• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

সিলেটের বন্যা : নৌকায় মানুষ, আশ্রয়কেন্দ্রেও অভুক্ত

প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুন, ২০২২ ৫:০০
আপডেট: সোমবার, ২০ জুন, ২০২২ ৫:০০

958265

সিলেটের বন্যা : নৌকায় মানুষ, আশ্রয়কেন্দ্রেও অভুক্ত

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে

অনুমান করা যায়নি কী ঘটেছিল সিলেটের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায়। নেটওয়ার্ক না থাকায় কোনো খবরই মেলেনি। মাঝে মধ্যে দু’একজন স্রোত ঠেলে নিরাপদে আসার পর তারা জানিয়েছিলেন নিজেদের কথা। কেউ কারও খবর রাখতে পারেনি। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন সবাই। গতকাল দুপুরের পর থেকে বন্যা কবলিত এলাকার খবর জানা যাচ্ছে। সিলেটে বর্ণনাতীত তাণ্ডব চালিয়েছে এবারের বন্যা। প্রলয়ঙ্করী উজানের ঢলে ভেসে নিয়ে গেছে বাড়িঘর। তিন দিন ধরে মানুষ বসবাস করছে গাছের ডালে। আবার কেউ কেউ ঘরের চালের উপর।

পরিবার পরিজন নিয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুনেছেন। জীবন নিয়ে ফিরতে পারবেন সেটি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। পানিতে ভাসছে ঘরের চাল। গবাদি পশুর মরদেহ ভেসে যাচ্ছে। রাত হলেই বাড়তো আতঙ্ক। ওদিকে খাবারের জন্য হাহাকার সর্বত্র। আটকেপড়াদের মতো আশ্রয় কেন্দ্রেও না খেয়ে দিন পার করছে মানুষ। দুয়েকটি কেন্দ্রে শুকনো খাবার পৌঁছালেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। গোয়াইনঘাটের দুয়ারী খাল। ভারতের পাদুয়ার নিকটবর্তী এলাকা। ওই গ্রামের বাসিন্দা হুনা মিয়া জানিয়েছেন ভয়াবহ তাণ্ডবের কথা। ১৬ই মে রাত থেকে হু হু করে বাড়তে থাকে বন্যার পানি। সেইসঙ্গে তীব্র বেগে নামে উজানের ঢল। কন্যাজঙ্গা নদীর তীরে তাদের বাড়ি। ঢলের তাণ্ডব রাতে আঁচ করতে পারেননি। সকাল হতেই দৃশ্য দেখে ভড়কে যান হুনা মিয়া।
প্রবল গতি নিয়ে ধেয়ে আসা ঢলে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চারদিক। গ্রামের জনির ঘর শুক্রবার ভোররাতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এরপর ভাসে চক্কনের ঘরও। এভাবে নদী তীরবর্তী বহু গ্রামের ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। প্রাণ বাঁচাতে অনেক মানুষ গাছের ডালে আশ্রয় নেন। কেউ কেউ পরিবার নিয়ে ওঠেন টিনের চালের উপর। তার গ্রামে অন্তত ১০টি বাড়ি ভেঙে পড়েছে ঢলের তোড়ে। হাজিপুর গ্রামে আব্দুস সালামের বর্ণনা আরও ভয়ঙ্কর। জানান, এমন ঢলের তোড় তিনি জীবনে দেখেননি। ঢলের সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ধারায় বৃষ্টি। ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছিল মানুষের আর্তনাদ। কারও ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কারও কারও গবাদিপশুও চোখের সামনে তলিয়ে গেছে। রাধানগর এলাকার উপর দিয়ে তীব্র বেগে যায় ঢলের পানি। কারও কারও বাড়ির টিনের চালের উপর দিয়েও যায়। ওই এলাকার বাসিন্দা কাজল মিয়া জানিয়েছেন, ঢলে অনেকের গবাদিপশু ভেসে গেছে। চোখের সামনে ঘরের মালামালও ভেসে গেছে। জীবন নিয়ে সবাই শঙ্কায় ছিলেন। জীবন বাঁচাতে লড়াই করেছেন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা। প্রবল বেগে ঢল থাকায় মানুষজন বাড়ির চালের উপর আশ্রয় নেন। তারা জানান, এই ঢল নামে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকা থেকে। প্রচণ্ড শব্দ করে সবকিছু ভেঙেচুরে ধেয়ে আসে ঢল। গোয়াইনঘাটের ১০-১২টি ইউনিয়নে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ আটকা পড়েছিলেন। ৪ দিন ধরে তারা রয়েছে বিদ্যুৎহীন। যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। গত শনিবার দুপুর থেকে অনেক এলাকায় সেনা, বিমান ও নৌ বাহিনীর সদস্যদের দেখা মিলেছে।

বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা গিয়ে পৌঁছতে পেরেছেন। তবে, ঢল অব্যাহত থাকায় সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনো মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়নি। দুপুরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদরে গিয়ে বন্যার ভয়াবহ তাণ্ডবের চিত্র দেখা গেছে। অসহায় মানুষ আর্তনাদ করছে। তাদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। তিনদিন পর অনেকেই সহযোগিতা পেয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। কোম্পানীগঞ্জ সদর। এখনো বুক সমান পানিতে বন্দি মানুষ। সড়ক থেকে পানি নামায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে সদর পর্যন্ত যাচ্ছেন। পানিতে ভাসছে টিনের চাল, গাছগাছালি। ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। কোম্পানীগঞ্জের ধলাইয়ের তোড়ে স্রোতে ভেসে যাওয়া একটি ঘরের ছবি ভাইরাল হয়েছে। দয়ারবাজার এলাকার নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নদী তীরবর্তী অনেক বাড়িঘর ঢলের তোড়ে ভেসে গেছে। মানুষজন কোনোমতে রক্ষা পেলেও তাদের সম্পদ রক্ষা করতে পারেনি। মানুষ যে যেখানে পেরেছেন আশ্রয় নিয়েছেন। এখনো অভুক্ত এলাকার মানুষ। বিদ্যুৎ নেই, নেটওয়ার্কও নেই। হাওর এলাকাগুলোর কয়েকটি গ্রামে মানুষজন আটকা আছেন বলে জানান তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে পানিবন্দি মানুষের আর্তনাদের অনেক খবর আসতে থাকে গোয়াইনঘাটের ওসি নজরুল ইসলামের কাছে। ঢল প্রবল থাকায় পুলিশও বন্দি।

ওসি নিজে থেকেই নৌকার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু রাতে তিনি বেশিদূর যেতে পারেননি। নিজে থেকে কিছু কিছু এলাকায় গিয়ে উদ্ধার কাজ চালিয়েছেন। শুক্রবার থেকে অনেক স্থানে পুলিশের পক্ষে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। তবে, শনিবার দুপুর থেকে সিলেটের পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিনের নেতৃত্বে দুর্গম এলাকাগুলোতে স্পিডবোড নিয়ে উদ্ধার চালানো হয়েছে। সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ কোম্পানীগঞ্জ ও গোইনঘাটের হাজারো মানুষকে উদ্ধার করেছে। যতদূর যাওয়া সম্ভব সেখানে উদ্ধার চালানো হয়েছে। গতকাল কোম্পানীগঞ্জের তেলীখালের হাওর এলাকার মানুষের কিছুটা সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা দুর্গম এলাকাগুলোতে গিয়ে উদ্ধার কাজ চালাচ্ছেন। হাওরের প্রত্যন্ত এলাকা। একটি ইঞ্জিন নৌকা ভাসতে দেখেন সেনা সদস্যরা। তারা স্পিডবোড নিয়ে কাছে ছুটে যান। ভয়ঙ্কর দৃশ্য। শিশু, সন্তান বয়স্কদের নিয়ে নৌকায় ভাসছে একটি পরিবার। গবাদিপশুও তাদের নৌকায়। তিনদিন ধরে অভুক্ত তারা।

নৌকায় ভেসে বেড়াচ্ছেন। প্রবল স্রোত থাকায় তারা বের হতে পারেননি। ওই পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তেলীখালের পিয়াইন নদীর তীরবর্তী তাদের বাড়ি। প্রবল স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঘরবাড়ি। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তারা নৌকায় অবস্থান নিয়েছেন। গতকাল দুপুরে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ সিলেটের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করতে এসে নিজেও দেখেছেন উদ্ধার কাজের দৃশ্য। এরপর তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রবল স্রোত ও ভারী বর্ষনের কারণে অনেক স্থানে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এরপরও সেনা সদস্যরা বসে নেই। জীবন বাজি রেখে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার কাজ চালাচ্ছেন। বলেন, স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে ওই এলাকায়। আমরা উদ্ধার কাজকে প্রাধান্য দিলেও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, উদ্ধার কাজে ঢল ও বৃষ্টি বড় বাধা। তবে, আমরা বসে নেই। যেসব মানুষ এখনো আটকা আছেন তাদের উদ্ধারে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সিলেটে সেনা প্রধান: বানবাসী মানুষকে উদ্ধারে যা যা করা প্রয়োজন সবই করবো বলে জানিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান এসএম শফি উদ্দিন আহমদ। দুপুরে তিনি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে বন্যার্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন। সেনাবাহিনী প্রধান জানিয়েছেন, এখানে কষ্টের দিকে থাকালে হবে না।

সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে হলেও করতে হবে। সেনা সদস্যরা যা যা করণীয় সব করবে। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীকে আমরা উদ্ধার করেছি। তারা বন্যায় আটকে ছিল। উদ্ধার অভিযান সেনাবাহিনী সর্বান্তকরণে উদ্ধার কাজ অব্যাহত রেখেছে। প্রচণ্ড স্রোত ও অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যরা জীবন বাজি রেখে কাজ করছে বলে জানান সেনা প্রধান। এ সময় সেনা প্রধান বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বন্যার্ত লোকজনের মধ্যে ত্রাণও বিতরণ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল হামিদুল হকসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন। ২১ জনকে উদ্ধার: সুনামগঞ্জে আটকে পড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ ২১ জনকে উদ্ধার করেছে সেনা সদস্যরা। গতকাল সকালে তাদের উদ্ধারের পর সিলেটে নিয়ে আসা হয়। গত ১৫ই মে থেকে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় আটকে ছিলেন ওই শিক্ষার্থীরা। ভয়াবহ বন্যায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তারা অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। উদ্ধারের পর সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের সিলেট ওসমানী আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে আসেন।

সেখান থেকে গাড়ি যোগে তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এদিকে, সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ১০০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে পুলিশ। দুপুরের দিকে তাদেরও ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আরও একশ’ শিক্ষার্থী উদ্ধার: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরসহ আরও কয়েকটি এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ’র মতো শিক্ষার্থী আটকা পড়েছিল। গতকাল তাদের উদ্ধার করে সিলেটে নিয়ে এসেছে পুলিশ। মিশু নামের এক ছাত্র জানায়, প্রবল স্রোতের কারণে তারা রাস্তায়ই আটকা পড়েছিলেন। পরে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার পুলিশ পাঠিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। তিনদিন তারা ওখানেই ছিলেন। গতকাল সকালে তাদের সিলেট পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছে। আটক অবস্থায় থাকা ৪ দিনের বিবরণে তিনি বলেন, এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কেটেছে। প্রথমদিন ঢলে আটকা পড়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে যেসব মহিলা শিক্ষার্থী তারা তো হাঁটতেই পারছিল না। আমরা একে অন্যের সঙ্গে হাত ধরে হেঁটেছি। কেউ হাত থেকে ফসকে গেলে চিরতরে হারিয়ে যেতো। স্রোত প্রবল থাকার কারণে আমরা সুনামগঞ্জ সদরে পৌঁছার পর পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলাম। শুকনো খাবার খেয়ে তাদের দিন যাপন করতে হয়েছে। সিলেট জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থীদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাসা মানুষ, খাদ্য সংকট গতকাল দুপুর থেকে বৃষ্টি কমেছে।

তিনদিন পর আটকা পড়া লোকজনকে উদ্ধার করা হচ্ছে। নেয়া হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু মানুষে ঠাসা। গরু, ছাগল নিয়ে বসে বসে দিন কাটাচ্ছে মানুষ। খাবার নেই। তাসলিমা বেগম। দু’দিন ধরে আছেন শেখঘাট মইনুন্নেছা স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে। অভুক্ত অবস্থায় উঠেছিলেন। শনিবার রাতে রান্না করা খিচুড়ি খেয়েছিলেন। গতকাল বেলা ১টায় জানা গেল কিছুই খাননি। কেউ দিয়ে যায়নি। আশ্রয়কেন্দ্রে শ’খানেক মানুষ। সবাই অভুক্ত। খাবারের জন্য তাদের চলছে অন্তহীন অপেক্ষা। কোম্পানীগঞ্জের বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র। ৪-৫শ’ মানুষ উঠেছেন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে। বাড়িতে পানি। ধনাঢ্যরাও এসে উঠেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। গতকাল সেনাপ্রধান গিয়েছেন ওখানে। এরপর থেকে তারা খাবার পাচ্ছেন। কিন্তু তার আগের তিনদিন তাদের অভুক্ত অবস্থায়ই কাটাতে হয়েছে। গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে তাদের ঠাসাঠাসি বসবাস। জীবন বাঁচাতে লড়ছেন সবাই। ওই কেন্দ্রর কয়েকজন মহিলা জানিয়েছেন, পার্শ্ববর্তী দলইরগাঁও, খাগাইলসহ কয়েকটি এলাকা থেকে তারা সাঁতরে এসে উঠেছেন। কিন্তু সবকিছু রেখে এসেছেন বাড়িতে। চম্পা বেগম। বসবাস করেন নগরীর মজুমদারপাড়া এলাকায়।

ওই এলাকার স্কুলে সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। শুকনো খাবার খেয়েই তিনদিন ধরে বসবাস করছেন। সিলেট শহর কিংবা গ্রাম সব এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রেই এখন একই অবস্থা। নগরীতে ৩৬টি আশ্রয়কেন্দ্র সিটি করপোরেশনের। তার বাইরে ব্যক্তি উদ্যোগে আরও ১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সব কেন্দ্রেই ৪-৫শ’ মানুষ। মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। নগরীর উপশহর। পানিবন্দি চারদিন। কেউ বাড়ির দোতলা, তিনতলায় অবস্থান নিয়েছিলেন। অভুক্ত অবস্থায় হাজার হাজার মানুষ দিন কাটাচ্ছেন। সবাই বন্যায় আক্রান্ত। গতকাল সকাল থেকে অনেকেই পানি ডিঙ্গিয়ে নিরাপদে ছুটছিলেন। সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা উদ্ধার কাজ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। নগরের উদ্ধার কাজে প্রয়োজন নৌকার। গতকাল নৌকা নিয়ে নগরের উপশহর এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। উপশহর, তেররতন, মাছিমপুর, ছড়ারপাড় এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজন জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে লোকজন বিভিন্ন সময় রান্না করা খিচুড়ী পাঠাচ্ছেন। যে পরিমাণ শুকনো খাবার পাওয়া যাচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে অভুক্ত অবস্থায় তাদের দিনযাপন করতে হচ্ছে। নগরীর মীর্জা জাঙ্গাল এলাকায়ও কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। লোকজনে ঠাসা।

স্থানীয় কাউন্সিলর শান্তনু দত্ত সন্তু জানিয়েছেন, তার পক্ষে কিছু কিছু আশ্রয়কেন্দ্রে একবেলা রান্না করা খিচুড়ী দেয়া হচ্ছে। এখনো সেভাবে সবাইকে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘আমরা উদ্ধার কাজ চালানোর পাশাপাশি রান্না করা খাবার পরিবেশন করছি। আশ্রয়কেন্দ্রে আসা লোকজন যাতে অভুক্ত না থাকে সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যে এলাকায় যে আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান, সেখানে স্থানীয় লোকজনও সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন।’ তিনি জানান, ‘নদী তীরবর্তী এলাকায় পানিবন্দি বিপুলসংখ্যক মানুষ বন্যার্ত। সবার কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করছি।’ গতকাল থেকে সিলেটের দুর্গম এলাকাগুলোয় সেনাবাহিনীসহ পুলিশ সদস্যরা যাচ্ছেন। তারা উদ্ধারের পাশাপাশি ত্রাণ দিচ্ছেন। সিলেটে পণ্য সংকট: গতকাল থেকে সিলেটে পণ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ত্রাণের জন্য পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা ব্যবসায়ীরা বেশি দামে বিক্রি করছেন পণ্য। কাউন্সিলররা জানিয়েছেন, ত্রাণের জন্য বেশি দামেও সিলেটে পণ্য মিলছে না। নগরের কালীঘাট, কাজিরবাজার এলাকায় পানি থাকায় টাকা দিয়েও চাল, ডাল পিয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। সিলেট জেলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জিয়াউল হক জানিয়েছেন, সিলেটের কালীঘাটে কোমর পানি। ব্যবসায়ীরা দোকানপাট খুলতে পারছেন না। বিক্রি করবেন কীভাবে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা এখন মালামাল রক্ষা করতে ব্যস্ত। তবে, কেউ কেউ কালীঘাটের আশপাশে পণ্য পৌঁছে দিয়ে বিক্রি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফালাহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পণ্যবাহী ট্রাক এসে ঢুকতে পারছে না। মালামাল রাখার জায়গাও নেই। এছাড়া- ব্যবসায়ীদের পণ্য ভিজে গেছে। এরপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি। বন্যার্তদের পাশে আওয়ামী লীগ: বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা সমূহে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়। গতকাল দুপুরে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খানের নেতৃত্বে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার প্যাকেট বিতরণ করা হয়। এ সময় সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় মানুষের পাশে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ রয়েছে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শমশের জামাল, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ সাকির আহমদ শাহীন, উপ-দপ্তর সম্পাদক মো. মজির উদ্দিন প্রমুখ।

এর আগে গতকাল সকালে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১২নং ওয়ার্ডের মঈনুননেছা উচ্চ বিদ্যালয় ও শেখঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে রান্না করা খাবার বিতরণের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়। ত্রাণ বিতরণে বিএনপি: সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেছেন, মাত্র ১ মাসের মধ্যেই দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হলো সিলেট অঞ্চল। গতকাল সিলেট সদর দক্ষিণ উপজেলার তেতলী, কামালবাজার, সিলাম ইউপি’র বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার মানুষের মাঝে খাবার বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন। সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বরাবরই কাজের চেয়ে ঢোল পেটায় বেশি, আর তাদের এই ঢোল পেটানোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ জনগণ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ছিলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কোহিনূর আহমদ, অলিউর রহমান চেয়ারম্যান, জেলা বিএনপি নেতা মাহবুব আলম, স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাজিম উদ্দিন পান্না, জেলা বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম তোরণ, হাজী পাবেল, মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে হাসান রাব্বী, জেলা জাসাসের সদস্য সচিব রায়হান এইচ খান, যুবদল নেতা রাসেল হোসেন, মো. আব্বাস, ছাত্রদল নেতা আজমল হোসেন অপু প্রমুখ।

ট্রেন চালু: ঢাকা-সিলেট রেল যোগাযোগ ফের চালু হয়েছে। দুপুরের দিকে এই রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এর আগে স্টেশনে বন্যার পানি ওঠায় রেল যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়। সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার নুরুল ইসলাম। সিলেট স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে বিকালে পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেন ছেড়ে যাবে বলেও জানা গেছে। সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, শনিবার থেকে ফেঞঞ্চুগঞ্জ পর্যন্ত বেশ কয়েক জায়গায় রেললাইন বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। যে কারণে সিলেট রেল স্টেশন থেকে রেল চলাচল বন্ধ রাখা হয়। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশন থেকে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক ছিল। রেললাইন থেকে পানি সরে যাওয়ায় দুপুর থেকে সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। এর আগে স্টেশনে বন্যার পানি ওঠায় শনিবার সিলেট স্টেশন থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। বুধবার থেকে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার তা ভয়াবহ রূপ নেয়। এদিন বিকাল থেকে দ্রুত বাড়তে শুরু করে পানি। এতে রেলস্টেশন, বিমানবন্দরসহ নগরীর অধিকাংশ এলাকা বন্যাক্রান্ত হয়ে পড়ে।


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com