fbpx
 

আগস্ট ছাত্র আন্দোলন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Pub: বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২২, ২০১৯ ২:৫৪ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২২, ২০১৯ ২:৫৫ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এক.
ওয়ান ইলেভেনের ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে একটি অস্হায়ী সেনাক্যাম্প স্হাপন করা হয়েছিল।যাকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি চাপা ক্ষোভ কাজ করছিল।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে সেনাবাহিনীর উপস্হিতি একটি অস্বাভাবিক সরকারের সংকেত ছাড়া কিছুই ছিলনা।প্রায় ২৪ ঘন্টাই আবাসিক হল গুলোতে ছিল পুলিশ ও গোয়েন্দাদের নজরদারী।
এরশাদের সামরিক শাসনের একটি নতুন সংস্করন তৈরি হতে যাচ্ছিল সে সময়।আজকের মেরুদেন্ডহীন পা চাটা বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই সেদিন যোগ্যপ্রার্থী আন্দোলনের নামে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক ব্যবস্হার সুর তুলেছিলেন।মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র (যদিও এখন আর নেই) বাংলাদেশের গনতন্ত্রের মাতৃসদন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেদিন অতীতের মতই রুখে দাঁড়িয়ে ছিল,আজকের মত নিরব থাকেনি!

দুই.
ঘটনার সূত্রপাত ২০ আগস্ট,চলে ২২ আগাস্ট ২০০৭ পর্যন্ত।বাংলাদেশে যা অাগাস্ট ছাত্র অান্দোলন নামে পরিচিত।ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সেদিন ডিপার্টমেন্টের এক ফুটবল খেলা চলছিল।মাঠের গ্যালারিতে বসাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের সাথে সেনাবাহিনীর কয়েক জন সদস্যের কথাকাটাকাটি হয়।এক পর্যায়ে সেনাসদস্যরা এক ছাত্রের গায়ে আঘাত করে।মুহূর্তের মধ্যেই সে খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে।ছাত্ররা প্রতিবাদে অগ্নিমশাল হয়ে জ্বলে উঠে।সারা বাংলাদেশের সকল প্রতিস্ঠানে একযুগে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধায় সেনাক্যাম্প বিরোধী এক মিছিল ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে শহিদ মিনারের সামনে দিয়ে এগুতে থাকে।অনেকেই রাগে, ক্ষোভে নিজ নিজ জুতা ছুড়ে মারতে থাকে ক্যাম্পও পুলিশের দিকে।ছাত্রদের মিছিলটি সেনা ওপুলিশ সদস্যদের মাঝখানে পড়ে গেলে ব্যাপক গন পিটুনির শিকার হয়।স্লোগান মুখর ঝাঝালো মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে উঠে ক্যাম্পাস-
” আমাদের ক্যাম্পাসে আমরাই থাকব
ক্যাম্পাসে সেনাক্যাম্প মানিনা মানবনা “
সুভাগ্য ক্রমে সেদিনের সেই প্রতিবাদ প্রতিরোধের মিছিলে অনেকের সাথে প্রথম বর্ষের একজন ছাত্র হিসাবে আমিও অংশ নিয়ে ছিলাম। আর্মি- পুলিশ বনাম ছাত্রদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।আমিও সেদিন চরমভাবে আহত হলে বন্ধু রাসেল (এখন পুলিশ অফিসার) আমাকে সূর্যসেন হলের বির্তক ধারার রুমে কোলে করে নিয়ে আসে।অবস্তার অবনতি হতে থাকলে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমাকে ভর্তি করা হয়।একটু পরেই একই কেবিনে হাতে রক্তাক্ত অবস্থায় এসে ভর্তি হন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ভিসি আফম ইউসুফ হায়দার,চোখে আঘাত প্রাপ্ত মুজিব হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানসহ আরো অনেক ছাত্র শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী।

তিন.
এফ রহমান হলের সামনের গাছের পাতা গুলো পুলিশের গুলিতে ছিড়ে কাগজের মত হয়ে পড়ে।সারাদিন ক্যাম্পাসে এমনও গুঞ্জন ছিল রাতে সামরিক শাসন জারি হতে পারে!সন্ধ্যারপর ছাত্রাবাসগুলোতে নেমে আসে তল্লাসির নামে নির্যাতন।রাতে কারফিউ জারি করা হয়।গ্রেফতার করা হয় পর্যায়ক্রমে আনোয়ার হোসেন,হারুন অর রশিদ,সদরুল আমিন,মলয় কুমার ভৌমিক সহ অনেক শিক্ষকও ছাত্রনেতাকে।তাদেরকে করা হয় অমানুষিক নির্যাতন।বন্ধু সুজন এখনো পুরোপুরি সুস্থ্য নয়।নির্যাতন প্রতিরোধ ছাত্রআন্দোলনের ব্যানারে সে সময় সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবীতে ক্যাম্পাসে সাধারন
ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপক অংশ গ্রহন ছিল।এটি ছিল একটি শতস্ফুর্ত ছাত্রআন্দোলন।একক কোন ছাত্র সংগঠন এর কৃতিত্ব দাবী করলে ভুল হবে।যদিও এই অান্দোলনে র ক্রেডিট এখন যেসব ছাত্র সংগঠনের নেতারা একক ভাবে দাবি করেন তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন অাছে।দল মত নির্বিশেষে সকলেই সেই লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে।

তৎকালীন সরকার এ ধরনের প্রতিবাদের মুখোমুখি না হলে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে আরেকটি দীর্ঘস্হায়ী সামরিক শাসনের কবলে পড়ত।২০১৬ সালে তুরস্কের জনগন যে কাজটি করেছে ২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও তাই করেছিল।একটি সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থান থেকে দেশকে সেদিন রক্ষা পেয়েছিল।সেই অসাধারণ সাহসী কাজটি করেছিল এদেশের বিপ্লবী ছাত্র সমাজ।সেই রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আহতদের চিকিৎসার খোজ খবর নিতে হাসপাতালে আসেন মেজর জে :সিনা ইবনে জামালী।এই খবরে রাতে ঢাকা মেডিকেল প্রায় ঘেরাও করে ফেলে ছাত্ররা।সেদিন রাতে এনটিভির সংবাদ শিরোনামে আমার আহত ছবি প্রচার করেছিল।এদিকে সাধারন ছাত্রছাত্রীদের ব্যানারে মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের জন্য ৪৮ ঘন্টা সময় বেধে দেয়া হয়।রাত পোহানোর আগেই ক্যাম্পাস ছাড়ে সেনাবাহিনী।কিছুটা সুস্হ্যবোধ করলে আমিও শেষ রাতেই এম্বুলেন্সে সূর্যসেন হলে ফিরে আসি।

চার.
২১আগস্ট ২০০৭ শহীদ মিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এক প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষনা করে।সকালে ছাত্র শিক্ষকদের প্রতিবাদী যৌথ মিছিল।এত বড় মিছিল আমার জীবনে আজো দেখিনি!এক মিছিলে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!সেদিন সকল ছাত্রসংগঠন সকল বেদাবেধ ভুলে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল। চারুকলার ছাত্ররা প্রতিবাদ স্বরুপ জলপাই রং দিয়ে সেদিন এক বিশাল অাকৃতির হাতি বানিয়ে ছিল!
ছাত্ররা শহিদ মিনারে রাখা সেনাবাহিনীর প্রতিকী সেই হাতির লেজ ধড়ে মজা করে অনেক টানাটানিও করেছিল!সেদিনের ছাত্রদের সংগ্রামে পূর্ন সমর্থন দিয়েছিল শিক্ষকরাও।আর্মির একটি গাড়িতে শাহবাগে আগুন ধড়িয়ে দেয় ছাত্ররা।নীলক্ষেত,পলাশীতে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে রনক্ষেত্রে পরিনত হয়।নিজ চোখে দেখেছি এফ রহমান হলের সামনে ছাত্রদের বীরোচিত পরিকল্পনা, কিভাবে বোতলে বানানো বোমা দিয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাড়ি উড়িয়ে দেয়া যায়!
এ যেন অারেক মুক্তিযুদ্ধ!সিএসবি টিভি চ্যানেলের লাইভ সম্প্রচারের ফলে সারা বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদের দাবানল দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে।কিছুক্ষণের মধ্যই সেই সিএসবি চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়া হল!রাতেই আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে মিরপুরে মামার বাসায় চলে যাই।সকালে থমথমে ঢাকা।সেনাবাহিনী রাস্তার মোড়ে মোড়ে।কোন বাস নেই।সকালে হেটেই চললাম মিরপুর থেকে মহাখালীর পথে বাড়ি যাব বলে।সংসদ ভবনের সামনে আসতেই সেনাসদস্যরা আমার পরিচয় জানতে চাইল!ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় পত্রটি জীবনে অনেক সম্মান দিলেও আর্মিরা সেদিন আমাকে ব্যদম প্রহার থেকে রেহাই দেয়নি!

পাঁচ.
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার- উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে মঈন ইউ আহমেদ বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছিলেন সেই সময়।এ ঘটনায় ৮০ হাজার ছাত্রের নামে বেনামে এক মামলা হয়।যদিও পরে মামলাটি রাষ্ট্রপতির সাধারন ক্ষমায় সরকার প্রত্যাহার করে নেয়।সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা ঐ আন্দোলনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সেই সময়ের শীর্ষ নেতারাও এই বীরোচিত সংগ্রামের গর্বিত অংশীদার।
৯০ এর পরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সফল ছাত্র আন্দোলন ২০০৭ এর আগস্ট ছাত্রআন্দোলন।
গনতন্ত্রের ক্যাম্প ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেদিন সেনাক্যাম্পকে মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে হঠিয়ে দিয়েছিল।আমি এখনও বিশ্বাস করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে যেকোন সময় যেকোন স্বৈরাচারকে বিদায় জানানো সময়ের ব্যাপার মাত্র!
অাজও বাংলাদেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই থাকিয়ে অাছে,অাজও সময় জেগে উঠার।

স্যালুট!
আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের বীরদের।

মো:নিজাম উদ্দিন
সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সহ সম্পাদক,
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল,কেন্দ্রীয় সংসদ।।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ