সারাদেশে ‘ছেলেধরা’ নিয়ে ‘ভয়ঙ্কর’ গুজব-আতঙ্ক

Pub: রবিবার, জুলাই ২১, ২০১৯ ১১:৩২ অপরাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, জুলাই ২১, ২০১৯ ১১:৩২ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে শিশুদের মাথা লাগবে- এমন গুজবে দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা ভেবে এলাকায় অপরিচিত কাউকে দেখলেই পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। গুজবের ডালপালা মেলছে প্রতিদিনই। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে ব্যাপকভাবে গণপিটুনির ঘটনা থামছে না, বরং তা বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যে অনেকেই আছেন চরম আতঙ্কে।

শনিবার (২০ জুলাই) এক দিনেই রাজধানী ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে তিনজনকে। গণপিটুনিতে আহত হয়েছেন অন্তত সাতজন। সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে দেশের কয়েকটি জেলায় গণপিটুনিতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত নয়জনে। গণপিটুনির শিকার অধিকাংশই নারী, মানসিক ভারসাম্যহীন এবং মাদকাসক্ত।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, অভিভাবকেরা তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে দ্বিধাবোধ করছেন। আবার অনেক অভিভাবক তাদের সন্তান্দের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছেন ও স্কুল থেকে আবার নিয়েও আসছেন।

এর মধ্যে অচেনা মানুষকে এলাকায় দেখলেই তেড়ে আসছেন স্থানীয়রা। আর একসঙ্গে বহু মানুষের প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেলেই শুরু হয় গণপিটুনি।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক স্থানে গণপটুনিতে মারায় যান এক যুবক এবং আহত হন এক নারী। কেরানীগঞ্জেও একইভাবে গণপিটুনিতে মারা গেছেন একজন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, বান্দরবান, গাজীপুরের চৌরাস্তা ও ময়মনসিংহের ভালুকায় একজন করে নারী এবং পটিয়া ও পাবনার চাটমোহরে একজন করে যুবক গণপিটুনিতে আহত হয়েছেন।

এসব খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়া অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও এসব ঘটনায় আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শনিবার পুলিশ সদর দফতর থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার উদ্দেশে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, যা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল। সেই সঙ্গে গণপিটুনি দিয়ে মানুষ মারাকে বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সন্দেহবশত কাউকে গণপিটুনি দেয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। গণপিটুনির ঘটনা তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে বিবৃতিতে।
শনিবার (২০ জুলাই) রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে এক নারী নিহত হওয়ার ঘটনায় অজ্ঞাত ৪০০ থেকে ৫০০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। শনিবার রাতে বাড্ডা থানায় নিহতের ভাগিনা নাসির উদ্দিন এ মামলা করেন।

মামলায় বলা হয়েছে, অতর্কিতভাবে ওই নারীকে স্কুলের অভিভাবক, উৎসুক জনতাসহ অনেকে গণপিটুনি দেয়। এতে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি জড়িত। বাড্ডা থানার এসআই সোহরাব হোসেনকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

বাড্ডা থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, রেনু তার মেয়েকে ভর্তি করার জন্য স্কুলে যান। কিন্তু মানসিক অসুস্থতার কারণে তার আচরণ অস্বাভাবিক ছিল। এজন্য স্কুলের অনেকেই তাকে ছেলেধরা হিসেবে সন্দেহ করছিল। প্রধান শিক্ষক তার সঙ্গে কথা বলার জন্য রুমে নিয়ে যান। কিন্তু স্কুল প্রাঙ্গণে তার অস্বাভাবিকতা দেখে অনেকেই বের করে মারধর করতে চাইছিলেন। প্রধান শিক্ষক রেনুকে বাইরে বের না করলে, স্কুলের কিছু অভিভাবক ও বাইরে থেকে আসা উৎসুক জনতা রুমের গেট ভেঙে তাকে ছেলেধরা বলে মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢামেকে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রেনুকে মৃত ঘোষণা করেন।

রবিবার (২১ জুলাই ) নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে ছয় ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরে পুলিশ ওই ছয় ব্যক্তিকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নেয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও থানা-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল আটটার দিকে এই ছয়জন উপজেলার বুড়িদহ গ্রামের রণজিৎ কুমার চৌধুরীর পুকুরে চুক্তিভিত্তিক মাছ ধরতে যান। পুকুরের মালিকের সঙ্গে তাদের চুক্তি ছিল যে তারা শুধু ছোট মাছ ধরবেন। কিন্তু তারা কয়েকটি বড় মাছও ধরে ফেলেন। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে পুকুরমালিকের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে পুকুরের মালিক ও গ্রামের লোকজন ছয় জেলেকে মারধর করতে শুরু করেন। তারা নিজেদের বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় গ্রামের লোকজন ছেলেধরা বলে চিৎকার করতে শুরু করলে আরও লোকজন ছুটে গিয়ে প্রথমে সাদ্দাম হোসেন নামের এক জেলেকে আটক করেন। ছেলেধরা পালিয়ে গেছে খবর রটে গেলে পাশের খুদিয়াডাঙ্গা গ্রামের লোকজন অন্য পাঁচজন জেলেকে আটক করে পিটুনি দেয়।

এর আগে গত ১৩ জুলাই রাজধানীর আদাবর এলাকায় গণপিটুনিতে মারা যায় এক যুবক। একইভাবে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুর ঘোনার কাঁঠালিয়া বাজারে গত ১০ জুলাই রাতে ছেলেধরা সন্দেহে লোকজন অজ্ঞাত এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় ডুমুরিয়া থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। এ ছাড়া কয়েক দিন আগেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা শহরে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অজ্ঞাত ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি মারা যান।

পদ্মাসেতু নিয়ে গুজবের কারণে সারাদেশে এখন পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সহকারী পরিচালক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কারা এসব ছড়াচ্ছে, তাদের ওপর নজরদারি চলছে।’

তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। যাকে আমরা সন্দেহ করছি আধোও সে জড়িত কিনা, যাকে সন্দেহ করছি তার পরিচয় কি, তার পরিচয় আগে শনাক্ত হতে হবে। এরপর যদি কিছু মনে হয় তাহলে স্থানীয় থানায় কিংবা র‍্যাবের কাছে অভিযোগ দিন। তৃতীয় পক্ষ যেন সুযোগ নিয়ে কোনও অঘটন না ঘটাতে পারে সে জন্য সকল গণমাধ্যমকর্মীকে এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’

পুলিশও বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। শুক্রবার চাঁদপুর এলাকা থেকে সাজ্জাদ গাজী, সায়েম ভূইয়া এবং আবু খালেক রতন নামের তিনজনকে গ্রেফতারের পর তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করা হয়েছে।

চাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘আমরা তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের না বুঝে মোবাইল থেকে শেয়ার করেছে বলে জানিয়েছে।’

কুমিল্লার তিতাস এলাকা থেকে খোকন মিয়া নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে জেলা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। খোকন মিয়া নামে ওই যুবক তার ফেসবুক আইডি থেকে ৭ ও ১০ জুলাই যথাক্রমে ‘মাথা কাটা থেকে সাবধান হুশিয়ার’ এবং ‘একটি বিশেষ সংবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিতে পদ্মা সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে মানুষের মাথা খুব প্রয়োজন। তাই মানুষের মাথা কেটে নেয়া হচ্ছে’ শিরোনামে দুটি স্ট্যাটাস দেন।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘তার দেয়া স্ট্যাটাস পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি এসব শেয়ার করেছেন। অন্যরা করেছে তাই তিনিও করেছেন। এর পেছনে অন্য কোনও স্বার্থগত কারণ পাওয়া যায়নি।’


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ