ফুটবল বিশ্বকাপে যুক্তরাজ্যে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা সাফার করছে

Pub: শুক্রবার, জুন ২৯, ২০১৮ ৪:০৫ অপরাহ্ণ   |   Upd: শুক্রবার, জুন ২৯, ২০১৮ ৪:০৫ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

যুক্তরাজ্যের কারি শিল্পের বিভিন্ন সমস্য তুলে ধরেছেন তার সাক্ষাতকারে

 

লন্ডন থেকে বিশেষ প্রতিনিধি: ঝালফ্রেজি— যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কারি রেস্টুরেন্ট। প্রতি বছর এক কোটির বেশি মানুষ বহুবার এই রেস্টুরেন্টের স্বাদ নিয়ে থাকেন। দেশটিতে প্রবাসী বাংলাদেশী পরিচালিত এমন প্রায় ১২ হাজার রেস্টুরেন্ট আছে। কারি শিল্প দেশটির অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অবদান রাখলেও এখন মারাত্মক কর্মী সংকট চলছে খাতটিতে। সরকারের বিভিন্ন আইনকানুনের গ্যারাকলে বর্তমানে প্রতিটি রেস্টুরেন্টেই রয়েছে শেফ, কুক, ওয়েটারসহ নানা ধরনের কর্মীর ঘাটতি। রয়েছে আরো সমস্যা। রেস্টুরেন্ট মালিকরা একে মহাসংকট বললেও সরকারি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে না।
নর্থ লন্ডনের ফিন্সলী এলাকায় অবস্থিত বিখ্যাত GURU RESTAURENT ও হার্ডফোর্ডে অবস্থিত CUMIN RESTAURENT এর মালিক লন্ডনের ক্যামডেনের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফুল শিপু। মাত্র ৪২ বছর বয়সী সাইফুল শিপু বিগত ১৯ বছর ধরে সফলভাবে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় আছেন। বাংলাদেশে তার বাড়ী মৌলভীবাজার সদরের কনকপুর ইউনিয়নের ভাদগাঁও এলাকায়।

লন্ডনে আমাদের বিশেষ প্রতিবেদকের সাথে সেখানকার রেস্টুরেন্টের বিভিন্ন সংকট নিয়ে কথা বলেছেন তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল শিপু

প্রশ্ন: ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা কেমন চলছে?
সাইফুল শিপু: এবারের ফুটবল বিশ্বকাপের সময় যুক্তরাজ্যে আমাদের ঝালফ্রেজি রেস্টুরেন্ট ফুডের ব্যবসা অনেক ডাউন হয়েছে। বলা যায় ব্যবসা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ কারনে এবার ব্যবসায়ীরা তাদের রেস্টুরেন্ট ভাড়া ও কর্মচারিদের বেতন নিজ পকেট থেকে দিতে হবে।

প্রশ্ন: ফুটবল বিশ্বকাপে ব্যবসা ডাউনের কারণ কি?

সাইফুল শিপু:ফুটবল বিশ্বকাপে ব্যবসা ডাউনের কয়েকটি কারণ আছে। রাশিয়ার বিশ্বকাপটি ইউরোপীয়ান সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গ্রুপ পর্বে প্রতিদিন যে তিনটি খেলা অনু্ষ্ঠিত হয় তা লন্ডনের লাঞ্চ ও ডিনারের সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। খেলা দেখতে লোকজন সাধারণত পাব বা বার যেখানে বড় স্ক্রিন থাকে সেখানে চলে যায়। কেননা সে সময় তারা অন্যান্য ফুড খাওয়ার চেয়ে তখন ড্রিক পছন্দ করে। অাবার অনেকে ঘরে বসে খেলা দেখে। তাদের থেকে শুধু একটু টেকওয়ে অর্ডার আসে। যা খুবই সামান্য। আবার রাত ১০.৪৫ থেকে বিশ্বকাপের হাই লাইট দেখায়। এসব কারণে ফুটবল দর্শকরা রেস্টুরেন্ট মুখী খুবই কম হচ্ছে। এজন্য বিশ্বকাপ নিয়ে অনেক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সাফার করছে।

প্রশ্ন: যুক্তরাজ্যে ঝালফ্রেজি রেস্টুরেন্টগুলোর সাফারিং এর কারণ কি কি:
সাইফুল শিপু: যুক্তরাজ্যে আমাদের এই ইন্ড্রাসটি সাফারিং করছে। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২টা করে রেস্টুরেন্ট বন্ধ হচ্ছে। বিগত ৩/৪ বছর ধরে এই অবস্থা চলছে। বিভিন্ন পত্রিকা খুললেই দেখা যায় ঝালফ্রেজি রেস্টুরেন্ট বিক্রির বিজ্ঞপ্তি। ব্যবসা মন্দার বহুবিধ কারণ আছে।
প্রথমত বলব, যুক্তরাজ্যের রেস্টুরেন্টগুলোতে শেফ ও স্টাফ সংকট চরমভাবে চলছে। বয়স্ক কারি শেফ, তন্দুরি শেফ ও কুকরা চাকরি ছেড়ে অবসরে চলে যাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।গত ৫০ বছর ধরে রেস্টুরেন্টের কর্মীর জোগান আসত বাংলাদেশ থেকে। পাঁচ বছর ধরে কর্মী নিয়োগে সরকারি কড়াকড়ি আরোপ ও ব্যাপক ধরপাকড়ের কারণে কর্মী সংকট তীব্রতর হয়েছে।
এখন বাংলাদেশ থেকে শেফ বা কুক আনার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। অথচ আশ্বাস দেয়া হয়েছিল ওয়ার্কপারমিট দেয়ার। যা এখনো বাস্তবায়নের কোন আলো দেখা যাচ্ছে না। অথচ ইউরোপিয়ানদের আবারো প্রায়েরিটি দেয়া হচ্ছে।
পুরোনো স্টাফ পরিবর্তিত হয়ে নতুন স্টাফ আসবে এটাই ইউরোপীয় কর্ম পরিবেশ। ভালো চাকুরি, ভালো অফার কিংবা অবস্থানগত সুবিধার কারণে কর্মিদের স্থান পরিবর্তনের কারণে আমরা স্টাফ হারাচ্ছি। কিচেনে বাংলাদেশি স্টাফরাই সেরা। ইউরোপীয় কর্মীদের দিয়ে অনেকেই চেষ্টা করেছেন কাজ চালানোর কিন্তু সফলকাম হননি। ইংলিশ, পোলিশ, চায়নিজদের দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তারা কিছুদিন কাজ করে ছেড়ে দেয়। বাংলাদেশ থেকে শেফ এনে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।
এ সমস্যার সমাধানে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির একাধিক এমপি ও লর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সমাধান নেই। সরকার দ্রুত সুবিধার দ্বার উন্মুক্ত না করলে আমরা আরো সমস্যার সন্মূক্ষীণ হবো।

দ্বিতীয়ত: ইয়াংস্টার বা বর্তমান জেনারেশন থেকে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার দিকে আসতে চাচ্ছে না। আমাদের প্রথম জেনারেশন যারা রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেছিলনে তারা রিটায়ার্ডে চলে গেছেন বা যাচ্ছেন। আমরা যারা বর্তমানে রেস্টুরেন্ট চালাচ্ছি তাদেরকে মিডেল জেনারেশন বলতে পারেন। কিন্তু আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের অধিকাংশরাই রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় আসতে চাচ্ছে না।

তৃতীয়ত: বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আর্থিক সহযোগীতামূলক যে সহায়তা ছিল তা এখন আর বর্তমান নেই বললেই চলে। এছাড়া বেসরকারি অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলো এখন আর রেস্টুরেস্ট ব্যাবসার সাথে কাজই করতে চায়না। এইজন্য রেস্টুরেন্টগুলো আর্থিক সমস্যায়ও ভূগছে। এ অবস্থায় অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। তারা রেস্টুরেন্টও বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছেন।
চতুর্থত: যুগের সাথে তাল মিলিয়ে অন্যদেশের খাবারও যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে। বর্তমানে তার্কিশ গ্রিল ফুড শহুরে এলাকায় জায়ড়া করে নিচ্ছে। তাদের সুবিধা হচ্ছে খাবার থাকে গ্রিল ফুড, সালাদ বেশী দেয় এছাড়া শিসা বারসহ নানা উপস্থাপনা আছে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী। তাদের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ তারা খাবারটা খুব দ্রুত সার্ভিস দেয়। আমাদেরকেও ব্যবসায় দ্রুততা নিতে আসতে হবে।

প্রশ্ন: বর্তমান জেনারেশনকে রেস্টুরেন্ট ব্যাবসায় কিভাবে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে?
সাইফুল শিপু: আমাদের পরবর্তী জেনারেশন রেস্টুরেন্ট ব্যাবসাকে মৃত প্রায় ব্যবসা হিসেবে ভাবতে শুরু করছে। আবার তারা না আসলে এই রেস্টুরেন্ট ব্যবসা বাংলাদেশিদের থেকে মৃতপ্রায় হয়ে যাবে। এর ব্যর্থতা আমাদেরও আছে। আধুনিক যুগের স্টাইলে রেস্টুরেন্ট ব্যবসাকে আমরা ঢেলে সাজাতে পারিনি। যদিও আমরা কারি ইন্ড্রাসট্রির আধুনিক ব্যবসায়ী তবুও বলবো আমরা রেস্টুরেন্টকে কিচেন, ওয়েটার প্লেস আর টেকওয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। এর বাহিরের বিষয়গুলোকে আমরা এখনো আরো আধুনিকিকরণ করতে পারিনি। আমাদের প্রতিযোগী কারা তাদের থেকে আমাদের এগিয়ে থেকে ব্যবসা করাটাকেই বলব আধুনিকীকরণ। রেস্টুরেন্ট ব্যবসাকে আধুনিকীকরণ করে আমাদের জেনারেশনকে বেশী করে ইনভলপ করতে হবে। এখানেই যে পরবর্তী সম্ভাবনার বীজ নিহিত তা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে।
আমরা যুক্তরাজ্যে থেকেও শুধু পুরুষরাই এই ব্যবসার আছি। আমাদের নারীরা এখানে পরিচালক হিসেবে কিংবা ভালো পদক্ষেপগুলোতে সম্পৃক্ততা এখনো নেই। আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের নারীদেরকেও এই রেস্টুরেন্ট ব্যাবসায় সম্মানজনকভাবে নিয়ে আসার চিন্তা ভাবনা করতে হবে।

প্রশ্ন: অনেকেই যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের ইতিহাস জানতে চান।
সাইফুল শিপু: যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের ইতিহাসটা অনেকের অজানা আছে। এখন এ নিয়ে গভেষণাও হচ্ছে। ব্রিটেনের প্রথম বাঙালি মলিকানাধীন রেস্টুরেন্টটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার খবর পাওয়া যায় লন্ডনে আজ থেকে প্রায় দুইশত দশ বছর আগে ১৮০৯ সালে। তার নাম ছিল হিন্দুস্তানি কফি হাউজ। প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ বছর পর রেস্টুরেন্টটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন

ব্রিটেনে কোন বাঙালি রেস্টুরেন্টের নাম খাতা কলমে পাওয়া না গেলেও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ১৯৪৬ সাল নাগাদ সেখানে ২০টি বাঙালি রেস্টুরেন্টের অস্তিত্বের কথা শোনা যায়। যুক্তরাজ্যে বাঙালি রেস্টুরেন্টগুলো প্রথমদিকে বিভিন্ন বন্দর কেন্দ্রিক ছিল। বাংলাদেশি নাবিকদের হাত ধরেই একের পর এক সেগুলো গড়ে উঠতে শুরু করে। এখন যুক্তরাজ্যের ছোট বড় সব শহরেই রয়েছে বাঙালি রেস্টুরেন্ট। যার বেশির ভাগই লন্ডন ও এর আশপাশের শহরগুলোতে অবস্থিত।
১৯৬০ সালে বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট এর সংখ্যা বেড়ে ৩০০টি হয়। এর বিশ বছরের মাথায় ১৯৮০সালের দিকে ব্রিটেনে বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার। ১৯৬০ সালের পর ব্রিটেনে উপ-মহাদেশের অভিবাসীদের ঢল নামতে শুরু করলে বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টগুলো ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় ব্রিটেনে এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কমপক্ষে ১৪ হাজার রেস্টুরেন্ট যার ১২ হাজারের মালিক সরাসরি বাংলাদেশিরা। যদিও ওসব বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের নাম এখনও ইন্ডিয়ান কুইজিন লেখা হচ্ছে। যার সমর্থন আমি কোন ভাবেই করি না। আমরা চাই বাংলাদেশি হিসেবে নিজদের সবজায়গায় পরিচিতি পেতে। কেননা আমরা বাংলাদেশিরাই এই ব্যবসা খাতের নিয়ন্ত্রণ করছি।

বিশেষ প্রতিনিধি: সাইফুল শিপু আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
সাইফুল শিপু: আপনাকে ও পাঠকদের সকলের প্রতি ধন্যবাদ রইল।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1172 বার