fbpx
 

রাষ্ট্র কি অপরাধ করে?

Pub: Sunday, May 26, 2019 3:02 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তৈমূর আলম খন্দকার :
সংক্ষিপ্ত আকারে একটি রাষ্ট্রের সংজ্ঞা এই যে, নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ডের একটি জনগোষ্ঠী যা সার্বভৌম একটি সরকার দিয়ে পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত। কিভাবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নির্ধারিত না হলেও জনগণের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার (জন্মগত অধিকার) নিশ্চয়তার বিধানই রাষ্ট্রীয় মূল দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্র চলে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে বা চাহিদা মতে। পৃথিবীতে অনেক স্বতন্ত্র ভূ-ভণ্ড রয়েছে যাদের অধিবাসীরা সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম প্রভৃতি দিক দিয়ে স্বতন্ত্র থেকেও আলাদা কোনো রাষ্ট্রের বাসিন্দা নয়, যাদের সার্বভৌমিকতা নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের ১/২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ০১. প্রজাতন্ত্র-বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হইবে এবং ০২. প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত হইবে ‘(ক) ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত পূর্বে যে সকল এলাকা লইয়া পূর্ব পাকিস্তান গঠিত ছিল এবং সংবিধান (তৃতীয় সংশোধন) আইন, ১৯৭৪-এ অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলিয়া উল্লিখিত এলাকা, কিন্তু উক্ত আইনে বহির্ভূত এলাকা বলিয়া তদবহির্ভূত এবং (খ) যে সকল এলাকা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সীমানাভুক্ত হইতে পারে।’

একটি রাষ্ট্রে সব কিছু থাকে, যেমনÑ রাষ্ট্রপ্রধান এবং নিজস্ব পতাকা, সঙ্গীত, ভাষা, ধর্ম, মুদ্রা, সম্পত্তি, রাষ্ট্রীয় উপাধি দেয়ার এখতিয়ার। অন্য দিকে কাউকে যেকোনো অপরাধ বা সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেয়ার ক্ষমতাসহ সব আইন, ক্ষমতা প্রভৃতির উৎস রাষ্ট্র। ঝঃধঃব রং ঃযব ঝড়ঁৎপব ড়ভ ষধ.ি জনগণের রক্ষাকর্তা রাষ্ট্র কি অপরাধ করতে পারে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চড়ঁষ ঞধঢ়ঢ়ধহ-এর লেখায় বলা হয়েছে যে, ঈৎরসব রং ধহ রহঃবহঃরড়হধষ ধপঃ রহ ারড়ষধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ঈৎরসরহধষ খধি পড়সসরঃঃবফ রিঃযড়ঁঃ ফবভবহপব ড়ৎ বীপঁংব ধহফ ঢ়বহধষরুব নু ঃযব ঝঃধঃব ধং ভধষড়হু. রাষ্ট্রের কার্যত তিনটি স্তম্ভ, আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ।

মূলত সমাজ ও জনগণের স্বার্থে আইন প্রণয়ন (আইন বিভাগ), আইন ভঙ্গকারীকে প্রতিরোধ বা চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করা (শাসন/নির্বাহী) এবং আইন পর্যালোচনাপূর্বক ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার বিধান (বিচার বিভাগ) প্রভৃতি রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব, যা রাষ্ট্র ওই তিন বিভাগের মাধ্যমে কার্যকর করে। রাষ্ট্র অপরাধের বিষয়গুলো নির্ধারণ করে এবং অপরাধীকে শাস্তি দেয়। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি নিজেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তখন রাষ্ট্রকে শাস্তির আওতায় আনার দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে কার ওপর বর্তায়? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ঈযধসনষরংং (১৯৮৯) বলেছেন, রাষ্ট্র দু’ভাবে অপরাধ করে। যথা-ঝঃধঃব ঙৎমধহরুবফ ঈৎরসব এবং ঝঃধঃব ঝঢ়ড়হংবৎবফ ঈৎরসব। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই অপরাধকে সংগঠিত করে অথবা রাষ্ট্র অপরাধের জোগান দেয় বা পৃষ্ঠপোষকতা করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, ঝঃধঃব ঈৎরসবং ধৎব পড়সসরঃঃবফ নু, ড়ৎ ড়হ নবযধষভ ড়ভ ঝঃধঃবং ধহফ এড়াবৎহসবহঃং রহ ড়ৎফবৎ ঃড় বীবপঁঃব ঃযবরৎ ভঁৎঃযবৎ ঢ়ড়ষরপরবং. অর্থাৎ ভবিষ্যৎ নীতিমালাকে বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র অপরাধ করে।

ক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখাই ‘ভবিষ্যৎ নীতিমালা’ বাস্তবায়নের প্রধান উদ্দেশ্য। ২০০৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এৎববহ ্ ডধৎফ প্রণীত ঝঃধঃব ঈৎরসব: এড়াবৎহসবহঃ, ঠরড়ষবহপব ধহফ ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ বইতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঝঃধঃব ঈৎরসব রং রষষবমধষ ড়ৎ ফবারধহঃ ধপঃরারঃরবং ঢ়বৎঢ়বঃৎধঃবফ নু, ড়ৎ রিঃয ঃযব পড়সঢ়ষরপরঃু ড়ভ ঝঃধঃব ধমবহপরবং.

অযৌক্তিক, অসৌজন্যমূলক ও বেআইনিভাবে অথবা আইনকে অপব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দমানোর কর্মকাণ্ডই রাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত অপরাধ। যথাÑ গণহত্যা, নির্যাতন, বিনাবিচারে আটক, প্রহসনমূলক বিচার, একতরফা বিচার, হত্যা, গুম, বৈষম্যমূলকভাবে আইন প্রয়োগ, ন্যায্য অধিকার কিংবা সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, প্রতিপক্ষকে দমানোর জন্য রাষ্ট্রীয় এজেন্সির ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জনগণের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডারের জন্য ব্যয়, কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা প্রভৃতি।

বিগত ১০০ বছরে ৫০ মিলিয়ন মানুষ রাষ্ট্র কর্তৃক নিহত হয়েছে। জোর গলায় দাবি করা হয় যে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতায় বিংশ শতাব্দীতে মানবসমাজ অনেক এগিয়ে আছে। অথচ এই শতাব্দীতেই অধিক রক্তপাত হয়েছে। জাতিগত নিধন, নৃগোষ্ঠীকে নিমূল বা ধর্ম ও বর্ণ বিভেদের কারণে নরহত্যা ছাড়াও শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য লাখ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়েছে। যেমন, ১৯৩২ সালে মাত্র ৪৪ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন করে তদানীন্তন সোভিয়েত সরকার কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে মানুষ হত্যা করেছে। এ সময় স্টালিন বলেছিলেন যে, ঞযব এৎবধঃ ইঁষশ (ড়ভ ঃযব ১০ সরষষরড়হ) বিৎব াবৎু ঁহঢ়ড়ঢ়ঁষধৎ ধহফ বিৎব রিঢ়বফ ড়ঁঃ নু ঃযবরৎ ষধনড়ঁৎবৎং. ০৩. ঐড়ষড়পধঁংঃ চলার সময়ে হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসিরা গ্যাসচেম্বার দিয়ে প্রকাশ্যে হত্যার মাধ্যমে ১১ লাখ ইহুদিকে হত্যা করে। ০৪. মিয়ানমারে গণহত্যা চালাচ্ছে কট্টর বৌদ্ধ সেনাবাহিনী। ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ বৌদ্ধ ধর্মের মূলমন্ত্র হলেও রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যাকে ওরা পাপ মনে করছে না। ১৯৪৮ সালে সে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই সেনাপ্রধান জেনারেল নেউইনের নেতৃত্বে গণহত্যা শুরু হয়ে এখনো চলমান, যার ফলে ১০ লাখ রোহিঙ্গা দেশ থেকে বিতাড়িত। মিয়ানমারের এ হত্যাকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে চীন ও ভারত।

২০০৫ সালে মিয়ানমার সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, কোনো রোহিঙ্গা নারী তিন সন্তানের বেশি গ্রহণ করতে পারবে না, ২০০৭ সালে বলা হয়, দুই সন্তানের বেশি গ্রহণ করতে পারবে না, যদি তৃতীয় সন্তান গ্রহণ করে তবে দণ্ডবিধি মোতাবেক তৃতীয় সন্তান জন্মদাত্রীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। জাতিসঙ্ঘের ঋধপঃ ঋরহফরহম গরংংরড়হ মিয়ানমার সরকারের ওই পদক্ষেপকে গণহত্যা হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ওই মিশনের প্রতিনিধি ১৪ মে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন সম্পর্কে জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত কোনো নীতিমালার প্রতি মিয়ানমার কর্ণপাত করছে না। তদুপরি, সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জেনারেল টুন্টুন্ জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত সব কার্যক্রম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। একটি রাষ্ট্র এভাবে জঘন্য অপরাধ করে গেলেও জাতিসঙ্ঘ একটি ঠুঁটো জগন্নাথ মাত্র। বৃহৎ শক্তিগুলোর তাঁবেদারি করাই যেন জাতিসঙ্ঘের প্রধান কাজ। ৫৬টি মুসলিম রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীতে মুসলমানেরাই সবচেয়ে অবহেলিত। মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় তাদের আন্তর্জাতিক ফোরাম মৃত প্রায় সংগঠন, যাদের নিন্দা বা উদ্বেগ প্রকাশ ছাড়া অন্য কোনো ভূমিকা নেই।

রাষ্ট্রীয় অপরাধ ঠেকানোর একমাত্র ওষুধ ‘গণতন্ত্র’। গণতন্ত্র যেখানে নেই, সেখানে প্রতিবাদের কণ্ঠ হারিয়ে যায় এবং গণতান্ত্রিক প্লাটফর্ম স্বৈরাচারী স্রোতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে এবং গণতান্ত্রিক কর্মীরা নানা কারণে ঝিমিয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের ঘাড়ে চেপে যারা ক্ষমতায় বসে তারাই গণতন্ত্র হত্যার কূটকৌশল খোঁজে। কৌশলকে সমর্থন দেয়ার জন্য ফরমায়েশি বুদ্ধিজীবীর অভাব হয় না। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি এর ব্যতিক্রম?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা কি গণমানুষ নির্যাতিত? সংবিধানের উল্লিখিত মৌলিক অধিকার কি জনগণ ভোগ করছে? সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পদ্ধতিতে দেশে কোনো নির্বাচন হচ্ছে কি? সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা কি জনগণের সেবায় নিয়োজিত, না তাদের হয়রানি ও নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? সরকার কি দলীয়করণের ঊর্ধ্বে? আমলাতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সাধারণ গণমানুষের জন্য আদর্শ, না অভিশাপ? সংবিধান লঙ্ঘনকারীদের কোনো দিন কি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে? এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য জনগণ যাবে কোথায়?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, State crimes are acts as defined by law as criminal and committed by state officials in the pursuit of their job as representative of the state অর্থাৎ রাষ্ট্র অপরাধ সংঘটিত করে তাদের নিযুক্ত কর্মচারী (রাষ্ট্রযন্ত্র) দ্বারা যারা বিভিন্ন কর্মে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।

লেখক : আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
[email protected]


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ