রোহিঙ্গারা কি ডেঙ্গু মশা, নাকি ডেঙ্গুরা মানুষ?

Pub: শুক্রবার, আগস্ট ২, ২০১৯ ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শুক্রবার, আগস্ট ২, ২০১৯ ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

গোলাম মাওলা রনি :
নয়া দিগন্তের পাশাপাশি আমি তখন আরো কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখতাম। সেই কলামগুলোর মধ্যে একটির শিরোনাম ছিল- কুশিক্ষার অন্ধকারে আলকাতরা ঝিলিক মারে। লেখাটি যে কোন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, তা আজ আর স্পষ্ট মনে করতে পারছি না। তবে লেখার বিষয়বস্তু এবং শিরোনামটির কথা আমার আজো মনে আছে। আমি সাধারণত কোনো একটি বিষয়ে নিবন্ধ লেখার আগে শিরোনাম ঠিক করে নিই। তারপর শিরোনাম ধরে এগোতে থাকি ধীরেসুস্থে, যেন শিরোনামের সাথে সূচনা বক্তব্য, উপসংহার এবং মূল প্রতিপাদ্যের একটি সংযোগ থাকে। বিগত দিনগুলোতে এমন ঘটনা খুবই কম ঘটেছে, যখন আমি শিরোনামের সাথে তাল মিলিয়ে লিখতে পারিনি অথবা লেখার পরে শিরোনাম পাল্টানোর প্রয়োজন হয়েছে।

আলকাতরার ঝিলিক মারা-সংক্রান্ত নিবন্ধটি লেখার পরে আমাকে পূর্বনির্ধারিত শিরোনাম পরিবর্তন করতে হয়েছিল। আমি মূলত অন্ধকারের নৈসর্গিক সৌন্দর্য-আঁধারের নৈসর্গিক নীরবতা ইত্যাদি নিয়ে আঁতেল মার্কা একটি রচনা লেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু লিখতে গিয়ে কিভাবে যেন কুশিক্ষা এবং আলকাতরার অন্ধকার একত্র হয়ে গেল। ফলে আমাকে শিরোনাম পাল্টাতে হলো এবং অধিক সতর্কতার জন্য বিষয়বস্তুটি কয়েকবার পড়তে হলো- যা আমার জন্য রীতিমতো বিরক্তিকর। কারণ, আমি সব সময় নিজের হাতে লিখি এবং আমার লেখায় কাটাছেঁড়া খুব কম হয় এবং লেখা শেষে রিভিশন দেয়ার প্রয়োজনও কম পড়ে। এ অবস্থার ব্যতিক্রম ঘটার জন্যই কুশিক্ষার অন্ধকারে আলকাতরা ঝিলিক মারে নামক নিবন্ধ লেখার স্মৃতি মনের মধ্যে জাগরূক রয়েছে।

আজ এত দিন পরে নিবন্ধটির কথা মনে পড়ল বৈশ্বিক, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় অশিক্ষা-কুশিক্ষা-অপসংস্কৃতির ত্রিবেণী সঙ্গমের ফলে সৃষ্ট অসহ্য-দৃষ্টিকটু এবং অমানবিক কাণ্ডকারখানার মহামারীর বিস্তার দেখে। বিশ্বের একক শক্তিশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের দালাল পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে যোগসাজশ করে পশ্চিমা গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী এবং চোরাকারবারিরা আশির দশকের শেষ দিকে এসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দেয় এবং নিজেদের কুশিক্ষার আলকাতরার কালি দিয়ে সারা দুনিয়ার মানুষের বিবেক-বোধ, বুদ্ধি এবং একান্ত অনুভূতি ভোঁতা করে দেয়। একটু তেল কিংবা গ্যাস অথবা অন্য কোনো বাণিজ্য হাসিল করার জন্য পশ্চিমারা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দুনিয়াব্যাপী যে লঙ্কাকাণ্ড শুরু করেছিল, সেই আগুনের কালো ধোঁয়ায় আমরা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছি- এখন তাদের পালা যারা সভ্যতা-ভব্যতা-স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও মানবতার অন্তঃমূলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মিথ্যা বলার যুগপৎ মহড়া দিয়ে পশ্চিমা শক্তিরা ইরাক-লিবিয়া ও সিরিয়া শেষ করে ইয়েমেনের বারোটা বাজিয়ে সৌদি আরবের জন্য কবর খোঁড়া আরম্ভ করেছে। তারা পাকিস্তানকে বন্ধু বানিয়ে আফগানিস্তানে তালেবান-মোল্লা ওমর এবং ওসামা বিন লাদেন সৃষ্টি করে সোভিয়েত রাশিয়াকে আফগানিস্তান থেকে তাড়িয়ে সে দেশে তালেবানি শাসন কায়েম করেছে। পরবর্তীকালে তালেবানদের ভয় দেখিয়ে ইরান-পাকিস্তান ও ভারতে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ইরান সেই আশির দশকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদেরকে কয়েক দফা লাল কার্ড দেখিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের হিজবুল্লাহ এবং আফগানিস্তানের তালেবানদের সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপটিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান বেশ কয়েকবার মার্কিন রাষ্ট্রশক্তিকে নাকানি-চুবানির পর নাকে খত দিয়ে ছাড়ে। ইতিহাসবিখ্যাত ইরান-কন্ট্রা অস্ত্র কেলেঙ্কারি এবং মার্কিন জিম্মিদের ছাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং নিজেদের দেশে দম্ভ করে আটক রাখা ইরানি রিজার্ভের অর্থ ফেরত দিয়েও রক্ষা পায়নি। ইরানকে সামাল দিতে না পারার ব্যর্থতা কাঁধে নিয়ে জিমি কার্টার সরকারের পতন হয় এবং অনেকটা নাটকীয়ভাবে রোনাল্ড রিগ্যান সরকারের অভিষেক হয় ইদানীংকালের ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের মতো। রিগ্যান অতিশয় বুদ্ধিমান এবং সফল রাষ্ট্রনেতা ছিলেন। তিনি খুব ভালো করে বুঝেছিলেন, একটি পাঁচ হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার ধারক-বাহক ইরানের সাথে লড়াই করার জন্য যে সুসভ্য, সুশিক্ষিত ও আলোকময় ধীরস্থির জনগণের দরকার তা মার্কিন মুলুকে নেই। ফলে তিনি পর্দার আড়ালে ইরান ত্যাগ করে তার মনোযোগ মধ্য এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিবিষ্ট করেন।

রোনাল্ড রিগ্যানের সফল কূটনীতি এবং তার সাম্রাজ্যবাদী দোসরদের ত্রিমাত্রিক প্রপাগান্ডা এবং কালোবাজারে লাখো কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে ফেলা হয়। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে বার্লিন প্রাচীর গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। সমাজতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী মরণ যন্ত্রণার মধ্যে চীন-উত্তর কোরিয়া এবং কিউবা কোনো মতে প্রাণে বেঁচে যায়। রিগ্যানের উত্তরসূরিদের চক্রান্তে ইরাকের পতনের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে নজর দেয়ার জন্য প্রথম সাঁড়াশি অভিযান পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাইন-ইলেভেন ট্র্যাজেডি ঘটানো হয়। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের অজুহাত তুলে যে মিথ্যাচার শুরু হয় তার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ভারত-পাকিস্তান পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করে মার্কিনিদের জালে আটকা পড়ে। অন্য দিকে জালের মধ্য থেকে যে অন্তর্দলীয় বিবাদ দেখা দেয়, সেই বিবাদে দৃশ্যত ভারত জয়ী হয়ে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের গডফাদার ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রধান এজেন্ট হওয়ার সুযোগ লাভ করে।

মার্কিন পুঁজিবাদী সমাজের অন্ধকারময় কুশিক্ষা-অপসংস্কৃতি এবং কালোবাজারি চক্রের খপ্পরে পড়ে ভারত এবং পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রই গত ৩০ বছরে যে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির কবলে পড়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। দেশটির অর্থব্যবস্থা দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে চলে গেছে। পাকিস্তানের সমাজব্যবস্থায় উগ্রতা-ধর্মান্ধতা এবং অশিক্ষা ক্যান্সারের আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই দেশের সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান মার্কিনিদের ক্রীড়নক পুতুলে পরিণত হয়েছে। অন্য দিকে, ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান, জাতিসত্তা এবং গণতান্ত্রিক চরিত্রের কারণে মার্কিন প্রশাসন তাদের ভারতনীতি ঠিক পাকিস্তানের মতো করেনি। তারা ভারতের মাটিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ সৃষ্টি, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তৈরি এবং ধনীদের জন্য দেশটিকে স্বর্গরাজ্য বানানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চোরাচালানোর অন্যতম রুট বানানোর মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়। এই লক্ষ্যে তারা নিজেদের সমাজের কুশিক্ষা-অন্ধকারময় দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভোগবাদী মনোবৃত্তির লালসা সমগ্র ভারতবর্ষে অত্যন্ত সফলভাবে ছড়িয়ে দিয়ে বিজেপির উত্থান ঘটিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে ভারতবর্ষের গাদ্দাফি বা সাদ্দামরূপে রাজনীতির মঞ্চ এবং ক্ষমতার সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়।

মার্কিনিদের নীলনকশা অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কর্তৃত্ব ভারতের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে ভারত এই অঞ্চলে হঠাৎ করেই ১৫-১৬ বছর ধরে মার্কিনিদের চেয়েও নোংরা ও নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ভারত তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনীতির কালো হাতের ধারালো নখ দিয়ে বাংলাদেশ-মালদ্বীপ-শ্রীলঙ্কা ও নেপালকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। এ অবস্থায় আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে চীন এগিয়ে আসে। তারা ভারতের কবল থেকে মালদ্বীপ-শ্রীলঙ্কা এবং নেপালকে ছিনিয়ে নেয়ার পর বাংলাদেশ মিশনও শুরু করেছে এবং ২৯ ডিসেম্বরের কালো রাত্রির মাধ্যমে নবতর আলকাতরার ঝিলিক মারা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, যা নিয়ে ভিন্ন একটি নিবন্ধ লেখা যেতে পারে। আমি সে দিকে না গিয়ে বরং মার্কিনিদের কুশিক্ষায় তাদের নিজ দেশে, ভারতে এবং বাংলাদেশে কত বড় অন্ধকার যুগ শুরু হয়েছে, তার গুটিকয়েক উদাহরণ টেনে আজকের নিবন্ধের উপসংহারে চলে যাবো।

তিন দশক ধরে মার্কিনিরা তাদের একক সুপার পাওয়ারের কর্তৃত্ব ব্যবহার করে দুনিয়াব্যাপী যত অমানুষ, দানব এবং বিবেকহীন অস্থির সমাজ সৃষ্টি করেছে; সেগুলোর মধ্যে সব নিকৃষ্ট মানব-দানব ও সমাজের খপ্পরে পড়েছে তারা নিজেরা। নিজেদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় মার্কিনি এমন সব নিকৃষ্ট নেতৃত্বের অধীন হয়ে পড়েছে, সে ধরনের খারাপ নেতৃত্ব দুনিয়ার কোথাও নেই। নেতৃত্বের পাগলামো-অশ্লীলতা ও চরিত্রহীনতার কারণে মার্কিনিদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, দুনিয়াব্যাপী কর্তৃত্ব এবং ব্যবসা-বাণিজ্য যে হুমকির মুখে পড়েছে, যার পরিণতিতে হয় আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ, নতুবা নিজ দেশে গৃহযুদ্ধ মোকাবেলা করে নিজেদের কৃতকর্মের পাপ মোচন করতে হবে। নিজেদের নেতার চরিত্র দিয়ে আজ মার্কিনিরা নিজেদের গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতা, স্বভাব-চরিত্র, রুচি ও আভিজাত্যের যে প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে ধরে নিতে হবে যে দাম্ভিক এই জাতিকে তাদের কৃতকর্ম ভোগ করার জন্য স্বয়ং বিধাতাই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার ভারতের অন্ধকারময়তা ও কুশিক্ষা নিয়ে কিছু বলা যাক। দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে গরু-গোমূত্র এবং গো-মাংস নিয়ে যে অশিক্ষা ও কুশিক্ষার মহড়া চলছে, তাতে পুরো ভারতীয় জাতিসত্তাই হুমকির মুখে পড়েছে। মহাভারতের যুগের ধ্রুপদী কাহিনী অর্থাৎ পাঁচ ভাই মিলে এক নারীকে ভোগ করার মধ্যে মাহাত্ম্য খুঁজে বেড়ানো অথবা প্রাচীন দেব-দেবীদের যৌনজীবন নিয়ে গর্ব করা লোকজন যেভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে গরু নিয়ে মেতে উঠেছে, তার নজির মহাকালের ইতিহাসে কোনোকালে ঘটেনি। মানুষের চিন্তাশক্তি, বুদ্ধি, কল্পনাশক্তি, রুচি ও বিবেকে পচন ধরলে তারা যে রকম অদ্ভুত আচরণ করে এবং অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে, ঠিক তার চেয়েও নিম্নমানের কাজকর্ম ও কথাবার্তার খবর আমরা ভারতীয় পত্রপত্রিকাসহ তাবৎ দুনিয়ার গণমাধ্যমে শুনতে পাই এবং দেখতেও পাই।
ভারতের বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে- সে দেশে মানুষের চেয়ে গরুর গুরুত্ব বেশি। তারা মানুষকে মেরে ফেলছে কেবল গোমূত্রের পবিত্রতা রক্ষার জন্য। তারা গরুর অভয়ারণ্য গড়ে তোলার জন্য পুরো মনুষ্য সমাজকে খোঁয়াড়ে ঢুকিয়ে ফেলেছে।

গরুরা যাকে ইচ্ছে তাকে গুঁতো দিচ্ছে এবং ইচ্ছেমতো মানুষের ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত, দোকানপাট এবং দেবালয়ে হানা দিয়ে মানুষজনকে লাথি-গুঁতো দিয়ে হতাহত করছে। গরুগুলো প্রকাশ্য রাজপথে গাড়ি বাদ দিয়ে মোটরসাইকেলসহ অসহায় পথচারী নারী-পুরুষের ওপর যৌন লালসা চরিতার্থ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় কোনো মানুষ যদি গরুর কর্মে বাধা দিতে চায়, তবে তার ওপর রাষ্ট্রশক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রীয় মদদে গরুবিষয়ক রচনা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। গরু নিয়ে ধ্যানজ্ঞান-গুণকীর্তন এবং গরুপূজাসংক্রান্ত নিত্যনতুন মন্ত্র শুনলে নিজেদেরকে আর মানুষ ভাবতে ইচ্ছে করে না। ভারতের বড় বড় রাজনীতিবিদ বলে বেড়াচ্ছেন, গরু হলো জাতে বর্ণ হিন্দু। সুতরাং গরু মারা গেলে তা চিতার আগুনে পোড়াতে হবে। কেউ কেউ বলছেনÑ গরু হলো মহাবিশ্বের একমাত্র প্রাণী, যা অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে। তারা গরুর সান্নিধ্যকে সর্বরোগের মহৌষধ এবং গোমূত্রকে অমৃতরূপে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার মানসে রাষ্ট্রীয় মদদে ভারতব্যাপী বিশাল এক প্রচারযজ্ঞ শুরু করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের দোসর ভারতের উল্লিখিত কুশিক্ষার প্রভাব বাংলাদেশে কতটুকু পড়েছে তা আমি বলতে পারব না। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু কর্মকাণ্ড, কথাবার্তা, গুজব ইত্যাদি যেভাবে মহামারী আকারে আমাদের সমাজকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরেছে তাতে মনে হচ্ছে আমাদের মানবতা, বিদ্যা-বুদ্ধি-বিবেক এবং আচরণে মারাত্মক সংক্রমণ শুরু হয়েছে। আমাদের সমাজের ছেলেধরার গুজব, গণপিটুনির নির্মমতা, চুরিচামারি, ডাকাতি-রাহাজানির ব্যাপকতা এবং রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার লোভ, জাল-জালিয়াতি, মিথ্যাচার ও নৃশংসতা সভ্যতার চাকা উল্টোপথে ঘুরিয়ে প্রাগৈতিহাসিক যুগের চেয়েও ভয়াবহতম অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন মানুষ ও বিষাক্ত কীটপতঙ্গের পার্থক্য বুঝতে পারছি না। আমরা নর-নারীর যৌন মিলন এবং সন্তান উৎপাদন ও বংশবৃদ্ধির সাথে ডেঙ্গু মশা ও ডেঙ্গু মশীর যৌনকর্ম ও বংশবৃদ্ধিকে এক করে ফেলছি। আমরা এখন বুঝতে পারছি না- কোনটা ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা এবং কারা ইতিহাসের জঘন্যতম মানবতাবিরোধী নৃশংসতার কবলে পড়ে আমাদের দেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলমান!

আমাদের সক্ষমতা এমন দুরবস্থায় পৌঁছে গেছে, যার কারণে আমরা মশার আক্রমণে বেধড়ক প্রাণ হারাচ্ছি। মশার ভয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছি। এই সুযোগে মশারা আমাদের সাথে বেজায় ঠাট্টা-মশকারা শুরু করে দিয়েছে। আমরা যদি রাজধানীর দক্ষিণ ভাগে মশা মারার ওষুধ ছিটাই তবে তারা আমাদেরকে পশ্চাৎদেশ দেখিয়ে উত্তরাংশে চলে যায়। আবার উত্তরাংশে আমাদের তৎপরতা বাড়লে ওরা আমাদেরকে লাথি-গুঁতো-কিল-চড়-ঘুসি মেরে দক্ষিণে এসে বাসা বাঁধে। আমাদের বুদ্ধির দৈন্য, শরীরের জড়তা এবং অনুভূতির মরণদশার কারণে উত্তর ও দক্ষিণের সমন্বয় বা মিলন ঘটাতে পারি না এবং যা নিয়ে আমাদের কোনো লজ্জা-শরমের বালাই নেই- নেই কোনো অনুশোচনা অথবা ভাবান্তর। আমরা কুশিক্ষার আলকাতরা দ্বারা এমনভাবে কালিমালিপ্ত হয়েছি, যার কারণে মশা তো দূরের কথা- আমরা নিজেদেরকে নিজেরা চিনতে পারছি না। আমরা কি মানুষ, নাকি ডেঙ্গু মশা অথবা রোহিঙ্গা তা যেমন পার্থক্য করতে পারছি না; তদ্রƒপ আমরা বুঝতে পারছি না, মানুষের কামড় বেশি বিষাক্ত নাকি ডেঙ্গু মশার কামড়!

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ