• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

একটি জাতির পুনর্জাগরণ-প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন, রাষ্ট্রগঠন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে অবদান

প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:৩৮
আপডেট: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:৩৮

96598887

একটি জাতির পুনর্জাগরণ-প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন, রাষ্ট্রগঠন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে অবদান

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামো নানা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। সেই কঠিন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক সংস্কার, কৃষি উন্নয়ন, জাতীয় পরিচয় এবং পররাষ্ট্রনীতিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তার রাষ্ট্রদর্শন ও উন্নয়ন চিন্তা নিয়ে রাজনৈতিক ও একাডেমিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলের ইতিবাচক ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে গ্রাস করে রাখা গভীর ও জটিল সংকটকে অনুধাবন করা প্রয়োজন। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরও নবীন রাষ্ট্রটি মারাত্মক অবকাঠামোগত ধ্বংস, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন এবং গভীর রাজনৈতিক বিভক্তির শিকার হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের শুরুতে একদলীয় সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রতিষ্ঠিত হলে দেশটি আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থান, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রাষ্ট্রকে এক সংকটময় অবস্থায় নিয়ে যায়।
এই হতাশাব্যঞ্জক ঐতিহাসিক শূন্যতার মধ্যেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ঘটে। শুধু শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং এমন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। যিনি জাতির সামনে একটি সুস্পষ্ট ও যুগান্তকারী পথনির্দেশনা উপস্থাপন করেছিলেন। প্রশাসনিক নেতৃত্বে তার আগমন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের সূচনা করে। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে আনতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসামরিকীকরণ, অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের বিকাশ এবং শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল সামরিক উপায়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেকে একজন পূর্ণাঙ্গ বেসামরিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। মধ্যপন্থী, মুক্তবাজারভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি জাতীয়তাবাদী, ঐতিহ্যবাদী এবং প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করে। এর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার পর গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ও সেনানায়ক থেকে দূরদর্শী বেসামরিক রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের এই উত্তরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, তিনি শুধু যুদ্ধজয়ের নায়কই ছিলেন না; বরং রাষ্ট্রগঠন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রেও একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী নেতা ছিলেন।
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর মধ্যে একটি ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণার বিকাশ এবং এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল মূলত ভাষা ও জাতিগত পরিচয়।
১৯৭৫ সালের পর এই ধারণা দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। প্রথমত, এটি অ-বাঙালি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করেছিল, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে। দ্বিতীয়ত, এটি বাংলাদেশের নাগরিকদের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী জনগণের একটি স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করতে পারেনি। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য একটি স্বতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত জাতীয় পরিচয় অত্যন্ত প্রয়োজন।
এই উপলব্ধি থেকেই তিনি জাতীয় পরিচয়ের ধারণাকে ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ের সীমা থেকে বের করে এনে ভৌগোলিক, নাগরিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন। তার প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ছিল এমন একটি ধারণা, যা রাষ্ট্রের সব নাগরিককে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের অধীনে একত্রিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদানগুলো ছিল-
প্রথমত, ভৌগোলিক ভিত্তি: নির্ধারিত সীমান্তের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রসত্তার স্বীকৃতি।
দ্বিতীয়ত, ভাষাগত ভিত্তি: বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের ঐক্য ও যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
তৃতীয়ত, সাংস্কৃতিক ভিত্তি: বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি।
চতুর্থত, ধর্মীয় ভিত্তি: ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
পঞ্চমত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তি: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ সকল নাগরিককে আইনগত ও জাতীয় কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা।

একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রের আদর্শিক কাঠামোকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেন। ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’এই নীতিকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভাষায় অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার আইনগত সুরক্ষাও বজায় রাখা হয়।
জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিতে এই নতুন জাতীয়তাবাদ ছিল বিভক্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত জাতীয় চেতনাকে পুনর্গঠনের একটি কার্যকর উপায়। তার বিশ্বাস ছিল, একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে এমন একটি জাতীয় পরিচয় প্রয়োজন, যা দেশের সব জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে সংযুক্ত করবে। এই কারণেই ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার নানা কাঠামোগত দুর্বলতায় আক্রান্ত ছিল। ১৯৭২ সালের পর ব্যাপক জাতীয়করণের ফলে দেশের অর্থনীতিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, পুঁজি পাচার, উৎপাদন হ্রাস এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছিল। এমনকি আন্তর্জাতিক মহলের অনেক পর্যবেক্ষক বাংলাদেশকে একটি ‘স্থায়ীভাবে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমান একটি গতিশীল ও বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জিয়াউর রহমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি সরকারি আমলাতন্ত্র নয়, বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও বেসরকারি খাত। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বস্ত্র, পাট ও হালকা প্রকৌশল শিল্পসহ অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতের হাতে ফিরিয়ে দেন। তিনি ব্যক্তিগত বিনিয়োগের ওপর থাকা বিভিন্ন বিধিনিষেধ শিথিল করেন এবং উদ্যোক্তাদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেন।
দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের জন্য জিয়াউর রহমান জাতীয় সীমানার বাইরেও নতুন সম্ভাবনার সন্ধান করেন। তিনি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশসমূহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষ ও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়। একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের উপার্জিত অর্থ নিরাপদে দেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসে এবং বৈদেশিক মুদ্রার একটি স্থায়ী উৎস তৈরি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখার ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই নির্মিত হয়েছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়নকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে দেখা। তার বিশ্বাস ছিল, প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন একটি জাতি অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তার অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কার কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলাদেশের প্রকৃত প্রাণস্পন্দন নিহিত রয়েছে তার প্রায় ৬৮ হাজার গ্রামের মধ্যে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, যতদিন পর্যন্ত একটি জাতি তার জনগণের খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন প্রকৃত অর্থে সে জাতি পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে পারবে না। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি একটি ব্যাপক কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যার সবচেয়ে স্মরণীয় ও প্রতীকী অংশ ছিল ঐতিহাসিক ‘গণখাল খনন কর্মসূচি’।

১৯৭৯ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই খাল খনন অভিযান ছিল দেশব্যাপী স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক এক অভূতপূর্ব উদ্যোগ। জিয়াউর রহমান শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রদানের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খাল খননের কাজে অংশগ্রহণ করেন। হাতে কোদাল নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করার তার এই দৃশ্য জনগণের মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।
তার এই প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী, তরুণ, বুদ্ধিজীবী এবং গ্রামীণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অনেকেই নিজেদের ছুটির দিন ও অবসর সময় স্বেচ্ছাশ্রমে ব্যয় করে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। এর ফলে এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জাতীয় অংশগ্রহণের একটি গণআন্দোলনের রূপ লাভ করেছিল। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। দেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত খাদ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতির লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ নামে একটি নতুন ধারণার প্রবর্তন করেন যা স্থানীয় সরকার সংশোধনী আইনের মাধ্যমে গঠিত হয়। রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং গ্রামীণ জনগণের হাতে উন্নয়ন কার্যক্রমের নেতৃত্ব তুলে দেয়াই ছিল এই কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য। জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিতে গ্রামীণ উন্নয়ন ছিল শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয় নয়; বরং এটি ছিল জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। তার বিশ্বাস ছিল, বাংলাদেশের গ্রামগুলো শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠলে সমগ্র জাতিই উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাবে। গণখাল খনন কর্মসূচি এবং স্বনির্ভর গ্রাম সরকার ব্যবস্থা সেই বৃহত্তর উন্নয়ন দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন ছিল।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে নারীর মূলধারায় অন্তর্ভুক্তিকরণের একজন অগ্রদূত ছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে যদি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবন থেকে বাইরে রাখা হয়, তবে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে গৃহীত কাঠামোগত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, জাতীয় মহিলা সংস্থা গঠন এবং সংসদে আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ভিত্তি স্থাপন করে এবং আধুনিক শিল্প শ্রমবাজারে তাদের নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালনের পথ সুগম করে।
স্বাধীনতার পর উপমহাদেশজুড়ে চলমান শীতল যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে গভীরভাবে সীমাবদ্ধ করে দেয়। যার ফলে দেশটি একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক শক্তি ও সোভিয়েত ব্লকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক অবস্থানে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও নীতিনির্ধারণের নমনীয়তাকে সংকুচিত করে এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব থেকে দেশটিকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। এ প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান বাস্তববাদী ও কৌশলনির্ভর কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে পুনর্গঠন করেন এবং ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়’ নীতিকে এর মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এই নীতিকে কেন্দ্র করে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ, সক্রিয় ও বহুমাত্রিক রূপে বিকশিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
তিনি আরব ও বৃহত্তর ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠাও আরও গভীর করেন। বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়কে কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে তিনি বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা, অনুকূল তেল সরবরাহ চুক্তি এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বিস্তৃত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি তিনি ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)’র বিভিন্ন উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধকালীন সময়ে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্বও পালন করেন। জিয়াউর রহমান চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি এটি বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম প্রাপ্তির পথ উন্মুক্ত করে।
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)’র ধারণা নিঃসন্দেহে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান এবং মালদ্বীপ আঞ্চলিক আধিপত্যের কাঠামোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে তিনি নিজে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাজধানী সফর করেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি সুসংগঠিত ও দূরদর্শী রূপরেখা উপস্থাপনের জন্য বিশেষ দূত প্রেরণ করেন। যদিও সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৫ সালে, তার মৃত্যুর চার বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাসে তাকে এর প্রধান স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তার এই দূরদর্শী উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়াকে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি সমান অংশীদারিত্বভিত্তিক স্থায়ী আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করার ভিত্তি স্থাপন করে।
কোনো দেশ পেশাদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা বাহিনী ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সার্বভৌম স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে না। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর সেনাবাহিনী সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা, মারাত্মক সরঞ্জাম সংকট এবং নিয়মিত অফিসার ও মুক্তিযোদ্ধা ফেরত আসা সদস্যদের মধ্যে মতাদর্শগত বিভাজনে জর্জরিত ছিল। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর একটি ব্যাপক ও সমন্বিত আধুনিকীকরণ কার্যক্রম গ্রহণ করেন । তিনি সশস্ত্র বাহিনীতে প্রচলিত কমান্ড কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, কঠোর শৃঙ্খলা নিশ্চিত করেন এবং ভাটিয়ারীর বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ)’র মতো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও কাঠামোগত সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নতুন পদাতিক ডিভিশন গঠন করেন, দেশের বিভিন্ন কৌশলগত ভৌগোলিক স্থানে গুরুত্বপূর্ণ সেনানিবাস স্থাপন করেন এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ উন্নয়নের লক্ষ্যে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত কূটনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, নৌযান এবং উন্নত আর্টিলারি অস্ত্র সংগ্রহ করেন, যার ফলে দেশ বহিরাগত হুমকির বিরুদ্ধে একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জন করে।
১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত এক সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্মযাত্রার মর্মান্তিক সমাপ্তি ঘটে। তবে তার হত্যাকান্ড মাত্র চার বছরের শাসনামলে নির্মিত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, যুগান্তকারী সংস্কার এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য রেখে যাওয়া সুদূরপ্রসারী উত্তরাধিকারকে মুছে দিতে পারেনি। ঢাকায় অনুষ্ঠিত তার জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার গড়ে উঠেছে বাস্তবমুখী সংস্কার, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি অটল আস্থার ভিত্তিতে। তিনি এমন এক সময়ে দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যখন বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংকটে গভীরভাবে নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু তার নেতৃত্বে দেশ বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের বিকাশ এবং মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি লাভ করে। যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তার গৃহীত সংস্কারসমূহ শুধু রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন রোধ করেনি, বরং বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি প্রদান করেছিল। তার নেতৃত্বে দেশ নতুন আত্মবিশ্বাস অর্জন করে এবং উন্নয়নের একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা লাভ করে। সর্বোপরি, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন সেই দূরদর্শী স্থপতি, যিনি সমসাময়িক বাংলাদেশের কাঠামোগত, অর্থনৈতিক ও জাতীয় চেতনার স্তম্ভগুলো নির্মাণ করেছিলেন।

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, শাবিপ্রবি’র সাধারণ সম্পাদক।


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com