fbpx
 

ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন টেকায় হাইব্রিড শাসন

Pub: Saturday, July 27, 2019 12:47 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজের বইয়ে আটটি চ্যাপ্টার আছে। প্রথমটিতে তিনি ১৯৯০ এর দশক থেকে কী করে হাইব্রিড রেজিম বা সংকর শাসনভুক্ত দেশগুলোতে একত্রে গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদী প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বিশ্বে এ রকম দেশের সংখ্যা বহু।
দ্বিতীয় চ্যাপ্টারে সংকর শাসনের মধ্যকার বৈচিত্র্য বা পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে। গণতন্ত্রায়নের স্টাডিজের মধ্যেই সংকর শাসনের উৎপত্তি এবং তার পরম্পরা ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকে মত ও পথনির্ভর ক্রান্তিকাল তত্ত্ব এটা অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের ফলে যারা বেনিফিসিয়ারি হয়েছে, তাদের দ্বারাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গলা টিপে ধরার ঘটনা ঘটতে পারে।

রীয়াজ লিখেছেন, দি এন্ড অব দ্যা হিস্ট্রির মতো ফরমান দেখে আমরা গণতন্ত্রায়নের উদ্দীপনা বিষয়ে
বেশ মেতেছিলাম। কিন্তু এখন এটা পরিষ্কার যে, ওই ফরমানের মধ্যে ১৯৭০-এর দশকে ল্যাতিন আমেরিকার দেশগুলো কি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল, সেবিষয়ে সামান্য মনোযোগই দেয়া হয়েছিল। আর সেকারণেই পরে ও’ ডোনেল ও স্মিটার হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে সরে আসার প্রক্রিয়ার ফল এই দাঁড়াতে পারে যে, দেখা যাবে, সেটা একটি উদারনৈতিক কর্তৃত্ববাদ কিংবা একটি রক্ষণশীল, উদারনৈতিক গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি কিছু নয়।

উল্লেখ্য যে, দি এন্ড অব দ্য হিস্ট্রি হলো একটি রাজনৈতিক মতবাদ। এর অর্থ হলো মানুষের পক্ষে যতখানি সম্ভব একটি সরকার ও শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, তার সমাপ্তি টানা। এর থেকে উত্তম আর কিছুই করতে না পারা।

এটা ধরে নেয়া যে, মানুষ যতদূর সম্ভব তার সামাজিক সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব, সেটা তারা অর্জন করার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে।
উইকিপিডিয়ার মতে, এন্ড অব হিস্ট্রি কথাটি ১৮৬১ সালে ফরাসি দার্শনিক কারনেট প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। এরপর হেগেল ও কার্ল মার্ক্সও যে যার মতো ব্যবহার করেছেন। তবে ১৯৯২ সালে ফ্রান্সিস ফুকুওমা ‘দি এন্ড অব হিস্ট্রি এন্ড লাস্ট ম্যান’ লিখে বিশেষভাবে ধারণাটি আলোচনায় আনেন।

আলী রীয়াজ তার ওই চ্যাপ্টারের আলোচনায় এটা ফুটিয়ে তুলেছেন যে, হাইব্রিড রেজিমের বহু চেহারা। এর কোনো একটি নির্দিষ্ট রূপ নেই। সোজা কথায়, এর ছলাকলার অন্ত নেই। যখন যেমন তখন তেমন। তবে মূল কাজটা হলো, প্রকৃত ভোটাধিকার এবং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থেকে শঠতার আশ্রয় নিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা। কোনো একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরনের হাইব্রিড রেজিমের অভিঘাত বিচিত্র। আলী রীয়াজ লিখেছেন, এটা কন্টিনজেন্ট। মানে অপ্রত্যাশিত, আগে থেকে অনুমান করা চলে না, এমন কিছু।

এই চ্যাপ্টারে তিনি এই বিষয়টির স্বরূপ উন্মোচনে বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশকেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন এটা পরিষ্কার করতে যে, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাটা কিভাবে হাইব্রিড রেজিমের বৈশিষ্ট্যকে গভীরভাবে ধারণ করছে।
আলী রীয়াজ তৃতীয় চ্যাপ্টারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পরীক্ষা করেছেন। বিশেষ করে তিনি এরশাদের পতনের পরে ১৯৯১ সাল থেকে রাজনৈতিক উন্নয়নে আলো ফেলেছেন। তবে তাতে রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের কোনো ফিরিস্তি নেই। শাসন ব্যবস্তা রূপান্তরকরণের প্রধান মুহূর্তগুলো তিনিই মূর্ত করতে সচেষ্ট থেকেছেন।

তার যুক্তি হলো, দুই দশকের সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ একটি নির্বাচনী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর সেই থেকেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তাতে ছন্দপতন ঘটে। এবং বছরের পর বছর ধরে চলা ওই রূপান্তর যথাক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নির্ভর শাসন ব্যবস্তার জন্ম দেয়। এভাবে তিনি রেজিম রূপান্তরের চশমা দিয়ে রাজনৈতিক ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছেন।

রীয়াজ লিখেছেন, ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদিতা থেকে আধা কর্তৃত্ববাদী এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ কর্তৃত্ববাদিতা থেকে নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। দুই দলের কোনোটিই যারা নিজেদের মধ্যে রাষ্ট্র ক্ষমতার অদলবদল ঘটিয়েছে, তারা কেউ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেনি। বরং তারা স্বল্প মেয়াদি ফায়দা তুলতে সংবিধানের অপব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এবং দুই দলের মধ্যে সাপে নেউলে সম্পর্ক আস্থার ঘাটতি প্রকট করেছে, যার পরিণতিতে গণতান্ত্রিক সমন্বয়ের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে। যখন পার্লামেন্টসহ অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান সম্পূণরূপে অকার্যকর থেকেছে, তখন সংবিধানে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ সাধারণ নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে, আর সেগুলোই বিদ্যমান সিস্টেমকে ধরে রেখেছিল। ২০০৬ সালে বিএনপি বিদ্যমান সিস্টেম অপব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছিল। এবং তারা এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যা বিদ্যমান কার্যকর ব্যবস্থাটির ওপর একটি সর্বাত্মক আক্রমণ রচনার অনুকূল হয়েছিল। ২০১১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গোটা ব্যবস্থাটিকেই নির্মূল করে দিয়েছিল। এবং সর্বশেষ তারা এমন একটি অবস্থা তৈরি করেছে যেখানে নির্বাচন আর গণতন্ত্রের হাতিয়ার নয়, নির্বাচন হয়ে পড়েছে কর্তৃত্ববাদিতার হাতিয়ার। ২০১১ সালের পর থেকে যে রূপান্তরকরণ শুরু হয়েছিল সেটা বিরোধী দলের বয়কটের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালে উদগ্র রূপ নিয়েছিল।

আলী রীয়াজ লিখেছেন, হাইব্রিড রেজিম রূপান্তরকরণের ওই প্রক্রিয়ায় শুধু যে সাচ্চা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের খোঁড়া যুক্তিকে ধীরে ধীরে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেটা শুধু সাংবিধানিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। এই উদ্দেশ্য সাধনে বহু ধরনের আইনগত এবং আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
আলী রীয়াজ বইয়ের চতুর্থ পরিচ্ছেদে বিরোধী দলগুলোর উপর কি করে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তাই আলোচনা করেছেন। এরমধ্যে রয়েছে ব্যাপকভিত্তিতে বিদ্যমান কালাকানুন ব্যবহার, সংবাদপত্রের কণ্ঠ চেপে ধরা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং আইনকে আরও কঠোর করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। রীয়াজ অবশ্য এ পর্যায়ে বলেন, এটাও উল্লেখ করা সঠিক হবে যে বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি লক্ষ্যহীনভাবে অগ্রসর হয়েছিল এবং সেকারণে তারা নাগরিকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর সেটাই বাংলাদেশে রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা এবং তাঞ্জানিয়ার মতো একটি হাইব্রিড রেজিম সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। আর এভাবেই চতুর্থ চ্যাপ্টারে কি করে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তার বিবরণ ফুটে উঠেছে।

তিনি তার বইয়ের পঞ্চম চ্যাপ্টারে বাংলাদেশের রাজনীতির এই সংকট আলোচনা করেছেন যে, ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি এবং বিরোধীদলগুলোর অংশগ্রহণ ভুল কি শুদ্ধ ছিল। তার কারণ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ কিংবা সাংগঠনিক পরিস্থিতির কোনোটাই বিরোধী দলের পক্ষে ছিল না। তারা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে অংশ নিয়েছিল, সেখানকার অভিজ্ঞতাও কোনোভাবে আশাপ্রদ ছিল না।

আলী রীয়াজ নিজেই প্রশ্ন করেছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ছাড়া তাদের সামনে আদৌ কোনো বিকল্প ছিল কি না? কারণ তারা দেখেছেন যে ২০১৪ সালের বয়কট তাদের উপরে বিরাট বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। তবে এই প্রশ্নের সঙ্গে বৃহত্তর যে তাত্ত্বিক প্রশ্নটি গভীরভাবে জড়িত, সেটি হলো হাইব্রিড রেজিমের কাছে নির্বাচন আসলেই কোন ম্যাটার করে কিনা?
হাইব্রিড রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে নির্বাচনের যে গুরুত্ব বিবেচনায় নেয়া হয়, সেই ধরনের নির্বাচন তো রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে সবরকমভাবে অপব্যবহার করার জন্য খোলা থাকে।

এই বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে গিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ লিখেছেন, আমি এটা দেখিয়েছি যে হাইব্রিড রেজিমের ক্ষেত্রে এর আগে পণ্ডিত লিন্ডবার্গ এবং তার সহকর্মীরা যে যুক্তি দেখিয়েছিলেন, তার বিপরীতে গিয়ে আমি বলেছি, এমন বহু নির্বাচন হতে পারে, যা কোনো গণতন্ত্রায়নের পথ তৈরি করে না। বরং ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হাইব্রিড রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। চলবে


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ