বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট থেকে আয় করার দাবি হাস্যকর

Pub: মঙ্গলবার, মে ১৫, ২০১৮ ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, মে ১৫, ২০১৮ ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোস্তফা কামাল পলাশ :
বঙ্গবন্ধু-১ নামক কৃত্রিম যোগাযোগ উপগ্রহ নিয়ে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের প্রচার দেখে আমার অবস্থা হয়েছে ঘর পোড়া গরুর মতো যে কিনা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়।

বাংলাদেশ সরকার ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালেস অ্যালেনিয়ার কাছ থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে একটি কৃত্রিম যোগাযোগ উপগ্রহ কিনেছে। বাংলাদেশের পার্সেল পরিবহন কোম্পানি এস এ পরিবহন বা বিদেশি কোম্পানি ডিএইচএল অথবা ফেডেক্স যেমন টাকার বিনিময়ে আপনার মালামাল দেশের ভিতরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছিয়ে দেয় তেমনি একটি আমেরিকান কোম্পানি স্পেসএক্স (SpaceX) যা টাকার বিনিময়ে কোন দেশ বা কোম্পানির বিভিন্ন প্রকার কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশের বিভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে দেয় কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী।

কৃত্রিম উপগ্রহগুলোকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে কিছু নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৃথিবী বা অন্য কোন গ্রহ-উপগ্রহের চার পাশে প্রদক্ষিণ করে বা ঘুরতে থাকে একটি নিদিষ্ট পিরিয়ডে। যেমন, কোন কোন কৃত্রিম উপগ্রহ প্রতি ২৪ ঘণ্টায় আপনি যে শহরে বসবাস করেন সেই শহরের উপর দিয়ে চলাচল করে।

ভূ-পৃষ্ঠ থেকে কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর দূরত্ব অনুসারে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। লো-আর্থ অরবিট (লিও) ও জিয়োসিনক্রোনাস অরবিট (জিয়ো)। লিও স্যাটেলাইট আবার দুই ধরনের। এক ধরনের লিও স্যাটেলাইট উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর উপর দিয়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, অন্য ধরনের লিও স্যাটেলাইট দুই মেরুর উপর দিয়ে চলে না। দুই মেরুর উপর দিয়ে চলাচলকারী কৃত্রিম উপগ্রহ গুলোকে পোলার অরবিটং স্যাটেলাইট বলা হয়ে থাকে। যেগুলো দুই মেরুর উপর দিয়ে চলে না সেগুলোকে বলা হয়ে থাকে নন-পোলার অরবিটিং স্যাটেলাইট। বর্তমান সময়ে প্রায় ১৩০০ লিও ও ৪০০ জিয়ো স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে।

লো-আর্থ অরবিট বা লিও কৃত্রিম উপগ্রহগুলো ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার থেকে ৭০০ কিলোমিটার উচ্চতায় পৃথিবীর চার পাশের ঘুরতে থাকে। পক্ষান্তরে জিও কৃত্রিম উপগ্রহগুলো ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬০০০ কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থান করে পৃথিবী নিজ কক্ষপথে যে গতিতে ঘুরে সেই একই গতিতে জিও কৃত্রিম উপগ্রহগুলো ঘুরতে থাকে। আপনি তুলনা করতে পারেন যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সাম্প্রতিককালে চালু করা দুই লেনের মহাসড়কে পাশাপাশি একটি বাস ও একটি মোটরসাইকেল একই গতিতে চট্টগ্রাম অভিমুখে চলছে। রাস্তায় কোন ট্রাফিক জ্যাম নাই, ফলে বাস ও মোটরসাইকেলটি একই গতিতে চলবে ও একই সময়ে চট্টগ্রামে পৌছবে।

বাংলাদেশ সরকার যে কৃত্রিম যোগাযোগ উপগ্রহটি কিনেছে ফ্রান্সের কোম্পানির কাছ থেকে সেটি একটি জিয়োসিনক্রোনাস অরবিট বা জিয়ো স্যাটেলাইট। বাংলাদেশ সরকার এর নাম দিয়েছে বঙ্গবন্ধু-১। অাকাশে বাহক রকেট মে ১০, ২০১৮, মহাকাশে বাণিজ্যিকভাবে কৃত্রিম উপগ্রহটি কক্ষে নি‌য়ে স্থাপন করার চেষ্টা করবে আমেরিকার মহাকাশ যোগাযোগ বিষয়ক বাণিজ্যিক কোম্পানি স্পেস-এক্স। আমেরিকার ফ্লোরিডা রাজ্যের ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬০০০ কিলোমিটার উঁচুতে প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্যে ভূ-পৃষ্ঠ ত্যাগ করবে। উৎক্ষেপণের পরে চূড়ান্ত স্থানে পৌছাতে সময় লাগবে প্রায় ৮ দিন।

মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ নামক কৃত্রিম যোগাযোগ উপগ্রহটি পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারকে স্পেস-এক্স কোম্পানিকে রকেটের ভাড়া হিসাবে ৭০ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় ৫৬০ কোটি টাকা দিতে হবে।

সরকারের দেওয়া তথ্য মতে বঙ্গবন্ধু-১ নামক কৃত্রিম যোগাযোগ উপগ্রহটিতে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশ ব্যবহার করবে বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাণিজ্যিক ভাবে ভাড়া দেওয়া হবে টাকার বিনিময়ে। প্রশ্ন করতে পারেন ট্রান্সপন্ডার কি? ট্রান্সপন্ডার হল কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহে স্থাপিত একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা ভূ-পৃষ্ঠ থেকে পাঠানো তড়িৎ সিগনাল (বেতার তরঙ্গ) গ্রহণ করে তা বিবর্ধিত করে আবারও সেই সিগনাল প্রাপকের কাছে পাঠাতে পারে । সরকারের তথ্য মতে বঙ্গবন্ধু-১ নামক কৃত্রিম যোগাযোগ উপগ্রহটি ক্রয় করা, সেটি উৎক্ষেপণ করা ও কক্ষপথে স্পেস কেনা বাবদ সর্বমোট প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু-১ নামক কৃত্রিম যোগাযোগ উপগ্রহটির জীবনকাল হবে ১৫ বছর। তবে অনেক সময় বিভিন্ন কারণে কৃত্রিম উপগ্রহ পূর্বে নির্ধারিত পুরো জীবনকাল পূরণ করতে পারে না ।

সরকারের নীতি-নির্ধারকরা বলছে ২০ টি ট্রান্সপন্ডার বাণিজ্যিক ভাবে ভাড়া দিয়ে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার আয় করবে। কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে যাদের সামান্যতম ধারণা আছে তারা সরকারের নীতি-নির্ধারকদের দাবি শুনে মুচকি হাঁসছে।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত নিজে কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ বানিয়ে নিজেদের রকেটের মাধ্যমে তা পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করে থাকে। যেহেতু ভারত নিজেই ভূ-উপগ্রহ বানায় ও তা কক্ষপথে স্থাপন করে তাই এই কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহগুলোর জন্য বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম খরচ হয়।

ভারত মঙ্গলগ্রহে একটি কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ পাঠিয়েছে আমেরিকার ১০ ভাগের এক ভাগ খরচে। এই তো গতবছর ভারত একটি মাত্র রকেটে করে এক সাথে ১০৪ টি কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করেছে। তার মধ্যে একটা মাত্র কোম্পানি একই সাথে ৮৮টি কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করেছে। ভারতের সরকারি ও বেসরকারি অনেক কোম্পানির কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ আছে যেগুলো অনেক কম খরচে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের যে নীতি-নির্ধারক ২০ টি ট্রান্সপন্ডার বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিয়ে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার আয় করবে বলে আশার বাণী শোনাচ্ছে তারা ভারতীয় সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা মূলক বাজারে নিজেদের পণ্য বিক্রয় করতে পারবে কি না? একই কথা প্রযোজ্য সিঙ্গাপুরের কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে অপেক্ষাকৃত কম দামে ক্রেতার কাছে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাণিজ্যিক ভাবে ভাড়া দিতে পারবে কি না?

বাংলাদেশের মতো আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার সরকারেরও খায়েশ হয়েছিল নিজের দেশের একটা কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠাবে। ঐ দেশের রাজনীতিবিদরা তাদের দেশের জনগণকে হাইকোর্ট দেখিয়ে বলেছিল উৎক্ষেপিত কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত ট্রান্সপন্ডার বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিয়ে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার আয় করবে। বাস্তবে দেখা গেছে এক বছরে আয় করে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। মনে করুন দুই বন্ধু একই সাথে একই ব্যবসায় নেমেছে। একজন বাপের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অন্য জন ব্যাংক থেকে ১০ -১৫ % সুদে লোন নিয়ে। লোন নিয়ে ব্যবসা শুরু করা ব্যক্তিটি যদি আপনাকে আশ্বাস দেয় যে আমার উৎপাদিত পণ্যটি বাপের টাকা নিয়ে ব্যবসা শরু করা মানুষটির চেয়ে কম দামে বিক্রি করবো তবে তা বিশ্বাস করা কষ্টকর বৈকি।

বিবিসির সংবাদে প্রকাশ আফ্রিকা মহাদেশের ঘানার ছোট একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ৫০ হাজার ডলার খরচ করে নিজেই বানিয়েছে এক কিউবিক ফুট আকৃতির একটি কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ যাকে কিউবস্যাট বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও এমনি একটি ন্যানো স্যাটেলাইট বানিয়ে ইতিমধ্যেই তা কক্ষপথে পাঠিয়েছে। সুতরাং বলা চলে বঙ্গবন্ধু-১ নামক কৃত্রিম যোগাযোগ উপগ্রহটি বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ নয় সরকারের দাবি অনুসারে।

এবারে অন্য একটি প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করি। বাংলাদেশের মতোই আফ্রিকার অন্য একটি দেশ বিদেশি কোম্পানিকে কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করে কক্ষপথে পাঠানোর চুক্তি করে। সেই সাথে ঐ কোম্পানিকে শর্ত দেয় যে ঐ দেশের একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ঐ কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি প্রতিটি পর্যায়ে সংযুক্ত করতে হবে ও ট্রেইন অাপ করতে হবে। ঐ শর্ত মেনেই সেই বিদেশি কোম্পানি ঐ দেশের জন্য কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করে ও কক্ষপথে পাঠায়। পরে আফ্রিকা মহাদেশের ঐ দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজেই কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি যোগ্যতা অর্জন করে ও বর্তমানে নিজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করছে অন্য দেশের জন্য। আফ্রিকার ঐ দেশের কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ তৈরির সফলতা নিয়ে দ্য ইকনমিস্ট পত্রিকায় বিশেষ সংবাদ প্রকাশ করেছিল প্রায় ২ বছর পূর্বে। সেখানে বাংলাদেশ করলো কি পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের কোন প্রকৌশলী বা বৈজ্ঞানিককে কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ তৈরির প্রজেক্টে সংযুক্ত করেছে বলে আজ পর্যন্ত কোন তথ্য জানতে পারি নি।

একটা কৃত্রিম উপগ্রহের অপারেশনাল লাইফ টাইম হয়ে থাকে ৫ থেকে ১৫ বছর। প্রধানমন্ত্রীর কথা হতে জানতে পেরেছি যে এই কৃত্রিম উপগ্রহের মেয়াদ ১৫ বছর। তার মানে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আবারও কোন কোম্পানিকে কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরির দায়িত্ব দিতে হবে। আবারও দেশের ৩ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশি কোম্পানির কাছে চলে যাবে।

অথচ আফ্রিকার সেই দেশের রাজনৈতিক নেতা বা পলিসি মেকারদের মতো বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা বা পলিসি মেকাররা যদি দূরদর্শী হতো তবে বুয়েটের মেকানিকাল ও ইলেকট্রিকাল বিভাগের অধ্যাপকদের এই কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ তৈরির প্রজেক্টে সরাসরি ট্রেইন অাপ করা সম্ভব ছিল।
Source — Mostofa Kamal Palash


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1316 বার