গৃহবধূ থেকে রণজয়ী রাজনীতিক-প্রধানমন্ত্রী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আজ ৪ জানুয়ারি। গতকাল ৩ জানুয়ারি রাজনৈতিক জীবনে ৩৬ বছর পূর্ণ করে আজ ৩৭ বছরে পদাপর্ণ করলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক বেগম খালেদা জিয়া। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরান ঢাকার বকশীবাজারের নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবন্দি জীবনযাপন করছেন গৃহবধূ থেকে ৩ বার প্রধানমন্ত্রী হওয়া রণজয়ী রাজনীতিক নারী।

বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় এই মহিলা প্রধানমন্ত্রীর জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রকৃত নাম খালেদা খানম পুতুল। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট। তাঁর পিতামহ হাজী সালামত আলী, মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান। বাবা ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার।

তাঁর স্বামী বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান এবং ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, তিনি এখন সপরিবারে লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। তাঁর কনিষ্ঠ ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।

পড়ালেখা করতেন দিনাজপুরেই। জিয়াউর রহমান তখন পাকিস্তান আর্মির ক্যাপ্টেন। খালেদা খানম পুতুল ছিলেন জিয়াউর রহমানের দূর সম্পর্কের খালাতো বোন। বিয়ের সময় জিয়ার পোস্টিং ছিল দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালের আগস্টে জিয়ার সাথে বিয়ের পর থেকেই পরিচিত হন বেগম খালেদা জিয়া নামে।

স্বামী, সন্তান আর পরিবার নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন এই গৃহবধূ। রাজনীতির কথা কল্পনাও করেননি। কিন্তু বাস্তবতা হল ১৯৮১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর নেতাকর্মীদের প্রবল চাপে ও আহ্বানে ঘর ছেড়ে রাজপথকেই ঠিকানা বানাতে হয় তাঁকে। গৃহবধূ থেকে দেশ ও মানুষের মুক্তির জন্য বেছে নেন সংগ্রামী জীবন। এখন তাঁর শরীরে বয়সের ছাপ পড়েছে। তবুও এই মুহূর্তে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্থিতিশীলতার তিনিই একমাত্র প্রতীক।

রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত বেগম জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধু ছিলেন। মূলতঃ দুই পুত্রকে লালন পালন ও ঘরের কাজ করেই সময় কাটাতেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীনও রাজনীতিতে বেগম জিয়ার উপস্থিতি ছিল না।

১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভুত্থ্যানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অনুরোধে-আহ্বানে তিনি ১৯৮২ সালে ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপাসরন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে পার্টির চেয়ারপাসরন নির্বাচনে তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হন। এরপর তার নেতৃত্বেই মূলতঃ বিএনপির পূর্ণ বিকাশ হয়।

১৯৮৩ সালের বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। একই সময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। বেগম জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। একই সময় তার নেতৃত্বে ৭ দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দল হয়। ৮ দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, ৫ দলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখান করে।

১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন। পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। অবশেষে দীর্ঘ আট বছর একটানা নিরলস ও আপোসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট পাঁচটি আসনে অংশ নিয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন।

খালেদা জিয়া নিজ দলের নেতৃত্বে যেমন দিয়েছেন, তেমনি নির্বাচনের মাঠেও তাঁর সাফল্য শতভাগ। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে ২০১৪ ও ২০১৮ ছাড়া বাকি সবগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নির্বাচনে খালেদা জিয়া কখনোই পরাজিত হননি।

১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ৫টি করে আসন এবং ২০০৮ সালে ৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতে জয়ী হোন খালেদা জিয়া। সব আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ভোট সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম, তারা কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীই করতে পারেননি।

বেগম খালেদা জিয়া এখন একটি নামই শুধু নয়-একটি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মহীয়সী এই মহিলা নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। স্বৈরাচার একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি বছরের পর বছর লড়াই করেছেন, সংগ্রাম করেছেন-জনগণের কাতারে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজপথে সংগ্রাম করেছেন। কারাগারে গেছেন। গৃহে অন্তরীণ থেকেছেন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফোনঃ +৪৪-৭৫৩৬-৫৭৪৪৪১
Email: [email protected]
স্বত্বাধিকারী কর্তৃক sheershakhobor.com এর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত