‘দল ক্ষমতায়, বুঝবে নেতায়, কোপা শামসু কোপা’

Pub: বৃহস্পতিবার, জুলাই ৪, ২০১৯ ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, জুলাই ৪, ২০১৯ ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড. আবদুল লতিফ মাসুম :
‘দল ক্ষমতায়, বুঝবে নেতায়, কোপা শামসু কোপা’- সাম্প্রতিক সময়ে এটি একটি প্রবাদ-প্রবচনের মতো উচ্চারিত বাক্যবাণ। যেকোনো প্রবাদ-প্রবচন বা উচ্চারণ তার সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে। এই বাক্যবাণের জন্মকাল এই দশকে। এই দশকের রাজনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কৃতি ওই বাক্যে প্রতিফলিত। একটি সহিংস সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে এই দশক। সহজ, স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক শব্দাবলি পরিত্যক্ত হয়েছে। তার বদলে নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ও নিপীড়ন সমাজের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে সমাজপতিদের আধিপত্য থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সমাজপতিরা সমাজকে কিভাবে পরিচালিত করছেন, তাই প্রতিফলিত হয় প্রতিদিনের কাজকর্মে। নিকট অতীতে যে মাস্তানবাদ সমাজের গহিনে প্রোথিত হয়েছে, এখন তাই ফুলেফেঁপে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।

আবহমান বাংলার লালিত সংস্কৃতি, আচার-আচরণ ও নিয়মনীতি রক্ষণশীলতার লক্ষণ বলে প্রমাণ করার প্রায়াস চলছে। হিজাব নিয়ে পাশ্চাত্যে তোলপাড় লক্ষণীয়। ওই জগতে নারীরা যত বেশি শরীর প্রদর্শন করতে পারবে, সে ততই আধুনিক ও স্মার্ট। তারা চায় আমাদের মেয়েরাও প্রদর্শনীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হোক। আমাদের মেয়েদের গরিষ্ঠ অংশ এতে সায় না দেয়ায় তাদের দারুণ গোসসা। আমাদের দেশেও পাশ্চাত্যের এজেন্টরা মেয়েদের কাপড় খুলে ফেলতে চায়। তারা এক রকম প্রেমের নামে, নারী অধিকারের নামে এবং আধুনিকতার নামে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছে। তসলিমা নাসরীনের মতো নগ্ন নারীবাদীরা দেহের স্বাধীনতার কথা বলছে। এসব কথা বলছি এ কারণে যে সাম্প্রতিক আলোড়ন সৃষ্টিকারী বরগুনার নৃশংস ঘটনার উৎস নারী। নিহত রিফাত শরীফের সাথে খুনি নয়নের দ্বন্দ্ব ছিল নারীকেন্দ্রিক।

শরীফের স্ত্রী মিন্নি সাক্ষ্য দিচ্ছে এই দ্বন্দ্ব-বিগ্রহের কথা। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও মিন্নির সাথে অবাধ মেলামেশা চাইত খুনি নয়ন। জোর করে মিন্নির সাথে রিকশায় চড়তে চাইত সেই খুনি। প্রেম এখন এতটাই পাশবিক হয়েছে যে, প্রেমিকপ্রবর প্রেমিকাকে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এমনকি এসিড নিক্ষেপ করতেও দ্বিধা করছে না। প্রেমের আবেদন প্রেমের মাধ্যমে না হয়ে তার স্থান দখল করছে শক্তি। মাস্তানরা দেখতে পাচ্ছে, শক্তি প্রয়োগে সব কিছু পাওয়া যায়। একটি মেয়েকে পেতে চাইলে তারা আজ হৃদয় দিয়ে আবেদন করছে না। ১০-১২ জন গুণ্ডা জোগাড় করে মেয়েটিকে জোরপূর্বক তুলে নিতে পারলেই প্রেমের ১০০ ভাগ সফলতা। লোকলজ্জার ভয়ে অবশেষে বিয়ে মেনে নিতে বাধ্য হন অভিভাবকেরা। আর এসব কাজে সমর্থন থাকে শক্তিমানদের। শক্তিমানদের সম্বল থাকে অস্ত্রশস্ত্র। পিস্তল-বন্দুক থাকলে বিপদ বেশি। তাই তাদের ভরসা দা, রামদা ও কিরিচে। নয়ন ফরাজীর ঘাতকেরাও ব্যবহার করেছে রামদা-কিরিচ।

রামদা-কিরিচের রাজনীতি নতুন না হলেও ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে এটাই তাদের ক্ষমতা রক্ষার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। তৃণমূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত শক্তিই রাজনীতির মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে যেমন তারা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর শক্তিকে ব্যবহার করে তথাকথিত জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেছে, তেমনি ইউনিয়ন পরিষদের রাজনীতিতেও দলীয় পরিচয়ে শক্তির প্রদর্শনী পরিলক্ষিত হয়েছে। শাসক আওয়ামী লীগ দলাদলি গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করায় রক্তারক্তিও হয়েছে সর্বত্র। বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের ইতিহাসে তৃণমূলপর্যায়ে এমন প্রাণহানি আর ঘটেনি। সুতরাং কোপাকুপি আওয়ামী রাজনীতির বাহনে পরিণত হয়েছে। যেহেতু জনগণকে তারা রাজনীতি তথা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, তাদের আর জনগণের সমর্থন বা অসমর্থনে কিছু আসে যায় না।

মাস্তান-নির্ভরতাই তাদের রাজনীতি। একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে দেখবেন, বরগুনার ঘটনায় আওয়ামী লীগের বিবদমান এমপি শম্ভু গ্রুপ এবং উপজেলা চেয়ারম্যান দেলোয়ার গ্রুপ- উভয়ই ‘০০৭’ মাস্তান গ্রুপকে কাজে লাগিয়েছে। এই মাস্তান গ্রুপের নেতা ছিল খুনি নয়ন। সে একজন মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে জেল খাটলেও শাসক আওয়ামী লীগের সৌজন্যে জেল থেকে জামিন পেয়েছে। এরা বারবার গ্রেফতার হয়েছে এবং বারবারই মুক্তি পেয়েছে। এ দেশে শাসক দলের অনুগ্রহ ছাড়া আইন-আদালতে সহায়তা পাওয়া যে অসম্ভব বিষয় তা সবারই জানা কথা। সুতরাং কখনো ‘এ’ গ্রুপ বা কখনো ‘বি’ গ্রুপ করে বরগুনার মাস্তানরা মানুষের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা সেখানে রীতিমতো ‘ভয়ের রাজ্য’ কায়েম করেছে। আর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও যে সরকারি দলের ইশারা-ইঙ্গিতে ওঠবস করে- তার প্রমাণ আপনারা নুসরাত মামলায় পেয়েছেন। বরগুনায় আকস্মিকভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে কোপাকুপি না করা পর্যন্ত এরা কিন্তু বহাল তবিয়তেই বরগুনায় ছিল। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

সুতরাং দাদা অর্থাৎ নেতার কথায় মাস্তানরা কোপাকুপি করে। তারা যা-ই করুক না কেন, তা সামাল দেয়ার জন্য নেতা আছেন। তারা জানে, তাদের কোনো শাস্তি হবে না। থানায় নিলে মুক্তি পাবে। জেল হলে তারা ক্ষমা পেয়ে বেরিয়ে আসবে। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার জন্য বাহিনী ও প্রশাসন রয়েছে। খোদ সরকার এই মাস্তান বাহিনীকে তোষণ-পোষণ ও ত্রাসনের ক্ষমতা দিয়েছে। পাঠকসমাজের মনে থাকার কথা, যখন কোটা আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের জন্য ছাত্ররা রাজপথে নেমে এসেছিল, তখন পুলিশের পিছু পিছু একদল মাস্তানকে তারা অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আন্দোলনকারীদের ঠেঙ্গিয়েছিল। এরাই হচ্ছে কোপাকুপির লোক। আওয়ামী রাজনীতির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রামদা-কিরিচের কোপাকুপির সচিত্র প্রতিবেদন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে অনেকবার। বিরোধী রাজনীতি দমনে হত্যা, জেল-জুলুমের ব্যবহার করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, সর্বত্র আওয়ামী মাস্তানরা মানুষ কুপিয়েছে, ঘর কুপিয়েছে ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কুপিয়েছে। অসংখ্যবার বিএনপির দলীয় কার্যালয় কুপিয়েছে এরা। এতই অসহিষ্ণু যে, ব্যক্তিগত ব্যাপারেও এরা হঠাৎ করেই কোপাকুপি শুরু করে।

মানুষজন প্রশ্ন তুলছে, সাধারণ মানুষ কেন বাধা দিতে এগিয়ে এলো না? এর উত্তর রাজনীতিতে নিহিত। যে কারণে রাজধানীর মানুষ মিছিলে যেতে ভয় পায়, সে কারণেই বরগুনার মানুষ হত্যাকাণ্ড চলাকালীন এগিয়ে আসেনি। কে যাবে বাধা দিতে! আর কার মায়ের কোল খালি হবে! ওই শহরের লোকজন যখন জানে, খুনিরা নেপথ্যের হত্যাকারীদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, তখন কোন ভরসায় তাদের শত্রু হবে সে! আইনের প্রয়োগ স্থান-কাল-পাত্রভেদে নানা রকম। আইনের শাসনের যে মৌলিক নীতিমালা রয়েছে, তা এখানে অনুপস্থিত। কোর্ট-কাচারিতে গিয়ে কোনো লাভ নেই তা আজ নাবালকেও বোঝে। সুতরাং মানুষের দাঁড়ানোর স্থান কোথায়?

আর এটাও অপ্রিয় সত্য কথা যে, সমাজে আদর্শবাদিতা এবং পরোপকারিতা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের মতো মানবিক সমাজে স্বার্থপরতা এতটা গেড়ে থাকার কথা নয়। ক্ষমতাসীন সরকার গত ১২ বছরে যে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আত্মকেন্দ্রিকতার আচরণ ও দীক্ষা দিয়েছে তা মানুষকে ত্যাগী না করে ভোগী করে তুলেছে। তা ছাড়া সরকার নিজেই মানুষ মারার কলে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বন্দুকযুদ্ধের নামে, মাদক নির্মূলের নামে অথবা জঙ্গি দমনের নামে মানুষ হত্যা করছে সরকার। সরকারের লোকেরা সাদা পোশাকে তুলে নিচ্ছে মানুষ। এই সে দিন তাজউদ্দীন-পুত্র সোহেল তাজ নিজ ভাগ্নের অপহরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাই ফিরে পেয়েছিলেন আপনজনকে। জনগণের তো কোনো সোহেল তাজ নেই। তাই মামাবাড়ির আবদার রক্ষারও লোক নেই। ভয়ের সংস্কৃতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি উভয় মিলে সত্যিকার অর্থে মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। আর তা ছাড়া ক্রমবর্ধমান বিজ্ঞান ও কারিগরির বিকাশ মানুষের জীবনে যান্ত্রিকতা সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া রাষ্ট্র ক্রমেই নাগরিক জীবনের জন্য অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। একসময় রাষ্ট্র মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের জিম্মাদার ছিল। এখন রাষ্ট্রের নামে সরকার তথা রাজনৈতিক দল কোপাকুপির সংস্কৃতি আমদানি করেছে। এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোখার জন্য ঐক্যবদ্ধ, সাহসী ও কুশলী রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ