fbpx
 

১৪০ দেশ ভ্রমণের রেকর্ড নাজমুনের

Pub: রবিবার, মার্চ ৮, ২০২০ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মানুষের ইচ্ছার বাইরে কিছুই অদম্য নেই। যা চায় তাই করতে পারে। তার ভেতরের তাড়না তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দেবেই। তা যতই বিপদসংকুল হোক। বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাবেই। বাংলাদেশের এক নারী সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীর পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন দুর্বার গতিতে। তিনি একের পর এক দেশে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়েছেন। বিজয় নিশান উড়ার তালিকায় ইতিমধ্যেই ১৪০ দেশের নাম লিখিয়েছেন।

তিনি আর কেউ নন। একজন নাজমুন নাহার। সর্বাধিক রাষ্ট্র ভ্রমণকারী প্রথম বাংলাদেশি। নিজ দেশের পতাকা হাতে বিশ্বের এই প্রথম কোনো নারী অভিযাত্রা করেছেন ১৪০ দেশ।

মুসলিম বিশ্বের এক সাহসী নারী নাজমুন নাহার। দীর্ঘ পথচলায় নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলেও থেমে যায়নি তার যাত্রাপথ। সেই আদি লগ্ন থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে যে সকল নারী বাধা ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাতে এশিয়া মহাদেশের সর্বাধিক রাষ্ট্র ভ্রমণকারী প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নাজমুন নাহারের নাম অঙ্কিত হয়ে গেছে।
শুরু হয়েছিল ভারতের গুজরাট দিয়ে। পরিভ্রমণের তালিকায় সবশেষ ১৪০তম দেশের তালিকায় রয়েছে ব্রুনাই। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতেও পা রাখা। আর এই চলার পথে তিনি মনে রেখেছেন কেবল কবিগুরুর সেই কথা, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলোরে।’ সত্যিকার অর্থেই, নাজমুন নাহার একাই পথ চলেছেন। প্রতিটি ভ্রমণ একাই সম্পন্ন করেছেন। আর তার বেশির ভাগই তিনি তা করেছেন সড়কপথে।

নাজমুন নাহার গত দু’দশকে ১৪০টি দেশ ভ্রমণ করার রেকর্ড অর্জন করেছেন। তার এই অভিযাত্রা যাত্রা অব্যাহত থাকবে ২০০টি দেশে বাংলাদেশের পতাকাকে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত। ইতিমধ্যেই তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভ্রমণ করেছেন এশিয়ার পাঁচটি দেশ। ২৯শে জানুয়ারি নাজমুন নাহার পৌঁছান ব্রুনাইয়ের রাজধানী সেরি বেগাওয়ান। এর মধ্যদিয়ে নাজমুন নিজেই নিজের রেকর্ড ভাঙেন। চলতি বছরই তিনি এশিয়ার মিয়ানমার, জাপান, তাইওয়ান, ফিলিপাইন হয়ে ব্রুনাই পর্যন্ত ভ্রমণ করেছেন। নাজমুন মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন, জাপানের হিরোশিমা, ওতাকে, ইয়ামাগুচি, হফু, শিমনোসেকি, কোগা হয়ে ফুকুওকা পর্যন্ত ভ্রমণ করেছেন। শিগগিরই তিনি পরবর্তী অভিযাত্রা শুরু করবেন। এবার তিনি যাবেন আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান এবং কিরগিজস্তান পর্যন্ত। খুব দ্রুতই তিনি ১৫০তম দেশে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে চান।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা: প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন দেশ-দেশান্তরে। ভ্রমণ তালিকায় রয়েছে- পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিটি দেশ। তিনি সড়কপথে ভ্রমণ করেছেন ইউরোপ ও এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ৩৫, ২০১৮ সালে ৩২, ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকার ১৫ এবং ২০১৯-এর এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘুরেছেন ১৫টি দেশ।

এই যাত্রাপথে অনেকবারই জীবনঝুঁকিতেও পড়েছিলেন। অন্তত পাঁচবার তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। ১৪ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় পেরুর রেইনবো মাউন্টেন অভিযাত্রায় আল্টিটিউড সমস্যায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে কোনো রকমে বেঁচে যান। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের সমুদ্রে স্লোর্কেলিংয়ের সময় মুখ থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল পাইপ। অনেক সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি মুখে ঢুকে পড়েছে। কিউবায় আখের রস খেয়েই কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। আমেরিকায় জঙ্গলে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে তাঁবুতে ঘুমানো, আইসল্যান্ডের ল্যান্ড মান্নালুগারের উঁচু পাথরের উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া, বলিভিয়ার দ্বীপে পথ হারানো কিংবা ইন্দোনেশিয়ার ইজেন কার্টারে ভয়ঙ্কর ভলকানিক অভিযানে যাওয়ার মতো দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে নাজমুনের।

লক্ষ্মীপুরের সেই মেয়েটি: নাজমুন নাহারের জন্ম লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন এরপর ২০০৬ সালে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য পাড়ি জমান সুইডেনে। সেখানকার লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোট থেকেই নাজমুনের বই পড়ার নেশা ছিল। আর বই পড়ার মাধ্যমেই দেশ-বিদেশ ভ্রমণের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। অনুপ্রেরণা পেয়েছেন পরিবার থেকেও। বাবা মোহাম্মদ আমিন সবসময় আমার পাশে থাকতেন। কোনো বিষয়ে আমি যদি এক পা এগোতাম বাবা এগিয়ে দিতেন আরো পাঁচ পা। স্কুল জীবনে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হয়ে কাজ করেছেন। বাবার প্রেরণা আর সাহসে কৈশোরেই ঘুরে বেড়িয়েছি দেশের বিভিন্ন জায়গা। সুইডেনে থাকা অবস্থাতেই পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করতেন। কষ্টার্জিত সেই অর্থের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেন দেশ ভ্রমণের জন্য।

সম্মাননা আর অর্জন: পৃথিবীর যেখানেই যান নাজমুন নাহার, সঙ্গে থাকে বাংলাদেশের পতাকা। লাল সবুজের পতাকা বহনের জন্য জাম্বিয়া সরকারের একজন গভর্নর নাজমুন নাহারকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ খেতাবে ভূষিত করেন। এ ছাড়াও তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পেয়েছেন সম্মাননা। ২০১৯ যুক্তরাষ্ট্রে তিনি পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পিস টর্চ বিয়ারার আওয়ার্ড। নাসাউ কলোসিয়ামের ফোবানা সম্মেলনে নাজমুনকে সম্মানিত করা হয়েছিল ‘মিস আর্থ কুইন অ্যাওয়ার্ড’ ও ইয়্যুথ কনফারেন্সে ‘গ্লোব অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে। এ ছাড়া ২০১৯-এ পেয়েছেন অনন্যা শীর্ষ দশ অ্যাওয়ার্ড, অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড, জন্টা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, রেড ক্রিসেন্ট মোটিভেশনাল অ্যাওয়ার্ড, উইমেন এম্পাওয়ার্মেন্ট সফল নারী সম্মাননা।

সাহস আর আত্মবিশ্বাসের কারণে কোনো অসুবিধা হয়নি, আটকে যাননি নাজমুন নাহার। অভিযাত্রায় নানা প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন; কিন্তু তা একজন নারী হিসেবে নয়; এক বিশ্ব অভিযাত্রী হিসেবে।

Hits: 49


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ