মধুর ক্যান্টিনের মত হলগুলোতেও সহাবস্থান চায় ছাত্রদল

Pub: শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ ১০:৪৭ অপরাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ ১০:৪৭ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীর্ঘ প্রায় ২৯ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। আগামী ১১ মার্চ বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে সরগরম ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও মুখরিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রতিদিনই ছাত্রনেতাদের আড্ডায় জমে উঠছে ছাত্ররাজনীতির ‘রাজনীতির আঁতুড়ঘর’ খ্যাত মধুর ক্যান্টিন।

শুধু মধুর ক্যান্টিনই নয়, ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের আলোচনার বিষয় এখন ডাকসু নির্বাচন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেয়ালে চোখে পড়ছে নতুন নতুন লেখা। সব মিলিয়ে নির্বাচনের আমেজ লেগেছে পুরো ক্যাম্পাসে। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কথা হয় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের সাথে।

শীর্ষ খবর ডটকমের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি দেওয়া হলো

দীর্ঘ নয় বছর পর মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদল, বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

আকরামুল হাসান: মধুর ক্যান্টিনে সহাবস্থানের ব্যাপারে আমরা প্রশাসনের আন্তরিকতা দেখতে পাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবে আমরা মধুর ক্যান্টিনে যেতে পারছি। তবে এই সহাবস্থান যেন শুধু ডাকসু নির্বাচনকে হালাল করার জন্য না হয়। আমরা আশা করি ডাকসু নির্বাচনের পরেও এই সহাবস্থান আব্যাহত থাকবে। শুধুমাত্র মধুর ক্যান্টিনে বসে চা খাওয়ার মানেই কিন্তু সার্বিক সহাবস্থান নয়। ক্যাম্পাসে আমাদের প্রোগাম করার সুয়োগ দিতে হবে। যারা এখনো নিয়মিত ছাত্র তাদের হলে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে আমি বলব সহাবস্থানের যাত্রা শুরু হয়েছে। এটা অব্যাহত থাকবে। এই জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ সকল সংগঠনকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। আমরা প্রত্যাশা করি অতীতের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারো তার গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় ফিরে আসুক। সেখানে সকলে সমানভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পাবে।

ডাকসু নির্বাচনে প্রশাসন ছাত্রদলের কোনো দাবিই মেনে নেয়নি, দাবি আদায়ে আপনারা আন্দোলনে যাবেন কিনা?

আকরামুল হাসান: আমাদের প্রধান দাবি ছিল ক্যাম্পাসে সহাবস্থান। আমরা মনে করি ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আন্তরিকতাকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছি। আমরা যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছি, তার প্রত্যেকটি দাবিই যৌক্তিক। আমাদের আরেকটি প্রধান দাবি হল ভোটকেন্দ্রগুলো হলের বাহিরে একাডেমিক ভবনে স্থাপন করতে হবে। এই দাবি অনেক ছাত্র সংগঠনই করছে। আপনারা জানেন, ১৯৯৪ সালে পরিবেশ পরিষদের সভায় ছাত্রলীগ ডাকসুর ভোট কেন্দ্র হলের বাহিরে স্থাপনের দাবি জানিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দাবি আরো বেশি যৌক্তিক। কারণ সেই সময় ক্যাম্পাস ও হলে হলে একটা গণতান্ত্রিক সহাবস্থান ছিল বর্তমানে যেটি নেই।

২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগ হলে ও ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারতো। কিন্তু এখন ১ম বর্ষের একজন ছাত্র যদি ছাত্রদলের সাথে জড়িত থাকে, তাহলে তাকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমরা মনে হয় না এই রকম একটা পরিস্থিতে সাধারণ ছাত্ররা হলের ভিতরে তাদের ভোটাধিকার স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারবে। তাই ছাত্রদল বিশ্বাস করে, যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নিয়ে প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করবে।

দাবি মানা না হলে শেষ সময় পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনে থাকবেন কিনা?

আকরামুল হাসান: ডাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা প্রথম থেকেই আন্তরিক। আমরা শেষ পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনে থাকতে চাই। প্রশাসনের প্রতি আমাদের আস্থা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের সহাবস্থানের যে প্রথম দাবি ছিল তা তারা মেনে নিয়েছে। আমাদের দাবিগুলো অন্যন্য সংগঠন ও সাধারণ ছাত্ররা সমর্থন করে। প্রশাসন আমাদের দাবির ব্যাপারে আন্তরিক থেকে একটি সুষ্ঠু ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করেবে।

দুইদিন হল ছাত্রদল ক্যাম্পাসে যাওয়া শুরু করেছে। পুর্ণাঙ্গ সহাবস্থান নিশ্চিত হতে আরো কয়েক মাস সময় লাগবে। তাই আমারা নির্বাচন তিন মাস পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। তবে আদালতের একটা নির্দেশনা আছে ৩১ মার্চের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই আদালতের কাছ থেকে আরো কিছুদিন সময় বাড়িয়ে নিতে পারে। যদি আদালত সময় বাড়িয়ে না দেয় তাহলে ৩১ মার্চের মধ্যে নির্বাচন করা হোক।

বয়সের কারণে আপনাদের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, সেক্ষেত্রে কারা ছাত্রদলের প্রার্থী হতে পারে?

আকরামুল হাসান: ছাত্র রাজনীতিতে বয়সের ধরাবাধা নিয়ম কখনো ছিল না। কোনো কোনো সংগঠন নিজেদের প্রয়োজনে বয়সের সীমা রেখা চালু করেছে, আবার রহিত করেছে। এরশাদের আমলে ছাত্রলীগ একবার কেন্দ্রীয় কমিটির বয়সসীমা ২৭ বছর নির্ধারণ করেছিল। তখন ছাত্রলীগের মইনউদ্দিন-ইকবাল কমিটি সেই বয়সসীমার মধ্যে করা হয়েছিল। সেই কমিটি ব্যর্থ হওয়ায় তারা বয়সসীমা তুলে নেয়। পরবর্তী রিপন-রোটন কমিটিতে বয়সসীমা ২৯ চালু করা হয়। তার পরে যারা ছাত্রলীগের কিমিটিতে এসেছে তারা তো সোনার চামচ মুখে দিয়ে এসেছে। তাদের তো কোনো আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়নি। ছাত্রদল দীর্ঘ ১২ বছর যাবৎ নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শতশত মিথ্যা মামলা রয়েছে। অনেককে গুম করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে বয়সের সীমারেখা বেধে দেওয়া খুব একটা বাস্তব সম্মত বলে মনে হয় না।

আমাদের বয়স কিন্তু খুব বেশি না। আমি যখন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হই তখন আমার বয়স ছিল ৩৪ বছর। আমাদের কমিটির মেয়াদ সাড়ে চার বছর হয়ে গেছে। তাই অন্যন্য সংগঠনের থেকে আমাদের বয়সের পার্থক্য বেশি মনে হচ্ছে। যদি পরিস্থিতি ঠিক থাকত তাহলে আমরা সঠিক সময়ে আমরাদের নতুন কমিটি দিতে পারতাম। আমাদের অনেক নেতা আছে যারা অনার্স শেষ করেছে কিন্তু মাস্টার্স শেষ করেনি। তাদেরকে ভর্তির কোনো সুয়োগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু ছাত্রলীগের সভাপতি ২০০৭-০৮ সেশনের তাকে ঠিকই ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের সাথে সবসময় যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। যাদের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা আছে , যারা ছাত্রদের কাছে প্রিয় তাদের নিয়ে ছাত্রদল একটা প্যানেল দিবে। তবে আমরা শেষ পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব ডাকসুতে বয়সের কোনো সীমারেখা থাকবে না। যারা ডাকসু ও হল সংসদের ফ্রি প্রদান করে তাদের সকলকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ প্রদান করবে।

ছাত্রদলের সাথে শিবিরের একটা সম্পর্ক থাকার অভিযোগ রয়েছে, সেটির সত্যতা কতোটুকু?

আকরামুল হাসান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল শিবিরে সাথে কখনোই রাজনীতি করেনি। জাতীয়ভাবে জামাতের সাথে আমাদের দলের একটা নির্বাচনী জোট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী কার্যক্রমের জন্য আমাদের এক সাথে কাজ করতে হয়েছে। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল কখনোই শিবিরকে নিয়ে রাজনীতি করেনি। এমনকি সর্বশেষ ৯০ এর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল ও শিবির আলাদা প্যানেলে নির্বাচন করেছিল। আমাদের সাথে কখনো শিবিরের রাজনীতি ছিল না, আগামীতেও থাকবে না।

আমরা যাচাই-বাছাই করে আমাদের কমিটি দিয়েছি। আমাদের কমিটিতে কোনো শিবির নেই। তবে যদি কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিব বরং ছাত্রলীগে শিবির রয়েছে। বিভিন্ন সময় তারা শিবির সন্দেহে হল থেকে বের করে দেয়। এমনিতে এই মুহূর্তে শিবির নির্যাতিত, ছাত্রদলও নির্যাতিত। তাহলে শিবির ছাত্রদলে কেন আসবে? কেন নির্যাতন থেকে আরেক নির্যাতনে আসবে? ছাত্রদল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীততি করে শিবির ইসলামী আদর্শে রাজনীতি করে। শিবির বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের এখানে আসার কোনো কারণ নেই বরং সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য ছাত্রলীগে যোগদান করতে পারে। সেক্ষেত্রে ছাত্রলীগকে সতর্ক থাকা উচিৎ। তাদের মধ্যে শিবির প্রবেশ করে ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করতে পারে। এমন অভিযোগও আছে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব শিবির থেকে এসেছে। এগুলো নিয়ে তাদের সংগঠনের ভিতরে অনেক বিতর্ক রয়েছে।

নির্বাচিত হলে সাধারণ ছাত্রদের অধিকার আদায়ে কি কি পদক্ষেপ নেবে ছাত্রদল?

আকরামুল হাসান: ছাত্রদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে ছাত্রদল সবসময় সোচ্চার ছিল। আমরা নির্বাচিত হলে ছাত্রদের পক্ষে প্রশাসনের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরব। তবে ডাকসু শুধু ছাত্রদের অধিকার আদায়ের প্লাটফম নয়। ডাকসু জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডাকসু সব সময় বাংলাদেশকে নিয়ে কথা বলেছে। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে ডাকসু ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি ৯০’র ডাকসু স্বৈরাচার এরশাদকে হাটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে এনেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নষ্ট করে ক্ষমতায় রয়েছে একটি দল। আমি আশা করব আগামীতে ডাকসু দেশের মানুষের সেই ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে। তাই সাধারণ ছাত্ররা সারা দেশের মানুষের ভোটের অভিকার ফিরিয়ে দিতে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেলকে বিজয়ী করবে।

ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল কারো সাথে জোটের কথা ভাবছে কিনা?

আকরামুল হাসান: আমরা অনেককের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। অনেক সংগঠনের সাথে আমাদের কথা হচ্ছে। ক্যাম্পাসে যারা বিভিন্ন সামাজিক কাজে জড়িত তাদের সাথে আমাদের জোটবদ্ধ হওয়ার একটা পরিকল্পনা রয়েছে। খুব শিগগিরিই এই বিষয়ে আমরা একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিব।

সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আকরামুল হাসান: আপনাকেও ধন্যবাদ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1136 বার