চোর-খামোশ-চরিত্রহীনে সাংবাদিক সমাজের প্রতিক্রিয়া!

Pub: শনিবার, এপ্রিল ২৭, ২০১৯ ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, এপ্রিল ২৭, ২০১৯ ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মঞ্জুরুল আলম পান্না :
সাংবাদিকতা পেশার মহত্ত্ব আর আগের মতো নেই, সে কথা বলাই বাহুল্য। পেশাটি তার আত্মমর্যাদা আর জৌলুস হারাতে বসেছে জ্যামিতিক হিসেবে। এর পেছনে নানাবিধ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয় কারণ হিসেবে কাজ করলেও মূল সমস্যাটি সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেই। উদাহরণ হিসেবে দেশজুড়ে আলোচিত অতি সাম্প্রতিক একটি ঘটনাই যথেষ্ট। জাতীয় প্রেসক্লাবে একটা অনুষ্ঠানে টেলিভিশন তারকা শমী কায়সার সাংবাদিকদের ‘চোর’ বলার পরও হাতে গোনা কিছু সাংবাদিকের ফেসবুকের পাতায় প্রতিবাদ ছাড়া এখন পর্যন্ত সাংবাদিক সমাজের নির্লজ্জ নির্লিপ্ততা চোখে পড়ার মতো। এই নির্লিপ্ততারও যথেষ্ঠ কারণ আছে বৈকি। ড. কামাল হোসেন যখন একজন টিভি সাংবাদিককে ‘খামোশ’ বলে চুপ করতে বলেন তখন আমরা অর্থাৎ আমাদের সাংবাদিক সমাজ যে গর্জে উঠেছিল সেই সাংবাদিক সমাজের প্রতিক্রিয়া এক্ষেত্রে হাস্যকরভাবেই নিরব।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন যখন একজন নারী সাংবাদিককে ‘চরিত্রহীন’ বলে গাল দেন তখন যে সাংবাদিক সমাজ হুঙ্কার ছেড়েছিল, জেলায় জেলায় মামলার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল সেই তাদেরকে শমীর বেলায় খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। একটা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থেকে শুধুমাত্র নিজ স্বার্থের কারণে একজন সাংবাদিকনেতা যখন শতশত সংবাদকর্মীর চাকরী খেয়ে যান কিংবা তারই অনুগত কেউ অন্য এক নারী সাংবাদিককে শ্লীলতাহানি করে তখনও আমাদের সাংবাদিক সমাজ মুখ বন্ধ করে থাকে।

ড. কামাল হোসেন কিংবা ব্যারিস্টার মইনুল যে চরম আপত্তিজনক মন্তব্য করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি জঘন্য এবং ঔদ্ধ্যত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন শমী কায়সার। তার দুটি মোবাইল সেট হারিয়ে যাওয়ার কারণে সাংবাদিকদের জাতীয় সংগঠন খোদ প্রেসক্লাবে বসেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রায় অর্ধশত সাংবাদিককে একযোগে চোর বলেছেন, তাদের দেহ তল্লাশি করার স্পর্ধা দেখিয়েছেন। তবুও সময় বিশেষে গর্জে ওঠা সেই সাংবাদিকরা রইলেন একেবারে চুপ। কেন ক্ষেত্র বিশেষে এই নির্লিপ্ততা? কেন এই দ্বিমুখীচারিতা?

ড. কামাল কিংবা ব্যারিস্টার মইনুল সরকার বিরোধী শিবিরের নেতা। তাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা সাংবাদিকরা হয়তো ভেবে নিয়েছিলেন যে, কামাল-মইনুলের বিরুদ্ধে হুঙ্কারে সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়তো নেই-ই, বরং উপর মহলের বাড়তি কৃপা দৃষ্টি লাভ করা যাবে। কিন্তু গত বুধবার প্রেসক্লাবের আপত্তিজনক ঘটনায় সাংবাদিক কমিউনিটির কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চুপ থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করছেন। কারণটা বুঝে নিতে সচেতন পাঠকের না বোঝার কোন কারণ নেই। কিছু সিনিয়র সাংবাদিকের ব্যক্তিত্বহীনতায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন তরুন সাংবাদিকেরা।

মানুষকে ব্লাকমেইল করার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকদের একটি অংশ নির্বিঘেœ বিস্তার ঘটিয়ে চলেছেন হলুদ সাংবাদিকতার। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের অনুগত সাংবাদিকদের একটি অংশ ব্যস্ত থাকেন বিশেষ বিশেষ সুবিধা লাভের আশায়। উচ্ছিষ্ঠ ভোগের সেই ব্যস্ততাকে তাদের ধ্যান-জ্ঞানে রপ্ত করার কারণে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি আর অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তিকে হারিয়ে ফেলছে রাষ্ট্রের চতূর্থ স্তম্ভটি। ফলে রাষ্ট্রশক্তিও সাংবাদিক সমাজের টুটি চেপে ধরার সুযোগ পায় আরও বেশি।

নতজানু সাংবাদিকদের এই অংশটির কারণে প্রকৃত সৎ সাংবাদিকদেরকেও এখন সন্দেহের চোখে দেখা হয়। প্রতিটি সরকারের সময়ে সিনিয়র কিছু সাংবাদিকের সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সাংবাদিকতা পেশা আজ চরম অসন্মান আর হুমকীর মুখে। এসব কারণেই কী তবে শমী কায়সাররা ক্ষমতার দাপটে পুরো সাংবাদিক সমাজকে হুমকী দেয়ার ধৃষ্টতা দেখান?

পুঁজিবাদী এই সমাজ ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি সরকারই চায় যে, গণমাধ্যম ব্যস্ত থাক কেবল তারই গুণকীর্তনে। সরকারের জন্য মারাত্মক বিব্রতকর এমন কোন সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করার ক্ষেত্রে নিশ্চয় অনেক ধরণের রক্তচক্ষু কাজ করে। কিন্তু বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতিতে আমরা রয়েছি যে, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের চাপ না থাকা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিদের একটি বড় অংশ উপযাজক হয়ে স্বআরোপিত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আবদ্ধ রাখেন নিজেদের। কিংবা একই দলীয় মতাদর্শের হওয়ায় অনেক দুর্নীতবাজ বা অপরাধীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশে তাদের অনীহা কাজ করে একান্তই ব্যক্তিস্বার্থে।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যে কারোর মোবাইলই তার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস। তা হারিয়ে গেলে থানায় জিডি করার করার সুযোগ রয়েছে। শমীর মতো একজন সেলিব্রেটির চুরি যাওয়া মোবাইল আমাদের গোয়েন্দা পুলিশ খুব সহজেই উদ্ধার করতে পারতেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কিন্তু তা না করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদের আধাঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হলো আলোচিত ব্যক্তির ক্ষমতার দম্ভে। এক সময়ের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী নাকি ক্ষমতাসীনদের খুব কাছের মানুষ। তাই বুঝি তার বেলাতে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা সেই পরিচিত তারকা সাংবাদিকদের!

শমী কায়সারও ক্ষমতার অহংকারে সম্ভবত তার পিতার পরিচয়ই ভুলে গেছেন। একজন বীর শহীদুল্লাহ কায়সারও সাংবাদিক ছিলেন। তাঁর নাম শুধু জাতীয় প্রেসক্লাবের বোর্ডেই নয়, ইতিহাসের পাতায় ভালবাসার অক্ষরে লেখা থাকবে অনন্তকাল। সেই শহীদ পরিবারের সন্তান একজন শমীর জন্য জন্য নিশ্চয় অন্যান্য শহীদ সন্তানেরাও আজ লজ্জিত!

মঞ্জুরুল আলম পান্না, সাংবাদিক

[email protected]


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ