fbpx
 

অনাস্থা ও প্রত্যাশার ঢাকা সিটি নির্বাচন

Pub: রবিবার, জানুয়ারি ৫, ২০২০ ৪:০৮ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ
বাংলাদেশে ইংরেজি নতুন বছরটাও শুরু হলো একটা রাজনৈতিক অনাস্থা ও হতাশার মুখে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে। ৩০ জানুয়ারি ২০২০ অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা হিসাবনিকাশ। এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর প্রতি সৃষ্ট অনাস্থার কারণেই সে হিসাব-নিকাশের অনিশ্চয়তা নিয়েই শুরু হচ্ছে ২০২০ সালের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের পাতা।

নির্বাচন অনুষ্ঠান ও ফলাফল নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় জনমানুষের আস্থার সংকট এতটাই প্রকট যে, অনেকে বিজয়ের আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে রেখেছেন নৌকা প্রতীকের দুই মেয়র প্রার্থীকে। তারা ধরেই নিয়েছেন, যেকোনো উপায়েই হোক, নৌকার দুই প্রার্থীকে বিজয়ী করার বন্দোবস্ত করা হবেই। এ ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ প্রযোজনা ব্যর্থ হবে না বলে যারা ধারণা রাখেন, তারাই আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে রেখেছেন। শুভেচ্ছার সঙ্গে সামান্য আবদারও করেছেন কেউ। ভোট জালিয়াতির দৌরাত্ম্য দেখিয়ে পদ দখল করলেও যারাই মেয়র হবেন, তারা যেন অন্তত মশার দৌরাত্ম্য ও ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্কমুক্ত শহরে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু রক্ষা করেন, সেই আবেদন রেখেছেন কেউ।

সিটি নির্বাচন নিয়ে এই আস্থাহীনতার পেছনে নিঃসন্দেহে এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ভূমিকা রেখেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকা দক্ষিণের নৌকার মেয়র প্রার্থী সিলেকশনের বিষয়টি। যারা মনে করতেন যে, সদ্য বর্ষপূর্তি করা জাতীয় নির্বাচনের বিব্রতকর কালো আস্তর সরানোর উদ্যোগ হিসেবে সরকার ঢাকা সিটি নির্বাচনটিকে সুষ্ঠু করে হারার ঝুঁকি নিতেও পারে, তারাও এই প্রার্থী নির্বাচন দেখে দ্বিধায় পড়ে গেছেন। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ নির্বাচন হলে নৌকার ফলাফল কী হতে পারে, তা জানার পরও ফজলে নূর তাপসকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করিয়ে মেয়র প্রার্থী করায় হিসাব আরও গোলমেলে করে দিয়েছে। কেউ আবার একটু ভিন্ন হিসাবও দিচ্ছেন। বলছেন, যেকোনো উপায়ে দক্ষিণ কব্জা করে উত্তরে সুষ্ঠু ভোট করে সরকার দেখাবে যে, তাদের অধীনে গ্রহণযোগ্য ভোট হয়।

যে যেই ব্যাখ্যাই দিন না কেন, সবই কিন্তু সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার প্রকট সংকটকেই তুলে ধরে। ভোটার তাদের ভোট দিতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী তা গণনা ও প্রকাশ করা হবে এই আস্থাটা কিন্তু কারোর নেই। সবাই হিসাব করছেন কৌশলের। সরকার ও নির্বাচন কমিশন কী ধরনের কৌশল নিতে পারে এবং কী কৌশল নিলে কী ফলাফল আসতে পারে বিশ্লেষণ চলছে তা নিয়েই।

কিন্তু যে দেশের মানুষ নির্বাচনকে একটা উৎসব হিসেবে নিতে চায়, সেই দেশে এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? এর উত্তরটি পাওয়া যাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের কথায়। ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান আছে কি না এ বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন এভাবে, এ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগের কারণ রয়েছে। কেননা, এ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। গত জাতীয় নির্বাচনে তারা নিজেদের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে পারেনি, অনেক কারসাজির আশ্রয় নিয়েছে। বস্তুত জাতীয় নির্বাচনে যা হয়েছে, তা মূলত এক ধরনের অশুভ আঁতাত। নির্বাচন কমিশন, এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মিলে এই আঁতাত তৈরি করেছিল। যে কারণে এই নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। তাদের কাছ থেকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করা দুরাশা ছাড়া আর কিছুই না।

এ ধারণা যে শুধু সুজন সম্পাদকই পোষণ করেন তা-ই নয়। মূলত তার বয়ানে এ দেশের অধিকাংশ মানুষের মতামতটিই প্রতিফলিত হয়েছে। তার কারণ, মাত্র এক বছর আগের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনটির দগদগে ক্ষত হয়তো ভুলতে পারছে না দেশবাসী। কী ঘটেছিল সে নির্বাচনে, তার কিছু তথ্য হয়তো অনেকেরই মনে আছে। … একটি আসনে যত বৈধ ভোট পড়েছে, তার ৯০ শতাংশের বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন ১১০ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ১০৮ জন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। বাকি দুজনও আওয়ামী লীগের জোটের শরিক। অন্যদিকে, ১৪৬টি আসনে মহাজোটের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ১০ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৮৩টি আসনে তাদের ভোট ৫ শতাংশেরও কম। তাদের প্রায় সবাই ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী। নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া ভোটের ফলাফলের প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে একটা-দুটো নয়, ৯১টি কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৫১টিতে ধানের শীষের প্রার্থীর ভোট শূন্য! ৫টি সেন্টারে ১টি করে এবং ৬টি সেন্টারে ২টি করে ভোট পেয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ৯১টির মধ্যে ৬২ সেন্টারে ধানের শীষের প্রার্থী শূন্য বা দু-একটি করে ভোট পেয়েছেন, সেই সেন্টারগুলোতে ভোট পড়ার হার অন্য কেন্দ্রের তুলনায় বেশি। এই কেন্দ্রগুলোর প্রায় সবগুলোতেই ভোট কাস্টিংয়ের হার ৯৪ থেকে ৯৯ শতাংশ।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনেও প্রতিপক্ষ ধানের শীষের প্রার্থীকে হাজারখানেক ভোট ধরিয়ে দিয়ে নৌকার প্রার্থী জয়ী হয়েছেন সোয়া তিন লাখ ভোটে! এ আসনে ১৬৮ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৫টি কেন্দ্রে ধানের শীষের প্রার্থী পেয়েছেন শূন্য ভোট। ১১টি কেন্দ্রে ১ ভোট করে, ১৩টি কেন্দ্রে ২টি করে ও ৬টি কেন্দ্রে ৩টি করে ভোট। অথচ এসব কেন্দ্রেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতোই ভোট পড়ার হার ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশ। ভোটের চিত্র সারা দেশে প্রায় একই ধরনের ছিল। সুজনের দেওয়া তথ্য মতে, এ নির্বাচনে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। ১ হাজার ২০৫টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশ। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পড়েছে ৬ হাজার ৪৮৪টি কেন্দ্রে। আর ৮০ থেকে ৮৯ শতাংশ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে, এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫ হাজার ৭১৯টি।

কিন্তু কেন এতটা অস্বাভাবিক ফলাফল হয়েছিল সে নির্বাচনে? তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির দেওয়া তথ্যেও। ‘একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা’ শীর্ষক গবেষণার প্রাথমিক প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, ৩০০ আসনের মধ্যে দৈবচয়নের ভিত্তিতে বেছে নেওয়া ৫০টি আসনের ৪৭টিতে নির্বাচনের দিন কোনো না কোনো অনিয়ম হয়েছে। ৩৩টি আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা পেয়েছে বলে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়।

নির্বাচনটি এতটাই বাজে হয়েছে যে, শুধু বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, সিপিবিসহ সরকারবিরোধী অংশই নয়, সরকারের শরিক দলগুলো থেকেও জালিয়াতির অভিযোগ বা দায় স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা নৌকার এমপি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘বিগত নির্বাচনে আমিও নির্বাচিত (এমপি) হয়েছি। তারপরও আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, গত নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। জাতীয়, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোথাও ভোট দিতে পারেনি দেশের মানুষ।’

মহাজোটের আরেক শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ লিখিত বক্তব্যে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সব রাজনৈতিক দল ও জনগণ উদ্দীপনা ও আশা নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচনের পরে বিষণœতায় আক্রান্ত হয়েছে পুরো জাতি। এর মূল কারণ হচ্ছে প্রশাসনের এক শ্রেণির অতি-উৎসাহী অংশ ভোটের পূর্ব রাতেই ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখাসহ নানা অনিয়ম সংঘটিত করেছে।

অনেক বিদেশি গণমাধ্যমের মতো প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টও এই নির্বাচনকে বলেছে, একটি স্বচ্ছ জালিয়াতির নির্বাচন। ‘অবিচুয়ারি অব এ ডেমোক্রেসি : বাংলাদেশ’ নিবন্ধে পত্রিকাটি বাংলাদেশের সে নির্বাচনকে বলে একটি ‘ফ্রডুলেন্টলি ট্রান্সপারেন্ট ইলেকশন’। এমন জালিয়াতির নির্বাচনের একটি দগদগে ক্ষত আছে এ দেশের মানুষের, যার বর্ষপূর্তি হলো মাত্র তিন দিন আগেই। তার ওপর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের তোড়জোড় দেখাচ্ছে নির্বাচন কমিশন, যাতে নৌকার প্রার্থী ছাড়া আর কারও সায় নেই। ইভিএম নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক আছে। এমনকী আমেরিকান কম্পিউটার বিজ্ঞানী বারবারা সায়মন পর্যন্ত দি আটলান্টায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন ইভিএমে জালিয়াতির বিস্তারিত। এ বিষয়ে সুজন সম্পাদক ডয়চে ভেলের কাছে বলেছেন, ইভিএম একটি বড় অংশের ভোটারদের ভোট প্রদান থেকে বঞ্চিত করছে। আমরা যদি গত জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় ২৯৪টি কেন্দ্রে সাধারণ ব্যালট আর বাকিগুলোতে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে। ইভিএমে ভোট পড়েছে ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ আর পেপার ব্যালটে ৮০ দশমিক ৮০। তাহলে ৩০ শতাংশের ফারাক কেন। সে ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, ৩০ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হয় ইভিএমের ত্রুটি অথবা জটিলতা, কিংবা ইভিএমের প্রতি মানুষের অনীহা থেকেই ৩০ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ দায়ভার কে নেবে? এ পদ্ধতির যৌক্তিকতা কোথায়? সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার তাই একটি মস্ত বড় ভুল হবে।

তবে সাধারণ পদ্ধতি ও ইভিএমে ভোটের এ ব্যবধানের জন্য ইভিএম কতটা দায়ী আর সাধারণ পদ্ধতিতে নেওয়া কেন্দ্রে জালিয়াতির প্রভাব কতটা সে প্রশ্নটিও থেকে যায়। কারণ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হলে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্সে ভরে রাখার কোনো সুযোগ থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। জাতীয় নির্বাচন, বিভিন্ন সিটি নির্বচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা থাকার পরও সরকারের সামনে আরেকটি সুযোগ এসেছে সে কলঙ্কের পথ থেকে সরে আসার। নতুন বছরের প্রথম মাসেই যে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনটি হতে চলেছে, তা নিয়ে অনেক অনাস্থা, সন্দেহ, অবিশ্বাস থাকলেও বিএনপি এ নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। এর ফলে নির্বাচনটি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে যদি প্রশাসনের ভূমিকাটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে থাকে। ইতিমধ্যে ভোটবিমুখ হয়ে পড়া মানুষকে কেন্দ্রে আনার একটা উদ্যোগ হতে পারে এই সিটি নির্বাচন।

লেখক/চিকিৎসক ও কলামনিস্ট
সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

বাংলাদেশে ইংরেজি নতুন বছরটাও শুরু হলো একটা রাজনৈতিক অনাস্থা ও হতাশার মুখে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে। ৩০ জানুয়ারি ২০২০ অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা হিসাবনিকাশ। এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর প্রতি সৃষ্ট অনাস্থার কারণেই সে হিসাব-নিকাশের অনিশ্চয়তা নিয়েই শুরু হচ্ছে ২০২০ সালের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের পাতা।

নির্বাচন অনুষ্ঠান ও ফলাফল নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় জনমানুষের আস্থার সংকট এতটাই প্রকট যে, অনেকে বিজয়ের আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে রেখেছেন নৌকা প্রতীকের দুই মেয়র প্রার্থীকে। তারা ধরেই নিয়েছেন, যেকোনো উপায়েই হোক, নৌকার দুই প্রার্থীকে বিজয়ী করার বন্দোবস্ত করা হবেই। এ ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ প্রযোজনা ব্যর্থ হবে না বলে যারা ধারণা রাখেন, তারাই আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে রেখেছেন। শুভেচ্ছার সঙ্গে সামান্য আবদারও করেছেন কেউ। ভোট জালিয়াতির দৌরাত্ম্য দেখিয়ে পদ দখল করলেও যারাই মেয়র হবেন, তারা যেন অন্তত মশার দৌরাত্ম্য ও ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্কমুক্ত শহরে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু রক্ষা করেন, সেই আবেদন রেখেছেন কেউ।

সিটি নির্বাচন নিয়ে এই আস্থাহীনতার পেছনে নিঃসন্দেহে এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ভূমিকা রেখেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকা দক্ষিণের নৌকার মেয়র প্রার্থী সিলেকশনের বিষয়টি। যারা মনে করতেন যে, সদ্য বর্ষপূর্তি করা জাতীয় নির্বাচনের বিব্রতকর কালো আস্তর সরানোর উদ্যোগ হিসেবে সরকার ঢাকা সিটি নির্বাচনটিকে সুষ্ঠু করে হারার ঝুঁকি নিতেও পারে, তারাও এই প্রার্থী নির্বাচন দেখে দ্বিধায় পড়ে গেছেন। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ নির্বাচন হলে নৌকার ফলাফল কী হতে পারে, তা জানার পরও ফজলে নূর তাপসকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করিয়ে মেয়র প্রার্থী করায় হিসাব আরও গোলমেলে করে দিয়েছে। কেউ আবার একটু ভিন্ন হিসাবও দিচ্ছেন। বলছেন, যেকোনো উপায়ে দক্ষিণ কব্জা করে উত্তরে সুষ্ঠু ভোট করে সরকার দেখাবে যে, তাদের অধীনে গ্রহণযোগ্য ভোট হয়।

যে যেই ব্যাখ্যাই দিন না কেন, সবই কিন্তু সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার প্রকট সংকটকেই তুলে ধরে। ভোটার তাদের ভোট দিতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী তা গণনা ও প্রকাশ করা হবে এই আস্থাটা কিন্তু কারোর নেই। সবাই হিসাব করছেন কৌশলের। সরকার ও নির্বাচন কমিশন কী ধরনের কৌশল নিতে পারে এবং কী কৌশল নিলে কী ফলাফল আসতে পারে বিশ্লেষণ চলছে তা নিয়েই।

কিন্তু যে দেশের মানুষ নির্বাচনকে একটা উৎসব হিসেবে নিতে চায়, সেই দেশে এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? এর উত্তরটি পাওয়া যাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের কথায়। ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান আছে কি না এ বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন এভাবে, এ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগের কারণ রয়েছে। কেননা, এ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। গত জাতীয় নির্বাচনে তারা নিজেদের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে পারেনি, অনেক কারসাজির আশ্রয় নিয়েছে। বস্তুত জাতীয় নির্বাচনে যা হয়েছে, তা মূলত এক ধরনের অশুভ আঁতাত। নির্বাচন কমিশন, এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মিলে এই আঁতাত তৈরি করেছিল। যে কারণে এই নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। তাদের কাছ থেকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করা দুরাশা ছাড়া আর কিছুই না।

এ ধারণা যে শুধু সুজন সম্পাদকই পোষণ করেন তা-ই নয়। মূলত তার বয়ানে এ দেশের অধিকাংশ মানুষের মতামতটিই প্রতিফলিত হয়েছে। তার কারণ, মাত্র এক বছর আগের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনটির দগদগে ক্ষত হয়তো ভুলতে পারছে না দেশবাসী। কী ঘটেছিল সে নির্বাচনে, তার কিছু তথ্য হয়তো অনেকেরই মনে আছে। … একটি আসনে যত বৈধ ভোট পড়েছে, তার ৯০ শতাংশের বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন ১১০ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ১০৮ জন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। বাকি দুজনও আওয়ামী লীগের জোটের শরিক। অন্যদিকে, ১৪৬টি আসনে মহাজোটের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ১০ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৮৩টি আসনে তাদের ভোট ৫ শতাংশেরও কম। তাদের প্রায় সবাই ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী। নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া ভোটের ফলাফলের প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে একটা-দুটো নয়, ৯১টি কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৫১টিতে ধানের শীষের প্রার্থীর ভোট শূন্য! ৫টি সেন্টারে ১টি করে এবং ৬টি সেন্টারে ২টি করে ভোট পেয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ৯১টির মধ্যে ৬২ সেন্টারে ধানের শীষের প্রার্থী শূন্য বা দু-একটি করে ভোট পেয়েছেন, সেই সেন্টারগুলোতে ভোট পড়ার হার অন্য কেন্দ্রের তুলনায় বেশি। এই কেন্দ্রগুলোর প্রায় সবগুলোতেই ভোট কাস্টিংয়ের হার ৯৪ থেকে ৯৯ শতাংশ।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনেও প্রতিপক্ষ ধানের শীষের প্রার্থীকে হাজারখানেক ভোট ধরিয়ে দিয়ে নৌকার প্রার্থী জয়ী হয়েছেন সোয়া তিন লাখ ভোটে! এ আসনে ১৬৮ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৫টি কেন্দ্রে ধানের শীষের প্রার্থী পেয়েছেন শূন্য ভোট। ১১টি কেন্দ্রে ১ ভোট করে, ১৩টি কেন্দ্রে ২টি করে ও ৬টি কেন্দ্রে ৩টি করে ভোট। অথচ এসব কেন্দ্রেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতোই ভোট পড়ার হার ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশ। ভোটের চিত্র সারা দেশে প্রায় একই ধরনের ছিল। সুজনের দেওয়া তথ্য মতে, এ নির্বাচনে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। ১ হাজার ২০৫টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশ। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পড়েছে ৬ হাজার ৪৮৪টি কেন্দ্রে। আর ৮০ থেকে ৮৯ শতাংশ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে, এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫ হাজার ৭১৯টি।

কিন্তু কেন এতটা অস্বাভাবিক ফলাফল হয়েছিল সে নির্বাচনে? তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির দেওয়া তথ্যেও। ‘একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা’ শীর্ষক গবেষণার প্রাথমিক প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, ৩০০ আসনের মধ্যে দৈবচয়নের ভিত্তিতে বেছে নেওয়া ৫০টি আসনের ৪৭টিতে নির্বাচনের দিন কোনো না কোনো অনিয়ম হয়েছে। ৩৩টি আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা পেয়েছে বলে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়।

নির্বাচনটি এতটাই বাজে হয়েছে যে, শুধু বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, সিপিবিসহ সরকারবিরোধী অংশই নয়, সরকারের শরিক দলগুলো থেকেও জালিয়াতির অভিযোগ বা দায় স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা নৌকার এমপি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘বিগত নির্বাচনে আমিও নির্বাচিত (এমপি) হয়েছি। তারপরও আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, গত নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। জাতীয়, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোথাও ভোট দিতে পারেনি দেশের মানুষ।’

মহাজোটের আরেক শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ লিখিত বক্তব্যে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সব রাজনৈতিক দল ও জনগণ উদ্দীপনা ও আশা নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচনের পরে বিষণœতায় আক্রান্ত হয়েছে পুরো জাতি। এর মূল কারণ হচ্ছে প্রশাসনের এক শ্রেণির অতি-উৎসাহী অংশ ভোটের পূর্ব রাতেই ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখাসহ নানা অনিয়ম সংঘটিত করেছে।

অনেক বিদেশি গণমাধ্যমের মতো প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টও এই নির্বাচনকে বলেছে, একটি স্বচ্ছ জালিয়াতির নির্বাচন। ‘অবিচুয়ারি অব এ ডেমোক্রেসি : বাংলাদেশ’ নিবন্ধে পত্রিকাটি বাংলাদেশের সে নির্বাচনকে বলে একটি ‘ফ্রডুলেন্টলি ট্রান্সপারেন্ট ইলেকশন’। এমন জালিয়াতির নির্বাচনের একটি দগদগে ক্ষত আছে এ দেশের মানুষের, যার বর্ষপূর্তি হলো মাত্র তিন দিন আগেই। তার ওপর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের তোড়জোড় দেখাচ্ছে নির্বাচন কমিশন, যাতে নৌকার প্রার্থী ছাড়া আর কারও সায় নেই। ইভিএম নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক আছে। এমনকী আমেরিকান কম্পিউটার বিজ্ঞানী বারবারা সায়মন পর্যন্ত দি আটলান্টায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন ইভিএমে জালিয়াতির বিস্তারিত। এ বিষয়ে সুজন সম্পাদক ডয়চে ভেলের কাছে বলেছেন, ইভিএম একটি বড় অংশের ভোটারদের ভোট প্রদান থেকে বঞ্চিত করছে। আমরা যদি গত জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় ২৯৪টি কেন্দ্রে সাধারণ ব্যালট আর বাকিগুলোতে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে। ইভিএমে ভোট পড়েছে ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ আর পেপার ব্যালটে ৮০ দশমিক ৮০। তাহলে ৩০ শতাংশের ফারাক কেন। সে ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, ৩০ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হয় ইভিএমের ত্রুটি অথবা জটিলতা, কিংবা ইভিএমের প্রতি মানুষের অনীহা থেকেই ৩০ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ দায়ভার কে নেবে? এ পদ্ধতির যৌক্তিকতা কোথায়? সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার তাই একটি মস্ত বড় ভুল হবে।

তবে সাধারণ পদ্ধতি ও ইভিএমে ভোটের এ ব্যবধানের জন্য ইভিএম কতটা দায়ী আর সাধারণ পদ্ধতিতে নেওয়া কেন্দ্রে জালিয়াতির প্রভাব কতটা সে প্রশ্নটিও থেকে যায়। কারণ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হলে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্সে ভরে রাখার কোনো সুযোগ থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। জাতীয় নির্বাচন, বিভিন্ন সিটি নির্বচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা থাকার পরও সরকারের সামনে আরেকটি সুযোগ এসেছে সে কলঙ্কের পথ থেকে সরে আসার। নতুন বছরের প্রথম মাসেই যে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনটি হতে চলেছে, তা নিয়ে অনেক অনাস্থা, সন্দেহ, অবিশ্বাস থাকলেও বিএনপি এ নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। এর ফলে নির্বাচনটি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে যদি প্রশাসনের ভূমিকাটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে থাকে। ইতিমধ্যে ভোটবিমুখ হয়ে পড়া মানুষকে কেন্দ্রে আনার একটা উদ্যোগ হতে পারে এই সিটি নির্বাচন।

লেখক/চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

Hits: 20


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ