‘সংসদ নির্বাচনে শতভাগ ভোট’

Pub: শনিবার, জুলাই ২৭, ২০১৯ ২:০১ অপরাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, জুলাই ২৭, ২০১৯ ২:০১ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আব্দুর রহমান :
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক চূড়ান্ত ফলাফল গত ৩০ জুন নির্বাচন কমিশন ওয়েব সাইটে প্রকাশ করেছে। এতে ভোট গ্রহণের যেসব গুরুতর অনিয়ম সঙ্ঘটিত হওয়ার আলামত পরিলক্ষিত হচ্ছে তা এককথায় ভয়াবহ। ১০৩টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। ১২৭টি কেন্দ্রে ৯৯ শতাংশ, ২০৪টি কেন্দ্রে ৯৮ শতাংশ, ৩৫৮টি কেন্দ্রে ৯৭ শতাংশ, ৫৮৬টি কেন্দ্রে ৯৬ শতাংশÑ এভাবে বাকি ৪২ হাজার কেন্দ্রে ৮০.৮০ শতাংশ থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। ৭৫টি নির্বাচনী এলাকার ৫৮৭টি কেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোটই ক্ষমতাসীন দলের নৌকা প্রতীকের পক্ষে পড়েছে। অপর দিকে, জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থীদের পক্ষে এক হাজার ২৮৫টি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। ২৯৪টি আসনে ভোট পড়ার গড় হার ৮০.৮০ শতাংশ হলেও ইভিএমে ভোট নেয়া ছয়টি আসনে ভোটের গড় হার মাত্র ৫১.৪০ শতাংশ এবং বিরোধী দলের প্রাপ্ত আটটি আসনে ভোট পড়ার গড় হার ছিল ৭৩ শতাংশ।

উল্লেখ্য, অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য হারে ভোট পড়া সব আসনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা এক লাখ থেকে চার লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। এই জয়ীদের ৮০ শতাংশ প্রার্থী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও ভোটারবিহীন নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ হিসেবে রয়েছে দুই থেকে ছয়টি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী ও পরাজিত হওয়ার সুখকর ও তিক্ত অভিজ্ঞতা। ভোটারদের নাড়িনক্ষত্র তাদের জানা। জনগণের প্রশ্ন হচ্ছে- নির্বাচনে জয়ের জন্য লাখ লাখ ভোটার ‘তাদের পক্ষে’ থাকা সত্ত্বেও তাদের যারা মনোনয়ন দিয়েছেন, তারাসহ সবাই মিলেমিশে কেন মধ্যরাতে ভোট কাটার আশ্রয় নিলেন? একটানা ১০ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে দেশ শাসনের পরে ভোটারদের ওপর আস্থার চিড় ধরল কেন? এ কারণে নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করার জন্য তারা প্রশাসন, পুলিশ ও পোলিং অফিসারদের সহায়তায় মধ্যরাতে ব্যালট কাটার মহড়া সম্পূর্ণ করায় ভোট পড়ার হারে এই বিচ্যুতি ঘটল। গুরুজনদের পরামর্শ হচ্ছে, সব সময় ৩পি (ঢ়) থেকে দূরে থাকবে। অর্থাৎ পুলিশ, প্লিডার ও প্রাজ। কেন দূরে থাকতে হবে, এবার নির্বাচনে প্রশাসন, পুলিশ ও পোলিং অফিসারদের কার্যকলাপেই তা প্রমাণ হলো। ৭০ শতাংশ ভোট কাস্ট হলেও সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণ করেও তা শেষ হবে না। এ জন্য অতিরিক্ত সময় ভোট গ্রহণ করতে হবে।

নিজে সাভার পৌরসভার ২০টি কেন্দ্র ঘুরে যা দেখেছি, তাতে কোনোক্রমেই ৪০-৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার কথা নয় সংসদ নির্বাচনে। কারণ দুপুর ১২টার পরে সব কেন্দ্র ভোটার শূন্য থাকায় দরজা বন্ধ করে মধ্যাহ্ন ভোজ সম্পন্ন করা হয়েছিল এবং এরপর আর দরজা খোলা হয়নি। অথচ এই আসনের প্রার্থী সর্বাধিক চার লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। মোবাইলে সারা দিন ধামরাই ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন কেন্দ্রের যে খবর পেয়েছি, তা ছিল সাভারের অনুরূপ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সংগঠনের নেতারা এবং সচেতন নাগরিক সমাজের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও কৌতূহলবশত বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে যা দেখেছিলেন তা তারা ব্যক্ত করেছেন ‘সুজন’ আয়োজিত সভায়। বিশিষ্ট সম্মানিত নাগরিকেরা ওই সভায় উপস্থিত থাকলেও সরকারসমর্থক বুদ্ধিজীবী, সুশীল ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, আইনবিদ, কবি ও সাহিত্যিকদের কাউকে দেখা যায়নি। সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট নাগরিকদের মতে শতভাগ ভোট পড়া শুধু অস্বাভাবিকই নয়, অবিশ্বাস্যও। প্রধান নির্বাচন কমিশনার যেহেতু বলেছেন, ‘শত ভাগ ভোট পড়া’র ব্যাপারে তার ‘করণীয় কিছুই নেই’, তাই বিশিষ্ট নাগরিকেরা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে নির্বাচনে সংঘটিত গুরুতর অনিয়ম তদন্তের সুব্যবস্থা করার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমীপে আরজি জানিয়ে নির্বাচনে নজিরবিহীন সোজামিলের (গোঁজামিল নয়) বলটি তার (মহামান্য রাষ্ট্রপতির) দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ হচ্ছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান রাষ্ট্রপতি। গত ৪৮ বছরে তিনি ছাড়া কোনো রাষ্ট্রপতিই দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি। প্রথমবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত, নবম সংসদের সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হলেও দ্বিতীয়বার ভোটারবিহীন দশম সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। সেই সংসদ সদস্যদের ১৫৪ জনই ছিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রপতিই একটির বেশি নির্বাচন কমিশন গঠন করতে না পারলেও এখনকার রাষ্ট্রপতি কাজী রকিব ও কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে দু’টি নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পেরেছেন। সার্চ কমিটির মাধ্যমে বাছাই করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলেও এই দু’টি সার্চ কমিটির প্রধান ছিলেন একই বিচারপতি। মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিয়োগকৃত, উভয় সিইসিই সাবেক নির্বাচন কমিশনার চতুষ্টয় সর্বজনাব বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, সাবেক সচিব মোহাম্মদ আবু হেনা, সাবেক সচিব আবু সাইদ এবং সাবেক সচিব এ টি এম শামসুল হুদার নির্বাচন কমিশনের মতো অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের আমলে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম সংসদ নির্বাচনকালীন রাষ্ট্রপতি ছিলেন যথাক্রমে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, আব্দুর রহমান বিশ্বাস, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন যথাক্রমে বিচারপতি হাবিবুর রহমান, বিচারপতি লতিফুর রহমান এবং ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। এসব সম্মানিত ব্যক্তি কেউ রাজনীতিবিদ না হয়েও মাত্র ১০ জন অরাজনৈতিক উপদেষ্টার সহায়তায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এবং জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হলেও ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা যাদের রয়েছে দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অতীত সেই নির্বাচনকালীন সরকার এবং কাজী রকিব ও নুরুল হুদার কমিশন যথাক্রমে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ১৯৯৬ এর বা ২০০৮-এর নির্বাচনের মতো করতে ব্যর্থ হলেন কেন? এর দায় কাদের ওপর বর্তায়?

জেনারেল জিয়ার পর বর্তমান রাষ্ট্রপতিই একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি। তিনি দীর্ঘ ৫০ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। সংবিধান অনুযায়ী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতিরেকে কোনো সিদান্ত গ্রহণে অপরাগ হলেও নির্বাচন কমিশন গঠন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে তার রয়েছে একক ক্ষমতা। তাই ‘সুজন’সহ বিশিষ্ট নাগরিকেরা একাদশ সংসদ নির্বাচনে শত ভাগ ভোট পড়ার মতো গুরুতর অনিয়মগুলো তদন্তপূর্বক অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ব্যর্থ প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের লক্ষ্যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের আরজি জানিয়েছেন। স্মরণযোগ্য, সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণপূর্বক ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার ব্যাপারে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানাতে ওই বিশিষ্ট নাগরিকদের কয়েকজন ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই বলে তাদের জানিয়েছিলেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান অর্থাৎ অবাধে ভোটদানের পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যর্থ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের সাংবিধানিক ক্ষমতা মহামান্য রাষ্ট্রপতির আছে। আটবার সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্য হিসেবে তার নির্বাচনী এলাকার জনগণের নেতা ছিলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সমগ্র বাংলাদেশের জনগণের নেতা। তাই তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, দলের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র বাংলাদেশের নেতা হিসেবে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, না শুধু কিশোরগঞ্জবাসীর মধ্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন? তিনিই পারেন ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের মতো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি করতে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ