fbpx
 

‘সিন্দাবাদ’ কবি ফররুখ আহমেদের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

Pub: Saturday, October 19, 2019 2:57 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফররুখ আহমদ (জন্ম : জুন ১০, ১৯১৮ – মৃত্যু : অক্টোবর ১৯, ১৯৭৪) একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী কবি। এই বাঙালি কবি ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তার কবিতায় বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অণুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে। বিংশ শতাব্দীর এই কবি ইসলামি ভাবধারার বাহক হলেও তার কবিতা প্রকরণকৌশল, শব্দচয়ন এবং বাক্‌প্রতিমার অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আধুনিকতার সকল লক্ষণ তার কবিতায় পরিব্যাপ্ত। তার কবিতায় রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতা পরিস্ফুট। ” সাত সাগরের মাঝি ” কাব্যগ্রন্থে তিনি যে-কাব্যভাষার সৃষ্টি করেছেন তা স্বতন্ত্র এবং এ-গ্রন্থ তার এক অমর সৃষ্টি।

জন্ম ও পরিবার
ফররুখ আহমদের জন্ম ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে (তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত) মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে। তার বাবা সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। ফররুখ আহমদের মায়ের নাম রওশন আখতার।

১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখ আহমদের বিয়ে হয়। তার নিজের বিয়ে উপলক্ষে ফররুখ ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লেখেন যা ‘সওগাত’ পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।
ফররুখ আহমদের ছেলে-মেয়ে এগারো জন। তারা হলেন : সৈয়দা শামারুখ বানু, সৈয়দা লালারুখ বানু, সৈয়দ আবদুল্লাহল মাহমুদ, সৈয়দ আবদুল্লাহেল মাসুদ, সৈয়দ মনজুরে এলাহি, সৈয়দা ইয়াসমিন বানু, সৈয়দ মুহম্মদ আখতারুজ্জামান [আহমদ আখতার], সৈয়দ মুহম্মদ ওয়হিদুজ্জামান, সৈয়দ মুখলিসুর রহমান, সৈয়দ খলিলুর রহমান ও সৈয়দ মুহম্মদ আবদুহু।

শিক্ষাজীবন
ফররুখ আহমদ খুলনা জিলা স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আই.এ. পাস করেন। এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। তবে চল্লিশ-এর দশকে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে। তিনি ভারত বিভাগ তথা পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেন।

কর্মজীবন ও মৃত্যু
ফররুখ আহমদের কর্মজীবন শুরু হয় কোলকাতায়। ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন তিনি। ১৯৪৫ সালে তিনি মাসিক ‘মোহাম্মদী’-র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে চাকরি করেন ঢাকা বেতারে। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ফররুখ আহমদ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। এখানেই প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ফররুখ আহমদ মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, সন্ধেবেলা ঢাকায়।

ফররুখ সম্পর্কে কিছু কথা :
‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?/ এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?/ সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?/ তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে; /অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।/রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?’ পাঞ্জেরি কবিতার এই কয়টি চরণ শুনলেই মনে জেগে ওঠে কবি ফররুখ আহমেদ এর নাম।

এমন অনেকেই আছেন ‘পাঞ্জেরি’ পুরো কবিতাটিই মুখস্ত যাদের। এমন আরো অনেক জনপ্রিয় কবিতা আছে ফররুখের। তার ‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতাটির কয়েকটি চরণ এ রকম- ‘কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা।/নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।/দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।/তবু জাগলে না ? তবু, তুমি জাগলে না ?/সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকো জাহাজ,/ অচল ছবি সে, তসবির যেন দাঁড়ায়ে রয়েছে আজ।’

আবার সিন্দাবাদ কবিতায়- ‘ছিঁড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল অবসাদ,/ নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দাবাদ।’

কবির অপর বিখ্যাত কবিতা ‘পাঞ্জেরী’। আরবি, ফারসি শব্দের সঠিক ব্যবহারে ৪২ লাইনের কবিতায় তিনি সুন্দর ছন্দে তাঁর কবি মনের গভীর কথাটি তুলে ধরেছেন মুন্সিয়ানার সঙ্গে-

রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘ?
সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।…

ফররুখ আহমদ শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া-কবিতা লিখেছেন। তার ‘পাখীর বাসা’, ‘ইলশে গুড়ি’, ‘ঝড়ের গান’, ‘চৈত্রের গান’, ‘শ্রাবণের বৃষ্টি’ বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

বিষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে,
রিমঝিমিয়ে, ঝিমঝিমিয়ে,
টিনের চালে, গাছের ডালে,
বিষ্টি ঝড়ে হাওয়ার তালে,
হাওয়ার তালে গাছের ডালে;
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
বিষ্টি নামে মিষ্টি মধুর,
যুঁই চামেলী ফুলের বোঁটায়,
বিষ্টি নামে ফোঁটায় ফোঁটায়,
বাদলা দিনের একটানা সুর
বিষ্টি নামে ঝুমুর ঝুমুর ॥

ফররুখ আহমদ অজস্র কবিতা লিখেছেন। প্রায় বারো’শ টুকরো কবিতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর সব কবিতা উদ্ধার করা যায়নি। একথা স্বীকার করতেই হবে যে তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে একজন কবি এবং অবশ্যই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের।

বলা হয়ে থাকে, একজন সত্যিকার কবির তিনটি প্রধান গুণ থাকা আবশ্যক। সুস্পষ্ট জীবনদর্শন, কাব্য আঙ্গিকের স্বাতন্ত্র ও মৌলিকত্ব, এবং বক্তব্যে তীব্রতা। কবির জীবনদর্শন হতে হয় মানবতার কল্যাণকেন্দ্রিক, সত্য ও ন্যায়ের পথে। তার কলম কেবল আনন্দের গীত গায় না- একই সাথে গায় জাগরণী সঙ্গীত। মানুষের ভেতরের ঘুমন্ত মানবতাকে জাগিয়ে তোলে। নিজের সমালোচনা শক্তির সাহায্যে একজন অভিজ্ঞ সার্জনের মতো সমাজ দেহের অসুস্থতার মূল কেন্দ্রে হাত রাখে। অত্যন্ত সতর্কতা ও আন্তরিকতার সাথে ফোড়া টিপে টিপে তার সব পুঁজ বের করে দেয় এবং সমগ্র সমাজ দেহের রক্ত পরিশুদ্ধ করে। ফররুখের জীবনদর্শন তথা আদর্শ ছিল ইসলাম। মানুষকে ভালোবেসেছিলেন বলেই মানবতার ধর্ম ইসলামকে ভালোবেসেছিলেন। তার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা হয়। বলা হয়, তিনি কেন শুধু মুসলমানদের নিয়ে লিখেছেন? কথাটা অনেকখানি ‘মধুসূদন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ কেন মুসলমানদের নিয়ে লিখলেন না’র মতো হয়ে যায়। আমরা দেখতে পাই, ফররুখ আহমদ অন্য ধর্মাবলম্বীদের কটাক্ষ করেননি। তিনি ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে সেই জীবনদর্শন মনে করতেন, যার বিধানে কল্যাণ আছে সমগ্র মানবতার, শুধু মুসলমানদের নয়। মোটকথা, ফররুখ বিভ্রান্ত চিন্তার অলিতে গলিতে ছুটে বেড়াতে চাননি। চিন্তার স্থিরতার মাধ্যমে জীবনকে কোন এক লক্ষ্যবিন্দুতে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব পালন করেছেন।

কবি ফররুখ আহমেদ সম্পর্কে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘ফররুখের কাব্যপ্রক্রিয়ায় যেহেতু একটা বিশ্বাসের উন্মুখরতা ছিল, তাই তার পাঠকের সংখ্যা আমাদের মাঝে সর্বাধিক। বিশ্বাসের সে একটা কল্লোলিত সমর্থন পেয়েছে। আবার ব্যবহৃত শব্দের পরিধির সার্থক বিবেচনায় এবং ধ্বনি সাম্যের কারণে অবিশ্বাসীরাও তাকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি।’

আদর্শিক নিষ্ঠা, জাতির জন্য নিঃস্বার্থ নিবেদন কবি ফররুখ আহমদের জীবনের সৌন্দর্য। এই দৃঢ়তা একসময় কবির জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘খল’ হয়ে উঠতে না পারায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হয়। আদর্শের সঙ্গে আপস না করায় চাকরিচ্যুত হন তিনি। সীমাহীন সংকটের ভেতর দিয়ে জীবনাবসান ঘটে এই কবির। যে রাজনৈতিক চিন্তার কারণে ফররুখ আহমদকে সতীর্থরাই নির্বাসিত করেছিলেন, সে চিন্তা কিন্তু তাঁকে মোটেও সংকীর্ণ করতে পারেনি। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হলে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং বাঙালির অধিকারের পক্ষে কলম ধরেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে। যদি তা-ই হয়, তাহলে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।’ তিনি পাকিস্তানি শাসকদের সমালোচনা করে ‘রাজ-রাজরা’ নামে নাটক রচনা করেন।

১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার এবং ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ‘হাতিম তা’য়ী’র জন্যে ‘আদমজী পুরস্কার’ পান। একই বছর ‘পাখীর বাসা’ লিখে ‘ইউনেস্কো পুরস্কার’ পান। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’, ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে ইসলামিক ফাউণ্ডেশন পুরস্কার লাভ করেন।

আজ ফররুখ আহমদের ৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর কবি তার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। কবির শেষজীবন কেটেছে খুবই অর্থকষ্টে। ১৯৭৩ সালে দৈনিক গণকন্ঠে কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা তার কলামে লেখেন- ’খবর পেয়েছি বিনা চিকিৎসায় কবি ফররুখ আহমদের মেয়ে মারা গেছে। এই প্রতিভাধর কবি যার দানে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে- পয়সার অভাবে তার মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে পারেননি, ওষুধ কিনতে পারেননি। কবি এখন বেকার। তার মৃত মেয়ের জামাই, যিনি এখন কবির সঙ্গে থাকছেন বলে খবর পেয়েছি তারও চাকুরি নেই। মেয়ে তো মারাই গেছে। যারা বেঁচে আছেন, কি অভাবে, কোন অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিনগুলো অতিবাহিত করছেন, সে খবর আমরা কেউ রাখিনি।’ আহমদ ছফার এ লেখা থেকেই কবির শেষ জীবনের দুর্দশা সম্পর্কে বুঝতে পারা যায়।

(এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া)
মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ)


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ