বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতালিপ্সু মইন, ঘটি আমিনুল করিম ও বিহারি আমিনদের ভূমিকা

Pub: Monday, September 7, 2020 9:23 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অলিউল্লাহ নোমান : বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠায় সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কিছু অফিসার মূল ভূমিকা রাখেন। যদিও সেনাবাহিনীর চাকরীর শপথ হচ্ছে সংবিধান সুরক্ষার পাশাপাশি জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। অথচ সেনাবাহিনীর দ্বারাই দেশে গণতন্ত্র বিনষ্ট হয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। কিভাবে সেনাবাহিনী দেশকে ফ্যাসিবাদী শাসনে নিয়ে গেছে ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিনষ্ঠ করেছে এ রিপোর্টে সেটাই অনুসন্ধান করা হয়েছে।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হয়েছিল। ওইদিনই আন্দোলনের নামে আওয়ামী পাণ্ডারা ঢাকার পল্টনে প্রকাশ্য দিবালোকে ৫ জনকে পিটিয়ে হত্যাসহ দেশব্যাপী ১৫ জনকে হত্যা করে। সেই সূত্র ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষমতা নেয় তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ও তাঁর অনুগত সেনা কর্মকর্তারা। তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে জরুরী অবস্থা জারি করতে বাধ্য করে সেনা অনুগত একটি পুতুল সরকার বসানো হয়। মূলত এ সরকারের কাজ ছিল মইন-মাসুদ গংয়ের হুকুম তামিল করা। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরী অবস্থা জারির মূল কারিগরদের নেতৃত্বে ছিলেন ক্ষমতালিপ্সু সেনা প্রধান মইন ইউ আহমেদ, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সেনা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) তৎকালীন মহাপরিচালক সাদিক আহমেদ রুমি, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এস এস এফ) মহাপরিচালক (ডিজি) সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমি সেনা গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ড. এটিএম আমিন (বিহারি আমিন), চৌধুরী ফজলুল বারী ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব আমিনুল করিম (ঘটি)। তাদের সাথে পরবর্তীতে যোগ হয়েছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী ও ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক এম এ মতিন। জরুরী অবস্থা জারির পর ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরে ফিরে এই নাম গুলোই তখন ছিল আলোচনায়।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে দুই বছর দাপটের সাথে অগণতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক জরুরী আইনের সরকার দায়িত্ব পালন করে। অতঃপর ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি সদ্য প্রয়াত প্রণব মূখার্জি, মইন ইউ আহমেদ এবং শেখ হাসিনার গোপন চুক্তিতে একটি সমঝোতার নির্বাচন হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর, যার বয়ান পরবর্তীতে পাওয়া যায় প্রণব মূখার্জির লেখা আত্মজীবনীতে। মইন ইউ আহমেদ এখন আছেন আমেরিকায়। প্রণব মূখার্জির লেখার কোন প্রতি উত্তর দেননি তিনি। এতেই অনুমান করা যায় বিষয়টির সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত। সেই থেকে দেশে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে।

গণতন্ত্র ধ্বংসকারী সেনাকর্তারা এখন কে কোথায়:

গণতন্ত্র ধ্বংস করতে মূল নেতৃত্বদানকারী মইন ইউ আহমেদ সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী চাকুরীর মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। গোপন সমঝোতার শর্ত মোতাবেক চাকুরী শেষে তিনি নিরাপদে দেশ ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকায় নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত মইন ইউ আহমেদ ঘর থেকে বেশি বের হন না বলে জানা গেছে। ঘর থেকে বের হয়ে জনসম্মুখে আসতে ভয় পান তিনি। জরুরী অবস্থা জারি করে গণতন্ত্র ধ্বংস এবং দিল্লীর কাছে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ায় আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাঁকে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে পারে। এজন্য তিনি জনসম্মুখে যাওয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। সেনাপ্রধানের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেই বই লিখে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। অথচ, অবসরে গিয়ে বই লেখা তো দূরের কথা তাঁর বিরুদ্ধে উঠা নানা অভিযোগের জবাব দেয়া থেকেও নীরবতা পালন করছেন।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী

জরুরী আইনের সরকারের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। বিলুপ্ত রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে আসা এই জেনারেল জিয়া পরিবারের আত্মীয় হিসাবে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে তিনিই সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তখন। মইনের সাথে বিরোধের জের ধরে জরুরী আইনের সময়ে দাপট বেশিদিন টেকেনি । তাঁকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে চাকুরী ন্যস্ত করা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে তাকে অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরও জিয়া পরিবারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার হিসাবে তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার হিসাবে বহাল তবিয়তে রাখা হয়। এমনকি তাঁর চাকুরীর মেয়াদ শেষে অবসরে যাওয়ার আগে আবারো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয় একই পদে।

জরুরী আইন জারি করে ক্ষমতা দখলের নেতৃত্বদানকারী সেনাকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তখনকার কুশিলব জেনােরেলরা কেউই দেশে থাকতে পারেননি। কিন্তু মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা নিয়ে দেশে আছেন। শোনা যায় হাজারো কোটি টাকার মালিক এখন তিনি। দাপটের সাথে দেশেই ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচনও করতে চেয়েছিলেন ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু শেখ হাসিনার নির্দেশেই তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগদেন এবং তাঁকে বিজয়ী করে আনা হয়। রাজনীতির এ অবস্থা বহাল থাকতে আগামী নির্বাচনে তাঁকে বিরোধী দলীয় নেতা বানানোর একটি প্রক্রিয়াও সক্রিয় বলে জানা গেছে।

আমিনুল করিম

জরুরী আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের সাথে জড়িত ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল অব. আমিনুল করিম। সেনাপ্রধান মইনসহ ক্ষমতা দখল করতে আসা সেনাকর্তাদের বঙ্গভবনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে জরুরী আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলে তাঁর ভূমিকা ছিল অন্যতম। বঙ্গভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পিজিআর প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা সেনা কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রপতির ভবনে প্রবেশে বাঁধা দিয়েছিল। আমিনুল করিমের তৎপরতায় সে বাঁধা অতিক্রম করে সেনাকর্তারা ক্ষমতা দখলে বঙ্গভবনে প্রবেশে সক্ষম হন সেদিন।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা মোখলেসুর রহমান চৌধুরী জানান, পিজিআর প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা সেনাকর্তাদের বাঁধা দেয়। এ নিয়ে বঙ্গভবনের গেইটে পিজিআর প্রধানের সাথে আমিনুল করিমের কথা কাটাকাটি হয়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্ষমতা দখল করতে আসা সেনা কর্মকর্তাদের পিজিআরের বাঁধা অতিক্রম করে বঙ্গভবনের ভেতরে নিয়ে আসতে আমিনুল করিমই মূল ভূমিকা পালন করেন। শুধু তাই নয়, বঙ্গভবনে প্রবেশ করানোর পর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে পদত্যাগে চাপ দিতে ভয় দেখানোর জন্য সেনা প্রধানের হাতে অস্ত্রও তুলে দেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে আমিনুল করিম এখন মালেয়শিয়ায় অবস্থান করেছন। ।

এটিএম আমিন

মেজর জেনারেল পদ থেকে অবসরে যাওয়া ড. এটিএম আমিন তখন সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই’র কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের পরিচালক ছিলেন। তিনি বিহারি আমিন হিসাবে পরিচিত। জেনারেল আমিন ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা দখলের মূল কারিগরদের অন্যতম। জরুরী আইন জারির পর থেকে আনসারের মহাপরিচালক হওয়ার আগ পর্যন্ত আমিন নামটি ছিল ত্রাস। তাঁর দাপটের কথা সবারই জানা তখন। সেনা প্রধান মইন উদ্দিনের খায়েস পূরণে এবং দিল্লীর সাথে চুক্তি অনুযায়ী সার্বভৌমত্ব সমর্পণে তাঁর ছিল মুখ্য ভূমিকা। তার তত্ত্বাবধানেই ডিজিএফআই ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার ব্যবস্থা করে। বিস্ময়করভাবে জেনারেল আমিনদের সমঝোতার সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় আসামী হিসাবেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাঁকে। বর্তমানে জেনারেল আমিন একটি বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।

চৌধুরী মোহাম্মদ ফজলুল বারী

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা দখলের সময় তিনি ছিলেন ডিজিএফআই’র পরিচালক। ভারপ্রাপ্ত ডিজির দায়িত্বে ছিলেন সেদিন। তাঁর তৎপরতাও ছিল তখন চোখে পড়ার মত। জরুরী আইন জারির পর তাঁর নাম বেশি উচ্চারিত হত বিভিন্ন মহলে। জরুরী আইনের সময়ই তাঁর চাকুরী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত হয়। তাঁকে নিয়োগ দেয়া হয় আমেরিকায় বাংলাদেশ অ্যাম্বেসিতে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর এপ্রিলেই তাঁর অবসরের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। অবসরের প্রজ্ঞাপনে অকালিন অবসরে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়। চাকুরী থেকে অবসরের পর তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি। এরপর থেকে তিনি আমেরিকায়ই অবস্থান করছেন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিউজটি পড়া হয়েছে 10021 বার

Print

শীর্ষ খবর/আ আ