর করেই তাকে বেঁচে থাকতে হত। অথচ বিনিময়ে তাকে যে মূল্য দিতে হত, তার সীমানা নির্ধারিত ছিল না। কেউ যদি বিনিময় মূল্য দিতে অস্বীকার করত তার কপালে বরাদ্দ ছিল ভয়াবহ সব শাস্তি। দুটি আস্ত বাঁশের ফাঁকে বা তক্তার তলায় হাত, পা বা আস্ত দেহটা ফেলে দুপাশে চেপে চেপে নাকেমুখে রক্ত বের করা, ছিল অন্যতম। এসব কিছুর মধ্যে কদর্যতম অত্যাচার ছিল জমিদারগণের লাম্পট্য চরিতার্থ করা। স্পষ্টতই নানকার প্রজাদের ঝি বেটিরা সুরক্ষিত ছিল না। কোন জমিদার যেঁ কোন মুহূর্তে তলব করলেই মেয়েদের যেতে হত। নানকার রমণীরা বিনামূল্যে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য হয়েছিল। চরিত্রহীনতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সমাজে একটি সাধারণ ব্যাপার। এ কদর্যতার আবেশ নানকার সমাজকেও প্রভাবিত করেছিল। এ অসহনীয় অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাবার পথ খুঁজে পেতেই প্রথম বিদ্রোহের সূচনা হয়। অসম সাহসিকতার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা এ সময় “ইতরজনের কাহিনী” বলে ভদ্রসমাজে উপেক্ষিত ছিল। তেমনি একটি ঘটনা লোকমুখে অনেক শোনা যায়।

বাহাদুরপুর জমিদার রইছ মিয়া তার নানকার প্রজা মথুরা ধূপীকে তুচ্ছ এক কারণে জুতাপেটা করলে লাঞ্ছিত প্রজা চুপচাপ কাছারি থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু অন্তরে তার প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে থাকে। দেখা যায়, জমিদার কাজকর্ম সেরে আহার ও নিদ্রাশেষে বিকেলবেলায় দিঘির পাড়ে কাছারিবাড়ির বারান্দায় আরামকেদারায় শুয়ে হাওয়া খায়। ও সময় তার কাছে চাকরবাকর কেউ থাকে না। যদিও জমিদারের হাকে ডাকে তৎক্ষণাৎ কেউ ছুটে আসার শঙ্কা অজানা নয় তবুও মথুরা সাহস সঞ্চয় করে পরিকল্পনা করে। একদিন সন্ধ্যাবেলা জমিদার উঠি উঠি করছে, এমন সময় আড়াল থেকে ছুটে এসে সে জমিদারেরই জুতাজোড়া হাতে নিয়ে তাকে অকস্মাৎ দু গালে পটাপট আঘাত করে বসল। বিরামহীন ভাবে তারপর সে তার চাষাড়ে হাতের পাদুকাঘাতে জমিদারকে জর্জরিত করে আহত অবস্থায় কাছারি বারান্দায় ফেলে রেখে যায়। পরবর্তীতে জমিদারেরে জ্ঞান ফিরলে আততায়ীকে ধরে আনবার জন্য লোক ছুটলে গিয়ে দেখা যায় মথুরা ধূপী তার পরিবার শুদ্ধ হাওয়া।

নানকার বিদ্রোহের প্রথম রোষাগ্নি প্রজ্বলিত হয় সুখাইড় গ্রামের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সে গ্রামের জমিদার পরিবারের কারণে গোটা গ্রামটা লাম্পট্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। গ্রামের এক নানকার রমণীর প্রতি একদিন জমিদারের চোখ পড়ে এবং তাকে সে ডেকে পাঠায়। রমণীটি চিরাচরিত প্রথামত ছুটে না গিয়ে জমিদারের লোককে সেদিন আচ্ছামত দু কথা শুনিয়ে দেয়। প্রতিক্রিয়া স্বরুপ অগ্নিশর্মা হয়ে জমিদার তার লোকবল নিয়ে রমনীটির ঘরে গিয়ে চড়াও হয়। টেনে হিচড়ে তাকে বাড়ি এনে আটক করে রাখে। একে তো এই বর্বর প্রথা নিয়ে গ্রামের মানুষ গুমড়ে মরছিল, তার উপর উক্ত ঘটনায় তাদের চাপা ক্রোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। সকলে ক্ষেপে গিয়ে জমিদার বাড়িতে তাদের যাতায়াত ও কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের ভিটেমাটি আগলে বসে রইল। জমিদার নিজের গ্রামেই একদম কোণঠাসা হয়ে পড়ল। সুখাইড় গ্রামের নানকার প্রজাদের সূত্র ধরে পরবর্তীতে এ বিদ্রোহ সুনামগঞ্জ মহকুমা, সিলেট সদর মহকুমা এ সকল জায়গাতেও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২২ সালে শুরু হয়ে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত এ বিদ্রোহ চলে, তারপর জমিদারদের সমবেত আঘাতে এটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়।

সাম্রাজ্যবাদী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষকদের এটি ছিল কেবল সূচনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরো সংগঠিত ভাবে নানকার বিদ্রোহ আঘাত হানে।

  • সংগ্রহে : এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া, মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ