জনগণ ঐক্যবদ্ধ না হলে স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে

Pub: রবিবার, জুলাই ১, ২০১৮ ১:৪৬ অপরাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, জুলাই ১, ২০১৮ ১:৪৬ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড. কামাল হোসেন। বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচনা কমিটির প্রধান ছিলেন। এখন গণফোরামের সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক।

বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন এই রাজনীতিক ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন। বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি, আইনের শাসন, নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করেছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব আজ—

বাংলাদেশের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে?

বর্তমান শাসনব্যবস্থার মধ্যে আমরা যে ঘাটতি দেখছি, সেটা আইনশৃঙ্খলার অবনতি। এটা নিয়ে অবশ্যই উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পত্রিকাগুলোতে প্রতিদিন কত ধরনের হত্যাকাণ্ড! আমি অবাক হয়ে যাই, এই পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করা যায়? শাসনব্যবস্থার যেসব ঘাটতি আছে, এসব বিষয়ে আমরা আশা করব যে, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হোক, মানুষ সৎ, যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচিত করুক। এজন্য যে সংস্কারের প্রয়োজন আছে, সেটা আমি আশা করি।

বর্তমান সরকার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি?

সংবিধান অনুযায়ী আমাদের যেটা হওয়ার কথা, সেই সংসদীয় গণতন্ত্রই আছে। এই বিধানটায় তো কেউ হাত দেয় নাই। কিন্তু, যে নির্বাচন হয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি, এটা নিয়ে যে ধরনের আলোচনা বিতর্ক হয়ে থাকে, সেগুলো থেকে তো জনগণ একটি বার্তা পাচ্ছে। সর্বোপরি ১৫৩ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সেখানে ঘোষণা করা হয়েছিল। এইটা তো হওয়ার কথা না। গণতান্ত্রিক সংবিধানে ইলেক্টেড মেম্বার নিয়ে পার্লামেন্ট গঠন করার কথা, সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন নির্বাচিত! এটা তো বলাই হয়েছিল যে সাময়িকভাবে এসব করা হচ্ছে। যেমন: ২০১৪ তে যেটা করা হলো। তখনও তারা এটা দাবি করতে পারে নাই যে, এটা সংবিধান অনুযায়ী সংসদীয় গণতন্ত্র। তারা বলেছিলেন, ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য আমরা এটা করছি, এর পরপরই যে নির্বাচনে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে এমন একটা নির্বাচন হবে। এটার পর সাড়ে চার বছর, পাঁচ বছর টেনে নেয়া!

রাজনীতির যে অসুস্থ ধারা ক্রমেই স্থায়ী রূপ লাভ করছে, এই সংস্কৃতি থেকে মুক্তির উপায় কি?

প্রথমে নাগরিকদের তাদের বিষয়ে সচেতন হতে হবে, সংগঠিত হতে হবে। এখন তো আমরা আবেদন রাখছি নাগরিক ঐক্যের। এককভাবে যদি দাবিগুলো করি আমরা অনেক ধরনের হুমকির শিকার হব। কিন্তু, সম্মিলিতভাবে যদি মানুষ করে তখন দেখা গেছে কিছু অর্জন করা সম্ভব। আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকালে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তর, এরপর যেভাবে আমাদের স্বাধীনতা আসলো এসব অর্জনই জনগণের ঐক্যের ফসল। জনগণের ঐক্য হলো সবচেয়ে বড় একটা শক্তির উৎস এবং যখনি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে নীতির ভিত্তিতে একটা ঐক্য হয়েছে, তখনি আমরা সেটার ফসল পেয়েছি। যেমন আমাদের স্বাধীনতা ও সংবিধান দুটোই ঐক্যের ফসল।

আপনি তো দীর্ঘদিন একটা ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন। ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মও দাড় করিয়েছেন। এটার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু বলুন…

এটা আমি একা করি নাই, অনেকে মিলে করেছে। আমি বিশ্বাস করি যে রাজনীতি থেকে ‘আমি’র জায়গায় ‘আমাদের’ চলে আসা উচিত। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ঐক্যমত হলে শক্তি সৃষ্টি হয়। এই যে ভাষা আন্দোলন, কেউ ভাবতে পেরেছিল মি. জিন্নাহর কথা আমরা উড়িয়ে দিতে পারব? সেটা আমাদের সম্ভব হয়েছিল ঐক্যের কারণে। ’৫৪-তে মুসলিম লীগকে যে আমরা নির্বাসিত করলাম, ঐক্যের ভিত্তিতে হলো। ষাটের দশকের কথা, আমরা ঐক্যের মধ্য দিয়েই আইয়ুব মুক্ত হলাম। স্বাধীনতার দিকে আমরা অগ্রসর হতে পারলাম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্য হয়েছিল বলেই। আজকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় লক্ষ্যগুলোকে সামনে রেখে জনগণের ঐক্য। আইনশৃঙ্খলার উন্নতির জন্য, দুর্নীতি বন্ধের জন্য পাগল ছাড়া সবাই বলবে ঐক্য প্রয়োজন।

যে কথাটা বঙ্গবন্ধু বলে গিয়েছিলেন, আমরা যখন প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখি, প্লেনে দেখলাম বঙ্গবন্ধু মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করছেন। আমি বললাম, কি চিন্তা করছেন? বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি এটাই ভাবছি। দেখ, নয় মাসে আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করলাম, স্বাধীন হলাম। কিভাবে হলাম? জনগণের ঐক্যের জন্য। এই ঐক্যটা ধরে রাখতে হবে। না ধরে রাখতে পারলে আমাদের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে যাবে’। আজকে এই কথাটা বলা খুবই প্রয়োজন মনে করছি আমি।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া কতটুকু ফলপ্রসূ মনে করছেন?

২০০৮-এ তো আমি মনে করি খুব বেশি ফলপ্রসূ হয়ে গেছে। এতো ফলপ্রসূ যে বলে শেষ করা যাবে না (হাসি)। তখন আমরা জামায়াত থেকে মুক্ত হলাম। আমরা ঐক্য প্রক্রিয়া ২০০৫ থেকে শুরু করেছি। ৫ দল, ৬ দল, ৭ দল, ৮ দল, ৯ দল আর ২০০৭-এ এসে আমরা ১৩ দল ছিলাম। তখন আমার কাছে প্রস্তাব আসে যে আওয়ামী লীগ আমার সাথে দেখা করবে। জলিল ফোন করল, আমি বললাম মোস্ট ওয়েলকাম। শেখ হাসিনা ছাড়া সব নেতৃবৃন্দ চলে এলেন। এসে তারা বললেন, আপনাদের সাথে আমরা ঐক্য করতে চাই। অবশ্যই এটাকে আমরা স্বাগত জানাই। ১৩ থেকে আপনারা ১৪ দল হলে তো আমরা খুশি হব। তারা বললেন, একসাথে আন্দোলন, একসাথে নির্বাচন, একসাথে সরকার হবে। আমি বললাম, নির্বাচন আর সরকার এগুলো তো পরের কথা, আগে আন্দোলন করেন। জামায়াতমুক্ত হলাম, স্বৈরাচারমুক্ত হলাম সফল একটা আন্দোলন করে।

ভবিষ্যতে কি এমন কিছু হবে বলে আশা করেন?

আমি মনে করি সব সময় এটার প্রয়োজন আছে। পত্রপত্রিকাগুলো দেখলে অবাক হই। এখন এসব দেখে বর্তমান দেশের পরিস্থিতিতে যদি কেউ বেশি উদ্বিগ্ন হন তাহলে এটার থেকে বাঁচার উপায় হলো ঐক্য গড়ে তোলা। ঐক্যবদ্ধভাবে বলা যে, আমরা আইনের সঠিক প্রয়োগ চাই। আমরা আইনশৃঙ্খলার উন্নতির লক্ষে নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী চাই। পুলিশকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা খুব ভয়াবহ একটা কাজ। এটা দেশের জন্য খারাপ, পুলিশের জন্যও খারাপ। তাদের পেশাগত দক্ষতা হলো তাদের মেইন ভিত্তিতে তাদের ভবিষ্যত গড়া, দলীয় সেবক হিসেবে নয়।

নাগরিক ঐক্য প্রক্রিয়ার চাওয়া কী?

আমার সবচেয়ে বড় কাজ সুস্থ রাজনীতি কে জাগানো। এর কোনো বিকল্প নেই। দেশ গড়াই তো আমাদের মূল লক্ষ্য। দেশ গড়া মানে এই না যে বিদেশে টাকা পাঠানো। দেশ গড়া মানে দেশে সব চেয়ে দরিদ্র মানুষের তার ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা হলো কি না? এখনো মানুষ ভিক্ষা করে, ছেচল্লিশ বছর পর এটা হবার কথা না। এদের বাসস্থান কোথায়? বস্তিবাসীদের বাসস্থান কোথায়? নিঃসন্দেহে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত। দেশে অনেক কিছু হচ্ছে, উন্নয়নও হচ্ছে কিন্তু বৈষম্য বাড়ছে। পত্রিকার পাতায় দেখা যায় পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ তো এত পড়েও না বোঝেও না। কেউ যদি বলে এই বৈষম্য নিরসন অর্থের ঘাটতিতে হচ্ছে না, আমি বলব তাহলে এই পাচারটা কেন হচ্ছে!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটুকু অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আপনি মনে করেন?

এটা করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য যা যা প্রয়োজন আমরা যেন করতে পারি। স্বাধীনতার জন্য যে সত্তরের নির্বাচন তা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়। এটাতো অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। সেটাতো আমরা সবসময়ই চাই এবং এটা সম্ভবও। পত্রিকার পাতা খুললে এখন যা দেখা যায়, ধর্ষণের মহামারী। অবাক লাগছে আমার কাছে, কি শুরু হয়েছে এসব! ছাত্রদের মধ্যে এমনকি সরকারি দলের ছাত্রদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারি গোলাগুলি করছে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য। রাজনীতি রুগ্ন হয়ে গেলে নৈতিকতা থেকে মানুষ দূরে সরে যায়। এখন প্রকৃত ছাত্রনেতারা রাজনীতি বিমুখ হয়ে যাচ্ছে। তথাকথিত রাজনীতি এভাবে চলতে থাকলে আমরাও একসময় রাজনীতি বিমুখ হয়ে যাব। কথা বলা, পাইকারিভাবে চুরিচামারি করা, নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু না করা। তো এসব তো আনফরচুনেট। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে, দেশের স্বার্থ উদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং তা অবশ্যই সফল হবে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1270 বার