ফেইসবুকে ভাইরাল একটি ভিডিওতে সম্প্রতি দেখা গেছে, হবিগঞ্জে একদল তথাকথিত “জুলাই যোদ্ধা” গভীর রাতে থানায় ঢুকে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারদের প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে এবং জোরপূর্বক একজন আসামিকে ছাড়িয়ে নিতে চাপ দিচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যত কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি। এই দৃশ্য শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্রই নয়, বরং গোটা পুলিশ প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি নগ্ন উদাহরণ।
প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কিসের আলামত? যে পুলিশ বাহিনী নিজের থানা, নিজের হেফাজতে থাকা আসামিকেও রক্ষা করতে পারে না, সেই পুলিশ দিয়ে কি আদৌ একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব? পুলিশের চোখে-মুখে যদি ভয় আর অনিশ্চয়তা ভর করে থাকে, তবে রাষ্ট্রের ভীত কোথায় দাঁড়িয়ে থাকে?
এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নীরবতা। এমন একটি গুরুতর ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব ছিল অবিলম্বে শক্ত অবস্থান নেওয়া, স্পষ্ট স্টেটমেন্ট দেওয়া, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা এবং থানায় হামলা ও হুমকিদাতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার বিপরীতটাই দেখছি—এক ধরনের রহস্যজনক প্রশ্রয় ও নির্লিপ্ততা।
অথচ অন্য ক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখি। মোবাইল চুরির অভিযোগে একজন নারীকে বেঁধে ঠান্ডা পানি ঢেলে শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় প্রশাসন দ্রুত নড়েচড়ে বসেছে, বিশেষ করে মাদ্রাসা ছাত্রদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সঠিক ও প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—আইনের এই কঠোরতা কি সবার জন্য সমান?
তাহলে জুলাই যোদ্ধাদের বেলায় এমন দ্বৈতনীতি কেন? কোনো অন্যায় কাজের সঙ্গে “জুলাই যুদ্ধ” বা কোনো অতীত আন্দোলনের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। অপরাধ অপরাধই, সে যেই করুক না কেন। থানায় ঢুকে পুলিশকে হুমকি দেওয়া, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া—এগুলো সরাসরি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার শামিল। এসব কাজকে যদি রাজনৈতিক বা আবেগী পরিচয়ের আড়ালে ঢেকে রাখা হয়, তাহলে আইনের শাসন শুধু স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমরা একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করছি—কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ের দোহাই দিয়ে মামলা থেকে অব্যাহতি, কোথাও থানায় প্রভাব খাটিয়ে অভিযুক্তকে রক্ষা, আবার কোথাও পুলিশের উপর প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি। এসব ঘটনায় পুলিশ যেন ধীরে ধীরে “আইনের প্রয়োগকারী বাহিনী” থেকে “নীরব দর্শক”-এ পরিণত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না।
একজন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মূল দায়িত্ব হলো—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্ভীক রাখা, তাদের পেছনে রাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখার সাহস দেখানো। কিন্তু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ভূমিকায় সেই দৃঢ়তা অনুপস্থিত। ফলে পুলিশের মধ্যে ভয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে অনাস্থা এবং অপরাধীদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব দিন দিন বাড়ছেই।
এইভাবে চলতে থাকলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আইন দুর্বল হলে শক্তিশালীরাই রাজত্ব করবে, আর সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে আরও দূরে সরে যাবে। এখনই সময়—দ্বৈতনীতি পরিহার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার। নইলে ইতিহাস জেনারেল জাহাঙ্গীর চৌধুরীকে একজন ব্যর্থ ও অপদার্থ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবেই মনে রাখবে।












