fbpx
 

আবরার হত্যা : আমাদের বোধোদয়

Pub: Wednesday, October 9, 2019 5:17 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাহবুবা জেবিন

স্টিলের একটা বাক্স তাতে সাদা রঙ দিয়ে লেখা ফাহাদ আর পাশের ছবিতেই মর্গের টেবিলে ফাহাদের নিথর মরদেহ । নিষ্পাপ চেহারার ছেলেটা আধখোলা চোখে ঘুমিয়ে আছে চিরদিনের মতো । সারা শরীরে আঘাত আর নির্মমতার চিহ্ন । আহারে কত না কষ্ট পেয়ে ছেলেটা মরেছে ।
লন্ডন অথরিটির একটি ফরমায়েশি লেখার মাঝপথে এসে সকাল থেকে একটি লাইনও লিখতে পারিনি । কিছুতেই পারছিনা ফাহাদের ছবিটা মাথা থেকে সরাতে । কি যেন একটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠছে । চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে বার বার ।
স্নেহময়ী মায়ের মনে নিশ্চয়ই কু ডেকেছিল । ফোন দিয়েছিলেন যেন সময় মত রাতে খাওয়ার কথা বলতে । আত্মভোলা ছেলেটা হয়তো না খেয়ে সারারাত পড়বে এরপর টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পরবে । অসংখ্যবার ফোন দিয়েও না পেয়ে মা আর ঘুমাতে যাননি । জায়নামাজে বসেই খবর পান আদরের সোনামণি আর নেই । সারা জীবনে যে ছেলেটির গায়ে একটি ফুলের টোকা পরেনি তাকেই মানুষের চেহারার হায়েনারা সারারাত ধরে ক্রিকেটের স্ট্যাম্প আর লাঠি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরেই ফেললো । ফাহাদ কি চিৎকার করে বলেছিল ? আমাকে আর মেরো না এই আঘাত লাগছে আমার হৃদয়ে ।

ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রদের খুনের তালিকাটা দিন দিন শুধু দীর্ঘই হচ্ছে । আর বিচার না পেয়ে তাদের পরিবার গুলোর হাহাকার আর অভিশাপের পরিমাণ ও শুধু বেড়ে চলেছে । আমরা শুধু বলি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা । কিন্তু একটাও যদি দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে পাওয়া যেতো তা হলে এই সব দানবেরা এতোটা হিংস্র হতে পারতো না ।

১৯৯৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ক্লাস শুরু হতে দেরী হয় আনন্দ হত্যার কারনে । ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে খুন হয় আনন্দ । খুনিরা দলীয় পরিচয় থাকায় পার পেয়ে যায় । পরবর্তীতে ২০১২ তে ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা যায় জোবায়ের । সরকারের উচ্চপর্যায়ের সহায়তায় জোবায়েরের খুনিরা এখন মালয়েশিয়ায় পালিয়ে গিয়ে সেলফি দেয় “আমরা এখন পাখীর মতো মুক্ত” ।
এবার আসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রসঙ্গে । প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার মানুষ আর শতশত ক্যামেরার সামনে চাপাতি দিয়ে বিশ্বজিত দাসকে কুপিয়ে হত্যা করে । মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আট আসামির সকলেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হওয়ায় পর্যায়ক্রমে তাদের মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেয়া হয় । এরপর আবরারের মতো আরেক মেধাবী ছাত্র আবু বকরকে হত্যা করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা । আদালত রায় দেয় আবু বকরকে কেউ হত্যা করেনি । এর মানেটা কি ? তাহলে কি আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন ?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলের ছাত্র আবরার ফাহাদের অপরাধ সে সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের মতামত দিয়েছিলো । বাংলাদেশের উপর ভারতীয় আধিপত্যের কথা সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছিলো । ভারতের স্বার্থান্বেষী চরিত্র তুলে ধরেছিলো । আর তাতেই কিছু সুবিধাবাদী ব্যাক্তির চেতনায় আঘাত লাগে । যে কোন মূল্যে তাকে আঘাত করার উসিলা খুঁজতে থাকে । ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায় । আহারে সহজ সরল বিনয়ী ছেলেটা এসব মানুষরুপী দানবদের আঘাত সহ্য করতে না পেরে বার বার মাকে ডেকেছে । মাঝরাত পেরোতে পেরোতে সব শেষ । এরপর তার মৃতদেহ সিঁড়িতে ফেলে রেখে ডাক্তারকে খবর দেয় ।
আবরার এর হত্যাকারীদের সবার ভিডিও রয়েছে । প্রভোস্ট এসে আবরারের মৃতদেহ দেখেছেন । চাদর সরিয়ে হাত ও পায়ের আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন । কিন্তু পুলিশ রিপোর্ট দিয়েছে তার গায়ে কোন আঘাতের চিহ্ন নেই (প্রথম আলো রিপোর্ট) এরপর খুনিদের আইনজীবি মিডিয়ার সামনে বলেছে আবরারের গায়ে আঘাতের চিহ্ন নেই । দাগগুলো চর্মরোগের কিনা খতিয়ে দেখতে হবে ।
আর বুয়েটের ভিসির কথা কি বলবো । সন্তানতুল্য ছাত্রকে মেরে ফেলেছে তাঁরই অন্য ছাত্ররা তিনি দেখতেও আসেননি । কতটা বেহায়া হলে বলেন “ আমাকে তো সবদিক ম্যানেজ করে চলতে হয়” ছিঃ । ভিসি তার চেয়ার বাঁচাতে আর খুনি ছাত্রলীগ নেতাদের কিভাবে বাঁচাবে এই নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ফাহাদের জানাজায় পর্যন্ত অংশ নেয়নি । না না অবাক হবার কিছু নেই । এরকম মেরুদণ্ডহীন পদলেহনকারী ব্যক্তিরাই ভিসির পদ অলঙ্কৃত করেন ।

আমার সবচেয়ে অবাক লাগে, ছাত্রলীগ নামক সংগঠনটির ল্যাবে কেন এতো এতো ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের জন্ম হচ্ছে? নাকি বিচার ব্যবস্থার ব্যারথতার জন্যই অপরাধীরা নতুন নতুন অপরাধ করতে দ্বিধা করছে না বরং সাহসী হচ্ছে । সংগঠন থেকে বহিষ্কার মানুষ হত্যার শাস্তি হতে পারেনা । একটা সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পাঠাতে একজন মা-বাবা কতোটা ত্যাগ স্বীকার করে তা কেবল সেই মা বাবাই জানেন । নিজের রক্ত পানি করে সন্তানকে আগলে রাখেন । ২০/২১ বছরের একটা সম্ভাবনাময় তরুণের মৃত্যু শুধু তার পরিবারের নয় বরং পুরো বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি ।
এভাবে নিরীহ একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ার খেসারত যদি মৃত্যু হয়, তাহলে বাংলাদেশে কি মানুষ মনের ভাব প্রকাশের অধিকার হারিয়ে হারিয়ে ফেলেছে? পছন্দ অপছন্দ প্রকাশ্যে বলার অধিকার হরণ করা হয়েছে? চোখের সামনে একটা ছেলেকে কয়েক ঘণ্টা ধরে মারতে দেখেও হল ভর্তি ছেলেদের একজনও এগিয়ে এলোনা? বললোনা আল্লাহর দোহাই লাগে এবার তোরা থাম! কেন এতো নির্লিপ্ততা? দেশের সেরা মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের মাঝেও কি বাধা দেবার মতো একজনও ছিলনা? নাকি সবাই মনুষ্যত্ব হারিয়ে দানবে পরিণত হয়েছে?

তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের মনঃজগতে যে একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা । আর সমাজে সামষ্টিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে যা বাংলাদেশের মানুষকে অনেক বেশী অসহিস্নু করে তুলেছে । হিংস্র করে তুলেছে ।
এখনি পরিবর্তন প্রয়োজন । কলুষিত সমাজ, নষ্ট রাজনীতি, আর দুর্নীতিতে আপাদমস্তক কলুষিত রাষ্ট্রব্যাবস্থার পরিবর্তন না হলে এই ঘটনার পুনঃরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে ।

মাহবুবা জেবিন
লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ