নির্বাচন বয়কট ও বিএনপির ভুল

Pub: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ ৪:৪৫ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়া বিএনপির ভুল ছিল কি না সে আলোচনা যেন থামছেই না। যারা বিএনপির ভুল ধরার জন্য সব সময় মুখিয়ে থাকেন, যারা বিএনপি ভুল নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে প্রচার করে দলটির সাধারণ নেতাকর্মীদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি রুষ্ট করতে চান তারা, এমনকি মাঝে মাঝে বিএনপির নেতারাও কথায়, ভাবভঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন যে ওই নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপি ভুল করেছিল। বিএনপি নেতাদের মুখ থেকে এ ধরনের কোনো কথা বের হলে আর রক্ষা নেই। যে সব মিডিয়া বিএনপি ভুল করেছিল প্রচার করতে উৎসাহ বোধ করেন তারা রং মাখিয়ে এমন ভাবে নিউজ হেডলাইন করেন যে বোঝাই যায় তাদের উদ্দেশ্যটা কী। তারা মনে করিয়ে দিতে চান যে দেখো, শুধু আমরাই বলি না। তোমাদের নেতারাও বলেন যে তোমরা ভুল করেছিলে ওই নির্বাচনে না গিয়ে। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আবার আলোচনায় এসেছে সেই পুরনো আলোচনা।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চট্টগ্রাম নগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘এই সরকারের আমলে আগের দু-একটি নির্বাচন বর্জন সঠিক হয়নি। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলকে জনগণের সঙ্গে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করতে চায়।… আমরা মনে করি যে অতীতে দু-একটি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। এরপর থেকে আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমাদের দলকে জনগণের সঙ্গে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করতে চাই। আমরা মনে করি, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেই এই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটাতে হবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে আমরা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলে মনে করছি।’ বিএনপি মহাসচিবের এই বক্তব্যের সংবাদ শিরোনাম ‘এই সরকারের আমলে আগের দু-একটি নির্বাচন বর্জন সঠিক হয়নি’ করার মধ্যে যে বিশেষ উদ্দেশ্য আছে তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যদিও বিএনপি শুধু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনই নয়, উপজেলা নির্বাচনসহ আরও কিছু ছোটখাটো নির্বাচন বর্জন করেছে। বিএনপি মহাসচিব হয়তো সে সব নির্বাচনকে ইঙ্গিত করেই তার বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ স্পষ্ট করে জিজ্ঞেসও করেননি যে ২০১৪ সালের নির্বাচন বিষয়ে তার অবস্থান কী। কিন্তু তার বক্তব্যের পরে আলোচনায় সামনে চলে আসে বিনা ভোটের সেই নির্বাচন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়া বিএনপির ভুল না সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল তা ওই বছরেই স্পষ্ট করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ওই বছরেই, নির্বাচনে না যাওয়া কোনো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে কি আপনি মনে করেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারপারসন রাজধানীর গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলন শেষে বলেছিলেন, ‘আপনি যে প্রশ্নটা করলেন, সেটা সম্পূর্ণ ভুল। বিএনপি, ১৯ দল এবং জনগণ মনে করে, এই নির্বাচনে না যাওয়াটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। এবং এই সরকারের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে জনগণ তা প্রমাণ করে দিয়েছে। কাজেই আমরা কোনো ভুল করিনি, ভুল করেছে এই অবৈধ সরকার। … গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি এবং সেই নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু এবং দেশে ও বিদেশে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।’

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বয়কট করেছিল আওয়ামী লীগও। কিন্তু তার সুফল তারা ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। সে কারণে আজ আর এ প্রশ্ন কেউ তোলেন না যে আওয়ামী লীগের ওই নির্বাচন বয়কট ভুল না সঠিক ছিল। আসলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট বিএনপির ভুল ছিল না। বিএনপির ভুল ছিল কোনোরকম প্রাপ্তি নিশ্চিত না করে ৬ জানুয়ারি থেকে আন্দোলন কর্মসূচি তুলে নেওয়া। নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলনে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত যে বিএনপি সফল ছিল এটা অস্বীকার করলে তা হবে সত্যের অপলাপ। এমন আন্দোলন হয়েছিল তখন যাতে আওয়ামী লীগের মতো একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক দল রাস্তায় দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেনি। আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি প্রার্থীরা অনেকেই এলাকায় যেতে পারেননি। আওয়ামী লীগের মতো একটা বড় দল ডামি প্রার্থী দিয়েও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি করতে পারেনি। যেখানে ১৫১ জন এমপি হলে সরকার গঠন করা যায় সেখানে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টিতে কোনো নির্বাচনই হয়নি। ওই ১৫৪ জনকে অটো বা কাগুজে এমপি হওয়ার অপবাদ নিতে হয়েছে।

সারা দেশে বিরাজমান ছিল এক থমথমে স্তব্ধতা। পুরো দেশ ছিল আন্দোলনকারীদের দখলে। বিনা ভোটের বা নামমাত্র ভোটের এমপিদের অনেকে ফলাফল জানার পরও নিজ নির্বাচন এলাকায় যাননি। তারাও ধরে নিয়েছিলেন, ওই নির্বাচন তিন মাসের বেশি টিকবে না। বিনা ভোটে ১৫৪ এমপি ও সাকুল্যে ৫-৭ শতাংশ ভোট নিয়ে যে একটি সংসদ চলতে পারে না, সেটা তারাও বুঝেছিলেন। কিন্তু এতো অর্জনের পরও বিএনপি ৫ জানুয়ারির পরের দিনই কেন আন্দোলনের মাঠ থেকে নিঃশর্ত প্রস্থান করল সে রহস্য আজও অজানাই রয়ে গেল। কার পরামর্শে কোনো রকম আনুষ্ঠানিক সমঝোতা ছাড়াই নিজেদের কর্মীদের ঘরে ফিরতে বললেন বিএনপি নেতৃত্ব সে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিতই রয়ে গেল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে কী হতে পারত? অনেকেই মনে করেন, তখন আওয়ামী লীগ অনেকটা বিপর্যস্ত ছিল। প্রশাসন ছিল ক্লান্ত ও ভীত। সে অবস্থায় আওয়ামী লীগ সুবিধা করতে পারত না। যারা এটা ভাবেন, তারা হয়তো মাথায় রাখেন না যে ২০০৮ সালের নির্বাচন ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার বা আসার ডিজাইনটা মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে করা হয় না। সে ডিজাইনে যে বিএনপিকে ক্ষমতার সড়কের বাইরে রাখা হয়েছিল সেটা নিয়ে কি এখনো কারও সন্দেহ আছে? তাহলে আর কী হতে পারত? হ্যাঁ, বিএনপি হয়তো প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে পারত। অবশ্য সেটাও নিশ্চিত নয়। বিএনপি যদি তখন প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসত তাহলেই বা কী এমন লাভ হতো? বিএনপিকে ধ্বংস করতে আওয়ামী লীগ ও তাদের ‘সুহৃদদের’ ডিজাইন পরিবর্তিত হয়ে যেত? তাদের ওপর গুম, খুন, নিপীড়ন, হামলা, মামলা, জেল কমে যেত? ২০০৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তো বিএনপি প্রধান বিরোধী দলের আসনে ছিল। ভুলে গেলে চলবে না, তখনই গুম খুনের রেকর্ড গড়েছিল সরকার। বিরোধী দলের চিফ হুইপের ওপর পুলিশের হামলা সর্বকালের নজির ভঙ্গ করেছিল।

অনেকেই হয়তো এই ভেবে সুখ অনুভব করেন যে, তখন তো বিএনপির নেতৃত্বে শক্ত আন্দোলন করা গেছে। ২০১৪ পরবর্তী সময়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে থাকলে সে আন্দোলনটা তো চালাতে পারত। সরি জনাব। ২০১৪ পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি সংসদে বিরোধী দলে ছিল বলেই শক্ত আন্দোলন করতে পেরেছিল, ব্যাপারটা তা নয়। তখন বিএনপির তা করার সাংগঠনিক শক্তি সামর্থ্য ছিল। আর ছিল টার্গেট। তারা কর্মীদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করতে পেরেছিলেন যে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে বিদায় নিচ্ছে। তাই কর্মীরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে ভয় পায়নি। আর এতো বছরে বিএনপির অনেক শক্তি ক্ষয় হয়ে গেছে। সংখ্যার বিচারে নেতাকর্মী না কমলেও তাদের মনোবল কমে গেছে। তাই এখন বিরোধী দলে থাকলেও ২০১৪ পূর্ববর্তী সময়ের তেজ নিয়ে আন্দোলন হয়তো বিএনপি পারত না। তবে বর্তমান আওয়ামী লীগও দল হিসেবে অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় চলে এসেছে। তারা হয়ে পড়েছে পুরোমাত্রায় রাষ্ট্রযন্ত্র নির্ভর। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র আওয়ামী লীগের অনৈতিক কাজ থেকে একটু সরে দাঁড়ালেই যে আওয়ামী লীগ সরকারের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে যত কথাই বলুক। এই সরকারকে তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরাজিত করার আর কোনো সুযোগ নেই। তারা রাষ্ট্রযন্ত্র এমন ভাবে সেট করেছে যে তার বিপরীতে তাদের অধীনে নির্বাচন করে তাদের পরাজিত করা অসম্ভব। কিন্তু এ অবস্থায় নির্বাচন বয়কট করাটাও সমীচীন হবে না। নির্বাচন তখনই বয়কট করা যেতে পারে যখন তা বানচাল করার এবং সুফল ঘরে তোলার সক্ষমতা থাকে। সে সময় না আসা পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলকে চাঙ্গা রাখার কৌশল ধরে রাখতেই হবে। পাশাপাশি দল গোছানো ও আন্দোলনের সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে নেতাকর্মীদের মনে আস্থা তৈরি করতে হবে যে আমরাও পারব।

লেখক

চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

sayantha15@gmail.com

Hits: 0


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ