বর্তমানে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে আমরা সবচেয়ে বেশি যে সংকটের মোকাবেলা করছি তা হচ্ছে বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন। নারী ও কিশোরীরা পরিবার, অফিস-আদালত, যানবাহন, রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সরকারসহ বিভিন্ন সংগঠনগুলো এই সংকটের প্রতিকারের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এর রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না। উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না থাকা নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে মূল বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক হলে সম্পদে নারীর সমঅধিকার বিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব মন্তব্য করেন। গোল টেবিল বৈঠকটি আয়োজন করে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)।
বৈঠকে ‘বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন উপসর্গমাত্র, সংকটের মূল কারণ সম্পদে নারীর সমান অধিকার না থাকা, বৈষম্য দূর করার জন্য উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার চাই’ শীর্ষক ধারণাপত্র পাঠ করেন বিএনপিএস-এর সহ-সমন্বয়কারী কানিজ ফাতেমা।
ধারণাপত্রে বলা হয়, ‘বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, মাতৃমৃত্যু ইত্যাদি রোগের উপসর্গ, মূল কারণে হাত না দিলে এই সংকট সমূলে উৎপাটন করা যাবে না। সেই মূল কারণটি হলো পুরুষতন্ত্র। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো ক্ষমতা নেই, যেখানে সকল ক্ষমতার মূল উৎস হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং সম্পদ ও সম্পত্তিতে তার মালিকানা, যার শুরু হয় পরিবার থেকে। এই সংকট মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর মূল পদক্ষেপ হবে নারীর অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় করা, তথা উত্তরাধিকারসহ সকল সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, যা পরিবার, সমাজ ও রাজনীতিতে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় করবে।’
আরও বলা হয়, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক কর্তৃক প্রণীত বৈষম্যমূলক ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের বলে উত্তরাধিকারসহ সম্পদ ও সম্পত্তিতে সমান অধিকার পাওয়া থেকে বাংলাদেশের নারীসমাজকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। যা সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রের ৫০ ভাগ জনগোষ্ঠী নারীর মানবাধিকার এবং নাগরিক হিসেবে তাদের সমানাধিকারের লংঘন। অথচ মৌলিক অধিকারের সাথে অসমঞ্জস্যপূর্ণ আইন বাতিল হয়ে যাবে বলে সংবিধানের ২৬ (১) ও ২৬ (২) ধারায় সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। আমরা মনে করি, একটি স্বাধীন দেশে এমন দ্বৈত ব্যবস্থা সুস্পষ্টভাবেই সংবিধান লঙ্ঘন।’
সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিএনপিএস এর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণই আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করেছে৷ অথচ উত্তরাধিকারে সমঅধিকার না থাকায় নারীরা ব্যাংক ঋণ ও অনান্য অর্থনৈতিক সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে তাই উত্তরাধিকারের আইনটি পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।’
গোলটেবিল বৈঠকে বিএনপিএস এর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীরের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট মো. হেলাল উদ্দিন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর বনশ্রী মিত্র, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. ফৌজিয়া মোসলেম প্রমূখ।












