বেগম জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করার প্রশ্নই ওঠে না

Pub: বুধবার, নভেম্বর ৭, ২০১৮ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, নভেম্বর ৭, ২০১৮ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোবায়েদুর রহমান :
আজ ৬ই নভেম্বর মঙ্গলবার। আগামী কাল ৭ই নভেম্বর বুধবার। বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর বাংলাদেশ ভারতীয় আধিপত্য এবং একদলীয় শাসন থেকে সিপাহী জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে মুক্তি লাভ করেছিল। আবার আগামী কাল সেই ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং সরকারের মাঝে দ্বিতীয় দফা সংলাপ। পরদিন অর্থাৎ ৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশ্যে রেডিও ও টেলিভিশন ভাষণের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করবেন। এর পরে আর কোনো সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে না।
খোদা না খাস্তা, যদি ঐক্যফ্রন্টের সাথে সংলাপ ব্যর্থ হয় তাহলে সরকার অত সহজে নির্বাচন করতে পারবে বলে মনে হয় না। এর আগে মওদুদ বলেছিলেন, দাবি না মানলে তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশে রাজনৈতিক ঝড় উঠবে। মাহমুদুর রহমান মান্না বলছেন, গতবারের মতো সরকার ওয়াকওভার পাবে না। তিনি আরও বলছেন, এবারের আন্দোলনের কর্মসূচি হবে দুর্বার। আবার একই সাথে সেই কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ, কোনো রূপ ভাংচুর বা সহিংসতা হবে না।
দুই
এখন পর্যন্ত যেসব ঘটনা ঘটেছে সেসব ঘটনা দেখে সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে এমন কথা বলা যাবে না। সংলাপের ধরণ দেখে মনে হচ্ছে যে, সরকার যেন সংলাপের নামে সময় ক্ষেপন করছে। তা না হলে এরশাদের জাতীয় পার্টির সাথে কিসের সংলাপ? যে জাতীয় পার্টি থেকে এরশাদ স্বয়ং বিশেষ দূত হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর চাকরি করেন, যে জাতীয় পার্টি থেকে ৩ জন মন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে চাকরি করেন তারা কিসের সংলাপে অংশ নেবেন? তাদের সাথে তো প্রধানমন্ত্রীর প্রায় নিয়মিতই দেখা হচ্ছে এবং কথা হচ্ছে। আর এরশাদ তো নিজেই বলেছেন যে, শেখ হাসিনার সাথে তাদের সংলাপের কোনো বিষয়বস্তু নাই। তারা সেখানে যাবেন, চা খাবেন এবং নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে কতগুলো আসন দিতে হবে সেই কথা বলবেন। আবার একথাও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে তিনি সব কথা বলবেন না। কারণ সেই সংলাপে পার্টির অন্য লোকরাও থাকবে। সকলের সামনে সব কথা তিনি বলতে পারবেন না। বরং প্রধানমন্ত্রীর সাথে একা একা দেখা করে তিনি তার দাবি দাওয়া পেশ করবেন। গত ৫ নভেম্বর সোমবার জাতীয় পার্টির সাথে সংলাপ হয়ে গেছে। এই সংলাপটি ছিল নেহায়েৎই সময় নষ্ট করা।
৬ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ৮ দলীয় বাম জোটের সাথে সংলাপ। এই সংলাপ যে অর্থহীন সে কথা আমরা বলছি না। তবে বাম জোট থেকে বার বার বলা হচ্ছে যে, তারা নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে না। এর মধ্যে আবার মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও সংলাপ করতে চেয়েছেন। তিনি তো আজ প্রায় ১০ বছর হলো শেখ হাসিনার অধীনে মন্ত্রীত্ব করছেন। তিনি আবার কি সংলাপ করবেন? আব্দুল লতিফ নেজামীর নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম পার্টির একটি অংশের সাথেও সংলাপ করার কথা। এর আগে বি চৌধুরীর বিকল্প ধারা বা যুক্তফ্রন্টের সাথে সংলাপ করা হয়েছে। এগুলো কেন করা হচ্ছে?
ইতোমধ্যেই কতগুলো মুখোশধারী রাজনৈতিক দলের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। যখন যুক্তফ্রন্ট তথা বি চৌধুরী বিএনপির সাথে ছিলেন তখন ক্ষমতার ভারসাম্যের নামে ১৫০ টি সিট চেয়েছিলেন এবং বিএনপি এত বিশাল দল হওয়া সত্বেও বি চৌধুরী বিএনপিকে ১৫০টির ওপর আসন না দেওয়ার প্রশ্নে অটল ছিলেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করার পর তিনি ডিগবাজি মারলেন কেন? এখন তো দেখি তার পুত্র মাহি চৌধুরীকে শেখ হাসিনা একটি মাত্র আসন দিলেই তিনি মহা খুশি। কোথায় গেল তার ভারসাম্যের রাজনীতি? তিনি বলেছেন, তিনি আরও খুশি হবেন যদি শেখ হাসিনা আবার সরকার গঠন করতে পারেন। সুতরাং এখন প্রমাণ হয়ে গেল যে, তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে বিএনপির যুক্তফ্রন্টে এসেছিলেন যাতে করে যুক্তফ্রন্ট বা ঐক্যফ্রন্টকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা যায়। এরশাদও তার মুখোশ উন্মেচন করেছেন। জামালপুরে তিনি বলেছেন যে, বেগম জিয়া তাকে ৬ বছর জেল দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন বেগম জিয়াকে সারা জীবন জেলেই থাকতে হবে। ইহজীবনেও তিনি আর জেল থেকে বেরোতে পারবেন না। তার ছেলে তারেক রহমানও ইহ জীবনেও দেশে ফিরতে পারবেন না। কত খানি প্রতিহিংসাপরায়ণ হলে এমন নির্লজ্জ উক্তি করা যায়!
সরকার যে লাইন ধরে সংলাপ করছে তার গুঢ় অর্থও এখন পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচনে ৩৯টি দলের মধ্যে ২৯টি দলই নির্বাচন বর্জন করেছিল। মাত্র ১০টি দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এবার সরকার দেখাবে যে, অধিকাংশ দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে আর কম সংখ্যক দল সরকারের বিরোধী রয়েছে। কিন্তু একথা বলা হবে না যে, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের পক্ষে রয়েছে।
তিন
তফসিল ঘোষণার আর দুই দিনও নাই। এরই মধ্যে অর্থাৎ ১ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে অনেক গুলো ডিস্টার্বিং ঘটনা ঘটছে। এক দিকে যখন সংলাপ চলছে অন্যদিকে তখন বেপরোয়া গ্রেফতার চলছে। বিগত ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ৬ ই নভেম্বর পর্যন্ত হাজার হাজার মামলা দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় সাড়ে তিন শত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গায়েবি মামলার কথা এখানে না হয় নাই উল্লেখ করলাম। গত রবিবার একটি বাংলা দৈনিকে শত শত লোকের গ্রেফতারের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আমরা স্থানাভাবে সেই বিস্তারিত বিবরণ পেশ করছি না। অধিকারের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, বিগত জানুয়ারী থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে ৪২২ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১৩ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে সরকারী ভাষায় ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এন কাউন্টার প্রভৃতির মাধ্যমে। যতই সংলাপ এবং ইলেকশন করা হোক না কেন, ঐক্যফ্রন্ট বিশেষ করে বিএনপি যেন এই সব শত শত ব্যক্তির রক্তদানকে ভুলে না যায়।
যেখানে বেশ কয়েকটি জেনুইন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন দেয়নি সেখানে হাইকোর্ট ব্যরিস্টার নাজমুল হুদার প্রায় অস্তিত্বহীন তৃণমূল দলটিকে নিবন্ধন দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে। এই ধরনের রাজনৈতিক বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের জড়িত হওয়া কতটা সমীচীন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ব্যরিস্টার মঈনুল হোসেন এখন রংপুর জেলে আটক রয়েছেন। পুলিশ প্রোটেকশনে তাকে হাজিরা দেওয়ার জন্য রংপুর কোর্টে নিয়ে আসা হচ্ছিল। আওয়ামী লীগের কর্মীরা আদালত চত্বরে পুলিশ কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় তার ওপর হামলা চালায়। তাকে কিল ঘুষি ও চড় থাপ্পড় মারে এবং তার ওপর জুতা ও পচা ডিম নিক্ষেপ করে। যখন আদালত থেকে তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন তখন চারদিকে পুলিশ বেষ্টিত থাকা সত্বেও আবার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা তার ওপর হামলা চালায়। তখন পুুলিশ তাকে হেলমেট পরিয়ে দেয়। এই সময় বিএনপির লোকরা এসে আওয়ামী লীগকে প্রতিরোধ করলে ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে হয়। এর আগে কুষ্টিয়ার আদালতে হাজিরা দিতে গেলে দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা করা হয় এবং এই হামলায় তিনি রক্তাক্ত হন। চিকিৎসার জন্য তাকে মালয়েশিয়া যেতে হয়। মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা এবং মইনুল হোসেনের ওপর হামলার জন্য আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগের একজন কর্মীর কেশাগ্রও স্পর্শ করা হয়নি।
চার
এসবের পাশাপাশি বিএনপির এক ধরণের রাজনীতির মাথা মুন্ডুর আমি কিছুই বুঝতে পারি না। কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে বিএনপির এত মাখা মাখি কেন? কাদের সিদ্দিকীকে ঐক্যফ্রন্টে নেওয়ার জন্য প্রথমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাতে সিদ্দিকীর মোহাম্মদপুর বাস ভবনে গমন করেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। অতঃপর ৩ নভেম্বর রাতে আব্দুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে বিএনপির ৫ জন নেতা কাদের সিদ্দিকীর বাসভবনে যান। এইভাবে দলে দলে তোয়াজ করার পরেও তারা তার মন গলাতে পারেননি। কাদের সিদ্দিকীকে এত তোয়াজ কেন?
চার
সর্বশেষে আর একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক খবর। বেগম জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দিতে সরকার পক্ষ এবং মহল বিশেষকে তৎপর দেখা যাচ্ছে। এমন সর্বনাশা কাজ থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিরত থাকতে হবে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বেগম জিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী ঢাকায় আসেন। তখন জোর গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, বেগম জিয়াকে প্যারোলে নেওয়ার জন্য কোকোর স্ত্রী নেগোশিয়েট করছেন। কিন্তু এদেশের সাধারণ মানুষ এবং বিএনপির নেতৃত্বের অধিকাংশই প্যারোলের প্রবল বিরোধিতা করে বলে শোনা গিয়েছিল। ১৯৭০ সালে জেনারেল আইয়ূব খান যখন রাওয়াল পিন্ডিতে গোল টেবিল বৈঠক ডাকেন তখন শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ঢাকার জেলে ছিলেন। তাকে প্যারোলে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য গোলটেবিল বৈঠকে নেওয়ার উদ্যোগ চলছিল। তখন সিরিয়াস ভাবে বেঁকে বসেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনি নাকি বলেন যে, প্রয়োজন হলে সারা বছর শেখ মুজিব জেলে থাকবেন, তবুও প্যারোলে বের হবেন না। তার এই দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের পর আইয়ূব খান শেখ মুজিবকে মুক্তি দেন এবং রাওয়াল পিন্ডি বৈঠকে নিয়ে যান।
বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোল সম্পর্কিত ইস্যুতে ঠিক ঐ রকম অবস্থান নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তিনি প্যারোলে যাবেন না। প্যারোলে বের হতে হলে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি নিতে হয়। আর যদি বেগম জিয়া মুচলেকা দেন তাহলে এই সরকার তার সেই মুচলেকার ফটোকপি সমস্ত পত্রপত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে প্রচার করবে।
খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা অথবা সংসদ বাতিল ও নিরপেক্ষ সরকার গঠন- এই সব দাবি প্রবল গণ আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করতে হবে। সেই গণ আন্দোলনে জনগণের জয়লাভ করার উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সরকারপক্ষ তার রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের ক্যাডার সহ সেই আন্দোলনকে দমন করতে সক্ষম হয় তাহলেও ঐক্যফ্রন্ট তথা বিরোধী দলের হারাবার কিছু থাকবে না। আর জিতলে এই সরকারের পতন হবে। বিএনপি বিগত ৪ বছর ধরে আন্দোলনের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের দ্ইু মাস আগেও সেই হুমকি-ধামকি। তাদেরকে সংগ্রামের মাঠে নামতে হবে। সরকারী দমন নীতির মুখে হেরে গেলেও বেগম খালেদা জিয়া শেখ মুজিবের ৭০-৭১ সালের জনপ্রিয়তায় উন্নীত হবেন। বাংলাদেশে বেগম খালেদা জিয়া হবেন ৭০ এর শেখ মুজিব বা আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা। সুতরাং তার এবং জনগণের হারাবার কিছু নাই।
journalist15@gmail.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1140 বার