বাংলাদেশে ধর্ষণের উত্থান, প্রতিকার কোন পথে?

Pub: Monday, October 12, 2020 7:49 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশে কি ধর্ষণের কুরুক্ষেত্র বনে গেলো? মনে হয় এ যেন ধর্ষণের এক স্বর্গরাজ্য। এম সি কলেজের ধর্ষনের ক্ষত দাগ না শুকাতেই গত কয়েকদিনে ঘটে গেলো আরো বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনা। যার মধ্যে নোয়াখালীর ধর্ষণের ঘটনা ও এর ভিডিও চিত্র ধারণ এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে সম্প্রচার যেন গোটা জাতিকে আজ হতভম্ব করে ফেলেছে, জাতি আজ বাকরুদ্ধ, হতাশ, প্রতিবাদ করার ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছে। প্রতিবাদ করতে গেলে আবার পুলিশী হয়রানি, লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ ও ধর্ষণে মদদদাতা আরেক বাহিনীর অন্যায়, অত্যাচার, উত্তম-মধ্যম জুটছে কপালে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো যেখানে এম সি কলেজের ধর্ষণের ঘটনায় দেশবাসীর মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে ঠিক সে মুহূর্তেই কোন এক অজানা সাহসের উপর ভর করে, এক অদ্ভুত খুঁটির জোরে, প্রশাসনকে বৃদ্ধা আঙ্গুল প্রদর্শন করে, সেই একই বাহিনীর সদস্য দ্বারা নোয়াখালীর গৃহবধূকে ধর্ষণ, ধর্ষণের ভিডিও ধারণ ও পরে সম্প্রচার যেন জাতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ধর্ষণকারীদের খুঁটির জোর অনেক বেশি, রয়েছে তাদের ক্ষমতার জোর, তাদের আছে বড় ভাই, লিডার, যাদের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে এবং প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় তারা আজ ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা একের পর এক ঘটিয়ে যাচ্ছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ থেকে শুরু করে, নাৎসি বাহিনীর অত্যাচার, পাকিস্তানী বর্বর কর্তৃক বাংলাদেশে সংঘটিত ধর্ষণ, রাশিয়া-সার্বিয়াদের দ্বারা বসনিয়া-হার্জেগোভিনাতে ধর্ষন, আমেরিকানদের দ্বারা উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ে ধর্ষণ, গুয়ান্তানামোবেতে ধর্ষণ এমন শত শত উদাহরণ আছে যে বিরোধী পক্ষকে শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে ধর্ষণকে বেছে নেয়া হয়। ধর্ষণ একটি হাতিয়ারও বটে। ধর্ষণ নামক হাতিয়ার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরেই ১৯৭২-১৯৭৫ সালে ব্যাপক হারে একটি বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত হয়েছিল, সেই সময়ে কিন্তু এখনকার মতো একই রকমের চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি, ওই সময়ে আমরা দেখেছি নববধূকে বাসর ঘর থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেছিল কথিত সোনার ছেলেরা, আবার আমরা এও দেখেছি যে ধর্ষণের পরে লাশ পড়েছিল ডোবা-নালায়, বাশ ঝাড়ে, পাট খেতে, ধান খেতে। যাত্রা শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্ষণ নামক অস্রের ব্যবহার। পরবর্তীতে আমরা এটিও অবলোকন করেছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরি, মিষ্টি বিতরণ, সেলিব্রেশন ইত্যাদি। আবার জাতিকে এটিও দেখতে হয়েছিল টিএসসিতে বাঁধনের উপর ধর্ষণ পিপাসুদের সংঘবদ্ধ বর্বর আক্রমণ, ধর্ষক কর্তৃক খাদিজার উপর আক্রমণ, মা-মেয়েকে একসাথে ধর্ষণ ও মাথা নেড়া করা, ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে তনুকে ধর্ষণ, নোয়াখালীতে মেয়ের সামনে মা কে দলবেঁধে ধর্ষণ ও উল্লাস, ৭ থেকে ৬৫ বছরের ভালনারেবল মহিলাকে ধর্ষণ, ভোলার ধর্ষণের ঘটনা ইত্যাদি। কিন্তু কেন এই ধর্ষণ? কেন এর কোন প্রতিকার নেই? কেনইবা প্রশাসন নির্লিপ্ত বা বিচার নামক প্রহসনের মধ্য দিয়ে ধর্ষকের স্বাধীন সাবলিল মুক্তি? সবার আগে বর্তমান সময়ের ধর্ষণের পরিসংখ্যানে একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায় এই বছর এপ্রিল-অগাস্ট পর্যন্ত দেশে ৬৩২টি ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে, ১৪২টি ধর্ষণের চেষ্টা সংঘটিত হয়েছে, ধর্ষণের জন্য ২৯টি মৃত্যু সংঘটিত হয়েছে, এবং ৫টি আত্মহত্যাও সংঘটিত হয়েছে। আবার, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায় গত ৮ মাসে দেশে ৮৯২ টি ধর্ষণ হয়েছে, ১৯২টি ধর্ষণের চেষ্ঠা সংঘটিত হয়েছে, ধর্ষণের জন্য ৪১টি মৃত্যু ও ৯টি আত্মহত্যা সংঘটিত হয়েছে। অধিকারের রিপোর্টে দেখা যায় গত বছর বাংলাদেশে মোট ১০৮০টি ধর্ষনের ঘটনা ঘটে এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ হয় ২৯৪টি, ধর্ষণের পরে হত্যা হয় ৪২টি, এবং ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা হয় ৭টি। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যে কোভিড-১৯ পেন্ডামিকের সময়ে গড়ে বাংলাদেশে প্রতিদিন ৪টি করে ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে।

বাংলাদেশের দু-একজন নির্লজ্জ বেহায়া মন্ত্রী এটিও বলার চেষ্টা করছে যে উন্নত দেশে ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে হরহামেশাই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু তারা এতটাই চোখ কানা যে তারা শুধু ধর্ষণের ঘটনা দেখে কিন্তু বিচারের ঘটনা দেখেনা।এই সমস্ত দেশ সমূহে ধর্ষণের রিপোর্ট হওয়ার সাথে সাথে পুলিশ ধর্ষণকারীকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে এসে দণ্ড কার্যকর করে থাকে। এক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয়, দলের নেতার ফোন, প্রভাব, ও ভিক্টিমকে জোর করে আপোষ-মীমাংসায বাধ্য করে না। নির্লজ্জ মন্ত্রীর এই সমস্ত কথাগুলো যে ধর্ষণকারীকে প্রশ্রয় দিবে, বিচারকাজে বাধা সৃষ্টি করবে, এর ফলে বিচারকরাও সঠিকভাবে ও সুষ্ঠুভাবে বিচার কাজ করতে পারবে না তা যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিনত হয়েছে। তাদের এই কথায় স্বপ্রনোদিত হয়ে বা নির্দেশিত হয়ে বাংলাদেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যাদের বেতন হয় সেই পুলিশ বাহিনী ধর্ষণের বিরুদ্ধে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ মানব বন্ধনে বাধা প্রদান করছে, লাঠি চার্জ করছে। পুলিশের এই কর্ম কাণ্ডে ধর্ষণকারীরা এই ভেবে আরো বেশি আত্মতৃপ্তি পায় যে তারা কিন্তু একা নয়, বা তাদের কিছুই হবে না, বা তাদের খুঁটির জোর রয়েছে বা বিচার নামক নাটকের মধ্যে দিয়ে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ধর্ষণ নামক সন্ত্রাসকে উস্কে না দিয়ে দায়িত্বশীলতার মধ্যে দিয়ে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাই হলো দায়িত্বশীলদের কাজ।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে ধর্ষণের মাত্রা বেশ করে বেড়েই চলছে। ধর্ষণের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক অনুষদের ডীন সাদেক হালিম বলেছেন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আইনগত কারণে ধর্ষণ সংঘটিত হয়।অন্যান্য কারণের সাথে সাথে রাজনৈতিক কারণে ধর্ষণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। রাজনৈতিক কারণে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা ধর্ষণকে একটি অস্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ধর্ষণ করে আবার ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে মিডিয়াতে প্রচারের হুমকি দিয়ে বিশাল অংকের চাঁদাবাজি করে। তাদের রয়েছে ক্ষমতার জোর, যার কারণে ধর্ষণকারীরা কখনোই শাস্তি পায় না বা নামমাত্র শাস্তির নাটক মঞ্চস্থ করে কয়েকদিন হলিডে পিরিয়ড কাটিয়ে সহজেই সগর্বে আরো বেশী শক্তি সঞ্চয় করে পুনরায় স্বপদে ফিরে আসে। এজণ্য ধর্ষণকে একটি পাওয়ার ক্রাইম বলে আখ্যায়িত করেছে দি টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকা।

ধর্ষণের আরেকটি বড় কারণ হলো ধর্ষণের যে শাস্তি বাংলাদেশ পেনাল কোডের ৩৭৬ নম্বর ধারায় বর্ণিত হয়েছে, তা সময়ের প্রেক্ষিতে অনেকটাই অকেজো, বা এর কোনো কার্যকারিতা নেই। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত একজন ধর্ষণকারীও এই শাস্তি ভোগ করেনি। বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণকারী গ্রেফতার হলেও দলীয় প্রভাবে, জরিমানা, মুচলেকা ও নামমাত্র কারাভোগ করে মুক্তি লাভ করে। বিচারহীনতা ও পর্যাপ্ত শাস্তি না হওয়া বাংলাদেশে ধর্ষণের মাত্রা বৃদ্ধিতে অনেকটাই দায়ী। তাই সময় এসেছে পেনাল কোডের ৩৭৬ ধারা সংশোধনের এবং মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংযোজন ও নিশিচত করার। Washington Post এর মতে ধর্ষণের বর্তমান মহামারীর কারণ হিসেবে আমাদরে দেশের sluggish court system বা ভঙ্গুর আদালত, few convictions বা হাতেগোনা নামমাত্র কোনোরকম শাস্তি এবং no exemplary punishment বা দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি না থাকার কারণে দেশে ধর্ষনের হার আজ ক্রমান্বয়েই বেড়ে চলছে।

ধর্ষণের পরে ধর্ষিতা যেমন শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত থাকে, ঠিক তেমনি সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে থাকে যদিও সে ধর্ষণের শিকার। সমাজ উল্টোভাবে তাকেই দোষারোপ ও হেয় করে থাকে। ধর্ষিতা না পারে মুখ খুলে কিছু বলতে না পারে মুখবুজে সইতে। সামাজিক কলংকের কারণে অনেক সময়েই ধর্ষিতা বিচারপ্রার্থী হয় না, আইন-সালিশ, থানা-পুলিশ ও মামলাতে জড়ায়না। একদিকে যেমন ধর্ষিতার নিশ্চুপ থাকা, অন্যদিকে সমাজের মেম্বার-চেয়ারম্যান, পুলিশ ও দলীয় নেতারা এগিয়ে এসে ধর্ষণের বিচার না করে বরং ধর্ষিতাকে জোর চাপ দিয়ে আপস মীমাংসা করতে বাধ্য করে।এক্ষেত্রে ধর্ষিতা হয় আপস রফা করে, না হয় চুপ থেকে নীরবে সয়ে যায় অথবা আত্মহননের পথ বেছে নেয় যা বাংলাদেশে ধর্ষণ বিস্তারে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। ওয়াশিংটন পোস্ট এই কারণকে ধর্ষণ সম্প্রসারণের অন্যতম কারণ বলে উল্ল্যেখ করেছে।

বাংলাদেশে ধর্ষণের আরো একটি অন্যতম কারণ হলো লঘু দণ্ড। অনেক সময়েই দেখায় যায় গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের বিচার করা হয় বা ধর্ষিতাকে সামান্য কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে বলা হয় যা হবার হয়েছে, তুমি আর এ নিয়ে কিছু করোনা বা বলোনা। মনে হয় ধর্ষণকারীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলা হয় বাবা ধর্ষণ কোনো ভালো কাজ না, তোমরা এগুলো আর করোনা আচ্ছা। আবার ও দেখা যায় – ধর্ষণের পরে ধর্ষিতা যদি পুলিশ বা মামলা করতে চায়, তখন ধর্ষকগোষ্ঠী তাদেরকে ফের তাকে ও তার মা-বোনকে ধর্ষণের হুমকি দেয়, ক্ষমতার প্রভাব দেখায়, পুলিশকে মামলা নিতে নিষেধ করে। এর ফলে ভয়ে ধর্ষিতা বিচারের পরিবর্তে চুপসে যায় যা বাংলাদেশে ধর্ষণের হার বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

মহিলাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব দেশে ধর্ষণের হার বৃদ্ধির আরোও একটি বড় কারণ। আমরা দেখতে পাই যে গাড়ি, বাস, লঞ্চ, ট্রেনে ধর্ষণের মতো ঘটনা প্রায়শ ঘটে শুধুমাত্র পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশে ধর্ষণের মাত্রা বৃদ্ধির জন্য মহিলাদের ড্রেসকেও দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন আজ মহিলারা বিশেষ করে উঠতি বয়সী নারীরা যে ধরণের আবেদনময়ী (ওড়না বিহীন, শার্ট, ফতুয়া, জিন্স ও প্যান্ট) পোশাক পরিধান শুরু করেছে যা একদিকে যেমন ধর্ষণের হার বৃদ্ধি করছে অন্যদিকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি -কালচারকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তারা বিদেশী সংস্কৃতির অবাধ বিচরণকে ধর্ষণের জন্য দায়ী করেছেন। এছাড়াও বিদেশী সিনেমা, বিদেশী সিরিয়াল, ওয়েবসিরিজ, অশ্লীল সিনেমা, অশ্লীল নাচ, অশ্লীল গানের আসর, বেলি ডান্স, মদের আসর, ক্যাসিনো ও জুয়ার আসর, ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা, বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সংস্কৃতি, ছেলে-মেয়েদের লিভটুগেদার, সহজলভ্য পর্নোগ্রাফি, পর্ণ সিডি, ভিসিডি, নিয়ন্ত্রণহীন পর্ণ ওয়েবসাইট, সহজলভ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ, হালের সেন্সর বিহীন নাটক, সিনেমা, যৌন ও অশ্লীল দৃশ্য সম্বলিত নাটক ও সিনেমা, অবাধ-নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেটের ব্যবহার, এবং পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারিবারিক শিক্ষার অবক্ষয়কে বাংলাদেশে ধর্ষণের হার বৃদ্ধিতে সহায়ক কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

বাংলাদেশ আজ যেন ধর্ষণের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রতিটি কোন থেকে শুরু হয়েছে প্রতিবাদের ঝড়। এই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মধ্যেও এক দল বিপথগামী কুলাঙ্গার প্রতিবাদের মধ্যে বাধা প্রদান করে, স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা দিয়ে তাদের খুঁটির জোড় জাহির করছে। আবার তাদেরকে সহায়তায় নেমেছে পুলিশবাহিনীও। গোটা দেশ যখন প্রতিবাদে উত্তাল, সবাই ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওয়াজ তুলছে, তখনও তথাকথিত নারীবাদীরা অন্য সময়ে যারা সবার আগে কোমরে গামছা বেঁধে শাহবাগে নামে, প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে, তারাই আজ তাদের কানে তুলো দিয়ে রেখেছে যে তারা কোনো কিছুই শুনেনি, আবার চোখে কালো চশমা পড়েছে যেন কি কিসের ধর্ষণ হয়েছে তারাতো কিছু দেখেইনি, তারাই আবার মুখে কুলুখ এঁটে রেখেছে, সেই নারীবাদীদের আসল মতলব আজ পরিস্কার। তারা কিন্তু আসলে আমার দেশের নারী তথা মা, বোনদের কল্যানকামী নয়, তাদেরকে চিনে রাখতে হবে। ছাত্র, শিক্ষক, প্রফেশনালসহ দেশের সচেতন জনগণ ধর্ষণের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপের জোর দাবি তুলছে, কিভাবে ধর্ষণকে নির্মূল করা যায়, এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা ও পরামর্শও দিচ্ছে। এবার আমরা আলোচনা করবো কিভাবে আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকে চিরতরে ধর্ষণ নামক সন্ত্রাস ও এর সাথে জড়িত সন্ত্রাসীদেরকে নির্মূল করা যায়।

ধর্ষণ নির্মূলে সবার আগে যেটি করতে হবে তাহলো সবার আগে ধর্ষণের শাস্তি সংক্রান্ত বাংলাদেশ পেনাল কোডের ধারা সংশোধন ও ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংযোজন করা এবং এর সাথে একটি পৃথক ট্রাইবুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধর্ষণের বিচার কার্য সম্পন্ন করে বিচারের সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) কার্যকরের ব্যাবস্থা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ধর্ষকদের জন্য পৃথক একটি ডাটাবেজ তৈরী করে দেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, পাড়া, ইউনিয়ন, এবং কাউন্সিলে ধর্ষকদের ও তাদের পরিবারকে চিহ্নিত করা ও সামাজিক ভাবে তাদেরকে বয়কট করা।

কুরআন ও হাদিসে ধর্ষণ ও ব্যাভিচারের যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা বলা হয়েছে তার আদলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে কার্যকর করা। যাতে এ থেকে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। ধর্ষণ দূরীকরণে অভিবাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বিশেষ করে বিবাহকে সহজতর করা, পড়ালেখা শেষ করে, ক্যারিয়ার গঠনের পিছু ছুটে বিবাহের মত অত্যাবশকীয় ফরজ (কখনো কখনো বিয়ে ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল) কাজকে বিলম্বিত না করা। যৌতুকের জন্য বিবাহ অনেক সময়ে বিলম্বিত হয়, যৌতুককে সমাজ থেকে চিরতরে দূর করা এবং বিবাহ উপযুক্ত পুরুষকে যৌতুক গ্রহণে নিরুৎসাহিত করা এবং প্রাপ্ত বয়স হওয়ার সাথে সাথে বিবাহ সম্পাদন করা।

পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক, ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে ধর্মীয়, ও মূল্যবোধ সংক্রান্ত শিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার করা।এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব, স্কুল, কলেজ, বিশ্বাবিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতে ধর্মীয়-মূল্যবোধ সংক্রান্ত অধ্যায়ের সংযোজন এবং শিক্ষক ও মসজিদের ইমামগণকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে উদ্ভুদ্ধ করা। অপেক্ষাকৃত গরিব এলাকাগুলোতে যেসমস্ত এনজিও কাজ করে তারা যেন তাদের পাঠ্যসূচীতে ধর্মীয় ও মূল্যবোধ সংক্রান্ত অধ্যায়ের সংযোজন করে সে দিকে কর্তৃপক্ষকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। দেশে যে সমস্ত পর্ণসাইট রয়েছে তা বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করা যেমনটি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কোরিয়াতে রয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের নামে ইন্টারনেটের যে সহজতা রয়েছে তা রোধ করা এবং অপ্রাপ্ত বয়স্করা যাতে অশ্লীল কোনো সাইট ও সিনেমা দেখতে না পারে সে বিষয়ের নিয়ন্ত্রন আরোপ করা। দেশে অশ্লীল সিনেমা চলচ্চিত্র, নাটক, টেলিফিল্মের উপর সেন্সর আরোপ করা এবং বিদেশী অশ্লীল সিনেমা দেশে প্রদর্শন বন্ধ করা। পাশাপাশি পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করার মতো পারিবারিক নাটক সিনেমা তৈরী করা। বিদেশী যে সমস্ত সিনেমা ও সিরিয়াল দ্বারা আমাদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি কালচার ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে বা পরকীয়ায় আসক্ত হচ্ছে, পরিবার ভেঙে যাচ্ছে সে সমস্ত বস্তাপচা সিরিয়াল বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা।

যুবক-যুবতীদের মধ্যে যে বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড ও রিলেশনশিপ কালচার গড়ে উঠেছে তা নিয়ন্ত্রণ করা। বিবাহ বহিঃর্ভুত শারীরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে শহরে বাড়িওয়ালাদেরকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। কেননা অনেক সময়ে দেখা যায় পড়াশুনার নাম করে বা চাকরির নাম করে উঠতি বয়সী যুবক যুবতীরা বাসা ভাড়া করে একই সাথে বসবাস শুরু করে সেখান থেকেও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে যা অনেকেরই অজানা বা লোক চক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায় ।

মাদক থেকে দূরে রাখার জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলার ব্যবস্থা করা, শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও জীবন ঘনিষ্ঠ বই পড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা, বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা, খেলাধুলা, বৃক্ষরোপন, এবং সমাজ ও সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়ন মুলুক কর্মকান্ডে যুবকদেরকে সম্পৃক্ত করা।

আইন-শৃংখলা, সভ্যতা, শালীনতা, ক্ষমতার দম্ভ ও একদল অন্যদলকে রাজনৈতিক ভাবে দোষারোপ না করে বরং সকলের ঐক্য মতের ভিত্তিতে ধর্ষক যে দলেরই হোকনা কে তাদেরকে রক্ষা না করে বরং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরন পারে ধর্ষণ অনেকাংশই কমাতে কেননা বর্তমান কালে যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠছে তারা ক্ষমতাসীন দলের লোক। তাই এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলকেই কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে তাদের উচিত হবে না যে এই দায় বা দোষ অন্য কারো উপরে চাপিয়ে ভারমুক্ত হওয়া। মন্ত্রী ও ক্ষমতাশীন দলের নেতৃবৃন্দকে অত্যান্ত আন্তরিকতার সাথে ন্যায়-বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতাশীন দলের ছাত্র উইংস এবং পুলিশের কর্মকান্ডে যাতে ধর্ষকরা কোনোভাবে আসকারা না পায় সেদিকে রাখতে হবে কঠোর দৃষ্টি। ধর্ষনের মতো অন্যায় ও ব্যাভিচার নিয়ে রাজনীতি না করে, আসুন সবাই মিলে ধর্ষণ নামক সন্ত্রাসকে এখনই একসাথে প্রতিহত করি।

©️ লেখকঃ ওয়াহিদ মুহাম্মাদ মাহবুব, সলিসিটর, ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিউজটি পড়া হয়েছে 177 বার

Print

শীর্ষ খবর/আ আ