fbpx
 

বিএনপির প্রতিষ্ঠা ও এখনকার রাজনীতি

Pub: রবিবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯ ১০:৫৪ অপরাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯ ১০:৫৪ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

খায়রুল কবীর খোকন
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের উত্থান ও তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে এক সময়োচিত ঘটনা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আজকের বিশ্বে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উন্মোচন ঘটছে তার প্রেক্ষাপটে এটা সুনিশ্চিতভাবে মন্তব্য করা যায় যে, সত্তরের দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে আগমন ও যথার্থ অবদান রাখার বিষয়াবলি যৌক্তিকতা পাবে সব দিক বিবেচনায়। জিয়াউর রহমান অত্যন্ত দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, যা এক ঐতিহাসিক সত্য। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সেই সত্তরের দশকে এতটাই অপরিহার্য একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, এর কোনো বিকল্পই এ দেশে আর ছিল না। এখন এটা প্রমাণিক সত্য- জিয়াউর রহমানই আজকের বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকা-ের সাফল্যের ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন।

বস্তুত, সারা বিশ্বে রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াইয়ের প্রক্রিয়ায় বাধ্য হয়েই এক ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ধারণ করেছে। অপরিসীম অর্থনৈতিক-শক্তিধর চীন এক ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উন্মেষ ঘটিয়েছেÑ তার সাম্যবাদী রাজনীতি থেকে অগ্রসরমান এক পন্থায় যা ওই রাষ্ট্রটিকে বিশ্ব-অর্থনীতির নিয়ন্তায় পরিণত করার পথে। সারা দুনিয়া এখন চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সেটা সম্ভব হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে চীনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানের মাধ্যমেই। আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতও তার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে চীনকে অর্থনৈতিকভাবে মোকাবিলা ও অন্যসব বিশ্বশক্তিকে নিজের পক্ষে কাজে লাগানো ও তার অর্থনৈতিক-কূটনৈতিক সাফল্য ধরে রেখে নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে তাও এক ধরনের ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশের মাধ্যমেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নও গড়ে উঠেছিল এক ধরনের ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদী চেতনাকে পুঁজি করে; তার সুফল নিজেদের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একচেটিয়া বণ্টনের নিশ্চয়তাবিধানের লক্ষ্য সামনে নিয়ে। সে ক্ষেত্রে এই ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো সেই জাতীয়তাবাদী চেতনার সুফল ভোগ করছে, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা চলে।

জিয়াউর রহমান সত্তরের দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ বাকশালব্যবস্থা কায়েম করে। ঠিক এমন সময়ে একটি সামরিক-অভ্যুত্থানে শীর্ষনেতা নির্মমভাবে নিহত হন সপরিবারে। তখনকার নৈরাজ্যময় পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ বা বাকশাল জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সে অবস্থায় আওয়ামী লীগ (যা তখন বিলুপ্ত দশায়) বা বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) তখন একেবারেই অকার্যকর। তখন নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্রটিও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে প্রবলভাবে বিভ্রান্ত ছিল। ওই রাষ্ট্রটির বাংলাদেশের বাজার দখল পরিকল্পনাও তখন ভেস্তে গিয়েছিল। কারণ, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতির পর্যুদস্ত দশা, বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির লাখো -কোটি টাকা মূল্যের পণ্য কেনার মতো সামর্থ্যই ছিল না। সেই সংকটের সময় আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের মতো সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনার যোগ্যতাসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতারা তিন/চারটি শিবিরে বিভক্ত ছিলেন। আর সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রও একটা নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দশায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার জোগাড়। জনগণ তখন খুবই অস্থির পরিস্থিতির শিকারে পরিণত। সেই দুরবস্থায় ঐতিহাসিকভাবেই দায়িত্ব বর্তায় জিয়াউর রহমানের ওপর। তিনিই এ দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবন করে বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসেন। এবং জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে একটা সুষ্ঠু পন্থায় প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি ও পার্লামেন্ট পদ্ধতির ভারসাম্য রক্ষার একটা সরকার পরিচালনব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা হয়। তখনকার আওয়ামী লীগের নেতারা যদি দ্রুততার সঙ্গে একটা পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের রাজনীতিতে ঐক্যবদ্ধ রাজনীতির রাজনৈতিক দলের মধ্যে সুসংগঠিত হতে, নিজেদের শক্তি সমন্বয় সাধন করতে সক্ষম হতে পারতেন, এবং সব ধরনের আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালির নিজস্ব ধারার জাতীয়তাবাদী চেতনায় শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হতেন, তাহলে হয়তো জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে না এলেও চলত। কিন্তু সেটা একেবারেই অসম্ভব ছিল। কারণ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির রাজনীতিতে বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদের শিকার হিসেবে ব্যবহারের একটা শক্তিশালী চক্রান্ত সক্রিয় ছিল বেজায়ভাবে। সেই রাজনীতির মোকাবিলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তখন সংগঠিত হতে ব্যর্থ প্রমাণ করেন নিজেদের। হয়তো তাদের মধ্যে সে ধরনের রাজনৈতিক শিক্ষা ও সাহসিকতা এবং এমনকি চেতনা সক্রিয় ছিল না। এবং এও তো সত্য, তখনো আওয়ামী লীগের (দল বিলুপ্ত দশায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নেতাদের মধ্যে) একটা বড় অংশের মধ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির সঙ্গে আপসকামিতার মানসিকতা পাকাপোক্ত ছিল, একটু বেশি মাত্রায়ই ছিল। এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের রাজনীতির ভিতরকার ব্যর্থ নেতাদের নিজেদের তৎপরতায় কাজে লাগাতে চেয়েছে- বিশেষভাবে তার পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের মাধ্যমে ‘ট্রানজিট সুবিধা আদায়ের’ দুরভিসন্ধি ছিল অপরিসীম মাত্রায়। বস্তুত, আওয়ামী লীগের তখনকার লুকোনো নেতারা (বা পরবর্তীকালের প্রকাশ্য নেতারা) আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভিতরে অবস্থান নেওয়া এবং তাদের সমর্থন নিতে ব্যস্ত ছিলেন। ওইরকম পরিস্থিতি জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি প্রবর্তনে ও আগ্রাসন-সম্প্রসারণবাদ-মুক্ত একটা বাংলাদেশি নিজস্ব রাজনীতি প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। আসল কথা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর ও ব্রিগেড (জেড ফোর্স) পরিচালনায় জিয়াউর রহমানের যোগ্যতা সম্পর্কে নেতাদের ইতিবাচক ধারণা ছিল। তাই তারা জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির বিরুদ্ধে শুরুতে তেমন একটা বিরোধিতার দিকে যাননি। কারণ, আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে জিয়াউর রহমানের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার মধ্যে তারা যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাননি। তারা বরং জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সরাসরি বিরোধিতা না করে তার সঙ্গে ‘কিছুটা আপস’ করে চলার নীতিতে এগোতে চেয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটা সুস্থধারার রাজনীতি উপহার দিয়েছিলেন, অন্যদিকে এখানকার কোনো রাজনৈতিক দল যাতে সম্প্রসারণবাদী রাজনীতির সহযোগী হতে না পারে সেদিকে তীক্ষè দৃষ্টি রেখেছিলেন। তিনি ‘এপার বাংলা-ওপার-বাংলা’ সংস্কৃতির ধুয়া তুলে যাতে কেউ কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদে বাংলাদেশকে ঢোকাতে না পারে সেদিকেও কড়া নজর রেখেছিলেন। জিয়াউর রহমানই বাঙালির জাতি-রাষ্ট্রটির আসল পরিচয় যে ‘বাংলাদেশি জাতি-রাষ্ট্র’, তা প্রমাণ করে গেছেন। তিনি ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গান গেয়ে বাংলাদেশিদের নিজস্ব রাষ্ট্র বাংলাদেশকে সুপ্রতিষ্ঠা দিয়ে গেছেন। জিয়াউর রহমানই এ দেশের মানুষকে আলস্যমুক্ত কর্মসংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তার ‘খাল কাটা’ কর্মকান্ড ছিল একটা বিশ্বখ্যাত কর্মসূচিÑ ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেবে অনাগতকাল।

লেখক : বিএনপির যুগ্মমহাসচিব, সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ