ছাত্র রাজনীতি, নাকি গ্যাংস্টারিজম?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাহবুব কামাল

বুয়েটের ছাত্র আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পাঠক লক্ষ করুন, ‘পিটিয়ে হত্যা’ শব্দ দুটির আগে ‘নির্মমভাবে’ লিখিনি। বাঘ বলার আগে যেমন হিংস্র না বললেও চলে, পিটিয়ে হত্যা বলতেও তেমন আলাদা করে ‘নির্মমভাবে’, ‘বর্বরোচিত’ ইত্যাদি বিশেষণের দরকার হয় না। একটা প্রাণ কি সহজে যেতে চায়? কতটা পেটালে প্রাণ ও দেহ আলাদা হয়ে যায়, তা বলার দরকার পড়ে না।

যাহোক, আবরারের মৃত্যু আমাকে ছাত্র রাজনীতির স্বরূপ সন্ধানে প্ররোচিত করেছে বলেই লিখছি এ কলাম। প্রথমেই বলে নেয়া ভালো, বাম ছাত্র সংগঠনগুলোকে এ লেখায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ছাত্র রাজনীতি বলতে বোঝাচ্ছি ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের রাজনীতি। বিএনপি ঘরানার কেউ হয়তো বলবেন- এই মুহূর্তে, বিএনপি যখন ক্ষমতায় নেই, তখন ছাত্রদলকে টানা হচ্ছে কেন? টানতে হচ্ছে, কারণ ‘চরিত্র কী?’ এই প্রশ্নের উত্তর অনেকে যেমন দেয় ‘সুযোগের অভাব’, তেমন ছাত্রদলের বর্তমান ‘ভালোত্ব’ বলতে বুঝতে হবে ক্ষমতার অভাব।

গৌরচন্দ্রিকা বড় হয়ে যাচ্ছে, শুরু করা যাক। দুটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলে নিই আগে- একটি ছাত্রদল, অন্যটি ছাত্রলীগের কর্মী নিয়ে।

প্রথমে ছাত্রদল। মিসেস জিয়ার শাসনামলের কথা। আমি গিয়েছিলাম উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা শহরের এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে। সকালে যখন নাশতা করছি, বন্ধুটির ছোট ভাই রানা কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আমার কাছে এসে আবদার ধরে, কামাল ভাই আমাদের কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠান, আমাকে বক্তৃতার কিছু পয়েন্ট দেন না! আমি বলি- তোমার বক্তৃতা তুমিই দেবে, আমাকে টানছ কেন? সে বলে, আমিই তো দেব, ভাইয়ার কাছে শুনেছি আপনি এক সময় রাজনীতি করতেন। আপনি শুধু পয়েন্ট দিয়ে সাহায্য করবেন।

এবার আমি একটু গভীরে যাই- সেক্ষেত্রে তো সেটা তোমার কথা হবে না, আমার কথাগুলো তোমার মুখ দিয়ে বলা হবে। দেখ, কম্পিউটারের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য হল, কম্পিউটারে ডেটা প্রসেস করতে হয় আর মানুষ কাজ করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তোমার ভেতরে ডেটা প্রসেস করে দিলে তোমার মানবিক দিকগুলো উপেক্ষিত হবে। ব্যক্তিত্ব গঠনের সময় চলছে এটা তোমার। আমার মনে হয়, এখন থেকেই নিজের মতো করেই বেড়ে ওঠা উচিত তোমার।

রানা নাছোড়বান্দা। অতঃপর আমি তখনকার ছাত্রসমস্যাভিত্তিক কিছু বিষয় এবং আমার বিবেচনায় সেগুলোর সমাধানের ইঙ্গিতসহকারে তার সঙ্গে ছোটখাটো একটা আলোচনা করি। আমার বিশ-পঁচিশ মিনিটের আলোচনা অরণ্যে রোদনে পর্যবসিত হয় বুঝতে পারি, যখন আলোচনা শেষে সে বলে ওঠে- শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কিছু বললেন না যে!

একটি কবিতার মধ্যে ‘হৃদয়’, ‘জগৎ’ ও ‘বাণী’- এই তিনটি শব্দ থাকলে যেমন সম্ভাবনা থাকে কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের, তেমনি ‘শহীদ’ ‘প্রেসিডেন্ট’ ও ‘জিয়া’ এই শব্দত্রয় দ্বারা আমার বুঝতে বাকি থাকে না, এই ছেলেটি ইতিমধ্যেই ছাত্রদল রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এবং আর যে দশটা ছাত্রলীগ-ছাত্রদল কর্মী রাজনীতির মতো একটি বিশাল বিষয়কে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘শহীদ জিয়া’ এ দুই শব্দ ও শব্দযুগলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে, সে সেই দশজনেরই একজন।

এবার আমি তাকে বলি, আমি বুঝতে পারলাম তুমি একজন ছাত্রদল কর্মী। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কারণ রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রের জন্যই দরকার নয়, ব্যক্তিকে সংস্কৃতিবান ও স্মার্ট করার জন্যও এটি একটি শর্ত। সেদিক থেকে আমি তোমাকে পছন্দই করছি।

কিন্তু তুমি কি আমাকে বলবে, কেমন করে এই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হলে? রানা জানায়, তৃতীয় বিভাগে এসএসসি পাস করেছে বলে শহরের ভালো কলেজটিতে ভর্তি হতে অসুবিধা হচ্ছিল। একদিন এক বন্ধুর সৌজন্যে সে কলেজের এক ছাত্রদল নেতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে তার মাধ্যমে ভর্তি হয়। এরপর সেই নেতার সান্নিধ্যে সে ধীরে ধীরে ছাত্রদল কর্মী হয়ে ওঠে।

এই কার্যকারণে আমার ভাবান্তর হয় না। কথা চালিয়ে যাই। বলি- আচ্ছা তুমি কি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচির যে কোনো পাঁচটি আমাকে বলতে পারবে? রানা আমতা আমতা করতে থাকে, আমি তাকে রেহাই দিই না। বলি- ঠিক আছে, বলতে হবে না। কিন্তু অন্তত এটা তো বলবে বিএনপি রাজনীতির কোন দিকটা তোমার ভালো লাগে?

  • বিএনপির সবকিছুই ভালো লাগে।
  • তা তো লাগবেই। একটা ভালো লাগার দিক বল অন্তত।
  • বিএনপি জাতীয়তাবাদী দল।
  • আরেব্বাবা, এ তো বিরাট দার্শনিক কথা বললে। তো তুমি বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পার্থক্যটা কর কীভাবে?
  • বাঙালি জাতীয়তাবাদ হচ্ছে হিন্দুদের আর বাংলাদেশি মুসলমানদের।
  • শেখ মুজিবকে তুমি কীভাবে দেখ?
  • তিনি তো ভারতের দালাল ছিলেন। ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করার ষড়যন্ত্র টের পেয়ে জিয়াউর রহমান তাকে হত্যা করে ক্ষমতা কেড়ে নেন।
  • বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তো মোশতাক ক্ষমতায় বসল। জিয়াকে তুমি কোথায় পেলে? ঠিক আছে, ছাত্রসন্ত্রাসের ব্যাপারে আমি একটু আগে কিছু বললাম। তোমার কোনো সাজেশন আছে?
  • সব সন্ত্রাসীকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া উচিত।
  • বাহ, ভালোই তো। তাহলে তো বিদেশে যাওয়ার আর কোনো চিন্তা নেই। সন্ত্রাস করলেই যাওয়া যাবে। কর্নেল তাহেরের নাম শুনেছ?
  • শুনব না কেন? উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ভারতের দালাল ছিলেন। জিয়াউর রহমান তাকে ফাঁসি দিয়েছেন। আচ্ছা উনি কি বীরশ্রেষ্ঠ?
  • না, উনি বীর উত্তম।

রানা উঠে যেতে চায়। আমারও ভালো লাগে না। ইতিহাসসচেতন নয় এমন কারও সঙ্গে বেশিক্ষণ আলাপ চালিয়ে যাওয়া মুশকিল। ওর অনেক দোষের মধ্যে ইতিহাসবিমুখতা অন্যতম। সে এই তথ্যটি পর্যন্ত জানে না যে, ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধি দেয়া হয়েছে শুধু তাদেরই, যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আমি বিরক্ত, তবু তাকে আরও দু-তিন মিনিট বসিয়ে রেখে আমার শেষ কথাগুলো বলি- তুমি কিন্তু ইতিহাসসচেতন নও।

এই সচেতনতা তুমি লেখাপড়া করে অর্জন করতে পার। দুই নম্বর, তোমার লজিক ফেয়ার নয়। এটা অর্জন করা খুব কঠিন, তবে একটি বিষয়কে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখার অভ্যাস করলে এক সময় তোমার মধ্যে এটা গ্রো করবে। তিন নম্বর, তুমি একরোখা টাইপের। আধুনিক মানুষকে একরোখা হলে চলে না। মজার ব্যাপার হল, ভর্তির আগে ওই ছাত্রদল নেতার সঙ্গে পরিচয় না ঘটে যদি ঘটনাচক্রে একজন ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে তোমার পরিচয় ঘটত, তাহলে কিন্তু তুমি বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে পড়তে এবং তখন তুমি একই রকম একরোখামি করতে।

এবার একজন ছাত্রলীগ কর্মী সম্পর্কে অভিজ্ঞতা। নতুন প্রজন্মের যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, তাদের সম্পর্কে আমি ধারণা নিয়ে থাকি একটি কমন প্র্যাকটিসের মাধ্যমে। সভ্যতা বিকাশে অবদান রেখেছেন, এ যাবৎকালের মানবেতিহাস থেকে এমন পাঁচ ব্যক্তির নাম করতে বলি তাদের। উত্তর থেকেই ওই ছাত্র বা ছাত্রীর জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গিটা মোটামুটি বোঝা যায়। তো কয়েক বছর আগে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলায় কলেজপড়ুয়া এক ছাত্রলীগ কর্মীকে করেছিলাম প্রশ্নটা।

প্রথমে সে প্রশ্নটাই বুঝতে পারেনি, বুঝিয়ে বলার পর সে নামগুলো সাজায় এভাবে- হজরত মুহাম্মদ (সা.), বঙ্গবন্ধু, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি জসীমউদ্দীন ও হুমায়ূন আহমেদ। প্রথম নামটি নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। দ্বিতীয় নামটি তার রাজনীতির আদর্শিক পুরুষের, যার প্রতি রয়েছে তার অপরিসীম ভালোবাসা, যা অন্য কারও প্রতি নেই; সুতরাং এ ক্ষেত্রেও বলার কিছু নেই।

কিন্তু বাকি তিনজন? আমি তাকে বলি- কম্পিউটারসহ তুমি যা যা ভোগ করে চলেছ, তার সবই হয় ইউরোপিয়ান, না হয় আমেরিকানদের মাথা থেকে বের হয়েছে; অথচ নামগুলো বলার সময় তুমি এশিয়া থেকে বের হতে পারনি। শুধু তা-ই নয়, পাঁচটা নামের মধ্যে চারটিই তুমি নিয়েছ তোমার নিজের দেশ থেকে। অর্থাৎ বাইরের জগৎ সম্পর্কে তোমার ধারণা খুবই কম।

পাঠক ভাববেন না, আমি এই ছাত্রলীগ কর্মীর কথায় খুব অবাক হয়েছি। এর চেয়ে নিুমানের রাজনৈতিক কর্মী দেখেছি আমি। এই ছাত্রলীগ কর্মীর সঙ্গে আমার পরের কথোপকথন ছিল এমন :

  • আচ্ছা, জিয়াউর রহমানকে তুমি কী চোখে দেখ?
  • উনি তো রাজাকার ছিলেন।
  • স্বাধীনতার পর তোমার দল আওয়ামী লীগই কিন্তু ক্ষমতায় ছিল। তোমরাই তাকে বীর উত্তম উপাধি দিয়েছিলে। কেন দিয়েছিলে?
  • বঙ্গবন্ধু খুব উদার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি যদি বিএনপিকে ধ্বংস করে দিতেন, তাহলে আর কোনো ঝামেলা থাকত না।
  • বঙ্গবন্ধুর আমলে তুমি বিএনপি পেলে কোথায়? থাকগে, তুমি কি ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র, আদর্শ-লক্ষ্য এসব পড়েছ?
  • না। স্যার, এগুলো কোথায় পাওয়া যায়?
  • এটা আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? উপজেলা বা জেলা শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে এতদিন চাওনি কেন?
  • এটা তো আমার মাথায়ই আসে নাই।
  • ঠিক আছে, এগুলো না হয় না-ই পড়েছ, পাটগ্রামের যুবসমাজের মধ্যে যে মাদকের প্রসার ঘটছে, এর প্রতিকারে তোমরা কী করছ?
  • স্যার পাটগ্রামে জামায়াত-শিবিরও বাড়ছে। শিবির সামলাতেই তো হিমশিম খাচ্ছি, মাদকবিরোধী আন্দোলন করব কখন?
  • তার মানে জামায়াত-শিবিরই একমাত্র শত্রু তোমাদের, মাদক নয়? আচ্ছা, তোমরা তো কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বল, টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজিও কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা?
  • আমি স্যার এসব করি না।
  • তুমি কর না ঠিক আছে, যারা করে তাদের কখনও চ্যালেঞ্জ করেছ?
  • তাহলে তো স্যার ছাত্রলীগই করতে পারব না।
  • করলে না! তাতে কি জাতির কোনো ক্ষতি হবে?
  • না স্যার, ছাত্রলীগ আছে বলেই তো জননেত্রীর হাত এত শক্তিশালী।
  • ঠিক আছে, তোমরা জননেত্রীর হাত শক্তিশালী করতে থাক।

২.

এসব কী হচ্ছে দেশে? আমরা কি একটি প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশকে কুনাগরিক বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছি? আমাদের জানামতে, দেশের কোনো ছাত্রসংগঠনেই রাজনৈতিক আচরণবিধি ও শিষ্টাচার শেখানোর কার্যকর প্রক্রিয়া চালু নেই। এগুলোয় যোগ্য কর্মী আছে বটে; কিন্তু সেই কৃতিত্ব একান্তই তাদের নিজস্ব। এরা যোগ্য হয়েছে নিজের চেষ্টায়, সংগঠন তাদের কিছু দেয়নি এবং সংখ্যায় এরা এত অল্প যে, দশমিকের পরে এদের অবস্থান। সংগঠনে থেকেও এরা সংগঠনে নেই- নিজভূমে পরবাসী তারা। আর বাকিরা? আওয়ামী লীগ যেহেতু এখন ক্ষমতায়, তাই ছাত্রলীগের কথাই বলি।

হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নামে দেশের এখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে গ্যাংস্টারিজমের একেকটি বিশাল দুর্গ। এসব দুর্গে অবস্থান নিয়েছে সৈন্যবেশী সশস্ত্র ছাত্র- এদের পেশি আছে, মগজ নেই; বর্তমান আছে, ভবিষ্যৎ নেই। এসব গ্যাংস্টার তাদের নেতার কাছে একেকটি মহামূল্যবান সম্পদ, কারণ নেতার সামান্য অঙ্গুলি হেলনে এরা ছারখার করে দিতে পারে লক্ষ্যবস্তু, গুঁড়িয়ে দিতে পারে প্রতিপক্ষ। এরা কেউ লেখাপড়া করে না।

এরা ডারউইন, মরগ্যানের নাম শোনেনি; রুশো-ভলটেয়ারকে এরা চেনে না, এদের স্বপ্নপুরুষ রোটন, সোহাগ, জাকির। বাহাদুর বেপারি এদের কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, লিয়াকত শিকদার বিশুদ্ধতম রাজনীতিক। শেলি-কিটসের কবিতা এদের কাছে অর্থহীন কিছু শব্দ, সময়-সুযোগ পেলে এরা পড়ে নেয় মাসুদ রানা অথবা হুমায়ূন; এরা রবি শঙ্করের সেতার ছুড়ে ফেলে দিয়ে হেডফোনে বুঁদ হয়ে শোনে র‌্যাপ সঙ্গীত। এরা ডিসিকার বাইসাইকেল থিফ কিংবা কুরুসোয়ার রাশোমন দেখে না, সন্ত্রাসের ফাঁকে ফাঁকে দেখে নেয় সালমান অথবা শাহরুখ খানের কোনো ছবি।

এরা জানে না কোন আদর্শের জন্য লড়ছে অথচ ঝুঁকি নিয়েছে নিজের জীবনের, কারণ বিজয়ী হয়ে নেতার সামনে দাঁড়াতে পারলেই হাতের মুঠোয় চলে আসবে উপরে ওঠার টিকিট। এরা ডাকাতের মতো সাহসী, আবার ডাকাতের চেয়ে অধম, কারণ ডাকাত বিরতি দিয়ে দিয়ে ডাকাতি করে, এরা মুহূর্তে মুহূর্তে প্রকম্পিত করে রেখেছে জনপদ।

কোন মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ দেশে ছাত্র রাজনীতি চালু রাখা হয়েছে, কেউ জানেন কি? কোন কাজটা কেন করছি, আসল কারণটা প্রীতিকর নয় বলে অন্য কারণ বলার রীতিটা অনেক পুরনো। সিঙ্গাপুর যাওয়ার আসল কারণ না বলে স্ত্রীকে বলছি- মেডিকেল চেকআপ। অথবা সুন্দরী লেডি সেক্রেটারি রেখে বলছি- মেয়েটি হাইলি কোয়ালিফাইড। দুই দলের চূড়ামণিরা (হাইকমান্ড) যে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল পুষছে; তার আসল কারণ এরা হল নির্বাচনী শক্তি।

নির্বাচনে জিততে হলে শক্তি দরকার আর সংগঠিত ছাত্রের চেয়ে বড় শক্তি আর কী আছে? দ্বিতীয় কারণ, এ হল প্রতিপক্ষকে সাইজ করার যন্ত্র। মিসেস জিয়া তো একবার বলেই ছিলেন- আওয়ামী লীগকে শায়েস্তা করতে আমার ছাত্রদলই যথেষ্ট। যাকগে।

বুকে-পিঠে ‘গণতান্ত্রিক সরকার’, ‘গণতান্ত্রিক দল’-এর পোস্টার সেঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছি অথচ কোনো লাশেরই কৈফিয়ত নেই। যে

জন্মেছিল বেঁচে থাকবে এই অধিকার নিয়ে, সে একটু বেশি সময় বেঁচে থাকার আকুতিতে সন্ত্রস্ত মেষশাবকের মতো প্রাণভিক্ষা চেয়ে ব্যর্থ হচ্ছে হিংস্র ব্যাঘ্রের কাছে (বিশ্বজিৎকেও স্মরণ করুন)। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, ভিন্ন জাতির সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ নয়, কোনো বন্যপ্রাণী নয়- নয় কোনো অসুখ-বিসুখ, রোগ-শোক-জরা; যমদূত হয়ে সামনে দাঁড়াচ্ছে বোতাম খোলা, কখনও বা গলায় সোনার চেইনপরা বিশ-একুশ বছরের তরুণ। স্বপ্নময় জীবন, রহস্যেঘেরা জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে নিমেষেই।

’৪৭-পরবর্তী এতদঞ্চলীয় রাজনীতির বঙ্কিম ধারাটি যারা শান্তভাবে বিশ্লেষণ করতে চাইবেন, তাদের কাছে কলাপাতার এপিঠ-ওপিঠের মতো দুটোই বাস্তব হিসেবে ধরা দেবে যে, জাতীয় সংকট (ঔপনিবেশিকতা কিংবা সামরিক একনায়কতন্ত্র) মোকাবেলায় ছাত্রসমাজ একটি উৎকৃষ্ট শক্তি, কোনো কোনো সময় রাজনীতির নিয়ামকও বটে; কিন্তু দলীয় রাজনীতিতে এই ছাত্রসমাজই নিকৃষ্ট ব্যবহার্য বস্তু। ছাত্রলীগের গৌরব যা, তার সবই এখন ইতিহাসের বিষয়বস্তু।

আবরার হত্যার পর ইয়েটসের ‘দ্য সেকেন্ড কামিং’ কবিতার লাইনটি মনে পড়ে খুব- Things fall apart, centre can not hold- সবকিছু ভেঙে পড়ছে, কেন্দ্র ধরে রাখতে পারছে না।

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

[email protected]


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফোনঃ +৪৪-৭৫৩৬-৫৭৪৪৪১
Email: [email protected]
স্বত্বাধিকারী কর্তৃক sheershakhobor.com এর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত