এক হাসিতে ফাঁসি, আরেক হাসি গুজবের মাসি !!

Pub: শনিবার, আগস্ট ১৮, ২০১৮ ৩:০৮ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, আগস্ট ১৮, ২০১৮ ৩:০৮ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

এম তানজুম :

যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশের পর তিনি আদালতের বারান্দায় হাসিমুখে দু’আঙ্গুলে ‘V’ চিহ্ন প্রদর্শন করায়,সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় শাহাবাগে বিক্ষোভ হয়, ফলশ্রুতিতে জাতীয় সংসদে আইন সংশোধন করে ১৭ই সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ আদালত কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করেন। সেদিন যদি কাদের মোল্লা দম্ভভরে ‘V’ চিহ্ন না দেখাতেন তবে হয়তো শাহাবাগ আন্দোলনই হতোনা । সেদিন হয়তো সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা শাহাবাগের আন্দোলনকারীদের জাগিয়ে তোলে :

“নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালেরই আলখাল্লায়;

গত ২৯ জুলাই দুপুরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম ও ছাত্রী দিয়া খানম বাস চাপায় প্রাণ হারায়। মন্ত্রী শাজাহান খানকে যখন ওই দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি হেসে উঠে জবাব দিলেন, ‘ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে এক সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ জন মারা গেছে। এগুলো নিয়ে আমরা যেভাবে কথা বলি, ওখানে কি এভাবে কথা বলে?’ মন্ত্রীর উপহাসমূলক, বিকৃত, ঐদ্ধত্বপূর্ণ, নির্লজ্জ হাসি ছাত্র সমাজকে ক্ষেপিয়ে তোলে এবং শুরু হয় নিরাপদ সড়কের দাবীতে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ।মন্ত্রী ঐরকম না হাসলে কোন আন্দোলনই হয়তো হতোনা ।শিক্ষার্থীরা শাজাহান খানের পদত্যাগেরও দাবি করে। মন্ত্রী হয়েও তিনি আবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনেরও প্রধান । জাতীয় কবির লেখনীতে অনুপ্রাণিত ছাত্রসমাজ আবারো জেগে উঠে ফেস্টুন হাতে :

“আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে ?
তোমার ছেলে উঠলে মা গো
রাত পোহাবে তবে।”

জনসাধারণ অবাক হয়ে দেখলো তাদেরই সন্তানসম ছাত্র-ছাত্রীরা যানবাহন ও চালকের লাইসেন্সের সঠিকতা যাঁচাইয়ে নেমে রাজপথের শৃংখলা ফিরিয়ে এনেছে । ছাত্রসমাজ মূলতঃ তিনটি স্লোগানকে প্রধান্য দিলো ১/ “We want justice,” ২/‘মন্ত্রী আর পুলিশকে স্কুলে পাঠান, শিক্ষার্থীদের দিয়ে রাস্তা চালান।’ এবং ৩/ “৪৭ বছরের নষ্ট দেশ মেরামতের কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধা মেনে নিন ।” এ আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন পেলেও শাসক শ্রেণি ভীত হয়ে একে দমন করেছে অত্যাচার ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে । আওয়ামী যুবলীগ, ছাত্রলীগের লাঠি ও চাপাতিধারী দুর্বৃত্তরা পুলিশের সহযোগিতায় প্রতিবাদকারীদের ভয় দেখিয়ে, আক্রমন করে রাজপথ ছাড়া করেছে। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের গাড়ি বহরে । শ’ শ’ ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে। আটক হয়েছে অগণিত শিক্ষার্থী, জনতা । এর মধ্যে আছেন প্রখ্যাত এক আলোকচিত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল আলম।সরকারী ভাষায় উপরে বর্ণিত এ সবই গুজব ।ছাত্র-গণ আন্দোলনের এ সময়গুলোতে ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সুশীল গোষ্ঠী মুখে কুলুপ এঁটেছিলো । এবং এই সুযোগে সত্যজিত রায়ের “হীরক রাজার দেশে” সিনেমায় বাউল চরণ দাসের কন্ঠে গাওয়া সেই গানের ঘটনাগুলোই শাসক শ্রেণি ঘটালো :

“কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাইরে!
ও ভাই, কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়!

দেখো, নিষ্পাপ প্রাণ অসময়ে ঝরে;
তবু নীতিবানের টনক নাহি নড়ে!
ও ভাই বিচার চেয়ে কাঁদলো যে, তার
হলো যে জেল, জুটলো প্রহার!
যে রক্ষাকবচ পড়ে মারে, তারতো বিচার নাই!
ওরে ভাইরে; ভাইরে, কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়!!

দেখো, এসব কথা নাই কোন খবরে;
তাতে সুযোগ বুঝে গুজব ছড়ায় ঘরে!
ও ভাই ছোট্ট শরীর রক্তে ভাসে,
অন্ধ সময় কাষ্ঠ হাসে!
আলোর মশাল নিভিয়ে তাই, বুদ্ধি বেঁচে খাই!
ওরে ভাইরে; ভাইরে, কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়!!”

শিক্ষার্থীরা খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবী করেনি , ভোটবিহীন সরকারের পদত্যাগ দাবী করেনি, পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের ব্যাপক জালিয়াতির নির্বাচন যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কৌশল বাস্তবায়নের আওয়ামী কর্মী প্রশিক্ষণ ও মহড়া তা উচ্চারণই করেনি, বাচ্চারা স্বর্ন তামা হওয়া নিয়ে কথা বলেনি, ১লক্ষ ৪০ টন কয়লা গায়েবের হিসাব চায়নি, যুব সমাজ বলেনি কোটা সংস্করণ চাই, বাস ভাড়া কমানোর দাবিও জানায়নি তারা , ছাত্ররা পদ্মা সেতুর অতিরিক্ত খরচ নিয়ে প্রশ্ন করেনি, বাংলাদেশ থেকে ৭৬ লক্ষ কোটি টাকা কোথায় পাচার হয়েছে সেই প্রশ্ন করেনি, ছাত্রীরা সীমান্তে ফেলানী, কুমিল্লার তনু, মিতু, সাগর, রুনি হত্যার বিচার দাবী করেনি, বাচ্চারা ভারতের ১০ লক্ষ লোক প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যায় কেন সেই প্রশ্ন করেনি, বাচ্চারা সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তা ঘাটে পানি জমে যায় কেন সেই প্রশ্ন করেনি, তারা ৫৭ ধারা ভংগ করে কোন কথাই বলেনি, বাচ্চাদের দাবীতে ক্ষমতাসীনদের জন্য অবমাননাকর কিছুই ছিল না !

ছাত্ররা দেখিয়ে দিয়েছে পুঞ্জীভূত অনিয়ম. দূর্ণীতি. ক্ষমতার অপব্যাবহার. দুঃশাসনে মানুষ অতিষ্ঠ । তারা মুক্তি চায় এবং ঘুষ-দূর্ণীতি ও সকল প্রকার ক্ষমতার অপব্যাবহার বন্ধ হলেই নিরাপদ রাষ্ট্র ও নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠিত হবে । তার জন্য প্রয়োজন সুশাসন, ন্যায় বিচার ও অর্থবহ গণতন্ত্র- যা বাংলাদেশে শতভাগ অনুপস্হিত । এখানে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী রাষ্ট্রীয় ক্ষমায় নিরাপদে বিদেশে চলে যায়, অন্যদিকে তিনবারের নির্বাচিত প্রধান মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারের পত্নী কেঙ্গারু কোর্টের ফরমায়েশী দন্ডে নির্জন কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।প্রতিটি ক্ষণে মন হয় কবি গুরুর “ন্যায়দন্ড” কবিতা —

“সত্যবাক্য ঝলি উঠে খরখড়্গসম
তোমার ইঙ্গিতে। যেন রাখি তব মান
তোমার বিচারাসনে লয়ে নিজস্থান।
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।”

যদি অবিলম্বে কোটা বিরোধী ও যানবাহন দূর্ঘটনায় সংগঠিত আন্দোলনের দাবীসমূহ ও এর অন্তর্নিহিত বিপ্লবী সুর, তাল, লয় অনুধাবনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয় তবে আমি তীব্র সুনামী ও ভূমিকম্পের মতো ছাত্র-গণ আন্দোলন ধেয়ে আসবে বলে মনে করছি, যাতে এ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্হা লন্ডভন্ড হয়ে যাবে ! হয়তো যে কোন মুহুর্তে গর্জে উঠবে বীর বাঙ্গালী, মন্ত্রীর উপহাসমূলক, বিকৃত, ঐদ্ধত্বপূর্ণ, নির্লজ্জ হাসির বদলা নেবেই তারা, যদি কোন এক নুরুলদিন ডাক দেয় একবার, শুধু আরেকবার !!

“অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায়
যে, আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়,
আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক, “জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?”

এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, শীর্ষ খবর ডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1397 বার

আজকে

  • ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
  • ৮ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

 
 
 
 
 
আগষ্ট ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« জুলাই   সেপ্টেম্বর »
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
 
 
 
 
WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com