ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ
ইস্তাম্বুল, তুরস্ক
শিশুরা একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপদ শৈশব, স্নেহময় পরিবেশ এবং মানবিক শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রতিটি সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনও শিশু নির্যাতনের ভিডিও দেখেছি, যা দেখে অশ্রু সংবরণ করা কঠিন। কোনো শিশুকে নির্মমভাবে প্রহার, অপমান কিংবা অমানবিক শাস্তি দেওয়ার দৃশ্য কেবল একটি শিশুর উপর নির্যাতন নয়; এটি মানবতা, নৈতিকতা এবং আইনের উপরও নির্মম আঘাত।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত তথ্য উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪ সালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে শত শত শিশু শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন এবং হত্যার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ঘটনাই সামাজিক লজ্জা, ভয় অথবা বিচারহীনতার কারণে প্রকাশ পায় না। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষের হাতেই—পিতা-মাতা, অভিভাবক এবং শিক্ষক। শাসনের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনকে এখনও সমাজের একটি অংশ স্বাভাবিক বলে মনে করে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের উপর শারীরিক নির্যাতনের বহু ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও সব মাদ্রাসা বা সব ধর্মীয় শিক্ষককে এক কাতারে ফেলা অন্যায় হবে, তথাপি যেখানে নির্যাতন ঘটে, সেখানে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে যে সন্তানকে কুরআনের হাফেজ বানালে পিতা-মাতার জন্য জান্নাত লাভের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এই ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবার অতি অল্পবয়সী সন্তানকে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোথাও কোথাও কিছু অসাধু ও নিষ্ঠুর শিক্ষক এই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে শিশুদের উপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। কোনো শিশুকে নির্যাতন করে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দয়া, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি অসীম স্নেহ, কোমলতা ও ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছেন। তাই শিশু নির্যাতন করে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া ইসলামের প্রকৃত আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। জান্নাত লাভের আকাঙ্ক্ষা যদি থাকে, তবে তার পথ হলো নিজের সৎকর্ম, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানবিক জীবনযাপন। শিশুদের নির্যাতনের পরিবেশে ঠেলে দিয়ে তাদের মানসিক বিকাশ ধ্বংস করা কোনোভাবেই ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শিশুর উপর নির্যাতনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। নির্যাতিত শিশুদের অনেকেই সারাজীবন মানসিক আঘাত, আত্মবিশ্বাসের সংকট, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা সহিংসতাকেই সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে শিখে ফেলে। ফলে একটি নির্যাতিত শিশু ভবিষ্যতে একটি অসুস্থ সমাজ গঠনের অনিচ্ছাকৃত অংশে পরিণত হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং সমগ্র সমাজকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে সরকার, মাননীয় আইনমন্ত্রী এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রীর উচিত জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যেমন—
১. শিক্ষক নিয়োগে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ: শিশু মনোবিজ্ঞান, শিশুর অধিকার, ইতিবাচক শৃঙ্খলা ও শিশু সুরক্ষা বিষয়ে স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ব্যতীত কাউকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এ বিধান লঙ্ঘন করলে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা: স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা: সহজলভ্য অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা, হেল্পলাইন, অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম এবং দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দিতে হবে।
৪. সিসিটিভি ও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা: আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গোপনীয়তা-সম্মত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সিসিটিভি স্থাপন, শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন এবং নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করতে হবে।
৫. শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা: যে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৬. অভিভাবক সচেতনতা বৃদ্ধি: সন্তান লালন-পালন, ইতিবাচক শাসন, শিশু অধিকার এবং মানসিক বিকাশ বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
৭. শিশুদের মানসিক সহায়তা: প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলিং সেবা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে তার মাধ্যমে। শিশুদের কান্না, ভয় এবং অসহায়ত্বের উপর কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হতে পারে না। শিশুদের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষা হবে ভালোবাসা, মানবিকতা ও মর্যাদার; ভয়, নির্যাতন ও অপমানের নয়। কারণ আজকের নিরাপদ শিশুই আগামী দিনের মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি।












