পোস্টমর্টেম : জাতীয় নির্বাচন ২০১৮

Pub: রবিবার, মার্চ ১০, ২০১৯ ১:৫৩ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, মার্চ ১০, ২০১৯ ১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তৈমূর আলম খন্দকার :
গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুসরণ ও অনুকরণের মধ্য দিয়েই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হয়ে গেল। ১ মার্চ জাতীয় পত্রিকায় এই মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার (মাহবুব তালুকদার) বলেছেন, ‘ডিএনসিসিতে একটি অপূর্ণাঙ্গ নির্বাচন হয়েছে।’ এক কেন্দ্রে মোট ভোটার চার হাজার ৯৭৭; অথচ ৪ ঘণ্টায় ভোট পড়েছে ৮৬টি। এটা জাতীয় পত্রিকা রিপোর্ট করেছে। জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ব্যান্ডসঙ্গীত শিল্পী শাফিন আহমেদের মতে- ‘ভোটাররা নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।’ ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ‘ডিএনসিসিতে ভোটারের উপস্থিতি কম ছিল।’ শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি বলেছেন, ‘মেয়র পদে মেয়াদ কম বলে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল।’ অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জোরগলায় বলেছেন, ‘সব কেন্দ্রেই ভোটারদের প্রচণ্ড ভিড় ছিল।’ দুই কেবিনেট মন্ত্রীর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। তবুও বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই এ কারণে যে, শপথ নেয়া উচ্চ পদধারীরা কে কী বললেন তা নিয়ে জাতি এখন আর মাথা ঘামায় না বা জাতির কোনো প্রকার মাথাব্যথা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তবে জনগণের মধ্যে চরম হতাশা ও তিক্ততা সৃষ্টি হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ কর্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডিএনসিসি নির্বাচনের পরক্ষণেই বলেছেন, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার আনার দায়িত্ব আমার নয়।’ এ কথাই যদি সঠিক হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীকে ভোট দিতে ভোটারদের জন্য নিরাপত্তামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা কার দায়িত্ব? ভোটাররা যে ভোট দেয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, এর ব্যর্থতা কার ওপর বর্তায়? জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কর্মকর্তারা সপরিবারে বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন। বাড়ি থেকে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে আনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নেই বলে দাবি করা তবুও কিভাবে সম্ভব? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৯ মোতাবেক ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব’ নিম্নরূপ-

(১) রাষ্ট্রপতি পদে ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের পর ন্যস্ত থাকিবে এবং নির্বাচন কমিশন এই সংবিধান ও আইনানুযায়ী (ক) রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন, (খ) সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন, (গ) সংসদে নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করিবেন এবং (ঘ) রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত করিবেন।

(২) উপরিউক্ত দফাসমূহের নির্ধারিত দায়িত্বসমূহের অতিরিক্ত যেরূপ দায়িত্ব এই সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের দ্বারা নির্ধারিত হইবে, নির্বাচন কমিশন সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন।

অধিকন্তু, ১৯৯২ সালের ১ ডিসেম্বর আফজল হোসেন বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার মামলায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৯-এর ব্যাখ্যায় হাইকোর্ট ডিভিশন (রিট নং-৪০৪০/১৯৯২) মন্তব্য করেন, ‘The Election Commission however must work within the framwork of the law made by Parliament concerning election matters and must not travel beyond the law and arrogate to itself powers not enjoined by law or act on fields prohibited by law but when the law is silent, not expressly providing a thing to be done or not to be done, the Election Commission has plenary power to act under Article 119 of the Constitution which is the reservoir of power for the Election Commission to act for the onward purpose of ensuring a free, fair and impartial election with expedition.Õ (Reported in DLR 45 C 1993, Page-255).
অর্থাৎ, ‘সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য আইনে কোথাও অস্পষ্টতা থাকলে সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ মোতাবেক একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন যেকোনো ক্ষমতা সংরক্ষণ করে।’ হাইকোর্টের ওই ব্যাখ্যা কেউই আজ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করেননি।

অনুরূপ, ভারতে ১৯৭৮ সালে মহীন্দ্র সিং বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ভারত মামলায় একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয়ে ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :

“The Supreme Court of India held that such an order under compulsion of circumstances can be served under Article 324 holding that when the provisions of the Representation of People Act is silent without any direction on either way Article 324 is a reservoir of power for the Election Commission to act for the avowed purpose of pushing forward a free and fair election with expedition and the order of the commission was upheld.” [Reported in AIR 1978(S.C.) 851].

একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রধান অংশীদার হলো ভোটার। ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত করার দায়িত্ব যদি সিইসির না থাকে বা তিনি যদি দায়িত্ব নিতে না পারেন তবে শপথবাক্য পাঠ করে তিনি কেন এ দায়িত্বে বসে সব সুবিধা ভোগ করছেন? সংবিধানের তৃতীয় তফসিলের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ৭ উপ-অনুচ্ছেদ মোতাবেক সিইসি যে শপথবাক্য পাঠ করে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তা নিম্নরূপ-

‘আমি, …, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (বা ক্ষেত্রমতো নির্বাচন কমিশনার) নিযুক্ত হইয়া সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত আমার পদের কর্তব্য পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব, আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব এবং আমার সরকারি কার্য ও সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হইতে দিব না।’

‘বাড়ি থেকে ভোটার আনার দায়িত্ব নাই’ বলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলেননি, বরং তিনি সংবিধান লঙ্ঘন ও শপথ ভঙ্গ করেছেন। এমন কথা বলে নিজের ব্যর্থতার সাফাই গাওয়া যায়, কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জিত হয় না; বরং যাদের টাকা দিয়ে ঠাটবাট চলে তাদের সাথে তামাশা করা হয়। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জোর দাবি উঠেছে, কোনো দিন যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, নিশ্চয়ই সাংবিধানিক চেয়ারে বসে সংবিধানবিরোধী কথা বলার জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে। তবে এ জন্য জনগণের প্রত্যাশিত ভূমিকা থাকা দরকার।

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
taimuralamkhandaker@gmail.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1069 বার