ঐক্যফ্রন্টকে হারানো হলো যেভাবে

Pub: রবিবার, জানুয়ারি ৬, ২০১৯ ১১:২৯ অপরাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, জানুয়ারি ৬, ২০১৯ ১১:২৯ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মো: মতিউর রহমান :
বেগম খালেদা জিয়ার ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার কারণে তাকে জেলে পুরার জন্য সরকার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করে, যাতে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে না পারেন। তফসিল ঘোষণার পর প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই বিএনপির মিটিং-মিছিলে আওয়ামী লীগের কর্মীরা হামলা করেছে। বাংলাদেশের প্রায় সব নির্বাচনী এলাকায় একই চিত্র লক্ষ করা গেছে। এর থেকে বোঝা যায় এ ধরনের কৌশল অবলম্বন কেন্দ্রীয়ভাবে প্রণীত ব্লু-প্রিন্টের অংশ।

মোবাইলে ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হুমকি-ধমকি দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের এলাকা ছাড়া করেছে। সেই সাথে পুলিশ বিএনপির নেতাকর্মীদের ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে কখনো তাদের বাড়িতে গিয়ে এবং কখনো তাদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এলাকা ছাড়তে এবং নির্বাচনের আগে এলাকায় ফিরতে নিষেধ করেছে।

কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের লোকজন নিজেরাই তাদের নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলায় জড়িয়েছে এবং কারাবন্দী করে রাখার ব্যবস্থা করেছে।

ভোটের দিন আওয়ামী লীগের কর্মীরা কেন্দ্র দখলপূর্বক ইচ্ছেমতো সিল মেরেছে এবং কোথাও কোথাও পোলিং অফিসারেরা ভোটারদের ব্যালট পেপারে নৌকায় সিল দিতে বলেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের আকাশ পাতাল ব্যবধানে এর সত্যতা মেলে। বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের জনসভায় লোকজনের বিপুল উপস্থিতি তথা গণজাগরণের সঙ্গে নির্বাচনের ফলাফল দারুণ অসঙ্গতিপূর্ণ। ভোট কেন্দ্রের বাইরের দৃশ্য দেখে ভারত, নেপাল, সার্ক ও ওআইসি ভোট গ্রহণ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তারা কিন্তু কেন্দ্রের ভিতরের দৃশ্য দেখার সুযোগ পাননি।

বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকেই পুলিশ বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্ট না থাকলেও বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার করে এবং আগের মামলায় গ্রেফতার দেখায়। ঘটনা না ঘটলেও গায়েবি মামলা দিয়ে গণহারে বিএনপির শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত রাখে। এ ছাড়া নির্দোষ নেতাকর্মীদের, এমনকি নির্বাচনের দিনও ইসির নির্দেশ উপেক্ষা করে পোলিং এজেন্টদের গ্রেফতার করে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় এই যে, প্রার্থীদের পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এর আগে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনে এ ধরনের কাণ্ড ঘটেনি। বিএনপি নেতাকর্মীদের যদি গ্রেফতারি পরোয়ানা থেকেও থাকে, নির্বাচনের পরে পুলিশ তা তামিল করতে পারত, যদি তারা বিএনপির প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ না করে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করত। নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপির কোনো নেতাকর্মীকে হয়রানি বা গ্রেফতার না করায় ধরে নেয়া যায়, নির্বাচনের আগে তাদের গ্রেফতার ছিল উদ্দেশ্যমূলক।

নিরাপত্তা দেয়ার অজুহাতে পুলিশ বিএনপি প্রার্থীদের বাড়িঘর ঘেরাও করে রেখে নেতাকর্মীদের তাদের বাড়ি-ঘরে ঢুকতে বাধা দিয়েছে এবং প্রার্থীদের থেকে নেতাকর্মীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। ভোলা-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী মেজর (অব:) হাফিজউদ্দিন ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেননি এবং ফরিদপুরের বোয়ালমারী-মধুখালী-আলফাডাঙ্গা এলাকায় বিএনপি প্রার্থী শাহ মোহাম্মদ আবু জাফরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখে, যাতে তিনি ভোটকেন্দ্রের কোনো কারচুপির প্রতিবাদ করতে না পারেন।

কোনো কোনো এলাকায় পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের ডেকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে যেতে বলেছে এবং নির্বাচনের আগে এলাকায় ফেরতে নিষেধ করেছে। পুলিশ অযাচিতভাবে সম্ভাব্য প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের পরিচয় যাচাই করে শুধু আওয়ামী লীগপন্থীদের নাম রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠায় বলে বিরোধী জোট তথা ঐক্যফ্রন্ট অভিযোগ করেছে। এসব কূটকৌশল অবলম্বন করে নির্বাচনে অসমতল মাঠ তৈরি করা হয়েছে। এ সব করে পুলিশ তাদের নিরপেক্ষতা হারিয়েছে এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিএনপির প্রচারণায় ঘাটতি ছিল বলে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, সে সম্পর্কে বলা আবশ্যক যে, বিএনপির মিটিং-মিছিলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা এবং পুলিশের মামলা ও গ্রেফতারের ভয়ে তারা মিটিং-মিছিল করতে পারেনি। বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীদের তারা এলাকা ছাড়া করেছে।

নির্বাচনে বিচার বিভাগের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা এবং সত্যিকার অপরাধমূলক মামলার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তাদের থাকবে এটাই জনমনের প্রত্যাশা। কিন্তু জনগণ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে ‘সুবিধা পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্যে’ পুলিশ গায়েবি মামলা দিয়ে গণহারে বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করলেও নি¤œ আদালত তাদের জামিন দেননি। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিতে হয়েছে। কোনো কোনো উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি-এই কারণে উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সরকার যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে, পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে কিংবা গ্রহণে গড়িমসি করে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান দায়ী নন।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান ন্যায়বিচার পাননি বলে প্রতীয়মান হয়। ইসি, প্রশাসন ও পুলিশ যদি নিরপেক্ষ না থেকে কোনো দলের পক্ষে কাজ করে তাহলে যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে। নির্বাচন ‘অবাধ’ হয়েছে, কিন্তু সুন্দর ও সুষ্ঠু হয়নি। যেনতেনভাবে নির্বাচিত হওয়াই যথেষ্ট নয়, নির্বাচন প্রক্রিয়া শুদ্ধ কিনা সেটাই বিবেচ্য। কালনিরবধি ক্ষমতায় থাকার লোভ নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়েছে জয়, তবে ন্যায্যতা ও গণতন্ত্রের হয়েছে পরাজয়। কলুষিত নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে বিএনপির পাঁচটি আসন পাওয়াকে কেউ কেউ রসিকতা করে বলছেন যে, সরকার ‘দয়া পরবশ হয়ে’ বিএনপিকে পাঁচটি আসন দিয়েছে। উল্লেখ্য ১১০ আসনে ৯১ শতাংশের বেশি ভোট প্রদান ব্যাপক কারচুপির আরেকটি দৃষ্টান্ত। এ সব কারণে বিএনপি জোট তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ইসলামী আন্দোলন এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রশাসন ও পুলিশের দলীয়করণ হলে জাতীয় জীবনে যে এর কী প্রভাব পড়তে পারে, গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তার কিছুটা আলামত পাওয়া গেল। নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে পাওয়া অভিযোগগুলো নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এর থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিধান করা। একটি কথা আছে-Politicians think of the next election and the statesmen think of the next generation. আশা করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নির্বাচনকেন্দ্রিক সঙ্ঘাত ও হানাহানি থেকে রক্ষা করতে এবং শুদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বার্থে ক্ষমতাসীন মহল প্রস্তাবটি বিবেচনা করবে।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1120 বার