দুখু মিয়ার দেশে যেভাবে ধরে রাখার চেষ্টা চলছে কবি নজরুলের স্মৃতি

Pub: সোমবার, আগস্ট ২৭, ২০১৮ ২:৫৮ অপরাহ্ণ   |   Upd: সোমবার, আগস্ট ২৭, ২০১৮ ২:৫৮ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বহু দশক ধরে কাজী নজরুল ইমলামের কবিতাই হয়ে উঠেছে বাংলা ভাষায় বিদ্রোহ আর প্রতিবাদের ছন্দ।

মানুষের কাছে কাজী নজরুল এভাবেই সমাদৃত। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি, কিন্তু সমানভাবে সমাদৃত ভারতসহ গোটা বিশ্বে।

কিন্তু তাঁর জন্মভিটার গ্রাম চুরুলিয়াতে কীভাবে বেঁচে আছেন দুখু মিয়া? সেখানকার সাধারণ মানুষ, আর ওই গ্রামে বাস করেন তাঁর যেসব উত্তরপুরুষ, তারা কীভাবে ধরে রেখেছেন নজরুল ঐতিহ্য?

আসানসোল শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে চুরুলিয়া। গ্রামে যাওয়ার পথে দূর থেকেই চোখে পড়ে বেশ কিছু টিলা। আর মাটির নীচে প্রায় সর্বত্রই কয়লা।

পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান কয়লাখনি অঞ্চল এটি।


চুরুলিয়া গ্রামের সংগ্রহশালায় নজরুল পরিবারের ব্যবহৃত কাপড়।
আঠারোশ নিরানব্বই সালে যখন চুরুলিয়া গ্রামেরই কাজী ফকির আহমেদের ঘরে জন্ম নেন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র, তার কয়েক বছর পরেই কাছের অজয় নদের ওপারে, ঘণ্টা কয়েকের রাস্তা পেরিয়ে শান্তিনিকেতনে আশ্রম গড়ায় মন দিলেন রবীন্দ্রনাথ।

তিনি তখন সাহিত্য কীর্তির প্রায় মধ্য গগনে।

১১ই জ্যৈষ্ঠ তাঁর জন্মক্ষণে উঠেছিল “ঝঞ্ঝা তুফান ঘোর, উড়ে গিয়েছিল ঘরের ছাদ ও ভেঙেছিল গৃহদ্বার” নিজের জন্মের সময়কার কথা এভাবেই কবিতায় জানিয়ে গিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।

সেই খড়ে ছাওয়া মাটির জন্ম ভিটে আর নেই। সেই জায়গায় তৈরি হয়েছে নজরুল একাডেমীর পাকা বাড়ি।

তবে মাটির বাড়িটির একটিই মাত্র ছবি রয়ে গেছে নজরুল একাডেমীর সংগ্রহশালায়।

কবির ছোট ভাই কাজী আলি হোসেনের পুত্র কাজী রেজাউল করিম সেই ছবিটা দেখাচ্ছিলেন।

“১৯৫৬ সালে এই মাটির বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। সেখানেই এখন নজরুল একাডেমীর দোতলা বাড়ি হয়েছে। মাটির বাড়িটা ভাঙ্গার আগেই আমরা একটা ছবি তুলিয়ে রেখেছিলাম। তাই কেমন ছিল কবির জন্মভিটা, সেটা এখনও দেখা যাচ্ছে। ছবিটা না তুলে রাখলে হারিয়েই যেত ওই বাড়িটা,” – বলছিলেন মি. করিম।

তার স্ত্রী রোকেয়া করিমের পৈত্রিক বাড়ি কবির বাড়ির একেবারে উল্টোদিকে।

নজরুল ইসলামের ছোটবেলার কথা অনেক শুনেছেন নিজের বাবার কাছে।

চুরুলিয়া গ্রামে নজরুল সংগ্রহশালার ছবি।

তাঁর কথায়, “আমরা যখন কবিকে দেখেছি, তখন তিনি নির্বাক, অসুস্থ। তিনি আর আমার বাবা তিন বছরের ছোট বড়, তারা বাল্যবন্ধু। কবির ছোটবেলার বহু গল্প শুনেছি বাবার কাছে। জন্মের পরে তিনদিন নাকি তিনি কোনও সাড়াশব্দ করেন নি। সবাই তো ভেবেছিল এ ছেলে বাঁচবে না।”

“তবে গ্রামে এক সাধক ছিলেন। তিনি কবিকে জন্মের পরে দেখেই বলেছিলেন এ মহাপুরুষ হবে। ছোটবেলায় খুব দুরন্তও নাকি ছিলেন কবি। বড় হয়েও সেটা কাটে নি – কিছুটা অভাবের তাড়নায়, কিছুটা স্বেচ্ছায় তিনি দৌড়ে বেরিয়েছেন। কখনও রুটির দোকানে কাজ নিয়েছেন, কখনও মক্তবে শিক্ষকতা বা ইমামতী করেছেন, আবার তার পরে সেনাবাহিনীতে গেছেন।”

ছোটবেলায় নজরুল ইসলামের নাম ছিল দুখু মিয়া। একটু বড় হতেই বাড়ির সামনের মক্তবেই শুরু হয়েছিল পড়াশোনা। সেই বিদ্যালয় এখন চুরুলিয়া নজরুল বিদ্যাপীঠ। বড় দোতলা বাড়ি।

সামনের মাঠে প্রতিবছর কবির জন্মদিনে শুরু হয় সপ্তাহ ব্যাপী নজরুল মেলা। সেটাই গ্রামের প্রধান উৎসব হয়ে উঠেছে বেশ অনেক বছর ধরে।

ওই মাঠের ধারেই সমাধিক্ষেত্র। কবি-পত্নী প্রমীলা দেবীর সমাধির পাশেই রয়েছে ঢাকায় কবির সমাধি থেকে কবি-পুত্র কাজি সব্যসাচী যে মাটি নিয়ে এসেছিলেন, তা দিয়ে তৈরি বেদী।

সেই পুরনো মক্তবটির একটি ছবি রাখা আছে নজরুল সংগ্রহশালায়।

একাডেমীর পরিচালক রেজাউল করিম বলছিলেন, “আগে ওই বিদ্যালয়ের নাম ছিল নজরুল মুসলিম বিদ্যাপীঠ। আমরা গ্রামের মানুষদের ডেকে একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে নজরুলের মতো একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষের নামে স্কুল, সেখানে কেন মুসলিম কথাটা থাকবে? অধিকাংশ মানুষ সেটা মেনে নিয়েছিল। সেই থেকেই স্কুলটার নাম নজরুল বিদ্যাপীঠ।”


তিনি যে মক্তবে পড়াশোনা করতেন, সেটাই এখন নজরুল বিদ্যাপীঠ।
বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পরে ছেদ পড়েছিল পড়াশোনায়।

তখন ওই মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন নজরুল ইসলাম।

ততদিনে তাঁর চাচা বজলে করিমের উৎসাহে শুরু হয়েছে গান রচনা। আর সেই সূত্রেই লেটো গানের দলের যোগ দেওয়া।

কবির সম্পর্কে নাতি ও সঙ্গীতশিল্পী সুবর্ণ কাজির কথায়, “নজরুলের সময়কার সেই লেটো গান বা লেটোর দল এখন আর এই অঞ্চলে পাওয়া যায় না। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে সেগুলো। তবে নজরুলেরই রচনায় এখনও বেচে আছে কিছু লেটো গান।”

সুবর্ণ কাজি গেয়ে শোনালেন নজরুলের লেখা লেটো গান ‘রব না কৈলাশপুরে, আই অ্যাম ক্যালকাটা গোয়িং’।

নজরুলের লেখা আরও একটি লেটো গান ‘আয় পাষণ্ড যুদ্ধ দে তুই’ শোনাচ্ছিলেন রেজাউল করিমের কন্যা সোনালি কাজি।

গ্রাম ছেড়ে অল্প বয়সেই নজরুল ইসলাম পাড়ি দিয়েছিলেন কাছের আসানসোল শহরে। কাজ নিয়েছিলেন একটি পাউরুটির কারখানায়।

কবি পরিবারের সদস্যদের কবর।
মানুষ আর গাড়ির ভিড়ে ঠাসা আসানসোল বাজারে কয়েকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে খুঁজে পেয়েছিলাম মেহের আলি বক্সের সেই বেকারি।

তারই উত্তরাধিকারী যুবক শেখ আসিফ ওসমান বলছিলেন, তাদের পরিবার সেই ১৮৮০ সাল থেকেই দোকানটি চালায়। তিনি বলছিলেন নজরুল ইসলাম যখনও কবি নজরুল হয়ে ওঠেন নি, সেই সময়ে হিসাবরক্ষকের কাজ করতেন তাঁদের পাউরুটির কারখানায়।

“উনি যখন এখানে হিসাব রাখার কাজ করতেন, সেই সময়ে আমার দাদুর বাবা দোকানটা চালাতেন। তিনি যে চেয়ার টেবিলে বসে হিসাব লিখতেন, সেটা এখনও আমাদের বাড়িতে রাখা আছে। দু’একদিন অন্তরই কেউ না কেউ আমাদের দোকানে নজরুল ইসলামের খোঁজে আসেন। কেউ বাংলাদেশ থেকে, কেউ কলকাতা থেকে আসেন এম. এ. বক্সের দোকানে। আমাদের গর্ব এটাই যে আমাদের এই দোকানের সঙ্গে নজরুল ইসলামের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে,” বলছিলেন মি. ওসমান।

কাজ ছেড়ে দিয়ে আবারও পড়াশোনা রাণীগঞ্জ শহরের স্কুলে।

পড়াশোনার শেষে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। নজরুল ইসলাম পরিবারের গৃহবধূ রোকেয়া করিম জানান তারপরে আর খুব একটা গ্রামে আসেন নি কবি।

নজরুল মেলার জন্য চুরুলিয়ার দেওয়ালে চলছে ছবি আঁকা।
কলকাতায় তাঁর সাহিত্যচর্চা থেকে শুরু করে বিবাহ এবং অবশেষে অসুস্থ হয়ে পড়ার যে জীবন, তা হয়তো চুরুলিয়া থেকে অনেকটা দূরে, তবে চুরুলিয়ার মানুষের মনের খুব কাছের।

কবির সেই জীবনের নানা দিক নিজেদের মতো করে সাজিয়ে রেখেছে নজরুল একাডেমী।

যেমন আছে নজরুল ইসলামের পরিচিত-অপরিচিত অনেক ছবি, পদক, তেমনই আছে ধুতি পাঞ্জাবী, পাণ্ডুলিপি, গ্রামোফোন।

“আমরা এগুলো সব কলকাতা থেকে নিয়ে এসে সাজিয়ে রেখেছি ঠিকই। কিন্তু কতদিন রাখা যাবে, সেটাই বড় চিন্তা। যেমন এই পাণ্ডুলিপিগুলো। কাগজগুলো সব নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা চেয়েছিলাম সরকার এই সংগ্রহশালা অধিগ্রহণ করুক। আশ্বাস পেয়েছি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে যে তারা এই সংগ্রহশালা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে,” জানালেন রেজাউল করিম।

তবে নিজেদের গ্রামের কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে গর্ব চুরুলিয়ার মানুষেরও কোনও অংশে কম না। বছরভর নজরুল একাডেমীর কোনও না কোনও অনুষ্ঠানে যেমন গ্রামের মানুষই এগিয়ে আসেন, তেমনই মূল অনুষ্ঠান – ১১ই জ্যৈষ্ঠ থেকে প্রতিবছর যে নজরুল মেলা হয়, তাতেও মেতে ওঠে গোটা চুরুলিয়া গ্রাম।

আসানসোলের এই পাউরুটির দোকানেই নজরুল কাজ করতেন।
একাডেমীর পরিচালক রেজাউল করিমের কথায়, “গ্রামের যে শিক্ষিত অংশ, তাদের বেশীরভাগই এখন শহরে চলে গেছেন। চুরুলিয়া অঞ্চলের বেশ কয়েকজন গবেষণাও করেছেন নজরুলকে নিয়ে। তারা নিজেদের মতো করে নজরুল চর্চা করেন। আর রইল গ্রামের মানুষ। তাদের না আছে অর্থবল, না আছে বিশেষ লেখাপড়া। তারা অবশ্য নজরুল মেলা বা একাডেমীর সব কাজে কর্মে এগিয়ে আসে – পরিশ্রম করে। এভাবেই নিজেদের গ্রামের কবির প্রতি সম্মান জানায় তারা।”

কীভাবে চুরুলিয়া গ্রামের মানুষ নজরুলের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, সেটা জানতে চেয়েছিলাম একাডেমীর সামনেই বিকেলের আড্ডা দিতে জড়ো হওয়া কয়েকজনের কাছে।

তাঁদেরই একজন, বাগবুল ইসলাম বলছিলেন, “আমাদের গ্রামের কবি নজরুলের প্রতিভার কথা তো আর নতুন করে প্রচার করার কিছু নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে যাতে তাঁর আদর্শের কথা আরও বেশী করে তুলে ধরা যায়, সেই চেষ্টাই করি। আমাদের যতটুকু জ্ঞানগম্যি, তার মধ্যেই সাধ্যমতো চেষ্টা করি আর কি।”

“এখন চারদিকে যা পরিস্থিতি, তার মধ্যে নজরুলের বাণীই আরও বেশী করে প্রচার করা উচিত – বিশেষ করে আমরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান – এধরণের লেখা বা কবিতাগুলো,” বলছিলেন গ্রামেরই মধ্যবয়সী রাজিবুল হক।

লটারির টিকিট বিক্রি করতে নানা জায়গায় ঘোরেন মজনু মোল্লা। তিনি বলছিলেন, “লটারির টিকিট বিক্রি করতে বহু জায়গায় ঘুরতে হয়। কেউ কেউ জানতে চায় আমার বাড়ি কোন গ্রামে। যখন বলি যে চুরুলিয়া, তখনই লোকে বলে বাবা! সে তো নজরুলের গ্রাম! গর্ব হয় তখন।”

চুরুলিয়ার ক’জন বাসিন্দা।
চুরুলিয়ার সাধারণ মানুষ যেমন স্বাভাবিক ভাবেই গর্বিত নিজেদের নজরুল ইসলামের গ্রামের মানুষ বলে পরিচয় দিতে, তেমনই গর্ব অনুভব করেন নজরুল ইসলাম পরিবারে বিবাহসূত্রে আসা একেবারে নবীন প্রজন্মের সদস্যরাও। সম্পর্কে নজরুল ইসলামের প্রপৌত্র-বধূ শাহনাজ পারভিন।

“কখনও তো ভাবি নি যে স্কুলে ছোটবেলা থেকে যার কবিতা পড়ে, গান গেয়ে বড় হয়েছি, সেই পরিবারেই বিয়ে হবে। যখন ঠিক হল বিয়েটা, তখন একটা অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল যেটা বলে বোঝানো যাবে না,” বলছিলেন মিসেস পারভিন।

গর্ব যেমন আছে, তেমনই রয়েছে অনুযোগও – অথবা বলা যায় নজরুল ইসলাম পরিবার বা তাঁর গ্রামের মানুষের দাবী। তাঁরা চান চুরুলিয়াতে তৈরি হোক নিয়মিত সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র। তা হতে পারে কাছের আসানসোলে সদ্য গড়ে ওঠা কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও বিভাগকে এই গ্রামের স্থানান্তরিত করা বা অন্য কোনও ভাবে। আর প্রয়োজন নজরুল সংগ্রহশালাটি অধিগ্রহণ করে কবির স্মৃতিগুলি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা।

একই সঙ্গে কাছের অজয় নদের ওপরে যদি একটি সেতু গড়া যায়, তাহলে শান্তিনিকেতনে যাতায়াতের পথ অতি সুগম হয়ে যাবে – পর্যটকরাও একই সঙ্গে ঘুরে যেতে পারবেন বাংলাভাষার দুই মহান স্রষ্টার কর্মকেন্দ্র আর জন্মভিটায়।বিবিসি


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1273 বার