মালদ্বীপের পার্লামেন্ট নির্বাচন:নির্বাসিত নাশিদের দল এমডিপি’র অভূতপূর্ব জয়

Pub: মঙ্গলবার, এপ্রিল ৯, ২০১৯ ১:৩৬ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, এপ্রিল ৯, ২০১৯ ১:৩৬ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

০১.
নির্বাসন থেকে ফিরে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে আবারও ক্ষমতার ধারপ্রান্তে মালদ্বীপের সাবেক নির্বাচিত গনতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের দল মালদিভিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি (এমডিপি)।

গত ৬ এপ্রিল,২০১৯ এ ৮৭ আসন বিশিষ্ট পার্লামেন্ট নির্বাচনে নাশিদের দল এমডিপি ৬০-৬৮ অাসন পেতে যাচ্ছে চুড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে তেমনটাই মনে হচ্ছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়ামেনের দল পেয়েছে মাত্র চারটি অাসন।অন্য একটি দল পেয়েছে সাতটি, বাকীগুলো স্বতন্ত্র এমপিদের দখলে।স্বতন্ত্রদের সমর্থনও চলে যেতে পারে নাশিদের পক্ষে।ফলে নাশিদ ও তার দলের এখন জয় জয়কার।ক্ষমতার ধারপ্রান্তে।

মালদ্বীপে এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কাস্টিং ভোট ৮০% যা গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কাস্টিং ভোটের চেয়ে ৯% কম।নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরেই রাজধানী মালেতে এক বক্তৃতায় নাশিদ-রাষ্ট্রীয় সংস্কার,দুর্নীতি দমন, স্হিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের নতুন যুগের সূচনার অঙ্গীকার করেছেন।তিনি বলেন-নতুন এক সূর্যোদয়কে স্বাগত জানাতে যাচ্ছে মালদ্বীপ।সূবর্ণ হলুদ সূর্যোদয়।[নাশিদের দলের প্রতীক হলুদ]

০২.
মালদ্বীপের সাবেক স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমের ৩০ বছরের (১৯৭৮ সাল থেকে ২০০৮) কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিরুদ্ধে একজন কট্টরপন্হী সমালোচক,লেখক ও রাজনৈতিক নেতা হিসাবে নাশিদকে কমপক্ষে ২০ বারের অধিক গ্রেফতার বরণ ও জেল খাটতে হয়েছে।

২০০৩ সালে নাশিদ প্রতিষ্ঠা করেন তার রাজনৈতিক দল মালদিভিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি।২০০৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে তিনি দেশে ফিরেন।২০০৮ সালে মালদ্বীপের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মামুন আবদুল গাইয়ুমের ত্রিশ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে মোহাম্মদ নাশিদ বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।নতুন স্বপ্নের শুরু হয় পথচলা।

চার বছর পর ২০১২ সালে বিচার বিভাগ ও পুলিশের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে জরিয়ে মোহাম্মদ নাশিদ প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন।২০১৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক স্বৈরশাসক মামুন আবদুল গাইয়ুমের সমর্থিত প্রার্থীর নিকট তিনি হেরে যান।
শুরু হয় খারাপ সময়ের।কিন্তু থেমে যাওয়ার মানুষ তিনি নন।২০১৪ সালে নাশিদ মালদিভিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন।তবে ২০১৫ সালের রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত থাকার কাল্পনিক অভিযোগে নাশিদকে ১৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দন্ডিত করা হয়।

যে রায়ের বিরুদ্ধে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ অনেক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন কথা বলেছে।২০১৬ সালে মোহাম্মদ নাশিদ শারীরিক চিকিৎসার নামে রাজনৈতিক নির্বাসনে যুক্তরাজ্য পাড়ি জমান।ফিরে আসেন পাঁচ মাস আগে।

০৩.
এরই মধ্যে ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাশিদের সময়কালের ভাইস প্রেসিডেন্ট এমডিপি সমর্থিত মোহাম্মদ সালেহ প্রগ্রেসিভ পার্টি অব মালয়েশিয়ার প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমের সৎ ভাই আব্দুল্লাহ ইয়ামেনকে পরাজিত করে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।অাবার শুরু হয় নাশিদের সুদিন!

এক পর্যায়ে মালদ্বীপের সুপ্রিম কোর্ট নাশিদ সহ নয় জন রাজবন্দীর দণ্ডাদেশ অবৈধ ঘোষণা করে।ক্ষমা করে দেয়। ফলে ভাগ্য বদলে যায় নাশিদের -যার দরুন গত বছর নবেম্ভরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন থেকে খুব সহজেই দেশে ফিরে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানেই পার্লামেন্ট নির্বাচনে জিতে যায় নাশিদ ও তার দল।এখন ক্ষমতার ধারপ্রাপ্তে।তার এক সময়ের কলিগ ইব্রাহিম মোহাম্মদ সালেহ এখন তার দল মনোনীত মালদ্বীপের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অার তিনি ও তার দল এখন সংখ্যা গরিষ্ঠ পার্লামেন্টে!বলতেই হয় নাশিদের ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে অাসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র,এটা খুব ভালভাবেই হচ্ছে। এযেন একাদশিতে বৃহস্পতি!

গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অাগে সাবেক প্রেসিডেন্টআব্দুল্লাহ ইয়ামেনের অনেক বড় কিছু দুর্নীতির বিশেষ দলিল -প্রমাণ অাল জাজিরা টেলিভিশনের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়,যা স্টিলিং প্যারাডাইজ(stealing paradise) নামে পরিচিত।সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ছিল কোনো পাবলিক টেন্ডার ছাড়াই সিঙ্গাপুরের এক টুরিজম ব্যবসায়ীর কাছে মালদ্বীপের ৫০ টি দ্বীপ লিজ দেওয়া হয়েছে, যেখানে সরাসরি প্রেসিডেন্টের হাত ছিল।এই রকম এক রাজনৈতিক উত্তপ্ত সময়ে গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় যখন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, অন্যদিকে নাশিদ নির্বাসনে,তার দল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে, ফলে জনগণ নাশিদের দল ও প্রার্থীকেই বেচে নেয়।

০৪.
বিগত চারপাঁচ বছরে মালদ্বীপে চীনের বিনিয়োগ ব্যাপক পরিমাণে বেড়ে যায়।টুরিজমের জন্য ১৭টি দ্বীপ লিজ দেওয়া হয় চীনকে,মালদ্বীপকে বিমানবন্দরের মত বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করে দেওয়ার মেগা প্রকল্প হাতে নেয় চীন যা ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দুনিয়া খুব সহজ ভাবে নেয়নি।সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামেনের নিকট অতীতে ভারতকে পাশ কাটিয়ে বেইজিং সফরকেও ভালভাবে নেয়নি ভারত যুক্তরাষ্ট্র।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে মালদ্বীপ ছোট রাষ্ট্র হলেও ভারত মহাসাগরে আধিপত্যের প্রশ্নে মালদ্বীপ- চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা দুনিয়ার কাছে স্ট্র্যাট্রিজিক্যালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। পরাশক্তি গুলো বিশ্বাস করে- অাগামীদিনে সমুদ্র যার দুনিয়া তার।মূলত এজন্যই ছোট দেশ হওয়ার পরেও মালদ্বীপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিগতভাবে মোহাম্মদ নাশিদ একজন ভারত ও পশ্চিমাপন্থী রাজনীতিবীদ।মালদ্বীপে চীনা ঋণের একজন কট্টর সমালোচক নাশিদ।এমনকি নিকট অতীতে নাশিদ ভারতকে মালদ্বীপের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করারও অাহবান জানিয়েছিলেন,যখন সাবেক প্রেসিডেন্টের স্বেচ্ছাচারীতা বেরে গিয়েছিল!

০৫.
মোহাম্মদ নাশিদ সারা বিশ্বে ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন হিসাবেও পরিচিত।অতীতে সমুদ্রের পানির নীচে তার ক্যাবিনেটের বৈঠক মালদ্বীপ যে জলরায়ু জনিত ভয়ানক হুমকির মধ্যে রয়েছে সে বিষয়টিকেই দুনিয়ার সামনে নিয়ে এসেছিল।তিনি দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। পর্যটন শিল্পের আয় দিয়ে কিভাবে একটি রাষ্ট্র, একটি দেশ গড়ে তোলা যায় এবার এগুচ্ছেন সেই পরিকল্পনা নিয়ে।তবে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের সদস্যরা এখন মোহাম্মদ নাশিদের দলের প্রতিনিধি হওয়ায় এটা বলাই যায় -মালদ্বীপের রাজনীতিতে একটা বড় পরিবর্তন অাসছে।
ভারত ও পশ্চিমা শক্তি গুলোর রাজনৈতিক প্রভাব চীনের তুলনায় আবারও মালদ্বীপে নাশিদের স্বগর্বে ফিরে আসায় বেরে যাবে কয়েকগুন, এটাই বাস্তবতা।

০৬.
মোহাম্মদ নাশিদ ভারত বা পশ্চিমাপন্থী বলে তাকে আমি প্রশংসা ও ঘৃণার জায়গা কোনোটাতেই রাখতে চাই না।তবে একটা শিক্ষা বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রিয় মানুষের জন্য নিশ্চয়ই মালদ্বীপের ক্ষমতায় নাশিদের ফিরে আসার মধ্যে রয়েছে-আর সেটা হলো রাজনৈতিক নির্বাসন কখনোই একজন জাতীয় নেতাকে নিঃশেষ করে দেয়না,দিতে পারে না,
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিতের বিপরীত ঘটনাই ঘটে।

অভিনন্দন মালদিভিয়ান ডেমোক্রেটিকপার্টি।
অভিনন্দন মোহাম্মদ নাশিদ।

।।
মো:নিজাম উদ্দিন
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সহসম্পাদক,ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ।
এমফিলগবেষক,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,ঢা:বি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1116 বার