fbpx
 

শাসক দলের সংকট

Pub: Thursday, October 17, 2019 4:18 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বদরুদ্দীন উমর
পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার নামই সংকট। এই সংকটেই এখন আওয়ামী লীগ নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতাসীন অবস্থায় এই দলটি যেভাবে নিজেকে ও নিজের অঙ্গসংগঠনগুলোকে পরিচালনা করে এসেছে তারই পরিণতিতে এখন সংকট ঘনীভূত হয়েছে।

মূল রাজনৈতিক দল ছাড়া তার অঙ্গসংগঠনগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের চরিত্র সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল মূল দল বা সংগঠনের ওপর। মূল দলের চরিত্র যে রকম হবে তার অঙ্গসংগঠনগুলোর চরিত্রও হবে সেই রকম। এটা এক স্বতঃসিদ্ধ সত্য।

কাজেই ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ইত্যাদি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত; কিন্তু তাদের মূল দল আওয়ামী লীগ ধোয়া তুলসীপাতা এটা হতে পারে না। এ ধরনের চিন্তা হয় মূর্খতা, নয়তো ধাপ্পাবাজির পরিচায়ক।

ছাত্রলীগের নানা অপকর্ম এবং দুষ্ট তৎপরতার কারণে সংগঠনটির মধ্যে যে সমস্যা দাঁড়িয়েছে, সেটা সামাল দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাত্র কিছুদিন আগে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি মনে করেছিলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ছাত্রলীগের মধ্যে নৈরাজ্যিক অবস্থার অবসান ঘটবে। এজন্য এ দু’জনের অপসারণকে শুদ্ধি অভিযান হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। কিন্তু তা যে ভুল এর প্রমাণ পাওয়া গেল বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর।

আবরারকে যেভাবে এবং যত নিষ্ঠুরভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে তা লোমহর্ষক। এর মধ্য দিয়ে বোঝা গেল, শুধু কয়েকজন নেতাকে অপসারণ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কোনো সংগঠন শুদ্ধ হয় না।

এর দায়িত্ব আওয়ামী লীগকে নিতেই হবে। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে অনেক অপকর্ম করেছিল। সেসব অপকর্মের মধ্যে ছিল ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ না করে তাদের ছাত্রসংগঠনকে দুই দল কর্তৃক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া।

তাদের ব্যবহার করা, নিজেদের শাসন মসৃণ রাখার জন্য। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে একটানা ক্ষমতায় থেকে তাদের ছাত্রসংগঠনটির নানা অপকর্ম এবং দুষ্ট তৎপরতাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে ব্যবহার করে এসেছে, বাংলাদেশে যার কোনো নজির নেই।

প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে জবরদস্তি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে তারা সব আবাসিক হল দখল করেছিল এবং চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের এক অদৃষ্টপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এসবই হয়েছিল আওয়ামী লীগ এবং তাদের সরকারের নাকের ডগায়। শাসক দলের পদলেহনকারী ব্যক্তিদের উপাচার্যের পদে অধিষ্ঠিত করে তারা এ কাজ সম্পন্ন করেছিল। এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এদিক দিয়ে যে ভূমিকা পালন করেন তা ন্যক্কারজনক। এসব ব্যাপারকে গুরুত্বহীন মনে করার কারণ নেই এজন্য যে, সরকার ও তাদের মনোনীত উপাচার্য ও পুলিশের মাধ্যমেই বেশ নিশ্চিন্তে ছাত্রলীগের নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের অপরাধমূলক তৎপরতা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

একথা সবারই জানা। কারণ সবার চোখের সামনেই ছাত্রলীগ দিনের পর দিন নানা অপকর্ম করে সমগ্র ছাত্রসমাজকেই কলঙ্কিত করেছিল। দেশের ছাত্ররা আগে যে গৌরবজনক রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে এসেছে, তার পরিবর্তে ছাত্রলীগ ছাত্রসংগঠনকে ও ছাত্র রাজনীতিকে পরিণত করেছিল দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের হাতিয়ারে।

বুয়েটের হত্যাকাণ্ডের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখন সেখানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের ব্যবস্থা হচ্ছে। কিন্তু বুয়েটে তো ছাত্র রাজনীতি বলতে ছাত্রলীগের ‘রাজনীতি’ ও সংগঠন ছাড়া অন্যকিছু নেই।

অন্যসব ছাত্রসংগঠনকে ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় বিতাড়িত করেছে। কাজেই বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বলতে বাস্তবত ছাত্রলীগের রাজনীতি ছাড়া অন্য কিছুই বোঝায় না। কিন্তু শুধু বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করেই কি আওয়ামী লীগের শুদ্ধি অভিযান সফল হবে? এটা চিন্তা করা এক মহা অবাস্তব ব্যাপার ও মূর্খতা।

শুধু বুয়েট নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ পরিচালিত টর্চার সেলের সংবাদও এখন প্রকাশিত হয়েছে। ‘অর্ধশত টর্চার সেল ঢাবির ১৩ হলে’ শীর্ষক এক রিপোর্ট যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে ১৪ অক্টোবর।

এতে বলা হয়েছে, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশত কক্ষ ব্যবহৃত হয় ‘টর্চার সেল’ হিসেবে। ১৩টি ছাত্র হলের এসব কক্ষে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থীও। কেবল শিক্ষার্থীদের নির্যাতনেই এসব রুম ব্যবহার হয় এমন নয়। পরিবেশ ও সময়ভেদে কক্ষগুলো হয়ে ওঠে ‘নির্যাতনের কেন্দ্র’। এক্ষেত্রে কখনও শয়ন কক্ষ, কখনও আহার কক্ষ, কখনও অতিথি কক্ষ, কখনও হলের ছাদ, মাঠ কিংবা গণরুমগুলো ‘টর্চার সেল’ হয়ে ওঠে।

গত সাত বছরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও ১৩টি আবাসিক হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ৫৮টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।’’ এভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রের মৃত্যুও হয়েছে।

কিন্তু তার কোনো বিচার হয়নি। এসব ঘটনা যে ঘটছে এবং এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে অবগত ছিল না, এটা কে বিশ্বাস করবে? এটা কি সম্ভব? আসলে আওয়ামী লীগের মনোনীত উপাচার্য, সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং পুলিশের সহায়তাতেই এ ধরনের ক্রিমিনাল তৎপরতা চালানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই এটা হচ্ছে এমন মনে করার কারণ নেই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই এ অবস্থা। ছাত্রলীগ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ‘টর্চার সেল’ তৈরি করে এবং লুটতরাজ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি করে নিজেদের শক্তিশালী করেছে।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতারা অনেক বড় বড় বাড়ি, গাড়ি এবং নানা সম্পদের মালিক। সরকার তাদের নাকের ডগাতেই সব ঘটতে শুধু দেখেছে তাই নয়, দিয়েছে।

১১ অক্টোবর ‘বরিশালের ৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হলে হলে টর্চার সেল, মাদকের আখড়া’ শীর্ষক যুগান্তরের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘‘কেবল বুয়েটের হলই নয়, বরিশালের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হলগুলোতেও গড়ে উঠেছে ‘টর্চার সেল’।

বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ‘টর্চার সেলে’ মেধাবী ছাত্র আবরারকে পিটিয়ে হত্যার পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলে ‘টর্চার সেলের’ সন্ধান মিলেছে। এসব কক্ষে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদক বেচাকেনাও। মাদক সেবন তো আছেই।

কক্ষগুলো কথিত ছাত্রনেতাদের কব্জায় থাকায় তাদের ব্যাপারে প্রশাসনকেও অসহায় দেখা গেছে। এসব কক্ষে ডেকে নিয়ে ছাত্র নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটলেও অজানা আতঙ্কে কেউ মুখ খুলছেন না।’’

প্রশাসনকেও অসহায় দেখা গেছে- এর অর্থ কি এই নয় যে, পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে উপনীত হয়ে খোদ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, যে প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতাতেই তারা এতদিন তাদের সবরকম ক্রিমিনাল অপকর্ম চালিয়ে এসেছে?

বরিশালের ওপর উপরোক্ত রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কলেজগুলোতেও একই কাণ্ড ঘটছে। এ পরিস্থিতিকে কি বেসামাল ও নিয়ন্ত্রণহীন বলা চলে না?

আসলে চারদিকে ছাত্রলীগের এই উচ্ছৃঙ্খল তৎপরতা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাতে চললেও এখন তা এত শক্তিশালী ও ব্যাপক হয়েছে যে, তা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পরিস্থিতি বেসামাল হয়েছে।

এই নিয়ন্ত্রণহীনতার ফলে চারদিকে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকারের পক্ষে সংকটজনক হয়েছে। এই সংকটের কারণেই তারা এখন এদের বিরুদ্ধে ‘শুদ্ধি’ অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু যা সর্বাংশে অশুদ্ধ এবং ব্যাপক ও বেসামাল, তা কি মাত্র কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করে শুদ্ধ করা যায়?

শুধু ছাত্রলীগই নয়, যুবলীগের মধ্যে ব্যাপকভাবে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাসিনো ব্যবস্থার মাধ্যমে যুবলীগের নেতা ও কর্মীরা প্রভূত পরিমাণ অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই তাদের ছাত্র-উত্তর জীবনে যুবলীগে কাজ করে। তাদের জন্যই যুবলীগ গঠিত হয়েছে।

সম্প্রতি তাদের তৎপরতার নানা বিবরণ সংবাদপত্রে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। যুবলীগের কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু এসব গ্রেফতারের মাধ্যমে কি যুবলীগকে ‘শুদ্ধ’ করা যাবে? আওয়ামী লীগের এই অঙ্গসংগঠন থেকে আওয়ামী লীগ কি বিচ্ছিন্ন? তারা কি অন্যরকম?

শুধু ছাত্রলীগ ও যুবলীগই নয়, সারা দেশে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের যে জাল বিস্তৃত হয়েছে তার দিকে তাকালেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং আওয়ামী লীগের ও তাদের সরকারের সংকটের চিত্র পরিষ্কার হবে। এই সংকট সত্ত্বেও জনগণের সংগঠিত শক্তি ও শক্তিশালী বাম রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতির কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় নিরাপদে টিকে আছে। তবে আওয়ামী লীগ যে সমাধানহীন সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, সেটা তাদেরকে ভেতর থেকেই দমিয়ে দেয়ার শর্ত তৈরি করছে।

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ