জয়িতারা বেঁচে থাক বহুরুপী হয়ে

Pub: বুধবার, জুলাই ৪, ২০১৮ ৮:৫১ অপরাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, জুলাই ৪, ২০১৮ ৮:৫১ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জিল্লুর রহমান:
ব্র্যাকের মাঠ কর্মি হিসেবে চাকরিতে যোগদান করলাম, জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল, বিসিএস টা আর হলোনা আমার।
কৃষক বাবার সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন, আমি একদিন বড় অফিসার হিসেবে চাকরি নেব, বাবার আশা পূর্ণ করা সম্ভব হলোনা আমার পক্ষে।
এতেই নিজেকে শান্ত্বনা দিতে পারি আর যাই হোক মাস শেষে অন্তত একটা বেতন তো হাতের মুঠোয় আসবে।

গ্রামের সাধারন মহিলা দের কে ঋন দানের মাধ্যমে সাবলম্বি করে তুলার একটা প্রজেক্টের সুপারভাইজারের দায়িত্ব টা পেলাম।
সেই সুবাধে সকাল থেকে সন্ধ্যা গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে মহিলাদের কাছ থেকে মাসিক কিস্তির টাকা আদায় করা ছিল আমার নিত্যকর্ম।

একদিন টাকা তুলে পাশের বাড়ীর মেটো পথবেয়ে পাকা রাস্তায় উঠার সময় চোখে পড়ল একটি গ্রাম্য কুমারি মেয়ে কলসিতে জল ভরে হেটে যাচ্ছে বাড়ীর দিকে,খুবই সাদাসিধে ষোড়সি মেয়েটি , মনে হলো শিক্ষিত হয়ত হতেও পারে।
আমরা তখন ঐ গ্রাম গুলোতে প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা করছিলাম ।

২০০৫ সাল আমি একদিন ঐ বাড়ীতে বেড়াতে গেলাম , দেখা হলো মধ্য বয়স্ক এক মহিলার সাথে , কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলাম ছোট বাচ্চাদের প্রাথমিক অক্ষর জ্ঞান দেওয়ার মতো কোন শিক্ষিত মেয়ে বাড়ীতে আছে কিনা ,

মহিলা সহজ সরল ভাবে বলে দিলেন,আমার মেয়ে এইবার মেট্রিক পরীক্ষা দিবে, যদি এই যোগ্যতায় হয় তাহলে দিতে কোন আপত্তি থাকবেনা।
আমিও রাজি হলাম ,পরের দিন মেয়েকে নিয়ে এরিয়া ম্যানেজারের অফিসে আসতে বলে আসলে যথারীতি মেয়ে কে নিয়ে মা হাজির হলেন , প্রাথমিক আলোচনায় বুঝা গেল এই মেয়েকে দিয়ে কাজ আপাতত চালিয়ে নেয়া যাবে।

মেয়েটির নতুন চাকরি,
অনেক কিছু বুঝার ক্ষমতা এখনও হয়নি ।নিজে থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলাম, বুঝিয়ে দিলাম অনেক কিছু , যাহাতে চাকরিটা স্হায়ী করতে সমস্যা নাহয়।
আমার সাথে ঘনিষ্টতা বাড়তে লাগলো , প্রায় ছুটির দিন বায়না ধরতো বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার , মাঝে মধ্যে নিয়ে যেতাম , নিজের কাছেও একটু ভাল লাগতো ,
এভাবে চলেগেলো বেশ ক’বছর।

ইতিমধ্যে “জয়িতা”এইস এস সি পাস করে ফেলেছে।
প্রতিদিন আমার সাথে দেখা না হলে ও যেন থাকতেই পারেনা।
সম্পর্ক টা অনেক গভীরে চলে এসেছে যা আমি বুঝেও না বুঝার ভান করছিলাম ।
একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেই দিল,
আমার তো বিয়ের বয়স হয়েগেছে ,মা আমার জন্য পাত্র খুঁজছেন , আমি কিন্তু তোমাকে ছাড়া অন্য কিছু চিন্তাও করতে পারিনা।এদিকে বাবা মা সংসারী হওয়ার জন্যে চাপ দিচ্ছিলেন, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম জয়িতার সাথেই বাকি জীবন টা কাটিয়ে দিই।

দুজনে বিয়ে করবো বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম কিন্তু না,বাধ সাধলেন জয়িতার মা , কারন আমি মুসলিম আর ও হিন্দু!
জয়িতার আগ্রহেই আমরা শুরু করলাম জীবনের এক নতুন অধ্যায়, অনানুষ্ঠানিক বিয়ের মাধ্যমে একই ছাদের নিচে বসবাস, এভাবে কাটলো দুই বছর!বিষয় টা বাবা মার অজানাই ছিল!

জয়িতা ওর মায়ের কাছে থাকবে বলে
আমার কাছ থেকে কিছু দিনের জন্য চলে গেলে,আমিও সম্মতি
দিলাম।
সেই যাওয়া থেকে ফিরতে চাইছিল না বেশ কয়েক মাস ,
আমাকে জানিয়ে
দিলো,আমি যেন বিয়ে করে ফেলি।চেষ্টা র ত্রুটি করিনি ফিরিয়ে আনতে।
আমার অতিবৃদ্ধ বাবা মায়ের মুখ পানে চেয়ে মায়ের পছন্দের এক পাত্রীকে বিয়ে করে যথারীতি আবার সংসার শুরু করলাম।

জয়িতা যখন জানতে পারল আমি বিয়ে করেছি , তখনই শুরু করলো অত্যাচার, বিভিন্ন ভাবে আমার অফিসে এসে আমাকে অপমান করা , অতীতের অনেক বিষয়াদি নিয়ে আমার সিনিয়র অফিসারদের সাথে আলোচনা, আমার চাকরি হারানোর ভয়ে আমি জয়িতার কথায় আবার রাজি হয়ে জানতে চাইলাম কি করতে হবে আমার?
শর্ত একটাই , আমার বিবাহিত স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে , নাহয় ও আত্মহত্যা করবে এমন কি আত্মহত্যা করার মতো পরিস্থিতি ইতিমধ্যে সৃষ্টিও করেছে ,আমি অসহায় কাঁঠের পুতুলের মতো সব শর্ত মেনে নিয়ে বৌকে তালাক দিতে হলো।

ভাংগা মন নিয়ে জয়িতার সাথে চলছিল আমার জীবন, অনেক টা হতাশায় আঁকড়ে ধরেছে আমাকে , এগারো বছরের যা উপার্জন সব জয়িতার পিছনেই ব্যয় করতে হয়েছিল , ভবিষ্যতের কোন চিন্তা ছিল না আমার ।
এরই মধ্য জয়িতার একটু আলট্রামডার্ন ভাব পরিলক্ষিত হলো আমার কাছে , রাত করে বাড়ী ফিরতে দেখতাম, জয়িতা এখন ব্র্যাকের সিনিয়র শিক্ষা অফিসার।
অনেক কিছু বুঝার ক্ষমতা ওর আছে।
আমার সাথে যোগাযোগ টা কমিয়ে নিয়েছে অনেক টা!

গত ৩০/০৬/১৮ ইং তারিখে থানা থেকে একটা ফোন আসলো আমার মোবাইলে , অপর প্রান্ত থেকে জানানো হলো আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে , থানার বড় বাবু আপনার সাথে কথা বলবেন ।
আমি সায় দিলাম , সময় মতো পরিচিত দুজন কে নিয়ে হাজির হলাম থানায়।
আলোচনা শুরু আমার প্রতি পক্ষ আমার সামনে বসা জয়িতার অভিযোগ, ও বিয়ে করতে চায়
আমি নাকি বিভিন্ন ভাবে বাঁধা সৃষ্টি করছি বিয়েতে!
পাশে ওর হবু বর , রুপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা বসেছিলেন ।জয়িতা এখন অতি আধুনিক , পড়নে স্কার্ট জিন্সের প্যান্ট পরা, অবাক হয়ে শুধু থাকিয়ে থেকেছিলাম জয়িতার বিষে ভরা মুখ পানে।

চোখে ভাসছিল জয়িতার ২০০৫ সালের অতি সাধারন চেহারা আর আজকের আধুনিক রুপ,
বড় বাবুর সিদ্ধান্ত আমাকে ষ্ট্যাম্পে লিখিত দিতে হবে জীবনে আর কখনো এই মেয়েকে ডিস্টার্ভ করবোনা, কাগজ রেডি করা হলো ,
কলম হাতে নিয়ে স্বাক্ষর টা করতে হলো আমাকে ,
একটি স্বাক্ষর যবনিকাপাত হলো আমার এগারো বছরের শ্রম ঘামের স্বপ্নে আঁকা সংসারের , আলোচনা শেষে আমি বিদায় নিলাম বড় বাবুর কাছ থেকে।চোখে যেন অন্ধকার দেখছিলাম, সাথের দুজনের সহায়তায় গাড়ীতে চেপে বসলাম , সবকিছু কেন জানি অন্ধকার মনে হচ্ছিল , আমি যেন লাইফসাপোর্টে থাকা এক জ্যান্ত লাশ!বিচিত্র পৃথিবীতে কতইনা নিষ্ঠুর হতে পারে মানুষ, তবুও মনের অজান্তেই দোয়া করে আসলাম জয়িতা আর ব্যাংক কর্তার সংসার যেন দীর্ঘ ও সুখের হয়,সুখ পাখিটি তাদেরই খাঁচায় বন্ধি থাক, গতিময় পৃথিবীতে আমার জন্য এক চিলতে ঠাই হয়ে যাবে হয়তো, কাল সকাল থেকেই শুরু আমার নতুন জীবন,এ জীবনে হয়তো জয়িতার মতো ছলনাময়ী থাকবেনা , হাজারও মন্দ লোকের ভিড়ে কারোনা কারো কাছে একটু সুখ খুজার চেষ্টা করবো ,জীবন জীবনের গতিতেই চলুক , আমার মতো দুর্ভাগারা হয়ত খড়কুঠো সম্বল করেই বেছে থাকবে বছরের পর বছর।
জয়িতারা বেঁচে থাক বহুরুপি হয়ে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1186 বার