২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা নিয়ে পুলিশী চক্কর

Pub: সোমবার, আগস্ট ২৭, ২০১৮ ১২:৪৪ অপরাহ্ণ   |   Upd: সোমবার, আগস্ট ২৭, ২০১৮ ১২:৪৬ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

শামসুল আলম : ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আওয়ামীলীগের ছোট একটি জনসভায় বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এক ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা সংঘঠিত হয়। এতে শেখ হাসিনা অক্ষত থাকলেও নিহত হয় আ’লীগের ২২ নেতাকর্মী।

ঘটনার সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া লক্ষ্মীপুরে সরকারী ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিলেন। ঢাকায় বোমা হামলার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হন। অতঃপর ঘটনায় আহত আওয়ামীলীগ নেত্রী আইভি রহমান ও শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারিক সিদ্দিকীকে দেখতে প্রধানমন্ত্রী সিএমইএইচে যান। পরের দিন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার বাসায় গিয়ে তাকে সমবেদনা জানাতে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যাওয়ার কথা, এজন্য নিরাপত্তা বাহিনী দিনব্যাপি চেষ্টা করে। কিন্তু সুধাসদনের আশেপাশের সবগুলি রাস্তা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হাজার হাজার কর্মী, গুন্ডা ও সন্ত্রাসী দিয়ে দিবারাত্রি দখল করে রাখা হয়। একপর্যায়ে অগ্রিম টিম হিসাবে পাঠানো প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্যকে মারধর করে সেখান থেকে বের করে দেয় লীগের গুন্ডারা। তদুপরি রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে প্রধানমন্ত্রী সেখানে যেতে পারতেন বটে, কিন্তু পরিস্থিতি আরো অবনতি হওয়ার আশংকায় তা করা হয়নি। তবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, ও কেবিনেট ওই হামলার নিন্দা জানায়, আহত নিহতের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানায়, দোষীদের বিচারের প্রত্যয় ব্যক্ত করে। পরে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজ স্বাক্ষরে শোক ও সমবেদনা জানিয়ে চিঠি পাঠান! সেই চিঠি পৌছাতে গিয়ে আমি নিজে (লেখক) গিয়ে হামলার শিকার হয়েছিলাম।

ওই গ্রেনেড হামলা নিয়ে পুলিশী মামলা হয়, যাতে সন্দেহভাজন হিসাবে কোনো এক ‘জজ মিয়া’কে হাজির করে পুলিশ বিতর্কে জড়ায়। এরাই পরে আ’লীগ সরকারকে গেলায় ‘মুফতি হান্নান’ থিউরি! দুটোই পুলিশের শেখানো সাক্ষী! এছাড়াও পুলিশকে বিশেষজ্ঞ সার্ভিস দিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফবিআই সদস্যরা আসে। জাতীয় সংসদের দাবীর প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের কর্মরত একজন বিচারপতিকে দিয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, হামলায় জড়িত ছিল পার্শ্ববর্তী দেশ (ভারত) ও আওয়ামীলীগের কতিপয় নেতা। নারায়ণগঞ্জের আ’লীগ নেতা শামীম ওসমান আরও কয়েকজন নির্বাসিত আ’লীগ নেতা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-য়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি বড় অন্তর্ঘাত ঘটাতে কিছু টেররিস্টকে রিক্রুট করে। ভারতের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি আয়রন বডি ট্রাকের (ট্রাকের ডামি) চারপাশে গ্রেনেড থ্রোয়িংয়ের মহড়া সম্পন্ন করে এরা। এই রিক্রুট লোকজনের বিশেষ ট্রেনিং সমাপনের পরে তাদেরকে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে পাঠানো হয় এবং ঘটনাস্থলে একাধিকবার ‘রেকি’ সম্পন্ন করে। যেহেতু এদের অধিকাংশই ওই দিনের সভাস্থলের নেতা-কর্মীদের চেনামুখ, সেজন্য ওইদিন অপারেশন চালাতে তাদের তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। ঘটনার দিন হামলাকারীরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে অপারেশন চালায়, যার ফলশ্রুতিতে ২১ আগস্টের ঘটনা ঘটে।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে বুঝতে হলে এর আগে পরের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করতে হবে। এর মাত্র তিন মাস আগে ভারতের ক্ষমতায় আসীন হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস । উল্লেখ্য, কংগ্রেস ক্ষমতায় বসলেই ভারতের ‘বাংলাদেশ পলিসি’ পরিবর্তন হয়ে যায়- অতি আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠে সেদেশের গোয়েন্দা সংস্থা- র! ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফিরে এলে র “রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান” হত্যার ফাইলটি নিয়ে আবার কাজ শুরু করে, এবং খুব দ্রুতই ৩০ মে ১৯৮১ তা বাস্তবায়ন করে। অথচ পূর্বের জনতা সরকারের সময়ে এ ফাইলটি শেলফে তুলে রাখা হয়েছিল। ঐতিহ্যগতভাবেই বাংলাদেশের আওয়ামীলীগ ভারতীয় কংগ্রেসের সাথে একাত্মা। ২০০৪ সালে ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার বিরোধী কর্মকান্ডের পালে হাওয়া লাগে।

হুমায়ূন আজাদের উপর হামলা
———————————
এর আগে ঐবছর ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকৃত রুচির লেখক হুমায়ুন আজাদের উপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ ও রাম-বাম দলগুলো অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বস্তুত আ’লীগ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW-এর পরামর্শে ও বুদ্ধিতে এই বিষয়টিকেই পুঁজি করে একুশে বইমেলায় পাশে হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা করায়। পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে জোট সরকারের পতন দাবী করে। বলা হয় জোট সরকারের ছত্রছায়ায় জামাতীরা আযাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করেছে। গুরুতর আহত আযাদকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। হামলার তিন দিন পর ১লা মার্চ, যখন তার অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নতি হতে থাকে, আ’লীগপন্থী টিভি চ্যানেল আই প্রচার করে- আযাদ ক্লিনিকালী ডেড। এর রেশ ধরে ঢাবিতে আরেক দফা ভাঙচুর হয়। তবে সরকারের দ্রুত অ্যাকশনের ফলে এই ইস্যু নিয়ে আর তেমন সুবিধা করতে পারেনি। সুস্থ হওয়ার পরে ১২ আগস্ট জার্মানীতে স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও তা নিয়ে জল ঘোলা করার চেষ্টা করে।

১০ ট্রাক অস্ত্র আটক
————————-
এরপরেই ঘটে ১০ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনা। ১লা এপ্রিল রাতে ভারতের উলফার ঐ অস্ত্র বাংলাদেশ দিয়ে আনা হবে, এমন খবর আগে থেকেই জানত র (সূত্র: জেইন ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট), অস্ত্র চালানের প্রতিটা স্টেপে তারা সক্রিয় ছিল। সিএফইউএল সার কারখানার জেটিতে রাতের বেলায় ঐ অস্ত্র খালাস করতে গেলে বাংলাদেশ পুলিশের নিম্নপদস্থ দুই কর্মকর্তা সেটি আটক করে। যদিও পরে ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পরে জোট সরকারকে রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে মামলা করে প্রশ্নবিদ্ধ বিচারে জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, গোয়েন্দা প্রধান ও কর্মকর্তাকে ক্যাপিটেল পানিশমেন্ট দেয়া হয়, কিন্তু এটা সহজবোধ্য যে, তৎকালীন জোট সরকার রাজনৈতিকভাবে ঐ অস্ত্র চোরাচালানের সাথে যুক্ত থাকলে সামান্য পুলিশ সার্জেন্টের পক্ষে তা আটক করা সম্ভব ছিল না। অথচ ঐ সময় ডেইলী স্টার রিপোর্ট করে- Joint forces seized 10 truckloads. সরকার জড়িত থাকলে জয়েন্ট ফোর্স তা আটক করার প্রশ্নই উঠেনা? তাছাড়া ২০০৪ সালে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের সাথে সাথে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা দাবী করেন, ঐ অস্ত্র ভারতীয় বিদ্রোহীদের জন্য নেয়া হচ্ছিল, এবং এতে হাওয়া ভবন জড়িত আছে! তিনি এর আন্তর্জাতিক তদন্ত চান। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভারত এবং আওয়ামলীগ ইস্যুটি নিয়ে বিএনপি সরকারের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। কয়েকদিন পরেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ করেন যে, চট্টগ্রাম এখন দক্ষিণ এশিয়ার অস্ত্রের বাজার, যা বিশ্বশান্তির জন্য বিপজ্জনক। তাই খালেদা জিয়ার সরকারের পতন ঘটাতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ’ওয়ান ইলেভেন’ ঘটিয়ে বিএনপিকে সিঙ্গেল আউট করা হয়!

৩০ এপ্রিল ট্রাম কার্ড
১০ ট্রাক অস্ত্র চালানের ঘটনাটি ঘটে ১ এপ্রিল রাতে, এটি এমন সময়ে ঘটনো হয় যে, এর সাথে মিল রেখেই আওয়ামীলীগ সেক্রেটারী জেনারেল আবদুল জলিল তার বিখ্যাত ‘ট্রাম্প কার্ড’ থিউরি মাঠে ছাড়েন। এতে তিনি ঘোষণা করেন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সরকারের পতন ঘটানো হবে, এবং ১লা মে খালেদা জিয়া হবেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী! সেই ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের মধ্যে ছিল প্রশিকা নামক একটি এনজিওর সমাবেশের নামে ১০ লাখ লোকের সমাবেশ করে রাজপথ দখল করা হবে, বিএনপির ১০০ এমপিকে মাথাপিছু ১ কোটি টাকা করে দিয়ে কিনে নিয়ে সংসদে অনাস্থা তৈরি করা হবে। একদিকে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের চাপ, সংসদে বিদ্রোহ, এবং ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে রাজপথ দখল- তাহলে আর সরকারের পতন ঠেকায় কে? কিন্তু সরকারের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেযার ফলে সেই ষড়যন্ত্রও ব্যর্থ হয়।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা
—————————-
এর পরের পরিকল্পনায় ঘটনানো হয় ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট- গ্রেনেড হামলা। আর এর জন্য বেছে নেয়া হয় বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থল! এই জনসভার নির্ধারিত স্থানটি ছিল মুক্তাঙ্গনে, সেটি পুলিশ গোয়েন্তা দিয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ দু’ঘন্টা আগে আওয়ামীলীগ সভাস্থল পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তাদের পার্টি অফিসের সামনে। এত অল্প সময়ে আ’লীগ কেনো স্থান পরিবর্তন করেছিল, সে কারণ অদ্যাবধি প্রকাশ করেনি। যদি আওয়ামীলীগের ঐ অনুষ্ঠানে বাইরের কারো হামলা করার পরিকল্পনা করে থাকত, তবে হঠাৎ স্থান পরিবর্তন করে নিজেদের অফিসের সামনে নেয়ায় ঐ হামলা আর চালানোর কথা নয়। কেননা এরূপ হামলা চালাতে গেলে রেকি করা প্রয়োজন, কে কোন্ দিক দিয়ে ঢুকবে, কোত্থেকে কে কি মারবে, কোথা দিয়ে কে পালাবে, এসব বিষয় আগে থেকে রেকি না করে এ ধরনের জটিল অপারেশন করা যায় না। অথচ মুফতি হান্নানকে পিটিয়ে নেয়া স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, দু’দিন আগেই সে জানতে পারে মিটিংয়ের স্থান পরিবর্তন হবে! এটা কি করে সম্ভব? শেষ মুহুর্তে ভেন্যু চেঞ্জ হবে সেটা দু’দিন আগেই কথিত হামলাকারীকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে! তাহলে পরিস্কার বলা যায়- মিটিং আয়োজনকারীরা জড়িত না থাকলে ঐরূপ কোনো হামলার ঘটনা সম্ভ নয়। তাছাড়া এতগুলো হামলাকারীদের একজনও ধরা পড়লো না, এ হিসাব কি মেলানো যায়?

বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশী পূণঃতদন্তে গ্রেনেড হামলার জন্য বিএনপি সরকারকে দায়ী করা হলেও বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট বলে ভিন্ন কথা। এতে বলা হয়, আ’লীগের সমাবেশে ঐ হামলার ঘটনায় নিজ দলের বেশ কয়েকজন নেতাও এতে জড়িত ছিল। এরই সত্যতা মিলে র‌্যাবের ভাষ্যে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি আবু বকরকে ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে আবু বকর জানায়, ওলামা লীগের ব্যানারে ২১শে আগস্টে আ.লীগের সমাবেশে ঢুকে হুজি জঙ্গিরা গ্রেনেড হামলা চালায়। ৭ নভেম্বর ২০১৪ প্রথম আলো পত্রিকায় খবরে প্রকাশ হয়, রমনার বটমূলে বোমা হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অভিযুক্ত আসামি আবু বকর সিদ্দিককে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, আবু বকর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের হামলায় গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছিলেন। তিনি হুজির আরেক সদস্য আহসান উল্লাহ কাজলসহ আরও কয়েকজন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগে আওয়ামী ওলামা লীগের ব্যানার নিয়ে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে শেখ হাসিনার সমাবেশে ঢুকেছিলেন। ঐ হামলাকারীদেরকে আশ্রয় প্রশ্নয় দিয়েছিলেন আওয়ামী ওলামা লীগের তৎকালীন সভাপতি আখতার হোসেন বেখারী। এ বিষয়ে আওয়ামী ওলামালীগের পরবর্তী সভাপতি ইলিয়াছ বিন হিলালীর কাছে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে বলেন, “২০০৪ সালে ওই ঘটনার সময় ওলামা লীগের তৎকালীন সভাপতি আক্তার হোসেন বোখারীর সাথে জঙ্গিদের যোগাযোগ ছিল বলে আমরা জানি। তাকে শেল্টার দিতেন হাবিবুল্লাহ কাঁচপুরী। গ্রেনেড হামলার সঙ্গে আক্তার হোসেন বোখারীর জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় তাকে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।” আর এই সত্য প্রকাশের কারনে পরে হেলালীকে জবাই করার চেষ্টা করে প্রতিপক্ষরা। তবে ঐ গ্রেনেড হামলা এত পারদর্শী লোক দিয়ে ঘটানো হয় যে, তাতে ট্রাকের চারপাশে গ্রেনেড পড়লেও শেখ হাসিনা অবস্থানরত ট্রাক মঞ্চের ওপরে একটিও গ্রেনেড পড়েনি। এ রহস্য অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়!

হামলার কয়েক মিনিট আগেও নীচের অবস্থানরত আইভি রহমানকে ট্রাকে উঠে আসার জন্য শেখ হাসিনা বার বার অনুরোধ করেন, তবে আইভি রহমান উঠে আসেননি, তারপরেই হামলা হয়, এবং পরে তিনি আহত হয়ে পরে মারা যান। এর ফলে অনেকেই ধারণা করেন যে, হামলার খবর নেত্রী জানতেন। তবে পরিকল্পনাকারীদের ধারনা ছিল হামলায় বেশী হতাহত হলে জনরোষে এবং বিদেশী চাপে বিএনপি সরকারের পতন ঘটে যাবে, যদি সে চেষ্টা সফল হয়নি।

যে গ্রেনেডগুলো ছোড়া হয়েছিল, সেগুলোর উৎস কি? আসামের একটি পত্রিকা লিখেছিল, ওগুলো ভারতীয়। বিএনপিকে ফাঁসাতে গিয়ে পুলিশের ফরমায়েশী তদন্ত রিপোর্টে গ্রেনেড সরবরাহ নিয়ে তিন ধরনের বক্তব্য উপস্থাপন করে: ১)”মুজাফফর শাহের দেয়া গ্রেনেডে হামলা হয়” – ইউসুফ ভাট, একুশে আগস্ট বোমা হামলার বিষয়ে জবানবন্দিতে, ৬ ডিসেম্বর ২০০৯। ২) “হামলার জন্য গ্রেনেড দিয়েছিল মওলানা তাজউদ্দিন” – বিস্তারিত তদন্ত শেষে ১১ জুন ২০০৮ সিআইডির রিপোর্টে জাবেদ পাটোয়ারী (বর্তমান আইজিপি)। “লুৎফুজ্জামান বাবর গ্রেনেড হ্যান্ডওভার করেন” – ১৫১ দিন রিমান্ডে অত্যাচার শেষে দেয়া মুফতি হান্নান কথিত জবানবন্দিতে, ৭ এপ্রিল ২০১১।

এটিএন, চ্যানেল আই, এনটিভির ফুটেজে দেখা যায়, গ্রেনেড হামলার সময় হাসিনা বক্তৃতা করছিলেন, কিন্তু তখন তার রাজনৈতিক সচিব সাবের চৌধুরী অবস্থান করছিলেন জিরো পয়েন্টে? কি করছিলেন উনি সেখানে? উনি কি জানতেন গ্রেনেড হামলা হবে, তাই কি দূরে সরে ছিলেন? হামলার পর বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বুলেটপ্রুফ গাড়িতে করে সুধা সদনে চলে যান এবং গাড়ীটাকে অক্ষত অবস্থাতেই দেখা যায় পীর ইয়ামেনী মার্কেট ও জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত। কিন্তু পরে রাজনৈতিক সচিব সাবের হোসেন চৌধুরী বিদেশী কূটনীতিকদের দেখান হাসিনার গাড়ীতে গুলির তথা স্নাইপার বুলেটের চিহ্ণ। তিনি জানান, গ্রেনেড হামলার পর পরই শেখ হাসিনা যখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউ হতে গাড়ীতে উঠছিলেন এবং গাড়ী চলতে শুরু করে তখন তাকে আশে পাশের কোন বিল্ডিং হতে ঘাতক গুলি করে। অবশ্য কিন্তু বিশ্বস্ত সুত্র জানিয়েছে, সাবের হোসেন নিজের পিস্তল দিয়ে ৬ রাউন্ড গুলি করে গাড়িটিতে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, যাতে মিডিয়াকে বলা যায় হাসিনাকে হত্যার জন্য গাড়িতে গুলি করা হয়েছে! পরে টিভি সংবাদ মাধ্যমে গাড়িতে গুলির কথা প্রকাশ হলে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, এমনকি এফবিআই গাড়ী পরীক্ষা করতে চাইলে সাবের ও আ’লীগ শেখ হাসিনার গাড়ীটি দেখাতে অস্বীকার করে। দাবী করা হয়, গাড়িটা নাকি তারা ধংস করে ফেলেছে! কিন্তু কেনো? কি লুকাতে চেয়েছে তারা? এতবড় আলামত কেনো ধংস করলো?

শেখ হাসিনার গাড়িটা ছিলো বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ বেঞ্জ। গাড়ির ভেতরে গুলি ঢুকেছিল আ’লীগের এমন দাবী মার্সিডিজ কোম্পানির নজরে আসলে তারা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে চ্যালেঞ্জ করে- ঐ গাড়িতে গুলি ঢোকা অসম্ভব। পরের দিন দেশের দৈনিক গুলো, বিশেষ করে আওয়ামি সমর্থক পত্রিকাগুলো বিভিন্ন কল্প কাহিনী ছাপাতে থাকে। Daily Star হাছিনার বরাত দিয়ে ছাপে, “বুলেট প্রুফ মার্সিডিজের কাঁচ ভেঙ্গে ভিতরে গুলি ঢুকেছে” কিন্তু বিষয়টি মার্সিডিজ কোম্পানির নজরে আসলে তারা তীব্র প্রতিবাদ জানায়, এবং পরীক্ষার জন্য গাড়িটি ফেরত চায়। এনিয়ে মার্সিডিজ কোম্পানী চাপ দিলে হাসিনার অফিস লিখিতভাবে আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়।

আওয়ামীলীগ এই গ্রেনেড হামলার জন্য বিএনপি তথা হাওয়া ভবন তথা তারেক রহমানকে দায়ী করে। এই দাবীর সমর্থনে তারা হাজির করে মুফতি হান্নানের একটি কথিত জবানবন্দী, যার ভিডিও দেখা যায় ইউটিউবে। এতে দেখা যায় মুফতি হান্নানকে পাশে থেকে পুলিশ কর্মকর্তারা শিখিয়ে দিচ্ছেন কি কি বলতে হবে। তবে এরপর ২০১১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মুফতি হান্নান আদালতে লিখিতভাবে আগেকার জবানবন্দী প্রত্যাহার করে বলেন যে, তিনি নিজে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী বা লুৎফুজ্জামান বাবরের সঙ্গে হাওয়া ভবনে কখনোই দেখা করেননি। এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও উল্লেখ করেছেন। বরং আগে রিমান্ডে নিয়ে মারধর করে অচেতন অবস্থায় স্বীকারোক্তিতে সাক্ষর করায় পুলিশ! (মুফতি হান্নানকে ইতোমধ্যেই ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে আওয়ামলীগ!), এখন আর তাকে জেরা করার সুযোগ নাই!) সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই মুফতি হান্নানকে ২০০৫ সালের ১ আক্টোবর গ্রেফতার করেছিল বিএনপি সরকার। তারেক রহমান বা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পরিকল্পনায় মুফতি হান্নান গ্রেনেড হামলা করে থাকলে সেই সরকারই কি আবার হান্নানকে গ্রেফতার করবে? আ’লীগের এই ‘হান্নান গল্প’ কি কোনো পাগলও বিশ্বাস করবে?

বিএনপির আমলে সংঘটিত ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালে ৬৩ জেলার বোমা হামলার জন্য আওয়ামীলীগ বিএনপি সরকারকে দোষারোপ করে। প্রশ্ন হলো সরকার কি নিজেরাই এমন অন্তর্ঘাত চালিয়ে নিজের ক্ষমতাকে বিপদাপন্ন করে তোলে? যদি তাই হয়, তবে একই ফরমুলায় আওয়ামীলীগের আমলে সংঘটিত (১৯৯৯ সালের মার্চ যশোরে উদিচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত ১০, ৯ অক্টোবর খুলনায় কাদিয়ানী উপসনালয়ে বোমা বিস্ফোরনে ৭ জন নিহত, ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে ৬৩ কেজি বোমা উদ্ধার, ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবি-র সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণে নিহত ৭, ১৪ মার্চ রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণে নিহত ১১, ৩ জুন গোপালগঞ্জের বানিয়ারচরের গির্জায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত ১০, ১৭ জুন নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলায় শামীম ওসমান ছাড়া নিহত ২১) হামলার জন্য দায়ী আওয়ামীলীগ সরকার!

২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে শেখ হাসিনা আমেরিকাতে গিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট অফিসিয়ালদের সাথে দেখা করে বিএনপি সরকারেকে জাঙ্গবাদী সরকার বলে অভিযোগ করে আসেন। অথচ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মূল প্রতিষ্ঠান জেএমবি সৃষ্টি করেছিল আওয়ামীলীগ নেতা ও মন্ত্রি মীর্জা আজমের দুলাভাই শায়খ রহমানকে দিয়ে, আর বিএনপি সরকার অভিযান চালিয়ে তার কাছে উদ্ধার করে ভারতীয় গোলাবরুদ! ২১ আগস্ট সহ বাংলাদেশে সংঘটিত এইসব অনাসৃষ্টির দায় কি আওয়ামীলীগ ও ভারত এড়াতে পারবে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। শীর্ষ খবর ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1182 বার

আজকে

  • ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
  • ৯ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

 
 
 
 
 
আগষ্ট ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« জুলাই   সেপ্টেম্বর »
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
 
 
 
 
WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com