রাহুগ্রাসে গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থা

Pub: শনিবার, মে ২৫, ২০১৯ ৩:৪৯ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, মে ২৫, ২০১৯ ৩:৪৯ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মো: মতিউর রহমান :
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের মানুষ নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এর প্রভাব এবার ঢাকা সিটি (উত্তর ও দক্ষিণ) ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ওপর পড়েছে। ডাকসু নির্বাচনেও জাতীয় নির্বাচনের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন অনেকে। ২০১৪ সাল থেকে দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার ক্রমাগত অধোগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে অবস্থা এমন চরমে পৌঁছে যে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি নির্বাচনকে যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে (প্রথম আলো, ৪ মার্চ ২০১৯)। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বাম গণতান্ত্রিক জোট পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।

এ অবস্থার জন্য নির্বাচন কমিশনের অযোগ্যতা ও অদক্ষতা যেমন দায়ী, ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার মানসিকতাও তেমনি দায়ী। ক্ষমতা না ছাড়ার মনোবৃত্তি এবং গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হওয়ার কারণে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করেছে। ক্ষমতার লোভে তথা দলীয় স্বার্থে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয়করণ ও ব্যবহার করা একটা রাষ্ট্রীয় অপরাধ বলে অনেকে মনে করেন। দলীয়করণের এই ছায়া ও অশুভ প্রভাব নির্বাচন কমিশনের ওপরও পড়েছে। উল্লেখ্য, স্যামুয়েল হান্টিংটনসহ সমসাময়িক ভাষ্যকারেরা এই ধারণা সমর্থন করেন যে, Elections, open, free and fair, are the essence of democracy, the inescapable sine qua non. (The Idea of Justice, Amartya Sen, page 326).

ভোট মানেই একটা উৎসাহ-উদ্দীপনার ব্যাপার, যা বলতে গেলে দেশ থেকে উঠেই গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি গণতন্ত্র এবং দেশের জন্য শুধু ক্ষতিকর নয়, রীতিমতো বিপজ্জনক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যদি অচল মুদ্রা বানানো হয়, তাহলে এর পরিণতি খুব খারাপ হতে বাধ্য। কেননা, সরকার পরিবর্তনের চিরায়ত পথ ও পন্থা রুদ্ধ হয়ে গেলে প্রতিপক্ষ বিকল্প পথ ও পন্থা খুঁজতে বাধ্য হবে এবং তখন ষড়যন্ত্রের ডালপালা বিস্তার লাভ করবে। এতে সমাজে অস্থিরতা ও উত্তেজনা বাড়বে এবং দেশবাসীর শান্তি বিঘিœত হবে।

একটা কথা সব সময় মনে রাখতে হবে- দেশ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের নয়। সুতরাং দেশ শাসন করা কিংবা দেশের উন্নয়ন করাও কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের একার পারঙ্গমতার বিষয় নয়। অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের সবারই দেশের উন্নয়নে অবদান রয়েছে। কারো একটু বেশি, কারো একটু কম। উন্নয়নে কোনো দলের কথিত পারঙ্গমতা যেনতেনভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে কোনো যুক্তি হতে পারে না। আর উন্নয়নে পারঙ্গমতা ছলে-বলে, কলে-কৌশলে নির্বাচনে জেতার অনুমোদন কিংবা নৈতিক বৈধতা দেয় না। উল্লেখ্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত। এটা গণতন্ত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও বটে। কিন্তু আইনের শাসনের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ ২০১৮ সালের ১০২তম অবস্থান থেকে এ বছর ১১২তম অবস্থানে নেমে গেছে ( প্রথম আলো, ২ মার্চ ২০১৯)। আইনের শাসন, মানবাধিকার কিংবা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাসহ প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই নিচের দিকে। বাংলাদেশের এহেন অবস্থান গণতন্ত্রের দৈন্যই নির্দেশ করে। ত্বকী ও সাগর-রুনি সাংবাদিক দম্পতি হত্যা এবং বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম ও ইলিয়াস আলীর গুমসহ আরো অনেক খুন-গুমের বিচার না হওয়ায় দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এটা কোন ধরনের উন্নয়নের রোল মডেল?

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন- Even though the question has often been asked whether political freedom is conducive to development, we must not miss the crucial recognition that political liberties and democratic rights are among the constituent components of development. (The Idea of Justice, Amartya Sen, page 346).

(২)
গণতন্ত্রের যত দোষত্রুটিই থাক না কেন, রাজ্য শাসন ও পরিচালনায় সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রই বিশ্বের সভ্য দেশগুলোতে স্বীকৃত ও অনুসৃত। জনগণের শাসনের একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে এর সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গণতন্ত্র অন্য সব শাসন পদ্ধতির চেয়ে উত্তম। এ জন্যই জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, ‘All the ills of democracy can be cured by more democracy.’ আর এ জন্যই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন বলেছেন- ‘The world must be safe for democracy.’

আমাদের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলনের পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান সংবিধানে সন্নিবেশ করা হয়েছিল এবং এর অধীনে কয়েকটা সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, আওয়ামী লীগ ঘরানার এক ব্যক্তি উচ্চ আদালতে রিট করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করার ব্যবস্থা করেন। উচ্চ আদালত অবশ্য দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছিলেন। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি উচ্চ আদালতের মতানুযায়ী সংবিধান সংশোধন করার সুপারিশ করতে চাইলেও দলীয় প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে তা বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধন (পঞ্চদশ সংশোধনী) করা হয়েছে।

তখন থেকেই গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থা ‘রাহুগ্রস্ত’। উল্লেখ্য, সংবিধান অনুযায়ী এই ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীনে ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ [অনুচ্ছেদ ৭(ক)]। সংবিধানে আরো বলা হয়েছে- ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন…।’ [অনুচ্ছেদ ৭(২)]। জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা সংসদে সর্বসম্মতভাবে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান করা হয়েছিল। তাহলে এটা ‘অসাংবিধানিক’ হয় কিভাবে?

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণে অনেকটা ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে। ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় অনেকে বিএনপির সমালোচনা করেছে। কিন্তু গত ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ডাকাতির তথা ‘মিডনাইট’ নির্বাচনের পর অনেকেই তাদের আগের মতে আর স্থির নেই। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত এবং অলঙ্কার ও অহঙ্কার। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের ব্যবস্থা ছাড়া এ দেশে কোনো সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব নয়, এই ধারণার সত্যতা আজ স্বীকৃত এবং সর্বজনগৃহীত।

এবারের জাতীয় নির্বাচনে দলীয় স্বার্থে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে, তাতে এ দেশে বিরোধী দলের পক্ষে কখনো নির্বাচনে জেতা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলো অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। তাদের সভা-সমাবেশ করতে না দিয়ে সাংবিধানিক তথা মৌলিক অধিকার সঙ্কুচিত করে এবং বিরোধী দলকে দমনপীড়ন করে তাদের জন্য রাজনীতি করা খুব কঠিন করে ফেলেছে সরকার। তাদের জন্য রাজনৈতিক তথা গণতান্ত্রিক স্পেস রাখাই হচ্ছে না। এহেন অবস্থায় বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কেউ বলেছেন ‘অনুমতির গণতন্ত্র’ কেউ বলেছেন ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’। জীবন ক্ষণস্থায়ী, ক্ষমতা আরো ক্ষণস্থায়ী। এ কথা জেনেও ক্ষমতার মোহে সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে এবং জনগণকে ভোটবিমুখ করেছে। আমরা গণতন্ত্রের এ কী মরণদশা দেখছি আজ!

অতএব, সমাজ ও রাষ্ট্রে সুস্থিতি ও ঐকতান প্রতিষ্ঠা করার স্বার্থে আমাদের এ অবস্থা থেকে বের হতেই হবে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে হাতে হাত ধরে চলতে হবে। নইলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। এ জন্য বিশুদ্ধ নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রনায়কোচিত দায়িত্বশীলতা ও আচরণই কেবল তা নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ