লেখক: ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ, লন্ডন, ১৩ জুলাই ২০২৬
ভূমিকা
শিশুরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। অথচ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর, জেলা সদর, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, বাজার ও পর্যটনকেন্দ্রে হাজার হাজার পথশিশু প্রতিদিন অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও অবহেলার মধ্যে বেড়ে উঠছে। নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক স্নেহ থেকে বঞ্চিত এসব শিশুর জীবন আমাদের সামাজিক বাস্তবতার এক কঠিন প্রতিচ্ছবি।
পথশিশু হওয়ার কারণ
পথশিশু সমস্যার পেছনে রয়েছে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক ভাঙন, শিশু নির্যাতন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন এবং সামাজিক বৈষম্য—এসব কারণ অনেক শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাস্তায় ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মৃত্যু বা অসুস্থতাও শিশুদের পথজীবনে বাধ্য করে।
পথশিশুদের জীবনসংগ্রাম
পথশিশুরা ফুটপাত, রেলস্টেশন, পার্ক কিংবা উন্মুক্ত স্থানে রাত কাটায়। জীবিকার জন্য তারা ফুল বিক্রি, কাগজ ও প্লাস্টিক সংগ্রহ, জুতা পালিশ, যানবাহন পরিষ্কার, ভিক্ষাবৃত্তি অথবা অস্থায়ী শ্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকে। প্রতিনিয়ত তারা ক্ষুধা, অনিরাপত্তা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মানবপাচার এবং মাদকের ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বঞ্চনা
অধিকাংশ পথশিশুর নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে তারা শিক্ষার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ, নিরাপদ পানির অভাব এবং চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বিশেষ করে পথশিশু কন্যারা নানা ধরনের সহিংসতা ও শোষণের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ
সরকার পথশিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। পাশাপাশি বহু বেসরকারি সংস্থা আশ্রয়কেন্দ্র, অস্থায়ী বিদ্যালয়, পুষ্টি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক সহায়তার মাধ্যমে পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে। তবে দেশের চাহিদার তুলনায় এসব উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
করণীয়
পথশিশু সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে দরিদ্র পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিশু সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এবং তাদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
উপসংহার
পথশিশুরা সমাজের বোঝা নয়; তারা আমাদেরই সন্তান এবং দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ। তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, টেকসই জাতীয় উন্নয়নেরও অপরিহার্য শর্ত। একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও শিশুবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পথশিশুদের অধিকার ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।












