fbpx
 

স্বপ্নলোকে আবরারের আর্তনাদ!

Pub: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১০, ২০১৯ ১১:৩৯ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১০, ২০১৯ ১১:৩৯ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

গোলাম মাওলা রনি
ঘটনার দিন বিকালে চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলাম। রমনা পার্কের একটি ছায়াঘেরা নির্জন স্থানে অন্যান্য দিনের মতো শুয়ে শুয়ে প্রকৃতি দর্শনে ব্যস্ত ছিলাম। আমার নিত্যকার অভ্যাসমতো ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে পুরো রমনা পার্ক চক্কর দেই। তারপর পার্কের যে দিকটায় গণপূর্ত বিভাগের কর্মচারীদের আবাস রয়েছে, সেখানকার ছোট্ট মসজিদটিতে আছরের নামাজ পড়ে আবার পার্কে ঢুকি। এরপর দেখেশুনে নিরিবিলি এবং গাছগাছালীতে পরিপূর্ণ স্থানে স্থাপিত কোনো বেঞ্চ খুঁজে নেই এবং বেঞ্চের ওপর শুয়ে গাছের ডালে বিভিন্ন পাখির নাচ-গান দেখি এবং কাঠবিড়ালীদের ইতিউতি ব্যস্ততার মাঝে নিজের জীবনের মানে খুঁজে বেড়াই। মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের ডাল-পাতার নড়াচড়া, আকাশে বাহারি মেঘের আনাগোনা এবং মহাকাশের অসীম শূন্যতার মাঝে জীবনের স্পন্দন শুনতে শুনতে হৃদয়মন পুলকিত করার চেষ্টা করতে থাকি।

আমি যেদিনটার কথা বলছি, সেদিনও সবকিছু অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু যেই না আমি পার্কের বেঞ্চিতে গা এলিয়ে দিলাম, অমনি হঠাৎ করে কেমন যেন অদ্ভূত এক সুনসান নীরতা নেমে এলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেখানে ভয়ঙ্কর কালো মেঘগুলো দানবের মতো দাপাদাপি করছে। গাছের পাতাগুলো অন্যান্য দিনের মতো কাঁপছে না। পাখিগুলোকেও দেখতে পেলাম না। কাঠবিড়ালী-দূর থেকে ভেসে আসা মানুষের হাঁটাচলা কিংবা কথাবার্তার কোনো লক্ষণ না পেয়ে আমি শোয়া থেকে উঠে বসলাম। আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম,পুরো পার্কে আমি ছাড়া কেউ নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম মাগরিব হতে তখনো বেশ খানিকটা সময় বাকি আছে। কিন্তু চারি দিকের অন্ধকার দেখে মনে হলো কালবৈশাখীর প্রবল ঝড় আঘাত হানার আগে যেভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশকে অন্ধকার এবং নিস্তব্ধতায় ঢেকে ফেলে, ঠিক তেমনি পরিবেশ আমাকে ঘেরাও করে ফেলেছে। আমি কিছুটা ভড়কে গিয়ে সেই স্থান ত্যাগ করার জন্য যেই না উঠে দাঁড়াব, অমনি পেছন থেকে কে যেন সালাম দিয়ে মিষ্টি মধুর কণ্ঠে জানতে চাইলেন, স্যার কেমন আছেন!

ঘটনার আকস্মিকতায় আমার ভড়কে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কারণ, এই কয়েক মুহূর্ত আগেও আমি আমার আশপাশে, সামনে-পেছনে কোনো কাকপক্ষীটিও দেখিনি। কালবৈশাখীর ঘনঘটার কালো মেঘের নিকষ অন্ধকারের বাতাসহীন গুমোট পরিবেশ যখন আমাকে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ করে পেছন থেকে সমধুর মনুষ্য কণ্ঠের সালামযুক্ত সম্ভাসন আমাকে অশরীরী আত্মার আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিলো। ফলে আমি বুঝতে পারছিলাম না, ওই মুহূর্তে কোনটি আমার জন্য সর্বোত্তম হবে! আমি কি ভোঁ দৌড় দিয়ে পালিয়ে যাবো এবং দৌড়ানোর সময় ওরে মাগো-ওরে মাগো বলে চিৎকার করে নিকটস্থ লোকজনের সাহায্য চাইব, নাকি পেছনে ফিরে সালামের জবাব দেবো! যিনি আমাকে সালাম দিয়েছিলেন সম্ভবত তিনি আমার মতিগতি টের পেয়েছিলেন। সুতরাং আমার গতিরোধ করার জন্য তিনি পেছন থেকে আমার ঘাড়ের ওপর হাত রাখলেন। আমি টের পেলাম যেন মস্তবড় হিমালয়ের ওজন আমার ঘাড়ের ওপর পড়েছে। সুতরাং আমি পুনরায় ধপাস করে বেঞ্চিতে বসে পড়তে বাধ্য হলাম।

নিজেকে সামলে নিয়ে সাহস করে পেছনে ফিরলাম। একজন সৌম্য দর্শন তরুণ তার মেধাদীপ্ত মুখশ্রীতে অদ্ভুত এক কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটিয়ে তুলে আমাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, স্যার! কেমন আছেন। তরুণের কমলকান্তিময় অভিব্যক্তি এবং সুমধুর বচন শুনে আমার মনে স্বস্তি ফিরে এলো। আমি যথারীতি তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম এবং আপন মনে নিজের ভয়কাতুরে স্বভাবের জন্য বারবার নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকলাম। আমি স্বস্নেহে তরুণের হাতটি চেপে ধরে তাকে আমার পাশে বসালাম। তরুণ পরম ভক্তি ও আগ্রহ নিয়ে আমার হাতখানাকে প্রথমে চুমু দিলেন এবং তারপর সেটিকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন- স্যার কি আমাকে চিনতে পেরেছেন। আমি আবরার। তরুণের কথা শুনে আমি কোনো চিন্তাভাবনা না করেই পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম, কোন আবরার! আমার কথা শুনে তরুণটি মনে হলো কিছুটা কষ্ট পেলেন। তিনি আমার হাতটি তার বুকে এমনভাবে চেপে ধরলেন, যার ফলে আমি তার বুকের ধুকধুক শব্দের আকুতি এবং বেদনা টের পেলাম। তরুণ তার সৌম্যদর্শন মুখখানি ভার করে মাথা নিচু করে আমাকে জানালেন যে, তিনি হলেন সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ বুয়েট ছাত্র লীগ নেতাকর্মীদের নির্মম ও অমানবিক পিটুনির কবলে পড়ে নিহত হওয়া আবরার!

ঘটনার আকস্মিকতায় আমার শরীর মন মস্তিষ্ক যেন ছ্যাড়াব্যাড়া হয়ে গেল। হাঁটু দুটো এমনভাবে কাঁপতে লাগল, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। পেটের নিম্নাংশ বিশেষ করে নাভীর চারপাশটা বরফের মতো শীতল হয়ে অদ্ভুতভাবে চিন চিন শব্দে বাজতে বাজতে আমাকে বেদনাতুর করে তুলল। আমার যে হাতটি তরুণ তার বুকে চেপে রেখেছিল সেটির অবস্থা এমন হলো যেন আমি কোনো ফুটন্ত লাভা অথবা পারমাণবিক চুল্লির মধ্যে নিজের হাতটি ঢুকিয়ে দিয়েছি। আমার বুদ্ধি লোপ পেল দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল এবং সারা শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতে আরম্ভ করল। আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য তরুণ ঠিক আগের মতো সমধুর গলায় বললেন, স্যার! ভয় পাবেন না- আমি আপনার কোনো ক্ষতি করতে আসেনি। আমি কেবল আমার কিছু না বলা কথা যা কেউ জানে না তা জানাতে এসেছি। কথাগুলো বলেই, আমি ঊর্ধ্বলোকে চলে যাবো। আমি ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে আবরার নামধারী তরুণের দিকে তাকালাম। তিনি আবার সুন্দর করে হাসতে লাগলেন। তার হাসির মাধুর্য্যে মুগ্ধ হয়ে আমি নাটকীয়ভাবে নিজের ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠলাম এবং তার কথা সোনার জন্য তার দিকে ফিরে তার কথাগুলো শোনার চেষ্টা করলাম!

আবরার বলতে আরম্ভ করলেন- ‘যে রাতে আমাকে মারার জন্য ওরা আমার ওপর আক্রমণ শুরু করল সে রাতে আমার মন যে কেমন ছিল তা আপনাকে বুঝাতে পারব না। সেদিন বিকালে আমি শহীদ মিনার গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে অপলকনেত্রে শহীদ মিনারটি দেখতে দেখতে আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবছিলাম। একটি ভাষার জন্য একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য এবং দেশের জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য মানুষ কেনো কিভাবে এবং কখন নিজের জীবন উৎসর্গ করে তা ভাবতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছিল যে, আমি হয়তো এখনো সুনাগরিক হতে পারিনি। কারণ, আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে আমি শুধু দেশের কাছ থেকে নিয়েছি, দেশকে এ যাবতকালে কিছুই দিতে পারিনি।

‘শহীদ মিনার থেকে ফেরার পথে আমি কিছুটা সময় এসএম হল অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে দাঁড়ালাম। বাংলার মানুষের অধিকার এবং এই অঞ্চলের মুসলমানদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য একজন মানুষ কিভাবে নিজের সর্বস্ব দান করে দিতে পারে তা ভাবতে গিয়ে আমি আরেক দফা দেশপ্রেমের নস্টালজি যায়। আক্রান্ত হলাম। আমার মনে হলো- দেশকে ভালোবাসতে পারার মতো দুর্লভ গুণাবলি না থাকলে মানুষের অন্য কোনো গুণাবলি, সফলতা বা অর্জন সার্থকতা লাভ করতে পারে না। আমি এসএম হলের সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পলাশী মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। পলাশী নামটি শুনলেই আমার শরীর মন ঘৃণায় দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। আমি যতবার পলাশী মোড়ে গিয়েছি ঠিক ততবারই মনে হয়েছে ঢাকার এই স্থানটির নাম কেনো পলাশী হলো। আমি কয়েকজন ইতিহাসবিদকে জিজ্ঞাসা করেও কোনো সদুত্তর পাইনি।

আমার মতে, পলাশী নামের মধ্যে যে বিশ্বাসঘাতকতা, যে মীর জাফরী প্রকৃতির দেশদ্রোহিতা, যে চক্রান্ত এবং যে প্রতারণামূলক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা এবং রাজনীতির নামে নিজের দেশ-জাতি-সম্পদ এবং মা-বোনদের ইজ্জত বিক্রির ইতিহাস লুকায়িত তার সাথে বাংলাদেশের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত এই স্থানটির সম্পর্ক কী!
‘ঢাকার পলাশী মোড়ের চারদিকে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; রয়েছে বুয়েট-ইডেন গার্হস্থ অর্থনীতির কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা মেডিক্যাল, পিজি, শেখ বুরহানউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা এবং ঢাকা বোর্ড। শিক্ষার এতসব আলোকবর্তিকার মাঝে পলাশী নামের হেতু খুঁজতে গিয়ে আমি হঠাৎ করে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। আমার মনে হলো- পলাশী ট্র্যাডেজির মূল উপাখ্যান শুরু হয়েছিল এই ঢাকা থেকে। নবাব সিরাজদ্দৌলার বড় খালা অর্থাৎ নবাব আলীবর্দি খানের বড় কন্যা ঘসেটি বেগম এই ঢাকা থেকেই বাংলা বিহার উড়িষ্যাকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলেন। এই ঢাকার মতিঝিলে অথবা হিরাঝিল প্রাসাদে বসেই তিনি বাংলার রাজনীতির মীর জাফর, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, মীরন প্রমুখ কুখ্যাত বেঈমান ও বিশ্বাসঘাতক সৃষ্টি করেছিলেন। কাজেই পলাশী ট্র্যাজেডির নায়ক যেমন নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং প্রধান খলনায়ক যেমন মীর জাফর, তেমনি এ দুর্ঘটনা যিনি গর্ভে ধারণ করেছেন, প্রসব করেছেন এবং দুগ্ধদানে লালিত পালিত করে খলনায়কদের হায়নায় রূপান্তরিত করেছেন, তিনি ঘসেটি বেগম।

‘আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বাংলাদেশকে যেভাবে ধারণ করি তাতে দেশটির জন্য আমার খুব মায়া হয়। এ দেশের সব মানুষ-প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণী, বৃক্ষরাজি-নদ-পাহাড়-সমুদ্র সব কিছুকেই আমার রক্তের আত্মীয় বলে মনে হয়। বাংলাদেশের যে কোনো সম্ভাবনা অথবা সফলতা যেমন আমাকে দারুণভাবে আনন্দিত করে, তেমনি দেশের কোনো স্বার্থহানির বিষয় দেখলে নিদারুণ কষ্টে হাহাকার করে উঠি। দেশ নিয়ে আমার এই আবেগ অনুভূতি আমি সুযোগ পেলেই ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিকমাধ্যমে লেখালেখি করি। সাম্প্রতিককালে ভারতের সাথে আমাদের তিস্তা চুক্তি না হওয়া এবং উল্টো ভারতকে ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার সুযোগ দান সংক্রান্ত একটি চুক্তির কথা শুনে খুব কষ্ট পাই। তিস্তার মতো একটি খরস্রোতা নদীর উজানে বহু সংখ্যক খাল এবং একাধিক বাঁধ নির্মাণ করে ভারত ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক এই নদীটির সর্বনাশ এমনভাবে করেছে যে, তিস্তার বাংলাদেশ অংশকে কেউ আর নদী বলতে পারবে না। কোনো আন্তর্জাতিক নদী নিয়ে এতবড় জাল-জালিয়াতি, চুরি-ডাকাতি কিংবা জোর জবরদখলের ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই।

‘ইদানীং ভারত সব ব্যাপারেই বাংলাদেশকে শোষণ করা আরম্ভ করেছে। আমাদের দেশের রোহিঙ্গা সমস্যা, সুন্দরবনের পরিবেশ বিপর্যয়, সীমান্তে হত্যা, যখন তখন ভারতীয় রফতানি পণ্য দ্বারা আমার বাজার সয়লাব করে স্থানীয় শিল্প কারখানা, কৃষি, বাণিজ্য ইত্যাদি ধ্বংসের পাশাপাশি মাঝে মধ্যে তারা চাল-ডাল-পেঁয়াজ এবং সুতার মতো অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী হঠাৎ করে রফতানি বন্ধ করে দিয়ে পুরো বাংলাদেশকে অস্থির করে তোলে। তারা আসাম থেকে কুড়ি লাখ মুসলমানকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইন করার হুমকি দিয়ে আমাদের দেশের জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। তারা তাদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার মাধ্যমে আমাদের দেশে অসংখ্য অদৃশ্য মীর জাফর রায় দুর্লভ ও জগৎ শেঠদের তৈরি করে আমাদের জনারণ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করি এবং আমার মনের কথাগুলো ফেসবুকে লিখে মনের মাঝে কিছুটা হলেও শান্তি খুঁজে পাই।

‘পলাশীর মোড় থেকে আমি সোজা আমার রুমে অর্থাৎ বুয়েটের হলে ফিরে এলাম। হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসার আগে মাকে ফোন করলাম। মা আমার প্রথমেই বললেন, বাবা কিছু খেয়েছ! দুটো বিস্কুট এবং দুই গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেয়ে তারপর পড়তে বসো। আমি সুবোধ বালকের মতো মায়ের কথামতো বিস্কুট এবং পানি খেলাম। মায়ের সাথে কথা বলার সময় আমি প্রায়ই কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলি। শৈশবে যেভাবে মাকে জ্বালাতন করতাম ঠিক একইভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তাকে জ্বালাতন করি। অন্য দিকে, মা আমাকে এমনভাবে সম্মান ও তোয়াজ করে কথা বলেন যেন আমি বুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে গেছি। আমি বুঝতে পারি যে, আমাকে নিয়ে মায়ের অনেক আশা- আমি মস্তবড় ইঞ্জিনিয়ার হবো, বড় চাকরি করব, মা আমার জন্য দেখেশুনে রাজকন্যা জোগাড় করে আনবেন বউ হিসেবে- তারপর ইঞ্জিনিয়ারের মা হিসেবে পরিচিতজনদের কাছে নিজেকে জাহির করে স্বর্গসুখ অনুভব করবেন।

‘আমি যখন মাকে ফোন করি তখন সময় নিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলি। কত যে কথা, মনে হয় শেষই হবে না। সেদিনও কথা বলছিলাম। এমন সময় কয়েকটি ছেলে এসে আমাকে জানাল যে, ওমুক ভাই তোমাকে এখনি তমুক রুমে যেতে বলেছে। আমি মায়ের সাথে কথা সমাপ্ত না করেও তমুক রুমের দিকে রওয়ানা দিলাম। কারণ যারা আমাকে ডেকেছে তাদের ডাকের গুরুত্ব যমদূতদের ডাকাডাকির চেয়েও ভয়ঙ্কর। কারণ কোনো যমদূত অন্যায়ভাবে অথবা নীতিগর্হিতভাবে কারো প্রাণ সংহার করে না। আমি সন্ত্রস্ত অবস্থায় কম্পিত পদব্রজে বুয়েটের রিমান্ড সেল বা টর্চার সেল বলে পরিচিত রুমে ঢুকেই দেখি সেখানকার যমদূতেরা আমার প্রাণ সংহার করার জন্য দশ পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমার সাথে একটি বাক্যবিনিময়ের সময় নষ্ট না করে ক্রিকেটের ব্যাট দিয়ে আমাকে পেটাতে আরম্ভ করল। আমি শুধু একটি বারের জন্য ওরে মাগো বলে চিৎকার দিতে পেরেছিলাম। তারপর ওরা আমার মুখের মা ডাক বন্ধ করার জন্য কয়েকজন মিলে মুখটি সজোরে চেপে ধরল এবং গামছা জাতীয় কিছু একটা দিয়ে মুখ বেঁধে বেদম পেটাতে লাগল।

‘আমার যতক্ষণ হুঁশ ছিল ততক্ষণ শুধু দুটো কথাই আমার বারবার মনে হচ্ছিল। প্রথমত, এরা আমাকে কেনো মারছে। আমি কী করেছি। এদের কারো সাথে তো আমার শত্রুতা ছিল না- কোনো বিরোধ নেই। এরা আমাকে কোনো দিন হুমকি ধামকিও দেয়নি। তবে আজ কোনো ডেকে এনে কোনো কথাবার্তা না বলে কেন মারছে! দ্বিতীয়ত, আমার বার বার মায়ের কথাগুলো মনে হচ্ছিল- মায়ের হাতের রান্না, মায়ের আঁচলের ম ম করা মাতৃত্বের ঘ্রাণ, তার মুখের হাসি, চপল অভিমান, কৃত্রিম রাগ এবং স্নেহভরা মায়াবী আলিঙ্গন। ওরা পেটাচ্ছে আর অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছে- আমার বাবা-মা তুলে গালি দিচ্ছে। আমি একটা সময় অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়লাম। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। এমন সময় হঠাৎ বাবার কথা মনে এলো- ইচ্ছে হলো বাবার গলাটি জড়িয়ে ধরে শৈশবের মতো বলে উঠি, ওরে সোনা বাবারে, ওরে আমার লক্ষ্মী বাবারে, আমি আর কোনো দিন তোমাকে কষ্ট দেব না, তুমি যা বলবে তাই শুনব বাবা। আমি সর্বশক্তি দিয়ে একটু নড়ে ওঠার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। আমার মনে হলো- আমার সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে- মায়ের আঁচল! পিতার মুখশ্রী, পূর্ণিমার চাঁদ আর আমার গ্রামের ফসলি মাঠের সবুজ দৃশ্য বায়োস্কোপের মতো আমার সামনে ভাসতে লাগল।’ আবরারের কথা শুনতে শুনতে আমারো সম্বিত হারানোর মতো অবস্থা হলো। সে আমার দুর্বলতা টের পেয়ে আমার হাতখানা একটু ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, স্যার, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন তো। আমি সম্বিত ফিরে পাওয়ার ভান করে চিৎকার করে বললাম, শুনেছি কিন্তু আর শুনতে চাই না। আমার চিৎকারের শব্দে স্ত্রীর ঘুম ভেঙে গেল। আমিও জেগে উঠলাম এবং দেখলাম রাত পৌনে চারটা।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ