আইন প্রয়োগকারীরাও ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ করছেন

সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা৷ সেসময় উসকানির অভিযোগ এনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়৷ কিন্তু শিক্ষার্থীরা আসলে কী বক্তব্য দিয়েছিল, সেগুলো কি উসকানিমূলক ছিল? কেনইবা তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে?

এসব নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক৷

উসকানিমূলক বক্তব্য আসলে কী?

অধ্যাপক ফাহমিদুল হক: এটা হলো যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের দিক থেকে শোনা যায়৷ যখন কোনো আন্দোলন হয় এবং সেটা বড় আকার ধারণ করে তখন কারো বক্তব্যে আন্দোলনে গতি সঞ্চার হলে তখন ক্ষমতাসীনরা সেই বক্তব্যকে উসকানিমূলক বলে অভিযোগ করেন৷ তখন বলা হয় তার বক্তব্যের কারণে আন্দোলন ভিন্নপথে গেছে এবং যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে৷

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যে বক্তব্য দিয়েছিল তা কি উসকানিমূলক ছিল?

যারা আন্দোলন করে তারা তো তাদের দাবি দাওয়াগুলোই পেশ করে৷ সেগুলোতো আর উসকানিমূলক না৷ তাদের দাবির পক্ষে তারা কথা বলে, এর সবটাইতো আর উসকানিমূলক হতে পারে না৷ আসলে আন্দোলনকারীদের বাইরে ভিন্ন কেউ আন্দোলনকে অন্য দিকে নিতে বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো হতে পারে৷ এভাবেই ধরে নেয়া যায়৷ সাধারণ আন্দোলনকারীরা তো তাদের বক্তব্য স্পষ্ট করেই বলেছেন৷ তাদের দিক থেকে তো কোনো সমস্যা নেই৷ এখানে আন্দোলনকারীদের বাইরে কাউকে মিন করা হচ্ছে৷

উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে তো অনেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে?

এখানে আসলে মিন করা হচ্ছে যারা গুজব ছড়িয়েছে৷ যাদের তথ্যের কারণে আন্দোলনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে৷ আন্দোলনের এক পর্যায়ে গুজব ছড়ানো হয় যে, কয়েকজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে এবং কয়েকজনকে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ সেই গুজবটাকে এখন উসকানিমূলক বক্তব্য বলা হচ্ছে৷ এই গুজব যারা ছড়িয়েছে তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হয়েছে, বলে অনুমান করা হচ্ছে৷ তবে হেলমেট পরা বা লাঠিসোঁটা হাতে আক্রমণকারীদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি, সেটাই দুঃখজনক৷

সোশ্যাল মিডিয়ার বক্তব্যকে সরকার গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে৷ এই বক্তব্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেককেই গ্রেফতার করেছে৷ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

প্রথমত সোশ্যাল মিডিয়ার বক্তব্য ট্রেস করা সহজ এবং কারো বক্তব্যে যদি সরকার বিরোধিতা লক্ষ্য করা যায় তখন তাকে সাজা দেওয়াও সহজ৷ এখানে একটি আইনি পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে৷ আপনি জানেন যে, আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদও হয়েছে৷ সরকারও স্বীকার করেছে এটা পরিবর্তন করা দরকার৷ এটা যেহেতু কঠিন আইন এবং এর এভিডেন্স সোশ্যাল মিডিয়াতেই আছে, ফলে এই আইনে শাস্তির মাত্রাও বেশি৷ যদি মানহানি হয়, তাহলে অন্য কোনো ফরমে শাস্তির মাত্রা কম৷ এখানে ৫৭ ধারায় এভিডেন্সও হাজির আছে, আবার শাস্তির মাত্রাও কঠিন হচ্ছে৷ বেশিমাত্রায়ও শাস্তি দেয়া যাচ্ছে, যাতে একটা ভীতির পরিবেশ তৈরি হয় এবং আন্দোলনকারীরা পিছিয়ে যায়৷ আমার মনে হয়, যারা এগুলো নিয়ে বিহাইন্ড দ্যা সিন কাজ করছেন, তাদের মধ্যে এই বিষয়গুলো কাজ করছে৷

আন্দোলনের সময় তো অনেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এমন সব তথ্য দিয়েছে যার কোনো কিছুই আসলে সত্য না৷ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বাধা থাকার কথা না?

সোশ্যাল মিডিয়া তো সবার মত প্রকাশের একটা প্লাটফরম৷ সেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমরা দেখেছি৷ এই সুবিধা নিয়ে অনেকেই সেখানে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দেন বা ভুয়া তথ্য দেন বা মিথ্যা তথ্য দেন, যেটার ভিত্তিতে সমাজে একটা অস্থিরতার সৃষ্টি হয়৷ এই দায়িত্বশীলতার জায়গাটা অনেক ব্যবহারকারী অবহেলা করেন বা এটার অপব্যবহার করেন৷ তাদের জন্য তো আইনি পদক্ষেপ নেয়াই উচিত৷ এটার জন্য ৫৭ ধারা প্রয়োগের পাশাপাশি অপপ্রয়োগের একটা প্রবণতা লক্ষ্যণীয়৷ এখন দেখবেন বাস্তব জীবনের অনেক মামলাই ৫৭ ধারায় ফেলার একটা প্রবণতা আছে৷

যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড ও ভ্যানকুভার দ্বীপের মাঝখানে স্যান জুয়ান দ্বীপ৷ ১৮৫৯ সালের ১৫ জুন এক মার্কিন চাষির ক্ষেত নষ্ট করে এক ব্রিটিশ কমর্কর্তার শূকর৷ তা দেখে একে গুলি করে মেরে ফেলেন সেই চাষি৷ আর যায় কোথায়? নানা উসকানির মধ্য দিয়ে এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত দুই পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ প্রায় বাঁধিয়ে দিয়েছিল৷ এই যুদ্ধকে ‘পিগ ওয়ার’ বলা হয়৷

কারো মানহানি হলে বিদ্যমান আইনেই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিল৷ কিন্তু সেটা না করে সবাই ৫৭ ধারার আশ্রয় নিচ্ছেন৷ কারণ এটাতে তার বেশি সাজা হয়৷ মানে, আসলে এটা প্রয়োগের পাশাপাশি অপপ্রয়োগও দেখা যাচ্ছে৷ এটা শুধু সাধারণ মানুষই করছে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও যারা এটা প্রয়োগ করছেন, তারা এটা প্রয়োগের পাশাপাশি অপপ্রয়োগও করছেন৷ সেই জায়গায় আপত্তিটা৷ কেউ যদি গুজব ছাড়ায়, মিথ্যা তথ্য দেয় তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে৷ কিন্তু সেই সুযোগে সবকিছু ৫৭ ধারায় ফেলে দেয়া এটা আমরা অপপ্রয়োগ হিসেবেই দেখতে পাই৷

এই ধারায় শিক্ষার্থীদের ধরপাকড়ে কি তাদের মনে একটা ভয়ের জন্ম দিচ্ছে না?

আমার তো মনে হয় ভয়ভীতি তৈরি করার জন্যই এটা করা হচ্ছে৷ যাতে আন্দোলন আর দানা না বাঁধে৷

এতে করে কি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের জায়গাটাতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে না?

হ্যাঁ, মুশকিল তো ওটাই হচ্ছে৷ মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে চায়৷ এই প্রথম সবার মত প্রকাশের একটা মাধ্যম পাওয়া গেছে৷ আগে মত প্রকাশের যে মাধ্যম ছিল, সেটাতে সবার প্রবেশের সুযোগ ছিল না৷ যেমন ধরেন প্রিন্ট মিডিয়া বা ইলেকট্রোনিক মিডিয়া, সেখানে তো সবার সরাসরি মত প্রকাশের সুযোগ ছিল না৷ এখন সবাই সরাসরি নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন, তার মাধ্যম তৈরি হয়েছে৷ এখন সবাই এটাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে৷ এটাতে আটকা পড়েছে৷ শুধু আমাদের দেশে না, বিশ্বের সব দেশেই দেখা যাচ্ছে, যে এখানে আটকা পড়ে একটা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট রেখে যাচ্ছে৷ এই ফুটপ্রিন্টগুলো খুঁজে পাওয়া সহজ৷ এখন সরকারকে কাউকে মনিটর করার জন্য খুব বড় উদ্যোগ নিতে হচ্ছে না৷ এখানেই তার কার্যক্রম মনিটর করা যাচ্ছে৷ আমাদের সবাইকে মোবাইল ফোনের জন্য বায়োমেট্রিক করতে হয়েছে৷ এর জন্য সবাই যেমন সরকারি সেবা পাচ্ছে, পাশাপাশি সরকারের নজরদারির মধ্যেও পড়ে যাচ্ছে৷ এর ভালো-মন্দ দুটো দিকই রয়েছে৷ একজন নাগরিক তার সব ধরনের সেবা পাওয়ার জন্য তার বেসিক তথ্য যেমন সরকারের কাছে দিয়ে দিয়েছে, সে কারণে সে সরকারের এক ধরনের নজরদারির মধ্যে পড়ে গেছে৷ তার স্বাধীন চলাচল কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে৷

সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী হবে?শিক্ষার্থীদের প্রতি সহনশীল বা সংবেদনশীল আচরণ করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানাই৷ আর শিক্ষার্থীদের আমি বলব, বিভিন্ন দাবি দাওয়া বা মত প্রকাশের অধিকার যেমন তার আছে, তেমনি অন্য কারো দ্বারা ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়টি তাকে দেখতে হবে৷ এই ধরনের অভিযোগ তার ঘাঁড়ে আসতে পারে৷ এ কারণে সতর্কভাবে এবং সৎ থেকে তাদের আন্দোলন করা উচিত৷ আর সরকারকে অনুরোধ করব- কেউ দাবি তুললেই প্রথমেই সেটার বিরোধিতা না করে তাদের দাবি দাওয়া সংবেদনশীলভাবে দেখতে হবে৷ডয়চে ভেলে


ফোনঃ +৪৪-৭৫৩৬-৫৭৪৪৪১
Email: info.skhobor@gmail.com
স্বত্বাধিকারী কর্তৃক sheershakhobor.com এর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত