মুক্তির ইশতেহার.৩৪৮ সুদানে জনগণের বিপ্লব:৩০বছরের স্বৈরাচার হটিয়ে সামরিক শাসন জারি!

Pub: শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০১৯ ৪:১১ অপরাহ্ণ   |   Upd: শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০১৯ ৪:১১ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

০১.
ওমর আল বশির এখন সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট!
৩০ বছর সুদানে একক আধিপত্য করেছেন তিনি!নিজ রাষ্ট্রের জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার মত জঘন্য অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।জনগণের বিপ্লবের মুখেই গত ১১ এপ্রিল,২০১৯ আফ্রিকার মুসলিম এই দেশটির স্বৈরাচার শাসক ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

বিক্ষোভের সূত্রপাত গত বছরের ডিসেম্বরে। যখন সরকার রুটি ও তেলের দাম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করে দেয়।জনগণ তখন ব্যাপক বিক্ষোভে দেশব্যাপী রাস্তায় নামে।নেতৃত্ব দেয় দি সুদানিজ প্রফেশনাল এসোসিয়েশন (এসপিএ) নাম একটি সংগঠন যারা সুদানের বিভিন্ন ইউনিয়নের সাথে সংশ্লিষ্ট।মানুষের ক্ষোভ ও বঞ্চনার পরিমাণ যখন খুব বাড়তে থাকে তখন খুব সাধারণ বিষয়েও বিদ্রোহে গর্জে উঠে,প্রতিবাদে রাজপথে নামে।সামাজিক গণমাধ্যমের কল্যাণে ২২ বছরের তরুণী সালার বিপ্লবী স্লোগান সারা দুনিয়াকে আজ জানিয়েছে-সুদানে স্বৈরশাসকের ডেইট এক্সপায়ার্ড,জনগণ এখন মুক্তি চায়।

০২.
ঐক্যবদ্ধ সুদানের রাজনীতি দেশের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের দ্বন্দ্ব সংঘাতে পরিপূর্ণ!উত্তর অঞ্চল মুসলিম অার দক্ষিণ অঞ্চলে ছিল খ্রিস্টানদের প্রভাব।উত্তর অঞ্চলের এক বেদুইন পরিবারে স্বৈরাচার বশিরের জন্ম।ছিলেন সেনা কর্তকতা।১৯৭৩ সালে তিনি অারব ইজরায়েল যুদ্ধে অংশ নেন।পরে ১৯৮৯ সালে রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ওমর আল বশির যখন সুদানের ক্ষমতা দখল করেন তখন ২১ বছর ধরে উত্তর ও দক্ষিণ সুদানের গৃহযুদ্ধ চরম পর্যায়ে চলছিল।যেভাবে ওমর আল বশির সামরিক কায়দায় ক্ষমতা দখল করে ছিলেন ঠিক তেমনি ভাবে ১১ এপ্রিল ২০১৯ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের পর ক্ষমতা হারালেন!

ক্ষমতায় এসেই সুদানের দক্ষিণের বিদ্রোহী নেতা জন গ্যারাঙ্গের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর অভিযান শুরু করেছিলেন বশির।সুদানের দারফুরে নারকীয় গণহত্যার অন্যতম কুশীলব মনে করা হয় প্রেসিডেন্ট বশিরকে,যে গণহত্যায় তিন লাখের অধিক মানুষ জীবন দিয়েছে!যদিও ঐক্যবদ্ধ সুদানকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করাই ছিল তার লক্ষ্য কিন্তু তাকে গণহত্যা,হত্যা, ধর্ষণ,নির্যাতন,হামলা, লুটতরাজে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে ২০০৯,২০১০ সালে দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলো আন্তর্জাতিক আদালত।কিন্তু বশির তা পাত্তা দেননি!বরং গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়েই আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার ঘনিষ্ট মিত্র সৌদি আরব, মিশর ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছেন!
২০১০ ও ২০১৫ সালে লোক দেখানো দুটি নির্বাচনে তিনি পর পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন!যেখানে একমাত্র বশির ই ছিলেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আর কেউ নয়!

০৩.
২০০৫ সালে সরকারের সাথে দক্ষিণ সুদানের সম্পাদিত এক শান্তিচুক্তি মোতাবেক ছয় বছর পর স্বাধীনতার পক্ষে বিপক্ষে গণভোট দিতে বাধ্য ছিল প্রেসিডেন্ট বশির।২০০৩ সাল থেকেই মূলত দক্ষিণ সুদান -inequality, Justice and ethnic discrimination এর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবীতে চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামে।
২০১১ সালে দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৯৯% পরে স্বাধীনতার পক্ষে! ফলে সুদান ভেঙ্গে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।উত্তরের মুসলিম অধ্যুষিত বর্তমান সুদান ও দক্ষিণের খ্রিস্টান অধ্যুষিত নতুন রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান।তবে সুদানকে ভাঙ্গনের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা দেশগুলোর হাত রয়েছে বলে যথেষ্ট অভিযোগ অাছে মুসলিম বিশ্বের।

একটি রাষ্ট্র কেন ভেঙ্গে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়?
নিশ্চয়ই শাসকের উদাসীনতায়,ব্যর্থতায়, না হয় তার অধিক নিষ্ঠুর শাসনের প্রতিবাদে,দায় এড়ানোর সুযোগ শাসকের থাকে না,নেই!সুদান ভেঙ্গে যাওয়ার দায়ও প্রেসিডেন্ট বশির এড়াতে পারবেন না।

০৪.
সুদানের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের চূড়ান্ত পর্ব মূলত দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই শুরু।সুদানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত যে তেল তার ৮০% দক্ষিণ সুদান থেকেই উত্তোলন করা হয়।ফলে দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর থেকে সুদানের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। দ্রব্য মূল্যের দাম বেরে গেছে সীমাহীন ভাবে! এটিএম বুথ গুলো ফাঁকা,টাকা নেই, মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে!পেট্রোল ও ডিজেলের চরম সংকট, লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েও পাচ্ছে না!খাবারের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে!এমন অবস্থায় জনগণের বিদ্রোহী হওয়া ছাড়া রাজপথে নামার বিকল্প থাকেনা,থাকার কথাও না।

শাসক যখন চরম স্বৈরাচার হয়ে যায় টুনকো বিষয়েই তখন ক্ষমতা হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।যার বাস্তব উদাহরণ সুদানের প্রেসিডেন্ট বশিরের পতন।

রুটি ও তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে তা সরকার পতনের অান্দোলনে পরিনত হয়।সমাজের প্রতিটি শ্রেণি পেশার মানুষকে ক্ষুদ্ধ বঞ্চিত করে কারও দ্বারাই ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়।ডিসেম্বরের আন্দোলন ফেব্রুয়ারিতে অারো বাড়তে থাকলে প্রেসিডেন্ট বশির মন্ত্রী সভা ভেঙ্গে দিয়ে এক বছরের জন্য জরুরী অবস্থাও ঘোষণা করেছিলেন।শেষ রক্ষা হয়নি।প্রদেশ গুলোতে বেসামরিক শাসকদের সরিয়ে তিনি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের নিয়োগ দেন,এতে জনগণ গনতন্ত্রের দাবীতেআরো বেশি বিক্ষোদ্ধ হয়ে উঠে।১৮টি প্রদেশের মধ্যে ১৫টি প্রদেশেই -Peace, Justice and freedom শীর্ষক এইআন্দোলনে অচল হয়ে পড়ে!

০৫.
সর্বশেষ গত পাঁচ এপ্রিল থেকে টানা ছয়দিনেরআন্দোলন চলে প্রেসিডেন্ট বশির ও সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টার এর সামনে।হাজার হাজার ছাত্র -জনতা এতে যোগ দেয়।বশিরের বাহিনী বিক্ষুব্ধ জনতার উপর চালায় হামলা গুলি।ফলে নিহতদের সংখ্যা ৩৮(আল জাজিরা) কয়েক হাজার অাহত!মানবাধিকার সংগঠন গুলো বলছে নিহত ও আহতের সংখ্যা অনেক বেশি। সেনা হেডকোয়ার্টারের সামনে থেকে জনতার বিদ্রোহ যখন কোনো ভাবেই দমানো যাচ্ছিল না,এমন এক সময়ে ১১ এপ্রিল ২০১৯ হঠাৎ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ঘোষণা করা হয় কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি জরুরি ঘোষণা দেয়া হবে।সুদানের জনগণ অধীর অপেক্ষায়,কী হয়, কী হবে?

অবশেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে। বশিরের পতন হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করে অজ্ঞাত স্হানে নিরাপদে রাখা হয়েছে। দেশের মন্ত্রী সভা,সংসদ এবং সংবিধান স্থগিত করে সামরিক শাসন জারী করা হয়েছে।বলা হচ্ছে সেনাবাহিনী দুই বছর ক্ষমতায় থাকবে।তিন মাসের জন্য জরুরী অবস্থা এবং এক মাসের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে।২৪ ঘন্টা অাকাশে কোনো বিমান উড়বেনা,সীমান্ত সিল গালা করা হচ্ছে!একটি মিলিটারী কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে যার কাজ হবে দুই বছর পর একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্হা করে ক্ষমতা জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া!

কিন্তু আসলেই কি সামরিক বাহিনী ক্ষমতা ফিরিয়ে দিবে? নাকি স্বৈরাচারের হাত থেকে সুদানের ক্ষমতা এবার সামরিক বাহিনীর হাতেই দীর্ঘদিনের জন্য চলে গেল?

০৬.
আশংকারও যথেষ্ট কারণআছে।সামরিক বাহিনীর যে জেনারেল মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান বা অর্ন্তর্বতী কালীন সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন সেই জেনারেল আহমেদ আওয়াদ ইবনে আউফ ছিলেন স্বৈরশাসক বশিরেরই ভাইস প্রেসিডেন্ট!
জেনারেল আউফের বিরুদ্ধেও বশিরের মত সুদানের দারফুরের কুখ্যাত গনহত্যার অভিযোগ আছে!এছাড়াও যেসব জেনারেলরা এখন সামরিক শাসনের দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের অধিকাংশই সাবেক প্রেসিডেন্ট বশিরের অনুগত বলে অভিযোগ করছেন বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া বেসামরিক নেতৃবৃন্দ। তারা চান সামরিক সরকার নয়,বেসামরিক রাজনৈতিক শক্তির হাতে সুদানের ক্ষমতার পালাবদল হোক।বিপ্লবীরা মনে করছেন জেনারেলরা জনগণের বিপ্লব ছিনতাই করে ফেলেছে,বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেনা আন্দোলনকারীরা।

স্বৈরাচার বশিরের পতন ঘটলেও নবগঠিত সামরিক বাহিনীর মিলিটারি ইন্ট্রিম গভর্মেন্টে মূলত প্রেসিডেন্ট বশিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতারাই রয়ে গেছে। দি সুদানিজ প্রফেশনাল এসোসিয়েশন (এসপিএ) যারা এই বিপ্লবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তারা বলছে বেসামরিক প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে।ত্রিশ বছরের এক সামরিক স্বৈরাচারকে হটিয়ে অান্দোলনকারীরা কি আরেকটি সামরিক সরকারকে অাসলেই মেনে নিবে?

তবে অাপাতত সুসংবাদ হচ্ছে জনগণের বিপ্লবে মুখেই প্রেসিডেন্ট ওমর অাল বশির ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

যদিও অনেকেই মনে করছেন মিশরের জনগণের বিপ্লবের মতই সুদানের বিপ্লবও হাত ছাড়া হতে যাচ্ছে।কারণ উভয়ের পেছনেই হাত ছিল ও অাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা বিশ্বের।

০৭.
সুদানের বিপ্লব সারা দুনিয়ার গনতন্ত্র প্রিয় মুক্তিকামী মানুষের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা-যত বড় স্বৈরাচারই হোক না কেন,জনগণ জেগে উঠলে পতন অনিবার্য।জনগণের এই বিপ্লবে জনগণের সরকার এখনো প্রতিষ্ঠা না হলেও পৃথিবীর সকল স্বৈরাচারের অবৈধ প্রসাদে এই বিপ্লব কাঁপন ধরাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সুদানের বিপ্লবী জনতা স্বৈরাচার প্রেসিডেন্ট বশিরের মসনদে দ্রোহের যে আগুন জ্বালিয়েছে সে আগুন ছড়িয়ে পড়ুক দুনিয়ার সকল স্বৈরাচারের অবৈধ ক্ষমতার প্রাসাদে।

জনগণের বিপ্লব সফল হোক।

।।
মো:নিজাম উদ্দিন
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সহসম্পাদক ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ
এমফিল গবেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢা:বি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1082 বার