আন্তর্জাতিক চাপের কি আর শক্তি আছে?

Pub: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮ ৭:০৩ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮ ৭:০৩ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

আফসান চৌধুরী:
একটা সময় ছিল স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপের একটা প্রভাব ছিল। মানুষ পশ্চিমাদেরকে ত্রাতা হিসেবে দেখতো, বিশেষ করে সে সব দেশ যেখানে মানবাধিকার পরিস্থিতির একটা অবস্থান ছিল। শীতল যুদ্ধের সময়ও এটা বেশ শক্তিশালি ছিল এবং বিশ্ব জনমতের উপর ভিত্তি করে তখন অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রভাব ক্রমেই কমে গেছে এবং জাতীয় সরকারগুলো ইচ্ছামতো এ ধরনের চাপকে অগ্রাহ্য করে চলেছে।

প্রসঙ্গ ১৯৭১

একটা ভালো উদাহরণ হলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানের গণহত্যার বিষয়টি খুঁটিয়ে দেখা। পাকিস্তানি জেনারেলরা ভেবেছিলেন যে, তারা বিশ্ব মিডিয়া এবং মতামতকে উপেক্ষা করতে পারবেন এবং যা খুশি করতে পারবেন যেহেতু মার্কিন সরকার তাদের পাশে আছে এবং চীনেরও এক ধরনের সম্মতি রয়েছে। কিন্তু এর পরও বিশ্বমত এতটাই পাকিস্তানের বিপক্ষে ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও কিছু করতে পারতো না। পাকিস্তানই এখানে পরিস্থিতিটা বুঝতে পারেনি এবং কোন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের হস্তক্ষেপই এখানে যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত, সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন নিয়ে এগিয়ে এসেছিল ভারত এবং ইতিহাস তৈরি করেছিল তারা।

কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, আন্তর্জাতিক জনমত ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল যখন তারা ডিসেম্বরের হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যুদ্ধের আগে সমর্থন জোগারের জন্য সারা বিশ্ব সফর করেছিলেন।

কিন্তু এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভারতকে দেয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের সতর্ক বার্তা – দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করতে হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, নিরাপত্তা কাউন্সিলে তারা মাত্র দুই থেকে তিনবার অস্ত্রবিরতির প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারে। জাতিসংঘ জেনারেল অ্যাসেম্বলি যখন একবার প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল, তখন তারা এটাকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি। এ কারণেই, জাতিসংঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলিরও একটা গুরুত্ব ছিল। ভারত তাদের সময় শেষ হওয়ার আগেই দ্রুত যুদ্ধ শেষ করেছিল এবং বাকি ইতিহাস সবারই জানা। এই সময়টা ছিল আন্তর্জাতিক ঐক্যমত এবং অভিমতের সময়, কিন্তু এই যুগটা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

জাতিসংঘ নিজেই তাদের প্রভাব ও সম্মান অনেকটা খুইয়েছে কারণ বিভিন্ন পরাশক্তি আর আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো মেনে চলার ব্যাপারে পরোয়া করে না। অন্যান্য শক্তিগুলো তাই গতানুগতিক পরাশক্তিগুলোর আওতার বাইরে বেড়ে উঠছে। তারা জানে যে বিশ্বমতকে অগ্রাহ্য করে এখন কাজ করা সম্ভব। কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানই ত্রুটিমুক্ত নয় এবং বড় শক্তিধর দেশগুলোও এমন বেপরোয়াভাবে কাজ করেছে যে তাদের আর কোন নৈতিক শক্তি নেই। এটা বিশেষভাবে পশ্চিমাদের জন্য প্রযোজ্য যারা বহুবার আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে। এ কারণেই, সার্বিকভাবে, এসব কণ্ঠস্বর আলাদাভাবে এবং সম্মিলিতভাবে তাদের প্রভাব ও শক্তি প্রতিদিনই একটু একটু করে হারিয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের শক্তি থাকবে কেন?

ইউনূস, শহিদুল, ডাব্লিউসিটি মামলা

বাংলাদেশের দুটো মামলা নিয়ে যথেষ্ট আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে কিন্তু সেগুলো শেখ হাসিনা সরকারের উপর কোন ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ দুটো হলো অধ্যাপক ইউনূস, শহিদুল আলম ও ওয়্যার ক্রাইম ট্রায়াল (ডাব্লিউটিসি) মামলা। অধ্যাপক ইউনূসকে মার্কিন সরকার সরাসরি সমর্থন দিয়েছিল কিন্তু সেটা কোন ধরনের প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। শহিদুল আলমের মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ আহ্বান জানিয়েছেন কিন্তু এখনও তিনি কারাগারে। ডাব্লিউটিসি’র ক্ষেত্রে, এটার পক্ষে অনেক আন্তর্জাতিক লবি সক্রিয় ছিল, কিন্তু কেউই বাংলাদেশের অবস্থানকে নড়াতে পারেনি। অবশ্যই তাদের যে যোগাযোগ ছিল, সেটা আমাদের চোখে বড় মনে হলেও বাস্তবে অনেক কম ছিল।

যে কারণে শেখ হাসিনা এই তিনটি মামলার ব্যাপারেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, সেটা হলো এগুলোকে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখা হয়েছে, মানবাধিকার মামলা হিসেবে নয়। এই মামলাগুলোকে কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্যও দেখতে পেয়েছেন তিনি। কিন্তু মূল বিষয় হলো, এই মানবাধিকার এবং নাগরিক মুক্তি বিষয়ক সংগঠনগুলো তাদের সম্মান এবং পশ্চিমের উপর নির্ভরতা অনেকখানি খুইয়েছে।

সহায়তা নির্ভর অর্থনীতির যুগে, এই ধরনের কণ্ঠস্বরের অনেক শক্তি ছিল কিন্তু এখন তাদের প্রভাব কমে গেছে কারণ এই নির্ভরতার মাত্রা কমে গেছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজের আন্দোলন নিজেই যৌন কেলেঙ্কারি এবং আরও নানা ধরনের অভিযোগে শেষ হয়ে গেছে। অনেকেই এখন ‘উদার’ বিশ্বের ধারণা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন, যেখানে মানবতার সেবার নামে কিছু মানুষের সুবিধার ক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেছে। জনগণের ইমেজের এই অবনতির কারণে সেটা জাতিসংঘের উপরও প্রভাব ফেলেছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘গ্লোবাল ভয়েজ’ও তাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের রাজত্ব

আজকের বিশ্বের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেছে, যে কারণে মিয়ানমার জাতিসংঘ এবং বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করতে পারছে কারণ তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক চীন তাদেরকে শক্তি যোগাচ্ছে। ভারতও যা খুশি, তা করতে এগিয়ে যেতে পারে কারণ তারাও পরোয়া করে না বিশ্ব কি ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্র বা চীন এখানে কি করতে পারে এবং কি করে, সেটা না হয় উল্লেখ না-ই করলাম।

এই পরিবেশে, অভ্যন্তরীণ জনমত এবং দ্বিপাক্ষিক সহায়তাই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নোবেল বিজয়ী কোন বিষয় নয় কারণ পুরস্কারটা নিজেই এখন আর কোন ব্যাপার নয়। আলোকিত ব্যক্তিত্ব এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মূল্য কমে যাওয়ায় তাদের কণ্ঠ আর শোনা যায় না। অনেকের বিরুদ্ধেই যৌন কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান পৃথিবীটা পুরনো ঐতিহ্যগত বিবেচনায় অনেক বেশি অনৈতিক হয়ে পড়েছে।

সম্পর্কের নেটওয়ার্ক আর পশ্চিমে এখন কাজে লাগে না এবং যারা অন্যায়, শাস্তি বা অস্বস্তির শিকার হয়েছেন, তাদের কাছে এটা একটা বাস্তবতা। এই বিষয়টাকে পরিবর্তিত বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে, কারণ তারা কাজ করতে করতে বড় ধরনের জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের সাহায্যের প্রয়োজন।

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1150 বার

আজকে

  • ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
  • ১৩ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

 
 
 
 
 
সেপ্টেম্বর ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
 
 
 
 
WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com