গরিব হচ্ছে নিঃস্ব, ধনীরা হচ্ছে বিত্তশালী

Pub: Saturday, July 11, 2020 12:41 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তৈমূর আলম খন্দকার

করোনা মৃত্যুর পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অন্যান্য মৃত্যুর মিছিল, লঞ্চডুবি আগেও ছিল, এখনো আছে, কিন্তু কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আলোর মুখ দেখেনি বা তদন্তের আলোকে ফলপ্রসূ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না তাও জনগণ জানে না। তবে এবারে পোস্তগোলার লঞ্চ দুর্ঘটনাকে নৌপ্রতিমন্ত্রী হত্যা বলে মন্তব্য করেছেন, এখন দেখা যাক হত্যাকারী এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী পরিমাণ শাস্তি কার্যকর হয় (!) মাদক কারবারি বা চিহ্নিত সন্ত্রাসী এনকাউন্টারে মৃত্যু এবং প্রতিনিয়ত বর্ডার এলাকায় ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশীদের হত্যার সংবাদ সমভাবে, সমমেজাজে দেশবাসী গ্রহণ করে না।

কারণ বর্ডারে বাঙালি হত্যা (যার প্রতিবাদ শুধু ফ্লাগ মিটিংয়ে সীমাবদ্ধ) প্রতিটি দেশবাসীর মন মগজে বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে। বিনা পাসপোর্টে বর্ডার ক্রস করলে কোনো দেশে মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়? কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করার চেষ্টা করে তখন তো কোনো ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড গুলি করে হত্যার সংবাদ শোনা যায় না। হৃদয় নিংড়ানো স্বাধীনতা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায় যখন বর্ডার এলাকায় বাংলাদেশীকে ভারতীয় বাহিনী ঠুনকো অজুহাতে আমাদের নাগরিকদের হত্যা করে। কোনো কারণেই কালো বাজার, স্মাগলিং বা অবৈধ পন্থায় বর্ডার ক্রসকে সমর্থন করা যায় না, কিন্তু এর অর্থ কি বর্ডার ক্রস করলেই হত্যার জন্য গুলি? এর জন্য অন্য কোনো বিচারব্যবস্থার বিধান চালু করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কি কোনো প্রকার দায়দায়িত্ব নেই?

মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয়েছে ‘বজ্রপাত’, যার ওপরও বিজ্ঞানীদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে পবিত্র কুরআন শরিফে এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। গত তিন বছরে বজ্রপাতে মৃত্যু সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। মিডিয়ার তথ্য মতে চলতি বছর জুনের প্রথম সপ্তাহ দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০-এর কাছাকাছি। এপ্রিলে ২১ জন হলেও শুধু মে মাসের এক-তৃতীয়াংশ সময়ে মারা গেছেন শতাধিক মানুষ। ২০১৮ সালের এপ্রিলে মারা যান ৭৬ জন। ২০১৭ সালের একই সময়ে মৃতের সংখ্যা ছিল ৩২ জন। এর আগের বছর ছিল ৪৩ জন। ওই বছর প্রায় ৩৫০ জন মারা যাওয়ায় সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করলেও বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রস্তুতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। শোনা গিয়েছিল যে, এ জন্য তালগাছ বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করা হবে। কিন্তু পদক্ষেপ এখনো নেয়া হয়নি।

‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে সরকারের এক নতুন ঘোষণা জনগণের ওপর আবির্ভূত হয়েছে। ঘোষণাটি হলো করোনা টেস্ট করাতে জনপ্রতি ২০০ এবং বাড়িতে গিয়ে টেস্ট করালে জনপ্রতি ৫০০ টাকা ফি দিতে হবে। পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রে করোনা পরীক্ষা করার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে কি? মিডিয়াতে এ মর্মে কোনো সংবাদ চোখে পড়েনি। তবে পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ বা ভারতে নাগরিকদের অর্থনৈতিক অবস্থান চিন্তা করলে তা বিবেকসম্পন্ন হবে না। কারণ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দরিদ্রতায় জর্জরিত।

যাদের ‘নুন আনতে পানতা ফুরায়’ তাদের পক্ষে কি ২০০ টাকা ফি দিয়ে করোনা পরীক্ষা করার জন্য কি কেউ এগিয়ে আসবে? উপরোক্ত আদেশে সাধারণ দিনমজুর খেটেখাওয়া মানুষদের করোনা টেস্ট করাতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সরকারের অবশ্যই বোঝা উচিত ছিল যে, আমাদের দেশের কত পারসেন্ট লোক সমাজ বা স্বাস্থ্য সচেতন? এত প্রচার প্রপাগান্ডার পরও মিডিয়া খুললেই দেখা যায় যে, শত হাজার লোক মাস্ক ছাড়াই বাজারে, রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করছে। সংক্রমণ ঠেকাতে হলে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে করোনা টেস্ট করানো দরকার। নতুবা গোপনভাবে করোনা সংক্রমিত হতেই থাকবে। কারণ কিছু করোনা রোগী পাওয়া যাচ্ছে, যার কোনো উপসর্গ না থাকলেও করোনাতেই মৃত্যুবরণ করছে। সচেতন থেকে চিকিৎসকরা যেখানে মৃত্যুবরণ করছে, সুস্থ সবল স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ যেখানে সংক্রমিত হচ্ছে, সেখানে খেটেখাওয়া মানুষ দ্বারা গোটা দেশবাসী সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সরকারের উচিত হবে ২০০-৫০০ টাকার বিনিময়ে করোনা টেস্ট পদ্ধতি উঠিয়ে দেয়া। সরকার যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করেছে সেখানে ফি নিয়ে করোনা টেস্টের সিদ্ধান্ত একটি হাস্যরসমূলক ঘটনা বটে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলতেন, ‘গরিব নেহি, গরিবি হটাও’ কিন্তু এখন চলছে গরিব হটানোর অদৃশ্য প্রকল্প। মানুষ কী পরিমাণ গরিব হলে নিজের কিডনি বিক্রি করে? একটি জেলার একই এলাকায় ১৬ জন ভারতে গিয়ে কিডনি বিক্রি করেছে, যার সংবাদ চাউর হওয়ার পর হয়েছে মামলা। কিডনি বিক্রি প্রবণতার হিড়িক রোধ করার জন্য হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন, শুধু নিকটাত্মীয়কে কিডনি দেয়া যাবে। স্বেচ্ছায় কিডনি দিয়ে কোনো স্বজনকে যদি বাঁচানো যায়, তাতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়, কিন্তু আপত্তি ওঠে সেখানেই যখন সরকার বলে যে, বাংলাদেশে গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে (!)। যদি তাই হয় তবে কেন এ দেশের মানুষ ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে কাঠের নৌকায় বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে সাগরেই সলিল সমাধি হচ্ছে? মু-বাবা তাদের শিশুসন্তানদের গলা টিপে হত্যা করছে। এর পেছনে কি শুধু পারিবারিক কলহ দায়ী, নাকি অভাব অনটন থেকে এ হত্যার সূত্রপাত। যে পরিবারে দু’বেলা অন্ন জোটে না সে পরিবারে বিবাদ কলহ ছাড়া আর কী থাকতে পারে?

প্রতিটি সিগনালে গাড়ি থামলে যখন অসহায় ভিক্ষুকদের দেখি তখন রাজধানীর চাকচিক্য ম্লান হয়ে যায়। জুমার নামাজে প্রতিটি মসজিদের সামনে ভিক্ষুকদের জটলা যাদের হাড্ডিসার বদন এবং ক্ষুধার্ত চেহারা দেখলে সরকারের প্রচারিত ‘উন্নয়নের চেহারা’ কালো ছায়ায় ঢেকে যায়। সরকার এ ধরনের কথা প্রচার করে নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য, কিন্তু সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা প্রচার করে বহুগুণে শুধু সরকারের কিছু বদান্যতায় প্রত্যাশায়। তবে তাদের এ প্রত্যাশা বিফলে যায়নি, কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ ছেড়ে এখন তারা পাঁজেরো গাড়িতে চড়ে। বুদ্ধিজীবীরা জাতির বিবেক, তারাই যখন স্বার্থ হাসিলের জন্য বিক্রি হয় তখন ভুক্তভোগী মানুষেরা তাদের ভাগ্য বিড়ম্বনাকে নিয়তির খেলাই মনে করে। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনে প্রতিটি নাগরিকের অংশীদারিত্বের দাবি জনগণ মনে করে না, যা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি। তবে সে প্রতিশ্রুতি একেবারে বিফলে যায়নি, কারণ একটি শ্রেণী এককভাবে ধনী হয়ে, এখন তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে বিত্তশালী হয়েছেন, বাকিরা রয়েছে প্রতিযোগিতায়, কার আগে কে শত কোটি টাকার মালিক হতে পারবে। যার পেছনে রয়েছে ব্যাংক লুট, মানিলন্ডারিং, বিদেশে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ প্রভৃতি। অনেকেরই পরিবার এখন বিদেশে নিজস্ব প্রাসাদে বসবাস করে, বেগমপাড়া নামে বাঙালি ধনী ললনাদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বিদেশে রয়েছে। বেশি কথা বলে এমন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি ঘরানার রাজনীতিবিদ, বিনা ভোটে নির্বাচিত এমপি দেশে করোনা দুঃসময়ে পাড়ি জমিয়েছে কানাডায়, তার জবানিতেই দেশবাসী জানতে পারল তার পরিবারবর্গ কানাডায় থাকে, অথচ মুখে যখন তার খৈ ফুটত তখন বোঝা যেত যে তার চেয়ে দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই।

সরকার পাটকল শ্রমিকদের Golden Hand Shake-এর মাধ্যমে বাধ্যতামূলক চাকরি থেকে বিদায় করে পাবলিক প্রাইভেট যৌথ অংশীদারিত্বে পাটকল পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাট শ্রমিকদের দাবি বড় বড় আমলাদের চুরি ও দুর্নীতির কারণে পাটকলে লোকসান হচ্ছে। সরকারি প্রেস নোট মোতাবেক লোকসান দিয়ে দীর্ঘ দিন পাটকল ইন্ডাস্ট্রিজ সরকারের পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। সরকারপ্রধান সরকারি আমলাদের পুকুরচুরির ঘটনা নিশ্চয় তিনি জানেন। ‘পাড়’ কেটে বিল কাটার খরচ তুলে নেয়া, সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার নার্সদের খাওয়ার খরচ ২০ কোটি টাকার কথাও তিনি (প্রধানমন্ত্রী) উল্লেখ করে তদন্ত করবেন বলে জানিয়েছেন। সরকার আমলাদের চুরি বন্ধ করতে পারছে না এবং এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কারণ সরকার যখন আমলানির্ভর হয়ে পড়ে তখন চোখের সামনে চুরি হলেও সরকার নির্বাক হয়ে যায়, যেহেতু আমলারাই সরকার টিকিয়ে রখেছে বলে একটি পাবলিক পারসেপশন বাজারে চালু আছে, যার সত্যতাও অবশ্যই রয়েছে।

প্রাইভেট পাবলিক যৌথভাবে পাটকলগুলো চালানোর সরকারের যে যুক্তি তা একটি শুভঙ্করের ফাঁকি মাত্র। প্রাইভেট অর্থাৎ ব্যক্তিমালিকানা। এ জুট মিলগুলো এখন ব্যক্তিপর্যায়ে বিক্রি করা হবে যাদের টাকা আছে তারাই পানির দরে মিলগুলো কেনার সুযোগ পাবে। বিত্তশালীদের ‘অলস’ টাকা বা কালো টাকা ব্যবহারের একটি সুযোগ সরকার করে দিলো। ফলে টাকাওয়ালারা আরো বিত্তশালী হবে বটে, কিন্তু পাটকল শ্রমিকদের পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যাবে। ২০ বছর আগে যে ব্যক্তি ১০ বিঘা জমির মালিক ছিল, সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে জমি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছে এবং যে ২০০ বিঘা জমির মালিক ছিল সে হয়েছে ৫০০ বিঘার মালিক। এমনিভাবে বিভিন্ন সেক্টর ওয়াইজ গরিবকে নিঃস্ব, অন্য দিকে ধনীদের আরো বিত্তশালী করার অদৃশ্য পরিকল্পনা এগিয়ে যাচ্ছে।

অর্থ উপার্জনের জন্য মানুষ বিশেষ করে ধনী ব্যক্তিরা যারা সমাজে বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে অস্বচ্ছ ও অসাধু প্রতিযোগিতায় নেমেছে। হাসপাতাল চালু করেছে সেবার উদ্দেশ্যে নয়, বরং মানুষের শরীর থেকে রক্ত নিংড়ানোর একটি ফাঁদ পাতা হয়েছে। ভাবতে খুবই আশ্চর্য লাগে যে, করোনাভাইরাসের ভুয়া নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়ে টাকা আদায় করে নিচ্ছে। তবে কি টাকা কামানোর প্রতিযোগিতায় মানুষ পশুর চেয়েও নিচে নেমে গেল (!) ডাকাত ডাকাতি করে, চোর চুরি করে সমাজে ডাকাত বা চোর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ রক্তপিপাসুদের সমাজ কোন নামে চিহ্নিত করবে?

সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবিতে স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন যা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন করতে রাষ্ট্র পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, সংবিধানে ঘোষিত নীতিমালা রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করতে পারেনি, কিন্তু এর দায়ভার বহন করতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে এবং এ স্ট্র্যাজিডি এখন জনগণের গা সয়া হয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অশনি সঙ্কেত।

লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)

taimuralyamkhandaker@gmail.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ