fbpx
 

ধর্ষণঃ চাই সম্মিলিত প্রতিরোধ

Pub: মঙ্গলবার, মে ১৪, ২০১৯ ১০:১৫ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, মে ১৪, ২০১৯ ১০:১৫ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রবিবার গোটা পৃথিবী জুড়েই পালিত হল বিশ্ব “মা দিবস” । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সবাই ঘটা করে মায়েদের ছবি আপলোড করেছেন । মায়েদের মঙ্গল কামনা করেছেন । আর বাংলাদেশে চলছে মায়ের অবমাননা । বাংলাদেশে যেন সব কিছুই উলটো রথে চলে । সারা বিশ্বে যেখানে নারীদের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, ঠিক সে সময় বাংলাদেশে ধর্ষণের মহোৎসব শুরু হয়েছে । আমরা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছি কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কোন কর্মজীবী নারীই নিরাপদ নন । এইতো কিশোরগঞ্জের নার্স শাহিনুর আক্তারের কথাই বলি যিনি বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীদের প্রতীক । যিনি সেবার এই মহান পেশায় নিয়জিত হয়ে পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন । কিন্তু এই স্বাবলম্বী নারীও বাস ড্রাইভার নামক হায়েনাদের হাত থেকে রেহাই পেলেন না তাকে হেল্পার আর ড্রাইভার মিলে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে । এই বাস ড্রাইভাররা দুইভাবে মানুষের প্রান হরণ করছে । যত্রতত্র বাসের চাপায় হত্যা করছে পথচারীদের আবার নিরীহ একাকী নারীদের দলবেঁধে ধর্ষণ করার পর নির্মমভাবে হত্যা করছে । ধর্ষিতা নারীদের এই মৃত্যুর মিছিল দিনদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ।

আজ নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে ঘরে বাইরে সবখানে । ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড মামলা গুলোতে আইনের ফাঁক গলে অনেক অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায় । আবার মামলার দিরঘসুত্রিতার ফাঁদে পরে একজন ধর্ষিতা যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে সময় পার করে তা শুধু নিযাতিতের পরিবার গুলিই জানে । অপরদিকে ধর্ষক ও হত্যাকারী জামিনে বেরিয়ে মুক্তহাওয়া গায়ে লাগিয়ে আরও শিকার ধরতে ব্যস্ত যায় । মনোবিজ্ঞানীদের মতে একজন ধর্ষক বারবার ধর্ষণে লিপ্ত হয়ে থাকে । একজন ধর্ষক শাস্তি শেষে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবারও একই কাজে লিপ্ত হবার প্রবৃত্তি তার মধ্যে থেকেই যায় । এখনি ভেবে দেখার সময় ধর্ষণের শাস্তি কি হওয়া উচিৎ । সম্প্রতি ভারতে নারী নির্যাতন আইন সংস্কার করা হয়েছে । পাকিস্তানে অনার কিলিং এর বিরুদ্ধে আইন পাশ হয়েছে ।

বাংলাদেশে এখন আইনের সুশাসন বলতে কিছু নেই । তার উপর রয়েছে মামলার দিরঘসুত্রিতা । আর এখন আরেক নতুন ট্রেনড চালু হয়েছে পুলিশবাহিনী দ্বারা ঘটনার মোটিভ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে অপরাধীকে আড়াল করার প্রবণতা ।আর অভিযুক্ত যদি প্রভাবশালী কেউ হয় তা হলেতো কথাই নেই । সে ক্ষেত্রে অপরাধীকে বাঁচাতে, তদন্তের নামে অপরাধের মূল ঘটনাকেই ধামাচাপা দিয়ে দেয়া হয় ।

আমরা সাগর রুনির হত্যাকাণ্ড দেখেছি । ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের খুঁজে বের করার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঙ্কার শুনেছি । এরপর পদ্মা মেঘনায় অনেক জোয়ার ভাটা হয়েছে । ছোট্ট মেঘের জীবনে এসেছে অনেক পরিবর্তন । আর আমরা দেখেছি তদন্তের নামে একের পর এক নাটক মঞ্চস্থ হতে । তদন্তের ভার পুলিশ থেকে ডিবি, ডিবি থেকে র্যাটব বারবার হাত বদল হতে । সম্প্রতি দেখলাম আবারো মামলার তারিখ পিছানো হল । “জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড” সেই চিরাচরিত নিয়মে ঘটনার ধামাচাপা । একই ভাবে তনু হত্যার ঘটনাকে ও মোটামুটি প্রায় ধামাচাপা দেয়া হয়ে গেছে । প্রথমে বলা হয়েছে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে । একপর অনেক নাটকীয়তার পর এখন বলা হচ্ছে হত্যা করার আগে তনুকে ধর্ষণ করা হয়নি । বিষয়টা যেন এমন ‘মারা গেছে কিন্তু তার চোখটা তো বেঁচেছে’ । তনুকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি হয়নি এটা মুখ্য বিষয় নয়, তনুকে ক্যান্টনমেন্টের মতো একটা সুরক্ষিত জায়গায় নিরজ্যাতন করে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে বীভৎস ভাবে হত্যা করা হয়েছে এটাই ধ্রুব সত্য ।

ঠিক তেমনি ভাবে নুসরাত হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই শাহিনুর ধর্ষিত হয়ে মৃত্যুবরন করলো । কোন বিচার বা তদন্ত কি আমরা দেখেছি?একের পর এক অন্যায়, অপরাধ হয় আর রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় খুনিরা থেকে যায় অধরা অস্পৃশ্য । আমরা অদ্ভুত এক বিচারহীনতার দেশে বসবাস করছি । যেখানে যত্রতত্র মানুষরূপী হিংস্র জানোয়ারেরা ওত পেতে আছে । আর সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পরে নারী দেহের উপর । লিবিডো তাড়িত পুরুষাঙ্গের দম্ভে এরা হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে শুধু খোঁজে যোনি । কিন্তু এই যোনি বৃদ্ধা, তরুণী নাকি শিশুর তা এদের কাছে খুবই গৌণ । বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ মাত্র ৮ দিনে ৪১ শিশু ধর্ষিত । এর মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু । ঘরে বাইরে কোথাও কন্যাশিশু নিরাপদ নয় । তবে কি আমরা আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে ফিরে যাচ্ছি?

সেই ৭১ এর বীরাঙ্গনা থেকে শাহিনুর । এর মাঝে আরও হাজার হাজার ইয়াসমিন, শাজনীণ, কল্পনা চাকমা, সীমা, তনু, রিশা, ধর্ষিত হয়েছে । অত্যাচার করে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে । এরপর ছিন্নভিন্ন খুবলে খাওয়া দেহটাকে ফেলে রাখা হয়েছে রাস্তার পাশে, ঝোপেঝাড়ে, ডোবানালা, জঙ্গল, নদী বা খালে বিলে । কখনো পরিচয় সনাক্ত করা গেছে কখনোবা বেওয়ারিশ হিসাবে আঙ্গুমানে মফিদুল ইসলাম লাশ দাফন করেছে । কিন্তু এরা সবাই আমার বোন, বন্ধু, একান্ত আপনজন, একজন নারী ।

তনু বা নুসরাতের মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারেনি । প্রতিবাদে রাজপথ হয়েছে উত্তাল । হত্যাকারীর বিচার দাবিতে, ছোট বড় নারী পুরুষ সবাই পথে নেমেছিল । কিন্তু ফলাফল শুন্য । সরকারের দায়িত্বশীল কারো পক্ষ থেকে জোরালো কোন বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি । কেননা তনুদের জীবনের দাম মাত্র ২০ হাজার টাকা ।

এইতো কয়েক বছর আগে ঢাকায় উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্রী রিশাকে কুপিয়ে ফেলে রাখে তার স্কুলের সামনে৷ কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ আহত রিশাকে হাসপাতালে নেয়া তো দূরের কথা, তাকে স্কুল চত্বরেও রাখতে দেয়নি৷ হাসপাতালে মারা যায় রিশা । তাকে হত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে ওবায়দুল নামে টেইলার্সের এক কর্মচারীকে কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ ও কোনভাবে এই হত্যার দায় এড়াতে পারেনা ।

এই ধর্ষক ফ্রাঙ্কেস্তাইন এক দিনে জন্ম নেয়না । একের পর এক অন্যায় অপরাধ করার পরেও সমাজ শাক দিয়ে মাছ ঢাকার তাদের আগলে রাখার কারনে অপরাধীর হাত দীর্ঘতর হয়েছে । অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় তাদের অন্যায়কে লেলিহান শিখার মতো আরো বাড়তে দিয়েছে ।

বিচারহীনতার দেশে, ছিঁচকাঁদুনে বিচার ব্যবস্থায় নারীরা বিচার না পাওয়ার কারনেই আজ একের পর এক ধর্ষণ, হত্যা আর নারীর উপর সহিংস আক্রমণের ঘটনা ঘটে চলেছে আর আমরা হেরে যাচ্ছি, জিতে যাচ্ছে অপরাধ । এর মাঝে গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মতো যোগ হয়েছে মাদক সেবন । কোন একটা মহলের কারসাজিতে মাদকদ্রব্য হয়ে উঠেছে খুবই সহজ লভ্য । আর এই মাদকের ছোবলে যুবসমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে । মাদকের নেশার ঘোরে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তারা আজ মনুষ্যত্বকে বিকিয়ে দিচ্ছে । এখন সময় এসেছে পরিবর্তনের । সময় এসেছে রুখে দাঁড়াবার । সময় এসেছে প্রতিঘাতের । পরিবর্তন করতে হবে সমাজের, মানসিকতার, আইনের, মূল্যবোধের । আর এটা শুরু করতে হবে নিজের পরিবার থেকেই ।

আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা নয়, মান্ধাতা আমলের শিথিল আইন সংস্কার করে নারী নির্যাতনের কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবী । আমাদের কন্যাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে । আমরা কি পারছি আজ সকালে যে মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়েছে, দিনশেষে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে নিরাপদে নিজ আঙ্গিনায় ফিরে আসার নিশ্চয়তা দিতে? আমরা কি পেরেছি আমাদের কন্যা, মা, বোন, বান্ধবী, স্ত্রী, প্রেমিকা সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে? ধর্ষণ একটি ভাইরাসের মতো আমাদের সমাজে আমাদের দেশে সংক্রামিত হয়েছে । এই সংক্রমণ ক্যান্সারে রূপ নেয়ার আগেই প্রতিরোধ প্রয়োজন ।আর এই লড়াইটা শুধু আমার আপনার বা শুধুমাত্র নারীদের নয়, এই লড়াই সকলের ।

মাহবুবা জেবিন
সাংবাদিক, লন্ডন ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ