fbpx
 

খুলনা থেকে শান্তিনিকেতন ( তৃতীয় পর্ব )

Pub: শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০১৯ ৬:৪৭ অপরাহ্ণ   |   Upd: শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০১৯ ৬:৪৭ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পূর্ব প্রকাশের পর ..শেখ মহিতুর রহমান বাবলু : জমিদার বাড়ি মানেই অপূর্ব কারুকাজ করা বিশাল ভবন। দেয়ালের প্রতিটি পরতে পরতে সৌন্দর্যের ছোঁয়া, ইতিহাস ও ঐতিহ্যর সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা।

অন্যান্য জমিদার বাড়ির চেয়ে একটু হলেও বাড়তি সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায় শান্তিনিকেতনে । এখানে পাশাপাশি কয়েকটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনই চমৎকার কারুকার্যমণ্ডিত।

বন্দনা মামী এখানে আগেই এসেছেন।কিন্তু ভাব সাব দেখে মনে হচ্ছে গাইড হিসাবে তিনি অচল । সুতরাং আমরা ড্রাইভারের সহযোগিতা চাইলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই শান্তিনিকেতনের একটা গেটের সামনে আমাদেরকে নামিয়ে দিলো ড্রাইভার। বললো এমন অনেক গেট বা প্রবেশদ্বার আছে এখানে। প্রথমে আপনারা রবীন্দ্র ভবন দেখে নিন। ওটা বন্ধ হয়ে যাবে।

ভিতরে ঢুকে বাম দিকে একটা দোতলা বাড়ি চোখে পড়লো। বাড়িটির নাম “বিচিত্রা”।এই ভবনের নকশা করেছিলেন কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।এই জায়গাটা অনেকটা মিউজিয়ামের মতো। বিচিত্রাতে রয়েছে রবীন্দ্র সংগ্রহশালা ‘রবীন্দ্র ভবন’। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষে এই বাড়িটি তৈরী করা হয়। অবশ্য ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে রবীন্দ্রনাথ নিজেই এখানে রবীন্দ্র ভবন স্থাপনের উদ্যোগ নেন। তখন ‘উদয়ন’নামের বাড়ির একটি অংশে রবীন্দ্র সংগ্রহশালার কাজ শুরু হয়। পরে জায়গার অভাব দেখা দিলে “বিচিত্রা” নামের বাড়িটি করার পরিকল্পনা করা হয়।

রবীন্দ্র ভবনে আছে-সংগ্রহশালা, অভিলেখাগার, রবীন্দ্র-চর্চ্চা প্রকল্প, গ্রন্থাগার, দৃশ্য-শ্রাব্য বিভাগ, সংরক্ষণ বিভাগ ও দপ্তর। বিচিত্রা উদ্বোধন করেন পন্ডিত জওহরলাল নেহরু। তিনি তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং পদাধিকার বলে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের দায়িত্বও ছিল তাঁর উপর।

রবীন্দ্রনাথের রচনাসমূহের মূল পান্ডুলিপি,মেডেল, নোবেল প্রাইজের পদক (অবশ্য তা চুরি যাওয়াতে বর্তমানে রেপ্লিকা), দলিলপত্র, চিঠিপত্র, নিদর্শনপত্র, উপহার সামগ্রী, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য শিল্পীদের আঁকা ছবি, রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত পোষাক ও তাঁর নিত্য ব্যবহার্য কিছু সামগ্রী এবং পারিবারিক ও দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে কবির দুর্লভ কিছু ছবি রবীন্দ্র ভবন সংগ্রহশালায় রয়েছে।

রবীন্দ্র ভবন গ্রন্থাগারে আছে রবীন্দ্রনাথের লেখা বই, রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত বই এবং রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন লেখকের বই। এছাড়া আছে সাময়িক পত্রাদি, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের ক্লিপিংস, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় রবীন্দ্র-সাহিত্যের অনুবাদ।

দৃশ্য-শ্রাব্য বিভাগে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অন্যান্য শিল্পীদের কন্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত এবং রবীন্দ্র-কবিতার ক্যাসেট ও ডিস্ক। এছাড়াও রয়েছে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তথ্যচিত্র এবং তাঁর গল্প ও উপন্যাসের চলচ্চিত্র।

রবীন্দ্র-চর্চ্চা প্রকল্প থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত রবীন্দ্র পান্ডুলিপি নির্ভর ষান্মাসিক পত্রিকা ‘রবীন্দ্রবীক্ষা’। বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনার পাঠ ও পান্ডুলিপি প্রস্তুত করার দায়িত্বও রবীন্দ্র-চর্চ্চা প্রকল্প করে থাকে।

এছাড়াও সেখানে আছে উপাসনা গৃহ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে উপাসনা গৃহ ভবনের প্রতিষ্ঠা করেন ।রঙীন বেলজিয়াম কাঁচ এবং মার্বেল পাথরে চারদিক অলংকৃত এই ভবনটিতে সন্ধ্যার সময় অসংখ্য মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয় বলে জানালেন কতৃপক্ষ ।

রবীন্দ্র ভবনের মিউজিয়াম ও উত্তরায়ণ দেখার সময় শুক্রবার থেকে মঙ্গলবার সকাল ১০টা হতে দুপুর ১টা এবং দুপুর ২টা হতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। প্রবেশ মূল্য ২০ রুপি । ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ১০ রুপি। জুতা রাখার জন্য দিতে হয় বাড়তি কিছু ।

১৯১৯ সালের দিকে উত্তরায়ণ এলাকায় প্রথম একটি পাকা বাড়ি নিমার্ণের কাজে হাত দেয়া হয়। এর নাম রাখা হয় ‘কোনার্ক’। এরপর পর্যায়ক্রমে তৈরী করা হয় ‘উদয়ন’,’দেহলী’ ‘শ্যামলী’,’পুনশ্চ’ ‘ উদীচী’ ও ‘গুহাঘর-চিত্রভানু’ নামে বাড়িগুলো।আমরা এগুলো ঘুরে ঘরে দেখলাম।বাড়ির ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ । সেখানে মূলত কবির ব্যবহারের সামগ্রী, পেইন্টিং আসবাবপত্র ইত্যাদি সংরক্ষণ করা আছে।প্রতিটি বাড়ি-ঘরের নির্মাণ শৈলীতে দৃষ্টি নন্দন অপরুপ শিল্পের ছোঁয়া স্পষ্ট।

বন্দনা মামীকে নিয়ে যত ঝামেলা ।সুযোগ পেলেই তিনি ধপাস করে বসে পড়েন। কিছুক্ষন পর পর আবার কোথায় যেন হারিয়ে যান। চারিদিকে তাকালে দেখা যায় তিনি বসে আছেন নির্জন গাছের নিচে। না হয় কোন বাড়ির সিড়ির উপরে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়। খাবার জন্য কোন ভাল হোটেলে নিয়ে যেতে বললাম ড্রাইভারকে।গ্রামের অলিগলি পেরিয়ে সে আমাদেরকে নিয়ে গেল একটা গেস্টহাউস সংলগ্ন রামশ্যাম ভিলেজ রেস্টুরেন্ট । যাবার পথে আদি বাসি পল্লী ঘুরে দেখালো ড্রাইভার। তাদের জীবন যাপনের মান বেশ চমৎকার ।

রেস্টহাউসটির কিছু কিছু রুম গোলাকৃতি খড়ের চালের পাকা ঘর । বাবুই পাখির বাসা ,হারিকেন ও ঘন্টা ঝুলছে এখানে সেখানে। চারিপাশে মনকাড়া প্রাকৃতিক শোভা । বাতাসে উড়ছে লাল ধুলো । জীর্ণ পাতা ঝরে পড়ে পায়ের কাছে। এখানে চোখ বন্ধ করলেই রবীন্দ্রসংগীত শুনতে পাওয়া যায়।চারিপাশে পাখির কিচির মিচির। কানে বাজে পাতা ঝরার আওয়াজ। চোখে পড়ে ছুটে চলা কাঠবিড়ালি।গাছের কোটরে পাখির বাচ্চা। ছ্যাদলা পড়া সান বাধানো পুকুরের শান্ত জল, শালবীথির শান্ত নির্জন পথ—সব মিলে এক স্বপ্নীল পরিবেশ , যা না দেখলে ভাষায় প্রকাশ করারনা।
ভারত তার স্ট্রিট ফুডের জন্য বিখ্যাত৷ এই বৈশিষ্ট্যই ভারতকে অনেক দেশ থেকে স্বতন্ত্র করে৷ এটা ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য৷ যার টান অনুভব করে পর্যটকরাও৷

বাঙালি মঙ্গলগ্রহে গিয়েও ভাত খোঁজে। সৌর জগতের যে প্রান্তেই যাক ভাতের হোটেল কোথায় আছে সে খোঁজ ন্যায় সবার আগে। আমি যে এর ব্যতিক্রম ছিলাম তা না। ১৯৮৭ সালে রাশিয়াতে গিয়ে ১০ দিন থাকতে হয়েছিলো । এক দিন, দুই দিন, তিন দিন যায় ভাতের দেখা মেলে না।মনের ক্ষুধায় দিশেহারা হয়ে গেলাম। যে হোটেলে থাকি ওটা পর্যটকদের জন্য একটা আন্তর্জাতিক মানের হোটেল। কিন্তু কেউ ইংরেজি জানে না। রাস্তাঘাটেও ইংরেজি জানা মানুষ মেলা ভার ।তিনদিন পর অনেক কষ্ঠে ভাতের কথা হোটেল ম্যানেজার কে বুঝলাম। তিনি আসস্থ করলেন ডিনারে ভাত পরিবেশন করবে বলে। মনটা খুশিতে নেচে উঠলো।রাতে মহা আনন্দে ডিনার টেলিবে গিয়ে বসেছি। থালা ভর্তি না না ধরণের খাবার এলো। সেখানে ভাতও ছিল। কিন্তু ওই ভাতে বাঙালি পেট ভরা তো দূরে থাক ২ টার বেশি চড়ুই পাখির পেটও ভরবে কিনা সন্দেহ।

ভেতো বাঙালির সংকৃতির থেকে আমি বেরিয়ে এসেছি অনেক দিন হল । এখন পৃথিবীর যে দেশেই যাই ওই দেশের ওই অঞ্চলের লোকাল খাবার টেস্ট করা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ।রামশ্যাম ভিলেজ রেস্টুরেন্টে ভেজ ননভেজ দুই ধরণের খাবারই পাওয়া যায়।আমি ভেজ অর্ডার করলাম। কাঁসার থালে চারিপাশে সবজি মাজখানে ভাত দিয়ে খাবার পশিবেশন করলো । একটা অল্প বয়সী মেয়ে পাশে এসে ঘি লাগবে কিনা জানতে চাইল।আমি ইয়েস প্লিজ বলতেই ভাতের উপর ঢেলে দিল ঘি। তৃপ্তি সহকারে খেয়ে উঠলাম ।

ভারত বড় দেশ। ভাষার ও সংকৃতির অভাব নেই সেখানে।ফুড স্টাইলেও রয়েছে ভিন্নতা। তবে আমি যতটুকু দেখেছি ওরা বাংলাদেশিদের চাইতে স্বাস্থ্য সচেতন ।গোটা ভারত জুড়ে লক্ষ কোটি পিওর ভেজ রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। অনেকে সারাজীবনে কোনদিনও আমিষ চেখে দেখেনি। নিরামিষ মানে পিয়াজ, রসুন, মুসুরির ডাল, মাছ মাংস ডিম কিছুই থাকবে না।
ধার্মিক হিন্দুরা মাসে ২ দিন উপবাস থাকেন। তাদের উপবাস আর আমাদের রোজা এক নয়। উপবাস ভঙ্গের পরেও অনেকক্ষন তারা পঞ্চ শস্য খাওয়া থেকে বিরত থাকেন ।ফলমূল খেয়ে কাটিয়ে দেন একটা লম্বা সময় । সপ্তাহে তারা এক থেকে পাচ দিন নিরামিষ খান । বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ অভ্যাস সুস্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ উপকারী।

বাংলাদেশিদের মধ্যে একটা কথা ভীষণ প্রচলিত। কলকাতায় কোন বাড়িতে বেড়াতে গেলে হোস্ট জিজ্ঞাসা করেন ” দাদা খেয়ে এসেছেন না যেয়ে খাবেন”। এ কথার সত্যতা কতটুকু প্রমান করার সুযোগ হয়নি আমার। তবে তারা যে বাংলাদেশী হিন্দু বা মুসলমানদের মতো অতিথি পরায়ণ না ,ভোজন রসিকও না এটা দিব্বি করে বলা যায়।কলকাতার অধিবাসীরা বাসায় যে কয় জন মানুষ ঠিক ওই কয় পিস্ মাছ ,মাংসের টুকরা বা ডিম্ কিনবে।মাছ থাকলে মেনুতে মাংস থাকবে না। যত টুকু প্রয়জন তার বেশি বাজার করে না তারা। একটা সিগারেট আজও তারা ভাগাভাগি করে খায়। এক কাপ চা কয়েকজন মিলে খাবার দৃশ্যও বিরল নয়। এটাকে তাদের ভাষায় বলা হয় মিতব্যয়ী।বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আতিথিয়তা। এর জুড়ি সত্যিই মেলা ভার।আমার মনে হয় বাংলাদেশিদের কিছু থাক আর না থাক হ্যাডাম আছে।খেতে খেতেই শহীদ হয়ে যাবে তারা ।

দুটি পাশাপাশি দেশ। একই ভাষা ।অনেকের ধর্ম ও বর্ণ অভিন্ন। একসময় এদুটি একই দেশ ছিল। অথচ দেশ দুটির মধ্যে কিছু কিছু অমিলের ব্যাবধান এতো বেশি যা না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব।

দুপুরের আহার শেষে শান্তিনিকেতনে ফেরার পথে ড্রাইভার আমাদেরকে নিয়ে গেল কঙ্কালীতলা। বোলপুর থেকে ৯ কিমি দূরে লাভপুরের রাস্তায় সতীপীঠ কঙ্কালীতলা।কথিত আছে যে এখানে সতীর কাঁখ বা কোমর পাওয়া গিয়েছিল । কোপাই নদীর ধারে অতি শান্ত পরিবেশে ছোট মন্দিরটি – নেই কোনও দর্শনার্থীদের ভীড়। রিপা বৌদি ভীষণ ধর্ম ভীরু। তিনি ঘোমটা মুড়ি দিয়ে একেবারে নতুন বউ সেজে পূজা দিতে গেলেন তার দুই মেয়ে ও মাকে নিয়ে। পুরোহিত সাগ্রহে মন্ত্র পড়ে ঢোল পিটিয়ে করলেন পূজা নিবেদন ।

আমি শসানে গেলাম। সেখানে মুসলমানদের কবরের মতো স্থাপত্তের উপর কি যেন লেখা। সেটা পড়ার জন্য এগিয়ে চলেছি । মন্দিরের ভিতর থেকে বৌদি শসানের কাছে যেতে বারণ করলেন আমাকে।এদিকে আমার বন্দনা মামী যথারীতি মন্দিরের সিঁড়িতে বসে আছে।

মন্দিরের পশে সাধু সন্ন্যাসীর অভাব নেই ।এক এক জনের বেশভূষা একেক রকম।তারপাশে সান বাঁধানো নিচু একটা চৌবাচ্চা । পূজা শেষে বৌদি তার মা ও মেয়েরা ঐ চৌবাচ্চা প্রদক্ষিণ করে মাটিতে মাথা নুয়ে প্রণাম করলেন। চৌবাচ্চার পানি হাতে মুখে লাগলেন।সাধুদের সাথে কথা বলে জানা গেল সতীর কাঁখ বা কোমর এখানে পাওয়া গিয়েছিল। গ্রীষ্মে চৌবাচ্চার পানি শুকিয়ে গেলে যা আজো দেখা যায়।

আমাদের মাইক্রোবাস ছুতে চলেছে আবারো শান্তিনিকেতনের উদ্যেশে। সেখানে গিয়ে এবার আমরা একজন গাইড সাথে নিলাম।গাইড আমাদেরকে প্রথমে সেই বিখ্যাত ছাতিম তলা নিয়ে গেল। পাশে বিশাল বটবৃক্ষ।একটি ফলকে নজর কাড়া মহর্ষির রচিত একটি কবিতা। ( চলবে )


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ