fbpx
 

ছাত্রলীগ-যুবলীগ দেখিয়ে দিল!

Pub: Tuesday, September 24, 2019 3:25 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. জাহেদ উর রহমান

বাংলাদেশ কি একটি সফল রাষ্ট্র? জিডিপি গ্রোথ, মাথাপিছু আয় কিংবা অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি দেখিয়ে ফুটানি মারার দিন শেষ হয়ে গেছে। আসলে কোনো রাষ্ট্র সফল না ব্যর্থ তা মাপার রয়েছে এগুলোর বাইরে নানা মানদণ্ড।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদক জি কে শামীম একজন স্কুলশিক্ষকের সন্তান। সেই শামীমের অফিস থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের ডকুমেন্ট। ক্যাশ টাকা পাওয়া গেছে প্রায় ২ কোটি।

পত্রিকায় এসেছে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় তার সাত-আটটি বাড়ি আছে, আর ঢাকার আশপাশে শত শত বিঘা জমি। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) বদৌলতে আমরা এখন খুব নিশ্চিতভাবেই জানতে পারি বাংলাদেশের টাকা উড়ে বিদেশে চলে যায় এবং এসব মানুষের টাকাই বিদেশে পালায় সবচেয়ে বেশি। তাহলে কেমন হতে পারে দেশে-বিদেশে জনাব শামীমের মোট সম্পদের পরিমাণ?

পত্রিকায় এসেছে গণপূর্ত বিভাগের সব ধরনের বড় ঠিকাদারি শামীম ছাড়া আর কারও পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। দয়া করে দু-একটা ঠিকাদারি অন্য কাউকে ছেড়ে দিলেও সেটার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন তাকে দিতে হতো। যুবলীগের আগে আলোচনায় এসেছিল ছাত্রলীগ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের ‘ন্যায্য পাওনা’ দাবি করেছিল ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। এই ন্যায্য পাওনার হার হচ্ছে চার থেকে ছয় শতাংশ। আগামী কয়েক বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার কাজ হবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবং সেই হারে ন্যায্য পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৬ কোটি টাকা।

এই নিয়ে ছাত্রলীগ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মধ্যে চাপান-উতোর চলার মধ্যে আমরা জেনে গেলাম ঈদের আগেই জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রলীগকে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা ঈদ বকশিশ দিয়েছিলেন উপাচার্য। সেই ভার্সিটির এক ছাত্রলীগ নেতা স্বীকার করেছেন তিনি ২৫ লাখ টাকা ঈদ বকশিশ পেয়েছেন।

খবরগুলো দেখে অনেকে স্তম্ভিত হয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, যদিও অবাক হওয়ার কিছুই ছিল না। এই দেশের ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, তাদের দলের বিভিন্ন মানুষ নানারকমভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়।

এই পরিমাণ সম্পদ এবং সম্পদের প্রাপ্তির পদ্ধতিটা আমাদের সামনে এভাবে এখন প্রমাণিত হয়েছে, তার মানে এই নয় এসব আমরা আগে জানতাম না।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ ধনী হয়েছিলেন এমন দু’জন ধনকুবের আমেরিকার বিল গেটস এবং মেক্সিকোর কার্লোস স্লিম। বিল গেটস ধনী হয়েছেন যুগান্তকারী অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজের মালিক হিসেবে, আর কার্লোস স্লিম মূলত একজন টেলিকম ব্যবসায়ী।

শুধু নিজের প্রতিভা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, আর পরিশ্রম দিয়ে একেবারে সাধারণ অবস্থা থেকে পৃথিবীর শীর্ষ ধনীতে পরিণত হয়েছেন বিল গেটস। কার্লোস স্লিমের গল্পটা কিন্তু এমন নয়।

এ ভদ্রলোক পৃথিবীর শীর্ষ ধনী হয়েছেন মেক্সিকোর ক্ষমতাসীন সরকারের ছত্রছায়ায়, তার অনুকূলে করা নানা রকম অন্যায় আইন এবং অন্যায় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে।

মোটামুটি সুস্থ, সৎ, প্রতিযোগিতামূলক কোনো বাজার ব্যবস্থা থাকলে কার্লোস স্লিম পৃথিবীর সর্বোচ্চ ধনী হয়ে ওঠার প্রশ্নই আসত না। শুধু তাই-ই নয়, এই ভদ্রলোককে অন্যায় সুবিধা দিতে গিয়ে মেক্সিকোর জাতীয় আয় ২০০৫ থেকে ২০০৯- এই চার বছরে কম হয়েছে ১১ লাখ কোটি টাকারও বেশি।

বিল গেটস এবং কার্লোস স্লিমকে এভাবে তুলনা করা হয়েছে ‘হোয়াই নেশনস ফেইল : দ্য অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রসপারিটি অ্যান্ড পভার্টি’ নামের বইটিতে। নানা কারণে বইটি এক অতি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ আমাদের মতো দেশের মানুষের জন্য।

বইটির লেখকদ্বয়, ড্যারন এসেমাগ্লু এবং জেমস এ রবিনসন অসাধারণ সব যুক্তি তথ্য-উপাত্ত উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়েছেন কেন একটা দেশ সমৃদ্ধিশালী হয়, আবার কেনই বা একটা দেশ গরিব থাকে, ব্যর্থ হয়।

উল্লিখিত দুই ধনকুবেরকে আলোচনায় এনে তারা খুব চমৎকারভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন কেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী থাকা একটা দেশ পৃথিবীতে নানা দিকে নেতৃত্ব দেয়, আর আরেকটা দেশ পড়ে থাকে অনেক অনেক পেছনে। যাদের জনগোষ্ঠীর বিরাট একটা অংশের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকায় ঢুকে যাওয়া।

এর ব্যাখ্যা লেখকরা দিয়েছেন। তারা বলেন, একটি শিশু আমেরিকায় জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠার সময় একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে দেখে, সেই দেশে সে তার মেধা, যোগ্যতা এবং পরিশ্রম অনুযায়ী ফল পাবে। ওই দেশ মানুষের উদ্যম, সৃজনশীলতাকে মূল্যায়ন করে।

এমনকি এসব যোগ্যতা থাকলে সে বিল গেটসের মতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীতেও পরিণত হতে পারে। তাই একটা আমেরিকান শিশু সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয় তার মেধা, যোগ্যতা এবং পরিশ্রমের দিকে। এভাবে সে তার রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে।

ওদিকে মেক্সিকোতে জন্মে, বেড়ে ওঠা একটা শিশু দেখে সেই সমাজে তাকে যদি সফল কিংবা ধনী হতে হয়, তাকে সরকারের সঙ্গে এক ধরনের যোগসাজশ তৈরি করতে হবে। তার মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি কিংবা পরিশ্রমের তেমন কোনো মূল্যায়ন ওই দেশে হবে না।

তাই বেড়ে ওঠার সময় একজন মেক্সিকান তার মেধা, যোগ্যতা, পরিশ্রমের প্রতি মনোযোগ দেয়ার বদলে তার জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় কীভাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেয়ার ওই চক্রের মধ্যে ঢোকা যায়।

একটা রাষ্ট্রের বিপুল জনগোষ্ঠী যখন তার শ্রম এবং উদ্ভাবনী কাজ বাদ দিয়ে দেয় সেই জাতির অর্থনীতি এবং অন্যান্য সবকিছু ধাপে ধাপে ভেঙে পড়তে বাধ্য। মেক্সিকোর ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে, বিশেষ করে, ২০১৪ সালের পর একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে প্রশাসনের এবং তার নিজ দলের একটা বিরাট অংশকে লুটপাটে জড়িত হতে হয়েছে সেটা আমরা জানি। সাম্প্রতিক যুবলীগ-ছাত্রলীগের ঘটনার পর এটা এক ধরনের প্রমাণ হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে মাত্র।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট মতে, এই দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে চার কোটি ৮২ লাখ কর্মহীন মানুষ আছে। এ মানুষগুলো কিংবা যে শিশুটি আজ বেড়ে উঠছে সে বাংলাদেশকে কেমন দেখছে?

সে তার চারপাশে দেখতে পাচ্ছে তার সমাজে তার এক সিনিয়র মন দিয়ে পড়াশোনা করে ভালো ফল করে চাকরি পাচ্ছে না। সে দেখতে পাচ্ছে একজন সৎ ঠিকাদার কোনো রকম কাজ পায় না, সৎ ব্যবসায়ীর ব্যবসা ভালো চলে না।

অথচ তার চারপাশের সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত চুনোপুঁটিরাও টাকা উপার্জন করছে বেশুমার। আর এই নোংরা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে শুধু টাকা থাকলেই একজন মানুষ সমাজে রিকগনাইজড হয়, সম্মান পায়। টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন করে কোনো মানুষের প্রতি নেগেটিভ ধারণা করার দিন এই সমাজে বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।

ছাত্রলীগ-যুবলীগের ডামাডোলের মধ্যেই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের উদ্ভট কর্মকাণ্ড আমাদের সামনে এসেছে। এর কারণও একই, এই রাষ্ট্রে ভিসি হওয়ার যোগ্যতা যখন একাডেমিক বা প্রশাসনিক দক্ষতা না হয়, যখন যোগ্যতা হয় শুধু কে সরকারকে কত তোষামোদ করতে পারে সেটা, তখন এমন মানুষই ভিসি হিসেবে নিযুক্ত হবেন, এটাই খুব স্বাভাবিক। সেই সমাজে সত্যিকারে যোগ্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ভিসি হবেন না।

এই সমাজে জন্মে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোর-তরুণরা খুব স্পষ্টভাবে দেখছে বৈষয়িক উন্নতি তারই হবে, যে সরকারের একটা চক্রের মধ্যে ঢুকতে পারবে।

সুতরাং সে তার যাবতীয় মেধা-যোগ্যতার চর্চা বাদ দিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও বেশিসংখ্যক মানুষ সেটা বাদ দিয়ে দেবে। তারা চেষ্টা করবে কী করে দলে দলে সরকারের ওই চক্রে ঢোকা যায় এবং সেই চক্রে ঢুকলেই নানা কিছু পাওয়া সম্ভব।

এভাবেই একটা সমাজে উদ্যম, উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। তরুণরা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুখস্থ করে হয় বিসিএসের জন্য জীবন দেয়, অথবা তারা দৌড়াতে থাকে কোনোভাবে সরকারি দলের অংশ হওয়ার জন্য। সেই সমাজে এই গোষ্ঠী দুটোর হাতেই টাকা যায়, ভয়ংকর পরিমাণে যায়।

সেই টাকার অঙ্ক এত বিশাল যে এই দেশে পৃথিবীর অতি ধনীর (২৫০ কোটির বেশি টাকার মালিক) সংখ্যা বৃদ্ধি পায় সবচেয়ে বেশি হারে আর ধনীর (সাড়ে ৮ থেকে ২৫০ কোটি টাকার মালিক) সংখ্যা বৃদ্ধি পায় তৃতীয় সর্বোচ্চ হারে। এই টাকার পরিমাণ কিছু মানুষের হাতে এতই বেশি যেই টাকা উপচে পড়ে, দেশ থেকে পাচার হয় বিদেশে, টাকার অঙ্কে বছরে সেটা কমপক্ষে ৭৫ হাজার কোটি টাকা।

এই গল্পের আরেকটা দিকে ভয়ংকর অন্ধকার। এত তথাকথিত উন্নতির মধ্যেও দেশে দারিদ্র্য কমার হার কমে যায়, নিুআয়ের মানুষের অধিকারে থাকা সম্পদের পরিমাণ কমে যায়, এমনকি কমে যায় তাদের আয়ও, বেকার থাকে কোটি কোটি কর্মক্ষম মানুষ। এভাবেই একটা জাতি ব্যর্থ হয়। সাম্প্রতিক ছাত্রলীগ-যুবলীগের কাণ্ড আমাদের আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সেটা।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ