fbpx
 

জানি ফিরবেনা তারপরও মাঝে মাঝে প্রচন্ড ইচ্ছে করে ফিরে যেতে শৈশবে

Pub: রবিবার, জানুয়ারি ১২, ২০২০ ৮:৪১ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তাজুল ইসলাম, যুক্তরাজ্য থেকে: ছোটবেলার খন্ড খন্ড অনেক ঘটনাই আমাদের কাছে স্বর্ণালী স্মৃতি হয়ে আছে এবং থাকবে চিরকাল যতক্ষন এই জগতে শ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার শক্তি থাকবে। হারানো দিনের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়লে নিজের কাছে হাসি পায় আবার কখনও চোখের জল এমনিতেই গরিয়ে পরতে থাকে, তবে সেটি কি আনন্দ অশ্রু না বেদনার, তা আমার নিজের কাছেই রহস্যময়!

ছোটবেলায় সবচেয়ে আনন্দ বোধ হতো ঝড়ের সময় সেই বৃষ্টিতে ভেজা, কাঁচা আম কুড়িয়ে খাওয়া! চৈত্র মাসের কোন এক দুপুরে সবাই গরমে অস্থির এর মধ্যে দেখা গেলো চারদিক আঁধার হয়ে আসছে। হু হু করে বাতাস বইছে গাছের পাতাগুলোকে অবলীলায় উড়িয়ে দিতে দিতে। তখন চারদিকে গাছ-গাছালিতে ঘেরা বাড়ীর উঠোনে দাঁড়িয়ে বাড়ির সব ভাই বোন অবাক হয়ে দেখতাম চারদিক কেমন অন্ধকার আর কালো হয়ে মেঘ আসছে! বুঝতাম এখুনি ঝড় আসবে! প্রচন্ড আনন্দে শুরু হতো আমাদের প্রস্তুতি। পরমুহুর্তে দেখতাম গাছগুলো সব দুলতে শুরু করেছে এবং প্রচন্ড বাতাসে ঠুস ঠাস শব্দে শুরু হতো গাছের আম পড়া! যে যেদিকে পারি ছুটতাম আর আম কুড়িয়ে বালতি ভরতাম। একসময় বাতাস কমে এলে আম কুড়ানো থেমে যেতো। শুরু হতো অঝর ধারায় ঝুম বৃষ্টি দৌড়ে ছুটতে থাকতাম উঠোনে, যদিও ঘর থেকে ডাকাডাকি করা হতো, মার-এর ভয় দেখানো হতো, তবুও ঘরে যেতাম না। অপেক্ষা করতাম শিল পড়ার! টি-ন শেইড এর নীচ থেকে কাঁত হয়ে হয়ে শিল কুড়িয়ে সেগুলো হাতে নিয়ে খেলতাম।

দুরন্ত উচ্ছলতায় যেমন কেটেছে শৈশব, তেমনি একাকী ছোট্ট কিছু গম্ভীর সময়ও ছিলো। কখনও বা আনমনে লোহার গেইট ধরে ঝুলতাম আর ভাবতাম, এই যে পৃথিবীটা ঘুরছে, গ্রহ, নক্ষত্র সবই ঘুরছে এটার শুরুটা কী করে আর শেষটাই বা কোথায়? আচ্ছা, মহাকাশ জিনিশটার নাকি শেষ নেই, এটা কি করে সম্ভব! ভাবতে ভাবতে কখনও হয়তো আকাশের দিকে তাকালে দেখতে পেতাম দূরে গ্যাস বেলুন উড়ে যাচ্ছে! বিজ্ঞান থেকে আমার ভাবনা তখন চলে যেতো দার্শনিকতার ভীড়ে। তাকিয়ে থাকতাম যতোক্ষণ দেখা যায় বিন্দু হয়ে যেতো একসময়, ভাবতাম কোথায় যেয়ে থামবে ওটা? আর নেমে কোথায়ই বা পরবে? আবার কখনও দৃষ্টি কেড়ে নিতো উড়ন্ত রঙ্গিন ঘুরি আর তার সাথে উড়তো নিজের মন, দুলতো নামতো আবার উঠতো, স্বপ্ন বিচরণ করতো সীমাহীন আকাশ জুড়ে। আর করবেই বা না কেনো? বড়দের মতো তখন তো আর বাইরে ঘুরা ফেরার অবাদ সীমাটি এঁকে দেয়া হয়নি!

অন্যদের মতো শহরের প্রাইভেট কিন্ডার গার্ডেন স্কুল কিংবা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যেতে না পারলেও যেতে পেরেছিলাম বাড়ির পাশের পাঠশালায়। খেলাধুলার পাশাপাশি আইসক্রিম কামড় দিয়ে ভাগ করে খাবার আনন্দ নিতে পেরেছিলাম। তারপর কেমন করে আনন্দগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলো পাঠশালা শেষ করে বড়দের স্কুলে (উচ্চ মাধ্যমিক) যাওয়া। দুঃখ একবারের জন্যেও মনে আসেনি, যে বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আমাকে অক্ষর জ্ঞান দিয়ে লিখতে শিখয়েছে আমি সেই স্কুল ছেড়ে চলে যাচ্ছি অচেনা আরেকটা স্কুলে।কাঁধে করে বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুলে যেতাম প্রথমে এতটা খারাপ লাগেনি বড় স্কুলের যাবার ভাবটা আছে তো!! ঘড়ি দেখা টা পড়াশোনা করে শিখলেও সেটা ব্যবহার করতাম ছুটির ঘন্টা কতক্ষণে পড়বে সেটা হিসাব করতে। ক্লাসরুমে কালো বোর্ডে একের পর এক বিষয় নিয়ে টানা চলতো বিকাল চারটা পর্যন্ত। স্কুলের প্রতিটি দিন ক্লাস বন্ধুদের সাথে গল্প, একটুতেই দেন দরবার করে চলতো। উচ্চমাধ্যমিকে কত নতুন বন্ধু পেলাম, স্কুল পালানো থেকে শুরু করে আরোও নতুন কত কিছু শিখলাম , ক্লাস ফাঁকি দেয়া, ব্রেঞ্চে কলম বাজিয়ে বাদ্যযন্ত্রে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

স্কুলের যে ঘরগুলোতে বসে একসময় বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি পলাশীর যুদ্ধ, সিপাহী বিদ্ৰোহ, মোগল সম্রাটের ইতিহাস পড়েছিলাম সেই ঘরগুলোই আজ নিজের কাছেই হয়ে গেছে ইতিহাস। যে বারান্দায় দাড়িয়ে স্কুলের গেটের পাশে আইসক্রিম ভেন আর বাইরের দৃশ্য দেখতাম, সেটা আজো চোখে দৃশ্যমান। মনে আছে, ঐ বারান্দায় দাড়িয়ে কতদিন না পড়া করে আসা বিষয়ের স্যারদের আসতে দেখলেই বলতাম “আজ হয়ে গেল” এবং তখন ভয়ে থাকতাম। ভয় ভিতির মাঝেও ভাবতাম কবে বড় হবো, কবে ঐ ভাইদের মতো যখন খুশি কলেজ যেতে পারবো। কিন্তু কলেজে উঠে বাধা ধরার নিয়ম ভাঙ্গার খেলা বেশিদিন ভালো লাগলো না, কেবলই মনে হতো স্কুল লাইফ টাই বেশী ভালোছিলো। কলেজে মাঠে গাছতলায় বসে বন্ধুদের সাথে কিছু গল্প, না হয় শহরের কোথাও আড্ডা দিতে চলে যাওয়া।এভাবেই কিছুদিন চলতে চলতে জীবন জীবিকার তাগিদে বন্ধুরা একে একে সবাই দেশ ছাড়তে শুরু করলে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম ভিন্ন দেশের ভিন্ন দিকে।একটা ফুলগাথা মালা হঠাৎ ছিড়ে ফেললে যেমন ভাবে ফুলগুলো ছড়িয়ে পড়ে তেমনভাবেই স্মৃতিনিয়ে সবাই ছড়িয়ে গেলাম।

ছোটবেলায় ভাবতাম কবে হবো বাবা মায়ের শাসনমুক্ত, কবে অন্যদের মতো বড় হবো, কবে হবো বাড়ির সীমানা প্রাচীর মুক্ত। সব দিক থেকে মুক্ত কিন্তু এখন বুঝি, এই অসমাপ্ত স্বপ্ন গুলোর চেয়ে, আমার ছোটবেলার ভাঙ্গা খেলনাগুলোই অনেক ভাল ছিলো।ইচ্ছেমতো ঘুরছি আজ দুর প্রবাসে, নেই নির্দিষ্ট কোন সীমানা, নেই বাবা মায়ের চোখ রাঙ্গানো শাসন, অবাদ বিচরনে তবে কেনো সেই তৃপ্তিটা যেন খুঁজে পাচ্ছি না! দুর প্রবাসে থেকে আজও চোখ বন্ধ করলে শুনতে পাই টিনে-র চালে বৃষ্টি পরার শব্দ। শুনতে পাই পাশের বাড়ির খেলার সাথীদের ছোটাছুটি করতে থাকা অর্থহীন হর্ষধনি আইও বা খেলাত যাইতায় নায় নি। আমার শৈশব আমার কাছে যেমন স্মৃতি মধুর তেমনি তা প্রত্যেকটা নর নারীর কাছে। শৈশবের সময়টা মমতা মাখা, সেই সময়টায় বার বার মন ফিরে যায়, মন সিক্ত হয়।প্রচন্ড ইচ্ছে হয় ফিরে যেতে কৈশোরের সেই দিনগুলিতে। জানি যায় দিন আসেনা ফিরে তারপরও প্রচন্ড ভাবে ইচ্ছে করে মাত্র একটিবারের জন্য, অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও ঐ সময়টিতে ফিরে যেতে।

Hits: 30


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ